Share |

অমর একুশে বিশ্বস্বীকৃতি পেলো যেভাবে

এম. সাইদুর রহমান খান
এম. সাইদুর রহমান খান

বাঙালির অবরুদ্ধ চেতনার মুক্তি এবং জাতিসত্ত্বা পুর্নজাগরণে ভাষা আন্দোলনের অবদান রেনেসাঁর সমতুল্য। সপ্তদশ শতকের কবি আবদুল হাকিমের ‘যে জন বঙ্গেতে জম্মি হিংসে বঙ্গবাণী’ কাব্যাংশ সর্বজনবিদিত। ভারতবর্ষে ভাষা সমস্যা দীর্ঘকালের। রাজনৈতিক চেতনা প্রাধান্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাষা সমস্যাও গুরুত্ব পেতে থাকে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ে চেতনার উম্মেষ ঘটলে সর্বভারতে একটা সাধারণ ভাষা বা লিঙ্গুয়া-ফ্রাঙ্কা প্রচলনের দাবি ওঠে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হওয়া উচিত এ বিষয়ে প্রথমে বিতর্ক শুরু করে বুদ্ধিজীবী মহল। ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডঃ জিয়াউদ্দিন আহমেদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তাব করলে ভাষাপন্ডিত ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ জ্ঞানগর্ভ যুক্তি দিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করেন। এর ফলে পূর্ব বাংলার শিক্ষিত সমাজ ও ছাত্রদের মধ্যে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সপক্ষে একটি প্রবল জনমত সৃষ্টি হয়। এরপর আন্দোলনের দীর্ঘ বন্ধুর পথ পেরিয়ে বহু রক্তের বিনিময়ে বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারের রক্তস্নাত একুশে ফেব্রুয়ারি মহান ভাষা দিবস বা শহীদ দিবস হিসেবে বাঙালি জাতি ১৯৫২ সাল থেকে মর্যাদার সাথে পালন করে আসছে। বাঙালি জাতির অমূল্য সম্পদ ভাষা শহীদদের রক্তমাখা অমর একুশে বাংলার মাটিতে, আলো বাতাসে স্থান করে নিল আমাদের অমিত প্রেরণার অনিঃশেষ উৎস এবং অধিকার আদায় ও আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে।
 একুশ আমাদের চেতনা, একুশ আমাদের প্রেরণা। একুশের প্রেরণা আমাদের ধাবিত করেছে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের দিকে। একুশের বীর শহীদদের রক্ত স্রোতে ভেসে যায় বাঙালির সকল দীনতা, হীনতা ও দুর্বলতা। তারা নির্জীব বাঙালি জাতিকে এক অমূল্য শিক্ষা দিয়ে গেছেন। ভয়কে জয় করার সাহস ও মৃত্যুকে তুচ্ছ করার শিক্ষা, ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান গাইতে পারা এবং বুঝতে শিখিয়েছেন “Only they deserve to live who dare to die”। এই শিক্ষার কল্যাণে বাঙালি জাতি অদম্য সাহসের সঙ্গে বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত আত্মপ্রতিষ্ঠার কঠোর সংগ্রাম চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ভাষা আন্দোলনের বড় সাফল্য আমাদের বাঙালি পরিচয়কে সুস্পষ্ট করা। রফিক, সালাম, বরকতসহ অসংখ্য নাম না জানা শহীদের রক্তবীজ থেকে জন্ম নিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ভিত্তি। মাতৃভাষার জন্য তাদের আত্মত্যাগে ভাস্বর এই দিনটি ১৯৯৯ সালে পেলো বিশ্বস্বীকৃতি।
