Share |

ওয়ার্ক পারমিট ভিসা নিয়ে জমজমাট ব্যবসা : প্রতারণার অভিযোগে গ্রেফতার ১০

পত্রিকা রিপোর্ট
লন্ডন, ২৭ জানুয়ারি : স্টুডেন্ট ভিসায় ভাটা পড়ার পর এবার ওয়ার্ক পারমিট ভিসা নিয়ে চলছে জমজমাট ব্যবসা। ইমিগ্রেশন কনসালটেন্সির সাথে জড়িত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আগ্রহীদের চাহিদা মিটাতে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছে। চাহিদার সাথে বাড়ছে সেবা প্রদানের দামও। এই ক্যাটাগরির ভিসার জন্য আবেদনকারীদের গুণতে হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ হাজার পাউন্ড। তবে এত বিপুল অর্থ খরচ করে ভিসা পেলেও মিলছে না মুক্তি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আবেদনকারিরা ওয়াদা মত কাজ না পেয়ে প্রতারিত হচ্ছেন। আবার অনেকে পড়ছেন ইউকেবিএ’র গ্রেফতারের ঝুঁকিতে। গত ২১ জানুয়ারি ব্রিটিশ ইমিগ্রেশন পুলিশ প্রতারণার মাধ্যমে ভিসা নেয়ার দায়ে ১৯ জনকে আটক করেছে। এদের মধ্যে ১০ জনের বিরুদ্ধে প্রতারণার মাধ্যমে ওয়ার্ক পারমিট নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই অবস্থায় এমপ্লয়ার এবং কাজের ধরন সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে আবেদনকারীদের কোনো অর্থ লেনদেন না করার পরামর্শ দিয়েছেন আইন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা।  
উল্লেখ্য, টিয়ার-২ (জেনারেল) ক্যাটাগরিতে কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে বিদেশী নাগরিকদের নির্দিষ্ট বেতন প্রদানসহ আরো কিছু কঠিন শর্তে কাজ দিতে পারেন। এ জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি স্পন্সর লাইসেন্স থাকতে হয়। স্টুডেন্ট ভিসায় নানা কড়াকড়ি আরোপের পর এখন ভিসা আবেদনকারীরা টিয়ার-২ এর অধীন ওয়ার্ক পারমিটের প্রতি ঝুঁকছেন। বিশেষ করে ২০১২ সালে যারা পোস্ট স্টাডি ওয়ার্ক (পিএসডব্লিউ) পারমিট পেয়েছেন তাদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি।
সম্প্রতি পূর্ব লন্ডনের বেশ কয়েকটি ইমিগ্রেশন কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কাছে পরামর্শ চাইতে আসা আবেদনকারীদের ওয়ার্ক পারমিট জোগাড় করে দেয়ার আশ্বাস দিচ্ছে। একাউন্টিং ফার্ম, ফোর স্টার হোটেল, কেয়ার জব থেকে শুরু করে অয়েল কোম্পানির নামও রয়েছে স্পন্সরের তালিকায়। ওয়ার্ক পারমিটের জন্য স্পন্সরগুলো দু’ভাবে বিক্রি করা হচ্ছে। এদের একটি হচ্ছে- শুধু স্পন্সর করে ভিসা করিয়ে দেয়া হবে। স্পন্সরকারী প্রতিষ্ঠানে কোনো কাজ দেয়া হবে না। প্রতি মাসে আবেদনকারীকেই তার নির্ধারিত বেতনের বিপরীতে ট্যাক্স প্রদান করতে হবে। এ স্পন্সরের জন্য আবেদনকারীকে দিতে হবে ৭ থেকে ৮ হাজার পাউন্ড। অন্যটি হল, স্পন্সর প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম আয়ের একটি ব্যবস্থা থাকবে। তবে এক্ষেত্রেও কাজের ধরন সম্পর্কে নিশ্চয়তা নেই। ট্যাক্সও নিজেদের পরিশোধ করতে হবে। এ জন্য নেয়া হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ হাজার পাউন্ড। তবে স্পন্সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এসব কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানের কাছে নেই। এ কাজে জড়িত কয়েকজন স্বীকার করেছেন যে, তারা সরাসরি এমপ্লয়ারদের সম্পর্কে জানেন না। তবে বিশ্বস্ত সোর্সের মাধ্যমে এসব ওয়ার্ক পারমিট তারা জোগাড় করেন। যে অর্থ তারা আবেদনকারীদের কাছ থেকে নেন, স্পন্সরকারী প্রতিষ্ঠানসহ দুই তিনটি পক্ষ ঐ অর্থের ভাগ পেয়ে থাকে।  
শুধু ইমিগ্রেশন কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠাগুলোই নয়; ওয়ার্ক পারমিট ভিসার ব্যবসার সাথে যুক্ত রয়েছে অনেকগুলো একাউন্টিং ফার্ম। অভিযোগ রয়েছে, এসব ফার্ম তাদের ক্লায়েন্ট প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ওয়ার্ক পারমিটগুলো বড় অংকের অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করে দিচ্ছে। পূর্ব লন্ডনের একটি একাউন্টিং ফার্মের কর্ণধার নাম গোপন রাখার শর্তে বললেন, তার পরিচিত একটি একাউন্টিং ফার্ম ক্লায়েন্টকে না জানিয়েই দু’টি ওয়ার্ক পারমিট ২৪ হাজার পাউন্ডে বিক্রি করে দিয়েছে। তিনি বলেন, যারা এসব ওয়ার্ক পারমিট কিনেছে, তারা জানেন না তাদের স্পন্সর কে। আবার স্পন্সরকারী প্রতিষ্ঠানের বাইরে তাদের কাজ করারও অনুমতি নেই। কিন্তু ভিসা টিকিয়ে রাখতে হলে তাদের প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অংকের ট্যাক্স প্রদান করে যেতে হবে যা মাসে অন্তত ৫শ’ পাউন্ডের কম নয়। ফলে ভিসা থাকা সত্ত্বেও এসব ওয়ার্ক পারমিটধারী চরম বিড়ম্বনায় পড়বেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে ওয়ার্ক পারমিট ভিসা নিয়ে ব্যবসা এখানেই শেষ নয়; ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসেছেন। তারা শুধুমাত্র ওয়ার্ক পারমিট ভিসার ব্যবসা করার জন্য প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছেন। একাউন্টিং ফার্ম, ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম, ওয়েব ডিজাইনসহ নানা নামে প্রতিষ্ঠান খুলে তারা ওয়ার্ক পারমিটের (টিয়ার-২) জন্য স্পন্সর লাইসেন্স করছেন। লাইসেন্স পাওয়ার পর বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ওয়ার্ক পারমিটগুলো বিক্রি করে দিয়ে তারা উধাও হয়ে যাচ্ছেন। আর প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিপাকে পড়ছেন এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ নেয়া ব্যক্তিরা।  
গত ২১ জানুয়ারি ইউকেবিএ ম্যানচেস্টার,  াউ, সাউথহল, সাউথহ্যাম্পটন, লুটন এবং হান্সলোতে অভিযান চালিয়ে ১৯ জনকে আটক করেছে। এদের মধ্যে ১০ জন প্রতারণার মাধ্যমে টিয়ার-২ অথবা টিয়ার ৫ ভিসা পেয়েছেন। এদের বেশিরভাগই নিজেদের মিনিস্টার অব রিলিজিওন দেখিয়ে ওয়ার্ক পারমিট পেয়েছেন। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ব্রিটেনে অবস্থান করায় অন্য ৯ জনকে আটক করা হয়। ১৯ জনের সকলেই ভারতীয় নাগরিক। ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির সহায়তায় ইউকেবিএ এসব অভিযান পরিচালনা করে। ব্রিটেনের ইমিগ্রেশন নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত এ প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তাদের কাছে প্রতারণার মাধ্যমে ভিসা নেয়ার বেশ কিছু তথ্য রয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে তারা গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রাখবে।  
এডুলেক্স কন্সালটেন্সি ইউকে লিমিটেডের কনসালটেন্ট শাওগাতুল আনোয়ার বলেন, ওয়ার্ক পারমিট কিনার ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের কঠোর সতর্কতা জরুরী। নিজেদের যোগ্যতা এবং স্পন্সরকারী প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে বিস্তারিত না জেনে কারো সাথে অর্থ লেনদেন না করার জন্য তিনি পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, অর্থের বিনিময়ে স্পন্সর কিনে নিলে এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। যে কোনো সময় এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। সে ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়বেন যারা স্পন্সর কিনে নিয়েছেন তারা। খুব সতর্কতার সাথে এ পথে আগানো উচিত বলে তিনি মনে করেন।