Share |

এইচএসসির ফল প্রকাশ : শীর্ষে সিলেট শিক্ষাবোর্ড

সিলেট, ২৪ জুলাই : সব বোর্ডকে ডিঙিয়ে এবার শীর্ষ স্থান দখল করেছে সিলেট শিক্ষা বোর্ড। চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষায় এই বোর্ডের পাসের হার ৭২ শতাংশ। গত বছরের চেয়ে এবার পাসের হার বেড়েছে ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। কিন্তু সারা দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা। চলতি বছর এই বোর্ড থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭০০ শিক্ষার্থী। গতবার জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ হাজার ৩৩০ জন শিক্ষার্থী। গত বছরের তুলনার এবার জিপিএ-৫ কমেছে ৬৩০ জন। জিপিএ-৫ কমার পেছনে ইংরেজিতে খারাপ ফল হওয়াকে দুষছেন বোর্ড কর্মকর্তারা। এছাড়া আইসিটি বিষয়ে খারাপ ফল হয়েছে বলে জানা গেছে।  
মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনের কারণে মাধ্যমিকের মতো উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষাতেও এবার জাতীয়ভাবে পাসের হার কমেছে। ১০ শিক্ষাবোর্ডে এবার পাস করেছে ৬৮ দশমিক ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থী। আর জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৭ হাজার ৯৬৯ জন শিক্ষার্থী।
গত বছর এই পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৭৪ দশমিক ৭০ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৫৮ হাজার ২৭৬ জন। সে হিসাবে এবার উচ্চ মাধ্যমিকে পাসের হার কমেছে ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ। আর পূর্ণাঙ্গ জিপিএ বা জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২০ হাজার ৩০৭ জন। দেশের দশটি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চলতি বছর অনুষ্ঠিত উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার এ ফল ২৩ জুলাই গত রোববার সারাদেশে একযোগে প্রকাশ করা হয়।
এবার সিলেট শিক্ষাবোর্ডের অধিনে ৬৫ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাশ করেছে ৪৬ হাজার ৭৯৭ জন শিক্ষার্থী। যার মধ্যে ২১ হাজার ৩০ জন ছেলে ও ২৫ হাজার ৭৬৭জন মেয়ে। বরাবরের মতো মেয়েরাও এবার ভালো করেছেন। রোববার সিলেট বোর্ডে প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষন করে দেখা গেছে- বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১০ হাজার ৪শ’ ৭৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাশ করেছে ৮ হাজার ৭৪৬ শিক্ষার্থী। পাসের হার ৮৩ দশমিক ৪৭ ভাগ এ বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬০৪ জন শিক্ষার্থী। মানবিক বিভাগ থেকে ৪৩ হাজার ৬০৩ জন পরিক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছে ২৯ হাজার ৩৫৬ জন। পাসের হার ৬৭ দশমিক ৮২ ভাগ। এদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৬ জন। বাণিজ্য বিভাগ থেকে ১১ হাজার ৩২১ জন পরিক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছে ৮ হাজার ৬৯৫ জন। পাসের হার ৭৭ দশমিক ৩৭ ভাগ। এদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭০ জন।
সিলেট শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষ বলছে- এখনো ইংরেজী বিষয়ে ভালো করতে পারছে না সিলেটের শিক্ষার্থীরা। আর কলেজের প্রিন্সিপালরা বলছেন-আইসিটি ও বিজ্ঞানে এবারের পরীক্ষায় ভালো করতে পারেনি শিক্ষার্থীরা। প্রশ্নগুলোও ছিল ব্যতিক্রম। এ কারণে শিক্ষার্থীদের বোধগম্যতা কম হয়েছে। গত রোববার ফলাফল ঘোষনার পর কলেজগুলোতেও শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ প্রতিত্রিুয়া ব্যক্ত করেছেন। তারাও বলেছে- এমনটি তো হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু রোববার ফলাফল ঘোষণার পর যেনো কলেজগুলোতে পিনপতন নিরবতা নেমে আসে। সিলেটের এমসি কলেজ ও মহিলা কলেজে প্রতিবারই ফলাফল ঘোষনা করা হলে মেধাবীরা হুই-হুল্লোর শুরু করেন। কিন্তু রোববার সেটি পরিলক্ষিত হয়নি।