বাঙালির মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের আন্দোলন সংগ্রাম স্মরণে গভীর শ্রদ্ধার সাথে পালিত মহান একুশে ফেব্রুয়ারিকে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’’ ঘোষণার প্রস্তাবক ছিল বাংলাদেশ সরকার। এজন্য ‘মাদার ল্যাংগুয়েজ অব দ্যা ওয়াল্ড’ এর উদ্যোগ, বাংলাদেশ সরকারের সময়োচিত দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ইউনেস্কোর সাধারণ কনফারেন্সে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের দক্ষ কূটনৈতিক তৎপরতার কারণেই ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো একুশে ফ্রেবুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। ৫ সদস্য বিশিষ্ট বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য হিসেবে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে উপস্থিত থাকতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। প্রতিনিধিদলের অন্যান্য সদস্যরা হলেন, তদানীন্তন শিক্ষা সচিব ডঃ সা’দত হোসেন, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডঃ আয়েশা খাতুন, ইউনেস্কো বাংলাদেশ জাতীয় কমিশনের সেক্রেটারি প্রফেসর কফিলউদ্দিন ও ফ্রান্সে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী। শিক্ষা মন্ত্রী জনাব এ.এস.এইচ.কে. সাদেক প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।
 কানাডার ভ্যাংকুভারে প্রবাসী কিছু বাঙালি ও অন্যান্য ভাষাভাষী কয়েকজন মিলে ‘Mother language lovers of the world’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এ সংগঠনের উদ্যোক্তাদের মধ্যে রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালামসহ (কি অদ্ভূত মিল, ১৯৫২-এর ২১শে ফেব্রুয়ারি যাদের রক্তে লেখা হয়েছে তাদের মধ্যে রফিক ও সালাম অন্যতম) কয়েকজন মিলে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’’ ঘোষণার প্রস্তাব করে প্রথমে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরে ও পরে প্যারিসে ইউনেস্কোর হেড কোয়ার্টারে পাঠান। কিন্তু ইউনেস্কো থেকে তাদের বলা হয়, এ ধরণের প্রস্তাব ইউনেস্কোর সদস্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসতে হবে। তখন তারা বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করেন। ইউনেস্কোর ৩০তম দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে প্রস্তাব পাঠানোর সময় বাকি ছিল মাত্র এক সপ্তাহ। বিষয়টি তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে আনা হলে তিনি এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেবার জন্য শিক্ষা মন্ত্রী জনাব এ.এস.এইচ.কে সাদেককে নির্দেশ দেন। ফলে বাংলাদেশের প্রস্তাবটি শেষ সময়ের (১০ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৯) দু’দিন আগেই ইউনেস্কোর সদর দফতরে পৌঁছে যায়। বাংলাদেশের প্রস্তাব ছিল এরূপ - Bangladesh propses that 21st February be proclaimedas 'International Mother Language Day' throughout the World to commemorate the martyrs who sacrificed their lives on this very date in 1952.  ইউনেস্কোর সচিবালয়ে বাংলাদেশের এ প্রস্তাব নিয়ে বেশ কিছু সমস্যা দেখা দেয়। প্রস্তাবটি গৃহীত হলে এ দিবসটি পালন করতে প্রতি বছর ইউনেস্কোর কমপক্ষে একলক্ষ ডলার বাজেট দরকার, যা দাতা দেশগুলির আপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইউনেস্কোর মহাপরিচালক সরাসরি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে এর সম্ভাব্যতা যাচাই এর জন্য এক্সিকিউটিভ বোর্ডে প্রেরণের জন্য মতামত দেন। এতে আমাদের প্রস্তাবটিকে রীতিমত অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সদস্যবৃন্দ বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রী সাদেক, রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী ও মহাপরিচালকের বিশেষ উপদেষ্টা জনাব তোজাম্মেল হক (টনি