Share |

অস্ট্রেলিয়ার জয়ে সিরিজে সমতা: সিরিজ জয়ের হাতছানিই কি ভুলিয়ে দিল ব্যাটিং!

ঢাকা, ৮ সেপ্টেম্বর :  সিরিজ-সেরার ট্রফিটা কার কাছে থাকবে? কাল রাত পর্যন্ত নাথান লায়ন ও ডেভিড ওয়ার্নার এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পেরেছেন বলে খবর নেই। অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল যেখানে যায়, বিশাল এক লটবহর নিয়ে যায়। বাংলাদেশ সফরেই যেমন ১৪ জন খেলোয়াড়ের ভালো-মন্দ দেখতে সঙ্গে এসেছেন ১৬ জন! সন্ধ্যায় হোটেলের লিফটে তাঁদেরই একজন সুন্দর সমাধান দিয়ে দিলেন, ‘নাথান তো আরেকটা ট্রফি পেয়েছে। এটা তাই ডেভিডকে দিয়ে দিলেই পারে!’
একসময় ম্যাচের সেরা, সিরিজের সেরা নির্বাচনের দায়িত্ব থাকত সাবেক কোনো ক্রিকেটারের ওপর। অনেক দিন ধরেই সেটি টিভি ধারাভাষ্যকারদের কাছে চলে গেছে। ম্যাচসেরা ঠিক করতে তাঁদের কোনো আলোচনাই করতে হয়নি। এশিয়ায় সফরকারী কোনো বোলারের ম্যাচে ১৩ উইকেট নেওয়ার মাত্র দ্বিতীয় কীর্তি গড়ার পর নাথান লায়ন ছাড়া আর কার নাম আলোচনায় আসবে! কিন্তু সিরিজ-সেরা বাছতে গিয়ে টানা দুই সেঞ্চুরির ওয়ার্নার আর ২২ উইকেটের লায়নকে আলাদা করা যায়নি।
ঢাকায় প্রথম টেস্টে ব্যাটে-বলে অস্ট্রেলিয়ার সেরা এই দুজন। চট্টগ্রামেও তাঁরা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জয়ের স্বপ্ন কোথায় মুখ থুবড়ে পড়ল, তা বুঝতে ঢাকায় বাংলাদেশের দুই সেরার চট্টগ্রামের পারফরম্যান্স দেখলেই চলছে। তামিম দুই ইনিংসে ৯ ও ১২। সাকিবের ২৪ ও ২ রানের সঙ্গে উইকেট এক-এক দুই। তার মানে কি বাংলাদেশকে বড় কিছু করতে হলে সাকিব-তামিমকে লাগেই!
ইংল্যান্ডের পর অস্ট্রেলিয়া। দেশের মাটিতে পরপর দুই সিরিজে টেস্ট ক্রিকেটের সবচেয়ে অভিজাত দুই দলের সঙ্গে ড্র। কয়েক বছর আগেও যা দিবাস্বপ্ন বলে বিবেচিত হতো। বাংলাদেশের আরও বেশি টেস্ট খেলার দাবি, তিন টেস্টের সিরিজ খেলার দাবি সবই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল এতে। কিন্তু সেই অর্জনের আনন্দটা হচ্ছে কোথায়?
ইংল্যান্ড সিরিজে হয়েছিল। কারণ সেটি ছিল সিরিজ হারার বদলে ড্র। এই ড্র যে জেতার বদলে! অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের সম্ভাবনাই কি বিষম চাপ হয়ে ব্যাটিং ভুলিয়ে দিল বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের! নইলে ৪৩ রানে ৫ উইকেট পড়ে যাওয়ার কী ব্যাখ্যা? পুরো টপ অর্ডারের এমন তাসের ঘর হয়ে যাওয়ার সর্বশেষ উদাহরণ খুঁজে পেতে যখন পিছিয়ে যেতে হচ্ছে ছয়-সাত বছর! লায়নের মায়াবী অফ স্পিনে ব্যাখ্যা খোঁজা যায়। আবার পুরোপুরি যায়ও না। চতুর্থ দিনের উইকেট সচরাচর যেমন হয়, তার চেয়ে ভিন্ন কিছু তো ছিল না। এতে লায়নকে খেলাই যাবে না? তাহলে কি ক্রিকেটে সব সময় সবকিছুর ব্যাখ্যা মিলে না বলে সান্ত¡না খুঁজবেন! মাস দশেক আগে বাংলাদেশের বিপক্ষেই এক সেশনে ১০ উইকেট হারিয়ে কি সিরিজ বিসর্জন দেয়নি ইংল্যান্ড! বাংলাদেশের পক্ষে গেলেই ক্রিকেটের গৌরবময় অনিশ্চয়তায় জয়গান গাইবেন, আর বিপক্ষে গেলে ‘এমন কখনো হয় নাকি’ আহাজারি-অন্যায়, বড় অন্যায়!