সিলেট বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. শামসুল ইসলাম ফলাফলের প্রাথমিক পর্যালোচনা করে বলেছেন- প্রতি বছরই ইংরেজিতে খারাপ ফলাফলের কারণে পাশের হারে প্রভাব ফেলে। এ বছরও ইংরেজিতে ২০ শতাংশ শিক্ষর্থী খারাপ করেছে। যা ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। এছাড়াও চলতি বছরে আকস্মিক বন্যার কারণেও ফলাফলে প্রভাবে ফেলেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। কিন্তু বন্যার বিষয়টি মানতে নারাজ অভিভাবকরা। তারা জানিয়েছেন- এবার পরীক্ষার সময় কেবলমাত্র বন্যা হয়েছে সুনামগঞ্জ জেলায়। এছাড়া সিলেট, মৌলভীবাজার কিংবা হবিগঞ্জ জেলায় এর কোনো প্রভাব পড়েনি। এ কারনে বোর্ড কর্তৃপক্ষের এমন মন্তব্য তারা বিশ্বাস করতে চান না। সিলেট সরকারী মহিলা কলেজের ফলাফল ঘোষণার পর অনেক শিক্ষার্থী কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তারা বলেন- এবার আইসিটি বিষয়ে অনেকের পরীক্ষা ভালো হয়নি। এর প্রভাব পড়েছে সার্বিক ফলাফলে।
সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজের প্রিন্সিপাল নিতাই চন্দ চন্দ্র মানবজমিনকে জানিয়েছেন- বিজ্ঞানে সবচেয়ে বেশি জিপিএ-৫ আসে। কিন্তু এবার বিজ্ঞানে আশানুরূপ ফল আসেনি। এর কারন হিসেবে তিনি বলেন- বিজ্ঞানের তিনটি বিষয়ে শিক্ষার্থী ভালো ফল করতে পারেনি। অনেক প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের বোধগম্য না হওয়ার কারনে সার্বিক ফলাফলে প্রভাব পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন- জীব বিজ্ঞান, পদার্থ বিদ্যা ও গনিতে ফল বিপর্যয় হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে আমরা ধারনা পেয়েছি। এরপরও তার কলেজে এবার ১৪৯ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। আগামীতে যাতে জিপিএ-৫ বাড়ে সে ব্যাপারে তারা সতর্ক থাকবেন। সিলেটের সরকারী মহিলা কলেজের প্রিন্সিপাল ড. মো. নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন- ফলাফলের মান ভালো করতে হলে উত্তরপত্র মুল্যায়নে কঠোর হতে হবে। শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশ রয়েছে মেধাবী শিক্ষার্থী বাড়ানো। সে কারণে এবার উত্তরপত্র মুল্যায়নে কড়াকড়ি ছিল। তিনি বলেন- এবারের ফলাফল মুল্যায়ন করে আগামীতে সেই বিষয়গুলোকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।  

দশ শিক্ষা  বোর্ডের চিত্র
ঢাকা বোর্ড: পাসের হার ৬৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এই বোর্ডে এবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৭৩৮ জন। পাস করে  ২ লাখ ৩২ হাজার ৭৪১ জন। এর মধ্যে ১ লাখ ১৭ হাজার ৮ জন ছাত্র এবং ১ লাখ ১৫ হাজার ৭৩৩ জন ছাত্রী। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৮ হাজার ৯৩০ জন।  
রাজশাহী বোর্ড: পাসের হার ৭১ দশমিক ৩০ শতাংশ। এই বোর্ডে থেকে এবার ১ লাখ ২১ হাজার ৮৩৬ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করে ৮৬ হাজার ৮৭২ জন। এর মধ্যে ৪৫ হাজার ২৪০ জন ছাত্র এবং ৪১ হাজার ৬৩২ জন ছাত্রী। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫ হাজার ২৯৪ জন।  
