Share |

কবিতা

ময়নূর রহমান বাবুল    
 বাড়ি বদল  
  গতকাল আবার বাড়ি বদল হলো
এ নিয়ে সাত বছরে আটবার  
ফি বছর একবার করে বাড়ি বদল
কতো যে ঝক্কি ঝামেলা
কতো কিছুর ওলট পালট
ভেঙ্গে যাওয়া হারিয়ে ফেলা
সখের জিনিষ নষ্ট হওয়া
আনতে গিয়ে খরচ বিধায় ফেলে আসা।  
 বাড়ি বদল, একটা ছেড়ে আরেক খানে
এখান ছেড়ে অন্য স্থানে
ফেলে আসা আগেরগুলো ভালোই থাকে -  
দক্ষিন দিকের জানালাটা, জোছনা মাখা
পূর্ব দিকের দরজা বেয়ে ভোরের আলো
তেছরা কেটে ঘরের ভেতর ঠিকরে পড়া  
সব গুলো গোছ-গোছানো শেষ না হতে
ভাড়ার ভয়ে আবার চলে বাড়ি বদল
এখান থেকে ওখানে চলছে শুধু বদল করে।  
 ছয় বছরের ছোট্ট শিশু কাঁদছে শুধু-
কাল রাতে তার ঘুম আসেনি
ছেড়ে আসা সেই বাড়িটা প্রিয় ছিলো
সেই বাড়িতে ফিরে যাওয়ার দাবী তাহার
নতুন বাড়ি ভাল লাগে না ঘুম আসে না
ঐ বাড়িটির ব্যালকনিতে খেলা যেতো...
 এই বদলের কারণগুলো জানে না সে  
নিত্য আয়ের হিসাব নিকাশ বুঝে না সে
মা’র রুজিতে কতো চলে  
বাড়ি ভাড়া খরছপাতি...  
গুম হলো যে বাবা তাহার ফিরলো না আর
মাসের শেষে যোগ হয় না বেতনটা তার
ওসব কী আর বুঝে শিশু ?  
তার চিন্তা : রাতে যদি ঐ বাড়িতে বাবা আসে
খুঁজবে তারে পাবে না যে, কাঁদবে তখন !  
 শিশুগুলো অবোধ থাকে
বাড়ি বদল কেন যে হয় বুঝে না যে !    
কাজল রশীদ  
এই বিরান নগরে কেন আসে মানুষ?
 আশার প্রদীপ জ্বেলে
এই বিরান নগরে
মানুষ,
কেন আসে?
প্রশ্নটি সরাসরি করেছিলো
বেগানা জমিন
তার উত্তরে নদীর জল
ঘোলা হয়ে গেলো,  
গড়িয়ে গেল সাগরে।
দিন কী কখনো
জানতো !    
রাতে,
চাঁদের আলোয়
কতো,   
কষ্ট জমা থাকে সারাক্ষণ।
এই বিরান নগরে
বিনিদ্র সময়ের সাথে
কথা হলো নিদ্রাময়
প্রহরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে
ব্যথা উপড়ানো সূর্য পানে।    দিন হারানো
উনুন ঘরে
ঘোরে থাকা স্বপ্ন পানে।  
এই বিরান নগরে
মানুষ,
কেন আসে,
কেন আসে বারবার ?
 

 উদয় শংকর দূর্জয়
 একটি স্বচ্ছ আকাশ ভাবনা, অতঃপর
 এমন মেঘাচ্ছন্ন জ্যোৎস্না আমরা চাই নি।
 পণ করেছিলে একটি দেয়ালী চিত্রে থাকবে
সব পাখির পালক ঝরা হাজার আহত ডানার
একটি আকাশ। অমর সঙ্গীতে কোরাস গাইবে
রাই সরষে ক্ষেতের সব প্রকারের প্রজাপতি।
সোনালি প্রান্ত ধরে বালক পতাকা হাতে দৌড়িয়ে
হাপিত্যেস হয়ে উঠোনে দাঁড়ালে মা মুছে দেবে ঘাম।
 কীর্ত্তনখোলার মাঠে ভর সন্ধ্যেবেলায়
ভৈরবী গান হবে। গৌরনদী স্নান সেরে মুছে নেবে
লাশের শরীরে আটকে থাকা ঘাতকের চি?। পৌষের
সূর্য ডুবতেই আজাদ ফিরে যাবে অপেক্ষার গলি ধরে
শেষ বস্তি ভিটেয়। জগৎ জ্যোতি সব খুনের বুলেট চুরি করে
দপ করে জ্বলে উঠবে দাঁতাল শুয়োরের কর্ণিয়ায়।
রায়ের সবক’টি আত্মারা শোকার্ত ছায়া উপেক্ষা করে
ভিড় করবে রাজপথে। কলাভবনের শরীরে
নীলিমার লিখে রাখা বীরাঙ্গনার ঠিকানা পড়ে
বুনো কবুতর এসে দাঁড়াবে তোমার ৩২ নম্বর ঝুল বারান্দায়।
 চেয়েছিলে দেখা অদেখা সর্বনাশের সব শকুন
ধারাল বন্য নখ গুটিয়ে নেবে। জয়নুলের
দূর্ভিক্ষের চিত্র হয়ে যাবে নিলাম। গুণ লিখবেন
প্রেমাংশুর রক্তের দ্বিতীয় অধ্যায়। অজর কবিতা
অবিনাশী গান গাইতে গাইতে রাহমান বুনবেন
কবিতার শ্রেষ্ঠ মায়াজাল।  

 এম মোসাইদ খান  
 তালাশ
 তোমার উদ্ধত তর্জনী  
জাগিয়ে তুলেছিলো সে দিন মানুষ হৃদয়  
মাটি আর প্রেম  
এক হয়ে গিয়েছিলো সকল প্রেমিক চোখে।  
মর্মবাণী মাথায় গেঁথে পাজরের ভাঁজ খুলে  
আগ্নেয়গিরি ঢেলে ছিলো  
পোকা-মাকড় আর কীটপতঙ্গের ঘাড়ে  
তারপর... তারপর দীর্ঘ নয় মাস  

মেঘের আস্তরণ ঠেলে  
উর্ধ্বমুখী লাল সবুজে মুক্তির নিঃশ্বাস।  
পুস্প উদ্যান গন্বেƒ সচকিত হবার আগেই  
কলংক মোড়া গুচ্ছ মেঘ চর্বিত চোখে-  
গিলে ফেলল স্বর্ণালী ভোরের আলো  
চিতাভস্ম হৃদয়ের এ ক্ষত মুছিবার নয়।  
আলো-আঁধারে আজও-  
মেঘেরা দানা বাধে লাল সবুজের ডানায়  
খুঁজে ফিরি, খুঁজে ফিরি তোমার উদ্ধত তর্জনী।
 

এ কে এম আব্দুল্লাহ
 প্রজন্ম ও আমার গল্প      
  ইতিহাস দেখেছিল সে দিন শিল্পীর আংগুল।
আহা ! আজ তুমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছো ,
ঠিক পিছনেই ঝরেছিল তোমার দাদার রক্তঃ
প্রাক্তন স্মৃতি জড়িয়ে বুকে আজও
মিশে আছে এই মাটির ভিতর।
উর্বর জমিন খুঁড়ে প্রাপ্ত ফসলের মত
তার দেহে অর্জনের বুলেট ; মা ঝুলিয়ে দিলেন
আমার গলে লকেটের মত, দাঁড়াতে শক্ত।
মায়ের চোখে কোনোদিন দেখিনি অশ্রু
দৃষ্টিতে বেজেছে কেবল বিজয়ের সঙ্গীত।
বেয়নেটের ছিন্ন ভিন্ন দেহ- হাত বাঁধা, চোখ গাঁথা  
রক্তাক্ত মাথার খুলী, খেয়াল নেই কোন
বুকের ব্যাকুল নিঃশ্বাস শুধু ঐ পতাকা পানে।
আজ যে নতুন ভোরটি জন্মের জন্য হাঁসছে চাঁদে
তাকে পৃথিবীর মুখ তোমাকেই দেখাতে হবে।
এখন তুমিই পার জন্ম দিতে আরেকটি নতুন গল্প।   

 মুহাম্মদ মুহিদ
 বেঁচে রবো
 আমি না হয় কষ্টগুলোকে আপন করে নিলাম
আমার নিভৃত নিলয়ে,
অভিমানে বাধিত আমি
রাখিনি ফুল হাতের আংগুলে
তোমার যাতনা বিরহ
এই দু’হাত ভরে নিলাম তুলে
ফুলের ফাগুন হাসে,আসে অনন্ত
আলোকোজ্জ্বল দিন।
তোমার স্বপ্ন বেচে রবে
নিমগ্ন প্রার্থনার প্রাচীর বেধে...
আর আমি কষ্টের সুখানুভবে
বেচে রবো আমার আনন্দ সমুদয়ে ।   

আসমা মতিন
 কাঙিক্ষত বর্ণীল রুমাল!
 দেউড়িতে বসে সূর্যালোকে ধরে ধরে রুমালে
সূচের লহর তুলে গ্লাসকেস এর উপর রেখে দিতাম!
সন্ধ্যায় বাড়ি এসে ওগুলো হাতে নিয়ে শুঁকে বলতে,
-তুমি কে গো গুণবতি?
সুগন্ধ রেখেছ রুমালে!
জবাবে বলেছিলাম,
-আমি নারী, মাটি আর শিশু ভালবাসি!
রুমালে মাটির সৌরভ!
মাটির সুগন্ধের প্রসারণ ঘটুক মনুষ্য শরীরে।
 রুদ্ধ হোক বারুদের স্ফুলিঙ্গের অসভ্য পৈশাচিক নৃত্য
সমস্ত যুদ্ধের চাই অবসান শিশুদের সুনিশ্চিত পৃথিবী তাদের বিস্তৃত উদ্যানে নানারঙের রুমাল
তাদের মুক্ত পৃথিবীতে।  

 ফাহমিদা ইয়াসমিন
 মার্চের কবিতা
 আসছে অগ্নিঝরা মার্চ
চৌ দিক ধুক ধুক করে কাঁপানো সেই ভয়াল রাত।
এতো কষ্ট এতো গ্লানীর পরেও কী
আমরা পেয়েছি পূর্ণ স্বাধীনতা ?
জাতির কাছে আজ আমার প্রশ্ন,
  স্বাধীনতার জন্য যদি আমাদের অগণিত লাশ
তবে কেন আজ স্বাধীন দেশে পরাধীনতা ?
   পরাধীনতার শৃংখল থেকে আজো হাজারো মিছিল
আজো বেদনাতুর মুক্তিযোদ্ধা বিষাদে নীল।
সৃষ্টিতে অশান্তির সম্ভাষণ কতো যে কষ্টকর
সে শুধু জানে সৃষ্টিকর্তা।
   
মোহাম্মদ ইকবাল
 পিতা
 মহাকালের নৈঃশব্দ্য শরীর থেকে ভবিষ্যতকে তোলে ব্যবচ্ছেদ করি অবলীলায়।
অপসারিত বরাদ্ধ কৃত সবটুকু গরলের প্রতিস্থাপন সুক্ষ¦ গ্রাফটিং করা নীশিগন্ধার, মাধবীলতা, কিংবা টকটকে লাল গোলাপে! ভবিষ্যতের শরীর থেকে মুছে ফেলি ঝঞ্ঝাট!
আল্পনা আঁকি আশার আলোকে  নির্বিঘœ উৎকর্ষতার!
আটকে ফেলি বর্তমানকে অনড় স্তব্দ!
লক্ষে ধাবমানতা শুধুই চলমান বেড়ে গিয়ে মহীরুহ  
হলেই সময়কে দেই ছেড়ে!
ছাতিফাটা তৃষ্ণায় ভুলেও স্পর্শ করি না কোমল পানীয় এর ক্যান,
বিলাসী বিপণন কেন্দ্রের রিফ্রিজারেটরের দরজার কাঁচে প্রতিবিম্বত হয় ক্যানগুলি বিদ্রƒপের হাসি,
ভদ্রতার বাহুল্যবর্জিত নির্জলা বিদ্রƒপ!
আমি কিছুই মনে করি না!
তবুও তোমার প্লেটে মানসম্মত খাবারের ব্যবস্থা করে রাখি,
উদরপুর্তি খাবার কখন খেয়েছিলাম মনে করতে পারি না,
আধপেটা অর্ধাহার অনাহার নৈমিত্তিক!
 আমাকে সন্তুষ্ট রাখতে তোমার জননী তোমার সন্তুষ্টিতে আমি, নিরন্তর বলি দিয়েই চলি আমাদের  যৌবন সমস্ত সাধ আহৗাদ!
স্বপ্নের প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত রাখি রক্ত ঘামের প্রতি ফোঁটায়।
তবুও তোমার চলার পথ রাখি নিষ্কণ্টক নির্বিঘœ মসৃণ,
 মুছে ফেলি যত অনিয়ম অসুখ!
পিতা আমি এটি আমার অহমিকা অংহবোধ ধ্রুপদী নান্দনিক সুখ!