হক, প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত, বর্তমানে বার্মিংহামের বাসিন্দা) বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ইউনেস্কোর ডেপুটি মহাপরিচালক জনাব কলিন পাওয়ারের সাথে সাক্ষাত করে আমরা তাকেও বুঝিয়েছি যে, আমাদের প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য হলো- পৃথিবী থেকে দ্রুত বিলীয়মান ভাষাগুলিকে রক্ষা করা এবং তা টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে বৃহত্তর সচেতনতা গড়ে তোলা।
 উল্লেখ্য যে, প্রতি বছর প্রায় ৩০/৪০টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষা পৃথিবী থেকে অবলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কাজেই দু’বছর আমাদের প্রস্তাবটি ঝুলিয়ে রাখলে আরো অনেকগুলি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠির মুখের ভাষা হারিয়ে যাবে। অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক জনাব কলিন পাওয়ার বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করেন এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের প্রস্তাবটি যথারীতি কমিশন-২ এ এজেন্ডা হিসেবে পাঠানোর সুপারিশ করেন। প্রস্তাবটি যদি Feasibility study-এর জন্য এক্সিকিউটিভ বোর্ডে প্রেরণ করা হতো তাহলে আর কোনদিন তা আলোর মুখ দেখতো বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের প্রস্তাবকে (নম্বর ৩০/সি/ডি/আর-৩৫) লিখিতভাবে সমর্থন জানায় পাকিস্তান ও সৌদিআরবসহ ২৮টি দেশ। পাকিস্তানের সমর্থন আদায়ে শিক্ষামন্ত্রী জনাব সাদেক এর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।  কনফারেন্সে আগত বিভিন্ন দেশের ডেলিগেটদের মধ্যে লবিং করার জন্য রাষ্ট্রদূত মোয়াজ্জেম আলী আমাদের কিছু গাইড লাইন ও দিক নির্দেশনা দিলেন। সারাজীবন শিক্ষকতা করেছি, কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা শূন্য। তবুও অন্তরের স্বতঃস্ফুর্ত জোরালো তাগিদে রাষ্ট্রদূত মহোদয়কে আশ্বস্ত করি যে, আফ্রিকান দেশগুলোর ডেলিগেটদের সাথে আমি কথা বলবো। আশির দশকে আফ্রিকার দুটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাম্বিয়া ও নাইজেরিয়ার আহমেদু বেল্লো) চার বছর শিক্ষকতা করেছি। সে সুবাদে প্রতিবেশী আরো কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করেছি। আমি জানি ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে ওদের অনেকের মাতৃভাষাকে গ্রাস করেছে ইংরেজী, ফরাসি ও জার্মান ভাষা। কিছু কিছু ভাষা এখনও অস্তিত্বের জন্য লড়ছে ।  
আমরা অন্যান্য দেশের ডেলিগেটদের বলেছি যে, মানুষের মনে স্বদেশ চেতনা ও স্বদেশ প্রেম উৎসারণে ভাষা এক বড় অবলম্বন। নিজের মাতৃভাষা বাংলাকে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক আগ্রাসন থেকে মুক্ত করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার ছাত্র জনতা আত্মত্যাগের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে স্মরণীয় করে রাখতে ঐ দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ পালনের প্রস্তাব আমরা করেছি। ২১শে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি পেলে তা পালনের মাধ্যমে পৃথিবীর অনেক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী তাদের নিজ মাতৃভাষাকে রক্ষার সুযোগ পাবে। এই স্বীকৃতি শুধুমাত্র বাংলাদেশের উদ্যোগের প্রতি নয়, বিশ্বমানবের আপন ভাষার মর্যাদার দিকটি এতে প্রতিফলিত