কুমিল্লা বোর্ড: পাসের হার ৪৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। এই বোর্ডে এবার ১ লাখ ৩৭২ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। পাস করে ৪৯ হাজার ৭০৪ জন। এর মধ্যে ২৩ হাজার ৭৯২ জন ছাত্র এবং ২৫ হাজার ৯১২জন ছাত্রী। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬৭৮ জন।
যশোর বোর্ড: পাসের হার ৭০ দশমিক ০২ শতাংশ। এই বোর্ডে এবার ৯৫ হাজার ৬৯২ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। ৬৭ হাজার ২ জন পাস করে। এর মধ্যে ৩৩ হাজার ৮০৮ জন ছাত্র এবং ৩৩ হাজার ১৯৪ জন ছাত্রী। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ হাজার ৪৪৭ জন।
 চট্টগ্রাম বোর্ড : পাসের হার ৬১ দশমিক ০৯ শতাংশ। এই বোর্ডে পরীক্ষায় অংশ নেয়া ৮২ হাজার ৪১৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫০ হাজার ৩৪৭ জন পাস করে। এর মধ্যে ২৪ হাজার ৭১৬ জন ছাত্র এবং ২৫ হাজার ৬৩১ জন ছাত্রী। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ৩৯১ জন।
 বরিশাল বোর্ড: পাসের হার ৭০ দশমিক ২৮ শতাংশ। এই বোর্ডে এবার ৬০ হাজার ৪৮৬ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করে ৪২ হাজার ৫০৭ জন। এর মধ্যে ২১ হাজার ১১১ জন ছাত্র এবং ২১ হাজার ৩৯৬ জন ছাত্রী। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৮১৫ জন।
 সিলেট বোর্ড: পাসের হার ৭২ শতাংশ। এই বোর্ডে এবার ৬৫ হাজার পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। পাস করে ৪৬ হাজার ৭৩৭ জন। উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২১ হাজার ৩০ জন ছাত্র এবং ২৫ হাজার ৭৬৭ জন ছাত্রী। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭০০ জন।
 দিনাজপুর বোর্ড: পাসের হার ৬৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এই বোর্ডে এবার ১ লাখ ৫ হাজার ৪০০ পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। পাস করে ৬৮ হাজার ৯৭২ জন। উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩৫ হাজার ২ জন ছাত্র এবং ৩৩ হাজার ৯৭০ জন ছাত্রী। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ হাজার ৯৮৭ জন।  
মাদ্রাসা বোর্ড: পাসের হার ৭৭ দশমিক ০২ শতাংশ। এ বোর্ডের অধীনে এবার ৯৬  হাজার ৮০২ পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। পাস করে ৭৪ হাজার ৫৬১ জন। উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪৩ হাজার ৬১২ জন ছাত্র এবং ৩০ হাজার ৯৪৯ জন ছাত্রী। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ৮১৫ জন।  
কারিগরি শিক্ষা বোর্ড: পাসের হার ৮১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এ বোর্ডের অধীনে এবার ৯৭ হাজার ১৪ পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। পাস করে ৭৮ হাজার ৯০৪ জন। উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫৪ হাজার ৫৮০ জন ছাত্র এবং ২৪ হাজার ৩২৪ জন ছাত্রী। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ হাজার ৬৬৯ জন।এইচএসসি পরীক্ষা

 চার কারণে এবার ফল খারাপ
নতুন পদ্ধতিতে উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের ফল বিপর্যয় এবার উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার সামগ্রিক ফলের ওপর প্রভাব ফেলেছে। এর সঙ্গে চারটি শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার কমে যাওয়া এবং বহু নির্বাচনী প্রশ্নের (এমসিকিউ) অংশে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের পাস করতে না পারাও খারাপ ফলের কারণ। মূলত এই চার কারণেই এবার ফল খারাপ হয়েছে।
আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসির ফল বিশ্লেষণে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। এইচএসসিতে এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ গতবারের চেয়ে কমেছে। এবার গড় পাসের হার ৬৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ। গতবার এই হার ছিল ৭২ দশমিক ৪৭ শতাংশ। পাসের হার ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ বিন্দু কমেছে। ফলের সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ কমেছে ১৫ হাজার ৭০৮। এবার আট বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩৩ হাজার ২৪২ জন শিক্ষার্থী। গতবার পেয়েছিলেন ৪৮ হাজার ৯৫০ জন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এসএসসি পরীক্ষার মতো এবার এইচএসসিতেও নতুন পদ্ধতিতে প্রথমবারের মতো মডেল উত্তরপত্র অনুযায়ী খাতা মূল্যায়ন করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন বিষয়ের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই আগে থেকেই প্রশিক্ষিত তিনজন পরীক্ষককে বোর্ডে ডেকে আনা হয়। তাঁরা নমুনা হিসেবে ভালো, মাঝারি ও খারাপ মানের তিনটি উত্তরপত্র সংগ্রহ করেন। সেগুলো এই তিনজনও দেখেন এবং পরে ২০ জন পরীক্ষককে দিয়ে দেখানো হয়। তাতে দেখা যায়, একই উত্তরপত্র হলেও একেকজন একেক রকম নম্বর দিচ্ছেন। পরে সবাই মিলে একটি মডেল উত্তরপত্র চূড়ান্ত করেন। সেটি খাতা নিতে আসা পরীক্ষকদের নির্দেশনা আকারে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, এই উত্তরপত্রে কেমন নম্বর দেওয়া হতে পারে, তার একটি ধারণা দেওয়া হয়। খাতা জমা দেওয়ার পর আবার সেখান থেকে দৈবচয়ন ভিত্তিতে সাড়ে ১২ শতাংশ খাতা যাচাই করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় পরীক্ষকেরা সতর্ক হয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন। বোর্ডের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই প্রক্রিয়ায় মূল্যায়ন তুলনামূলক সঠিক হচ্ছে। ফলে আগের মতো আর ঢালাও নম্বর পাওয়া যাচ্ছে না।
এত দিন পরীক্ষায় উদারভাবে বেশি নম্বর দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ ছিল। শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যেও এই অভিযোগের বিষয়টি উঠে এসেছে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ গতকাল বলেছেন, এবারের ফলে তাঁরা বিস্মিত নন। বরং নতুন পদ্ধতিতে সঠিকভাবে মূল্যায়ন হয়েছে, এটাই বিবেচ্য বিষয়। তিনি বলেন, তাঁরা অভিজ্ঞতায় দেখেছেন, আগে সব পরীক্ষক সঠিকভাবে খাতা দেখতেন না। কেউ কম বা বেশি নম্বর দিতেন। এ জন্য এটাকে অনেকে হাস্যকর করে বলতেন, ওজন করে নম্বর দেওয়া হয়। এ জন্যই বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিটের মাধ্যমে সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে বিভিন্ন বোর্ডের পরীক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুমিল্লা বোর্ডের ফল বিপর্যয়ের বড় প্রভাব পড়েছে এবারের সার্বিক ফলাফলে। এই বোর্ডে পাসের হার ৪৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। সার্বিক গড় পাসের হারের চেয়ে এই বোর্ডে পাসের হার ১৭ দশমিক ৩২ শতাংশ বিন্দু কম। এ ছাড়া মানবিক শাখায় ৪২ হাজার ৩৯৩ জন পরীক্ষা দিয়ে পাস করেন মাত্র ১৬ হাজার ২৭২ জন। এক শাখাতেই বিরাটসংখ্যক এই পরীক্ষার্থী ফেল করায় গড় পাসের হার কমেছে। এই বোর্ডে ইংরেজিতে প্রায় ৩৮ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেননি।
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল খালেক বলেন, প্রাথমিকভাবে তাঁরা মনে করছেন, ইংরেজির কারণেই ফল খারাপ হয়েছে। তবে বিষয়টি তাঁরা আরও মূল্যায়ন করে দেখবেন।
