Share |

অলৌকিক অর্কেস্ট্রা

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে আমার মুগ্ধতা সেই ছেলেবেলা থেকে। মনে আছে, কৈশোরে, মফস্বল শহরের অলি-গলি, চৌরাচ্চা আর অজানা উৎস থেকে বিশেষ দিবসগুলোতে ভেসে আসতো ঐন্দ্রজালিক এক কণ্ঠস্বর। পরিণত বয়সে বুঝতে শিখেছি, ঐ ভাষণ আর বাঙলাদেশের ইতিহাস পাশাপাশি হাত ধরে পথ হাঁটে। আজও। আমার রাজনৈতিক চেতনা এবং উপলব্ধিতে নিবিড়ভাবে মিশে আছে বজ্রকণ্ঠ সেই ভাষণের প্রতিটি শব্দ। আমি একাত্তর দেখিনি। তবু ৭ মার্চের ঐ ভাষণ যতবার শুনি, অজানা এক উত্তাপে তাপিত হই। অনেকেই ভেবে পান না, রেসকোর্স ময়দানে জড়ো হওয়া জনসমুদ্রকে মুজিব কোন জাদুমন্ত্রে জাগিয়ে তুলেছিলেন? ইন্টারনেট-ইউটিউব-ফেইসবুকবিহীন পূর্ব বাংলায় কোন অলৌকিক অর্কেস্ট্রায় ভর করে ছড়িয়ে গেল অনিবার্য সেই আহবান, ‘এবারের আমাদের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’! শুধুই একটি ভাষণ, অথচ কী অসীম তার ক্ষমতা।   
মুজিবের অতি মানবীয় কোনো ক্ষমতা ছিলো না। তিনি রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন। তবে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবার অভাবিত এক ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছিলেন তিনি। মিশে যেতে পারতেন বাঙলার ধূলো-মাটি আর মানুষের সাথে। বোধকরি, এ কারণেই জাতির সবচেয়ে সংকটময় মুহুর্তে অমন অসাধারণ মহাকাব্যিক এক ভাষণ দিতে পেরেছিলেন তিনি। কী ছিলো ঐ ভাষণে? অবশ্য প্রশ্নটাকে একটু অন্যভাবেও করা যেতে পারে- কী ছিলো না ঐ ভাষণে? স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর, একটি আক্রান্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করবার সকল উপকরণ খুঁজে পাওয়া যাবে সেখানে। ১৯ মিনিটের ঐ ভাষণের শুরুতেই তিনি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বর্বরতার চিত্র তুলে ধরেন। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবার পরও জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় তীব্র ভাষায় ক্ষমতাসীনদের আক্রমণ করেন। মার্শাল ল তুলে নিয়ে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার দাবি উত্থাপন করেন। পাশাপাশি সামরিক সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পূর্ব পাকিস্তানে সংগঠিত হত্যাকাণ্ডের তদন্তসাপেক্ষে বিচার দাবি করেন।  
মুজিব প্রজ্ঞাবান নেতা ছিলেন। রাজনৈতিক চর্চায় কিংবা নীতি-নৈতিকতার মানদণ্ডে পাকিস্তানি নেতৃবৃন্দের সাথে শত সহস্র আলোকবর্ষ দূরত্ব থাকলেও মুজিব বরাবরই আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানে আগ্রহী ছিলেন। তবে সেটি কার্যত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ায় ৭ মার্চের ঐ ভাষণে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিতে বাধ্য হন তিনি। বক্তৃতাটি তিনি লিখে আনেননি; এমনকি বক্তৃতামঞ্চে কোনো নোটও দৃশ্যমান ছিলো না- তবু তাৎক্ষণিক ঐ ভাষণ কেমন করে অতটা বিন্যস্ত হলো, তা এক বিস্ময় বটে। পাশাপশি, ৭ মার্চের ভাষণের ভাষাগত দিকটিও বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। মুজিব মাঝে মধ্যে উপস্থিত জনতাকে ’তুমি’ বলে সম্বোধন করছিলেন। আমার ধারনা, তিনি এটি সচেতনভাবেই করেছেন। মুক্তিকামী মানুষকে এক ধরনের অধিকারবোধ থেকে ’তুমি’ বলে যেন আরেকটু আপন করতে চাইছেন। আরেকটি কাজ তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে করেছেন। ভালো একটি কবিতা যেমন পাঠকের ভেতরে প্রণোদনা সৃষ্টি করে, ঠিক তেমনি এই বক্তৃতার প্রতিটি শব্দ আর বাক্য দিয়ে তিনি সকলকে অনুপ্রাণিত করেছেন। মুজিবের ঐ ভাষণ মিছিলের একেবারে পেছনে থাকা লাজুক, সন্ত্রস্ত এবং সবচেয়ে অন্তর্মুখী ছেলেটিকেও সাহসী করে তুলেছিলো। স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহবানটি যদিও একেবারে শেষের দিকে এসে সরাসরি উচ্চারিত হয়েছে, তবু তাঁর পুরো ভাষণ জুড়েই ছিলো মুক্তির অতলস্পর্শী আকুতি। মুজিবের কট্টর সমালোচকদেরকেও আজ অবধি বলতে শুনিনি- এমন কিছু ঐ ভাষণে বাদ পড়ে গেছে, যা তখনকার প্রেক্ষাপটে অনিবার্য ছিলো।
পৃথিবীর কালজয়ী রাজনৈতিক ভাষণগুলো বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কেবল আধেয় এবং উপযোগিতাকেই বিবেচনায় আনা হয় না, দেখা হয় বক্তার শরীরী ভাষাকেও। পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি উচ্চতার বঙ্গবন্ধুকে এমনিতেই ভীড়ের মধ্যে আলাদা করা যেত। কিন্তু রেসকোর্সের উন্মুক্ত মঞ্চে দীর্ঘদেহী এই মানুষটির সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসা, হাতের ব্যবহার এবং চোখের অভিব্যক্তি দিয়ে স্বপ্নকামী জনতাকে সম্মোহিত করবার মহানায়কোচিত প্রয়াস- এক কথায় অনবদ্য। কেবল একাডেমিক জায়গা থেকে নয়, খানিকটা বাস্তবতার নিরিখেও ৭ মার্চের ভাষণটিকে আমি মূল্যায়ন করবার চেষ্টা করেছি। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি গবেষণা পরিচালনা করতে গিয়ে বছর তিনেক আগে বাংলাদেশের ১৭টি জেলায় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি, যাঁরা সবাই সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছিলেন। এদের মধ্যে অনেকেই আছেন মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশে ভিন্ন পথ এবং মতের অনুসারী হয়েছেন। তাতে কী! এরা প্রত্যেকেই জানিয়েছেন- মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের প্রধান অনুপ্রেরণা ছিলো বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। এই ভাষণের অবস্থান বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর মধ্যে কত নম্বরে সেটি হয়তো রাজনীতির প্রয়োজনে অনেকের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমি বিষয়টিকে একটু ভিন্ন আলোয় দেখতে চাই। পৃথিবীর কোথাও কী আর এমন ভাষণ খুঁজে পাওয়া যাবে, যা একটি জাতির স্বপ্ন-সংগ্রাম আর অস্তিত্বের সমার্থক হয়ে কিংবদন্তির মতো বেঁচে আছে?  
লন্ডন, ০৭ মার্চ ২০১৬
লেখক : বুলবুল হাসান
সাংবাদিক, গবেষক