হবে। সপ্তাহখানেক আমরা লবিং করার সুযোগ পেয়েছিলাম। ইউনেস্কোর এতগুলো রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের এই স্বল্প সময়ের মধ্যে যুক্তি দিয়ে রাজী করানো খুব সহজ কাজ ছিল না। নিজস্ব মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষা ও সংরক্ষণ করতে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। বাঙালিরা সেদিন প্রতিবাদী হয়ে যেভাবে শাসকগোষ্ঠির বিরুদ্ধে লড়ছে, ত্যাগের যে গৌরবমাখা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা অন্য কোন জাতি পারেনি। আর এখানেই তো ২১শে ফেব্রুয়ারি অনন্যতা। একথাগুলিই আমরা বুঝানোর চেষ্টা করেছি বিদেশী প্রতিনিধিদের।
উল্লেখ্য যে, ইউনেস্কোর ৩০তম দ্বিবার্ষিক সাধারণ সম্মেলন ১৯৯৯ সালের ২৬ অক্টোবর থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিদিন বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ২/৩টি সমান্তরাল সেশন চলতে থাকে। আমাদের প্রস্তাবটি ১২ নভেম্বর তারিখের জন্য এজেন্ডাভূক্ত হয়। প্রায় ৮/১০ দিন জোরালো লবিং শেষে আমাদের মাঝে এলো সেই বহু প্রতীক্ষিত ১২ নভেম্বর। সকাল ১০টায় যথারীতি কমিশন-২-এর কার্যক্রম আলোচ্যসূচী অনুযায়ী শুরু হলো। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী, ড. সা’দত হোসেন ও আমি নির্ধারিত ডেস্কে আসন নিলাম। পেছনের সারিতে আরো ছিলেন ইউনেস্কো বাংলাদেশ জাতীয় কমিশনের সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর কফিল উদ্দিন, প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর ইখতিয়ার মমিন চৌধুরী এবং ইউনেস্কোর মহাপরিচালকের বিশেষ উপদেষ্টা জনাব টনি হক। কমিশনের সভাপতি ে াভাকিয়ার জনাব লুডোভিট মোলনার একের পর এক প্রস্তাবগুলো উত্থাপন করছেন - বিতর্ক হচ্ছে, সংশোধনী আসছে, গৃহীত বা পরিত্যক্ত হচ্ছে। দুরু দুরু বুকে আমরা অপেক্ষা করছি, না জানি কি হয়।  
এখানে যদি আমাদের প্রস্তাব গৃহীত না হয় তবে সকল প্রচেষ্টাই ব্যর্থতায় ঢাকা পড়ে যাবে, আর এখানে পার হওয়া মানেই বাংলাদেশের জন্য বিরাট গৌরব অর্জন। তাই স্বভাবতঃই আমরা ছিলাম ভীষণ টেনশনে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকেও বারে বারে খোঁজ নেওয়া হচ্ছিল আমাদের প্রস্তাবের অগ্রগতি সম্পর্কে। ভ্যাংকুভার থেকে রফিক ও সালাম রাষ্ট্রদূতকে ফোন করে খোঁজ-খবর নেয় একাধিকবার। আমাদের বড় ভয় ছিল- যদি কোন সদস্য প্রস্তাবটির ওপর Feasibility study- করতে বলেন কিংবা প্রস্তাবটিকে ভাষা বিষয়ক কমিটি ও এক্সিকিউটিভ বোর্ডের মাধ্যমে পেশ করতে বলেন তাহলে সে ব্যাপারে তাদেরকে নিবৃত্ত করা সহজ হবে না। স্থানীয় সময় বেলা তিনটায় আলোচ্যসূচী অনুযায়ী উত্থাপিত হলো বাংলাদেশের সেই ঐতিহাসিক প্রস্তাব (নম্বর ৩০সি/ডি/আর-৩৫)। মাননীয় রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অতি সুন্দরভাবে প্রস্তাবের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করলেন। আমাদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ক্রমেই বাড়ছে। সমে¥লন কক্ষে বিভিন্ন দেশের প্রায় পাঁচশত প্রতিনিধি উপস্থিত। সভাপতি মহোদয় পর পর দু’বার জিজ্ঞাসা করলেন প্রস্তাবের ওপর কারো কোন আপত্তি বা মন্তব্য আছে কিনা। আমাদের পরম সৌভাগ্য। কারো কোন আপত্তি না থাকায় সভাপতি জনাব মোলনার তিনবার হাতুড়ি পিটিয়ে প্রস্তাবটি গৃহীত হলো বলে ঘোষণা দিলেন। হাততালিতে মুখরিত হলো সম্মেলন কক্ষ। সে কি অনুভূতি! আমরা আনন্দে