ইংরেজির ফল শুধু কুমিল্লা বোর্ডেই খারাপ হয়নি, চট্টগ্রাম ও দিনাজপুর বোর্ডেও এ বিষয়ের ফল খারাপ হয়েছে। যশোর বোর্ডেও ইংরেজির কারণে ফল খারাপ হয়েছে।
যশোর বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল আলিম বলেন, ইংরেজিতে গতবার পাসের হার ছিল ৮৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ, সেখানে এবার পাস করেছেন ৭২ দশমিক ৯৫ শতাংশ। পদার্থেও গতবারের চেয়ে পাসের হার কমেছে। এই দুই বিষয়ে পাসের হার কমে তা বোর্ডের ফলে প্রভাব ফেলেছে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমার সরকার বলেন, এবার এমসিকিউ অংশে পাসের হার অনেক কম। অথচ আগে এই অংশে পাসের হার বেশি হতো।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই বোর্ডের একজন কর্মকর্তা বলেন, আগে অনেক পরীক্ষার কেন্দ্র থেকে এমসিকিউ অংশের প্রশ্নপত্র বাইরে চলে আসত এবং তা সমাধান করে ভেতরে দেওয়া হতো। এতে কিছু শিক্ষকও জড়িত ছিলেন। এ বিষয়ে কড়াকড়ি অবস্থান নেওয়ায় এই প্রক্রিয়া কমে গেছে। এ কারণে এমসিকিউতে অনেকে ফেল করেছেন।
গতকাল সকালে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে ফলাফলের অনুলিপি তুলে দেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। পরে বেলা একটায় সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে ফলাফলের বিস্তারিত তুলে ধরেন। এর পরপরই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ফল প্রকাশ হতে থাকে। এবার আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৯ লাখ ৬৪ হাজার ৯৩৮ জন পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৯৪২ জন। তবে কারিগরি, মাদ্রাসাসহ ১০ বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১১ লাখ ৬৩ হাজার ৩৭০ জন। এর মধ্যে পাস করেছেন ৮ লাখ ১ হাজার ৭১১ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩৭ হাজার ৯৬৯ জন।

মানবিকে ধাক্কা
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবার মানবিক শাখায় ফল বেশি খারাপ হয়েছে। আট বোর্ডের অধীনে এই শাখায় পাসের হার ৫৮.১৪ শতাংশ। অথচ গড় পাস ৬৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এই শাখায় পাসের হার কমার কারণে সার্বিক পাসের হার স্বাভাবিকভাবেই কমেছে। আট বোর্ডে মোট জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩৩ হাজার ২৪২ জন। এর মধ্যে মানবিক শাখায় পেয়েছেন ১ হাজার ৭২৬ জন। ব্যবসায় শিক্ষায় ২ হাজার ৫৮১ জন এবং বাকি ২৮ হাজার ৯৩৫ জনই বিজ্ঞানের। বিজ্ঞান শাখায় পাসের হারও বরাবরের মতো বেশি (৮৩ দশমিক ১৪ শতাংশ)।

শীর্ষে সিলেট
বোর্ডওয়ারি ফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, এবার পাসের হারে সবার শীর্ষে আছে সিলেট বোর্ড, ৭২ শতাংশ। ঢাকা বোর্ডে ৬৯ দশমিক ৭৪, রাজশাহী বোর্ডে ৭১ দশমিক ৩০, যশোরে ৭০ দশমিক শূন্য ২, চট্টগ্রামে ৬১ দশমিক শূন্য ৯, বরিশালে ৭০ দশমিক ২৮ এবং দিনাজপুর বোর্ডে পাসের হার ৬৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

পাসে ছাত্রীরা এগিয়ে
১০টি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হারে ছাত্রদের (৬৭ দশমিক ৬১ শতাংশ) চেয়ে ছাত্রীরা (৭০ দশমিক ৪৩ শতাংশ) এগিয়ে আছেন। তবে মোট জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের মধ্যে ছাত্র ২০ হাজার ৫৩৫ এবং ছাত্রী ১৭ হাজার ৪৩৪ জন।

শতভাগ-শূন্যভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এবার ৫৩২টি প্রতিষ্ঠান থেকে শতভাগ পরীক্ষার্থী পাস করেছেন। গতবার এমন প্রতিষ্ঠান ছিল ৮৪৮টি। অন্যদিকে শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠান এবার ৭২টি। গতবার ছিল ২৫টি। অর্থাৎ এ দুই ক্ষেত্রেই অবনতি হয়েছে।