এর চেয়ে বড় অন্যায়টা অবশ্য হলো মুমিনুল হকের সঙ্গে। প্রথম ইনিংসে পরপর নামা পাঁচ বাঁহাতির প্রথম চারজনেরই লায়নের অফ স্পিনে মৃত্যুর পর বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডারে একটা পরিবর্তন প্রত্যাশিতই ছিল। তাই বলে নাসিরকে চারে তুলে মুমিনুলকে নামিয়ে দেওয়া হবে আট নম্বরে? মুশফিক আগে আসতে পারতেন, অথবা সাব্বির। কথাটা শুনতে খুব খারাপ শোনায়, কিন্তু সেটিই যে আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে। চাপে পড়ে দলে নিতে বাধ্য হওয়ায় চন্ডিকা হাথুরুসিংহে মুমিনুলের ওয়ানডে ক্যারিয়ারের পর টেস্ট ক্যারিয়ারেরও শেষ দেখে ছাড়বেন বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন। মিল তো পাওয়াই যাচ্ছে। গত বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের সঙ্গে প্রথম ম্যাচে মুমিনুলকে নামানো হয়েছিল নয় নম্বরে! শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পরের ম্যাচে চারে নামানোর আগে আভাসে-ইঙ্গিতে জানিয়ে দেন, বাছা, এটাই তোমার শেষ সুযোগ। বাড়তি এই চাপ নিতে ব্যর্থ হওয়ার পর মুমিনুল আর ওয়ানডে খেলেননি।
প্রথম ইনিংসে ৩১ করতে উইকেটে ছিলেন যে ৮২ মিনিট, দারুণ স্বচ্ছন্দ মনে হয়েছে। আটে নামার দুঃখ চাপা দিয়ে কালও ভালোই খেলছিলেন। কামিন্সের দারুণ এক ক্যাচ শেষ করে দিয়েছে ইনিংসটা। মুমিনুল করেছেন ২৯। টেস্টে এটা কোনো রানই নয়। কিন্তু এদিন যে এটাই বাংলাদেশের ইনিংসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ!
সর্বোচ্চ মুশফিকের ৩১। মুমিনুল ছাড়া একমাত্র যাঁর ব্যাটেই যা একটু লড়াইয়ের প্রতিজ্ঞা খুঁজে পাওয়া গেল। ও হ্যাঁ, মিরাজের নামটাও বলা উচিত। আবারও আগুন ঝরানো কামিন্সের বাউন্সারে আঙুল ফেটে রক্ত পড়েছে। তারপরও দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে গেছেন। আরও করতেন। কিন্তু ইনিংসই যে শেষ হয়ে গেল!
দ্বিতীয় দিন শেষেই এই টেস্ট বাঁচানোর রেসিপিটা বলে দিয়েছিলেন মুশফিক। অস্ট্রেলিয়াকে ৭০ রানের বেশি লিড নিতে দেওয়া যাবে না। এরপর ব্যাটিং করতে হবে চার সেশন। প্রথমটা হলো। আগের দিনের স্কোরেই অলআউট হয়ে অস্ট্রেলিয়ার লিড মাত্র ২ রানই বেশি। কিন্তু এরপর তামিম-সাব্বিররা যে ব্যাটিংটা করলেন, তাতে চার সেশন টিকে থাকার কোনো গেম প্ল্যানের অস্তিত্ব কে খুঁজে পাবে!
অস্ট্রেলিয়াকে ১৫০ রানের একটা টার্গেট দিতে পারলেও যে দারুণ একটা ম্যাচ হতো, ৮৬ করতেই অস্ট্রেলিয়ার ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলা থেকেই সেটি পরিষ্কার। এর প্রথমটি মোস্তাফিজের। তাঁর আইপিএল অধিনায়ককে আবারও বাউন্সারে তুলে নিয়ে। হতাশার গল্প লেখা এই টেস্টে একমাত্র আলোর শিখা মোস্তাফিজের বোলিং। কিন্তু সেটির সাধ্য কি এমন ঘোর অন্ধকার ঘুচিয়ে চারপাশ আলোকিত করে তোলে!
সে জন্য তামিমকে লাগত। সাকিবকে লাগত। নিজের শহরে জোড়া ব্যর্থতায় তামিমকে কী ম্রিয়মাণই না লাগল ম্যাচ শেষে! আর সাকিব, তাঁকে কিনা দাঁড়াতে হলো ম্যাচ রেফারির কাঠগড়ায়! কাল অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যম সাকিবের মাটিতে বল ঘষার একটা ভিডিও ছেড়ে দিয়েছে বাজারে। পরিষ্কার বল ট্যাম্পারিংয়ের অভিযোগ। ম্যাচ রেফারিও সেটির সত্যতা খুঁজে পেয়েছেন। মাত্র এক-দুই সেকেন্ডের ব্যাপার। বলে এটির কোনো প্রভাব পড়েনি বলে বেঁচে গেছেন সাকিব। তবে সতর্কবাণী শুনতে হয়েছে ঠিকই।
ব্যাটে-বলে আলো ছড়িয়ে আগের টেস্টেই বাংলাদেশের জয়ের নায়ক। আর বাংলাদেশকে ইতিহাসের হাতছানি দেওয়া পরের টেস্টটিই সাকিবের জন্য এমন দুঃস্বপ্ন!
ক্রিকেট যেমন দেয়, তেমনি নেয়ও!