আত্মহারা-উদ্বেলিত। মনে হচ্ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির আবেগ ও উচ্ছাসের বহিঃপ্রকাশ ঘটলো আমাদের ক’জনার মধ্যদিয়ে। এত অল্প সময়ে এত বড় অর্জন আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের মতই মনে হচ্ছিল। বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরাও আমাদের অভিনন্দন জানালেন। আমাদের সত্ত্বা ও অস্তিত্বের এক অপরিহার্য ও অমোঘ অবলম্বন মাতৃভাষা বাংলা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলো। এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে।
আগেই উল্লেখ করেছি এরপর ১৭ই নভেম্বর সাধারণ সম্মেলনে প্রস্তাবটি রুটিন বিষয় হিসেবেই গৃহীত হয়। ০৪ জানুয়ারি ২০০০ তারিখে ইউনেস্কোর মহাপরিচালক জনাব কাইচিরো মাটসুরা এক চিঠিতে ইউনেস্কোর সকল সদস্য রাষ্ট্রের প্রতি তখন থেকে প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে পালনের আহ্বান জানান। ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়ে শুধু মাতৃভাষার জন্য আমাদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগকেই স্বীকৃতি দেয়নি, অমর একুশের শহীদদের আত্মদান থেকে উৎসারিত স্বাধীনতা আন্দোলন ও স্বাধীনতা অর্জনকেও মর্যাদা দিয়েছে, জাতি হিসেবে পৃথিবীর বুকে আমাদেরকে মহিমান্বিত করেছে । বিশ্বের ১৯০টি দেশে এখন প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে উদযাপিত হচ্ছে। ঐসব দেশের মানুষ জানছে ঢাকার বুকে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে কি ঘটেছিল, কি কারণে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার প্রাণ দিয়েছিল। আরো জানবে বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি এবং বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের ইতিহাস। এটা যে জাতি হিসেবে আমাদের জন্য কত বড় অর্জন তা ভাবা যায় না। জাতিসংঘের এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ইউনেস্কো পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি, উপজাতি ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠির সামাজিক, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ সংরক্ষণ ও বিস্তারে মূল্যবান অবদান রেখে আসছে। তারই অংশ হিসাবে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আমরা বাঙালিরা আশা করবো- পৃথিবীর সকল অত্যাচারিত, নিপীড়িত, শোষিত, বঞ্চিত জনগোষ্ঠী যেন এই দিবসটি পালনের মাধ্যমে তাদের ক্ষয়িষ্ণু ভাষা ও হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতিকে রক্ষার সুযোগ পায়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মূল প্রেরণা হবে নিজের মাতৃভাষাকে ভালবাসা, সেই সঙ্গে অন্যের ভাষাকে শ্রদ্ধা করা। আমরা অন্য ভাষা শিখবো, প্রয়োজনে একাধিক ভাষা শিখবো কিন্তু অন্য ভাষার প্রভূত্ব মেনে নেবো না। অন্য ভাষার প্রভূত্ব রোধ করতে গিয়েই তো একুশে ফেব্রুয়ারির জন্ম।  আমরা আশা করবো ইউনেস্কোর ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ পালনের মধ্যদিয়ে পৃথিবীর ছোট ছোট দেশ ও জাতিগোষ্ঠির মাতৃভাষা যথাযোগ্য সম্মান ও মর্যাদা লাভ করবে, সেই সাথে একুশের ভাষা শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে। চিরঞ্জীব হোক অমর ‘একুশে ফেব্রুয়ারি - আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। লেখক : ব্রিটেনে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার