Share |

ক্রিকেটের শিরোপা পাকিস্তানের

১৯ জুন : কে না জানে, ক্রিকেট বিস্ময় উপহার দিতে ভালোবাসে। তাই বলে এতটা?
কে না জানে, ক্রিকেটের পাকিস্তান ইংল্যান্ডের আবহাওয়ার মতো। কখন কী হবে, কেউ বলতে পারে না। তাই বলে এমন কিছু? রোববার ওভালে যা হলো, তা নিছকই আরেকটা ক্রিকেট ম্যাচ নয়। ব্যাখ্যার অতীত কিছু! ক্রিকেটের রহস্যপ্রিয়তা, পাকিস্তানের ক্রিকেটের অননুমেয় চরিত্র মনে রেখেও যেটি বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের সীমারেখা মুছে দিতে চায়। দুদিন ধরে লন্ডনে প্রচণ্ড গরম। ঠাঠা রোদে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির এই ফাইনাল, যা দেখতে দেখতে কারও মনে সংশয় জাগতেই পারত-যা দেখছি, তা সত্যি তো? নাকি তীব্র রোদে চোখের ধাঁধা? র‌্যাঙ্কিংয়ে ৮ নম্বর হিসেবে সুযোগ পাওয়া পাকিস্তান, প্রথম ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে উড়ে যাওয়া পাকিস্তান ৩৩৮ রান করে ফেলেছে আর সেটির জবাবে বিশ্বের সেরা ব্যাটিং লাইনআপ ৫ উইকেটে ৫৪! এর মিনিট পাঁচেক পর ওভালের বাইরে উঁকি দিলে কারও মনে হতেই পারত, ফাইনাল ম্যাচটা একটু আগে শেষ হয়ে গেল। নইলে ঘরমুখী দর্শকের এমন স্রোত কেন?
ফাইনাল আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে আরও অনেক পরে। অভাবনীয় এক প্রাপ্তির আনন্দে আত্মহারা পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা যখন মাঠে দৌড়াচ্ছেন, গ্যালারি তখন অর্ধেকেরও বেশি খালি। চোখের সামনে যা হচ্ছে, তা সহ্য করতে না পেরে ভারতীয় দর্শকেরা যে বেরিয়ে গেছেন আগেই। সবচেয়ে বড় অংশটা ৫ উইকেট পড়ার পরই।
পাকিস্তানকে ট্রফিটা চাইলে তখনই দিয়ে দেওয়া যেত। ৭২ রানে ৬ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর তো আরও। এরপর পান্ডিয়া ও জাদেজার ৮০ রানের জুটি ম্যাচটা শুধু একটু লম্বাই করতে পেরেছে। ভারত চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে তৃতীয় শিরোপা জিতছে, না পাকিস্তান প্রথম-এই প্রশ্ন একবারের জন্যও ওঠেনি। পান্ডিয়া যখন একের পর এক ছক্কা মারছেন, তখনো না। ওই প্রশ্ন অনেক আগেই মীমাংসিত। বলতে পারেন মোহাম্মদ আমিরের ৫ ওভার পরেই। সাত বছর আগে এই ইংল্যান্ডেই স্পট ফিক্সিংয়ের পাঁকে ডুবে যাওয়া বাঁহাতি  ফাস্ট বোলারের নামের পাশে তখন ৫-১-১৬-৩! ৯ ওভার শেষে ভারত ৩ উইকেটে ৩৩। সেই ৩ উইকেট ভারতের প্রথম ৩ ব্যাটসম্যান, যাঁরা আগের ম্যাচগুলোতে পরের ব্যাটসম্যানদের বলতে গেলে নামতেই দেননি।
চোটের কারণে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালটা খেলতে পারেননি। ফাইনালে আমিরই ভালো হবেন, না তাঁর বদলে সুযোগ পেয়ে ভালো বোলিং করা রুম্মান রইস-এ নিয়ে কথা শোনা গেছে। যা থামিয়ে দিতে আমির একদমই সময় নেননি। নির্দিষ্ট করে বললে ৩ বল। এই টুর্নামেন্টে ভারতের দুই ওপেনারই বলতে গেলে অনেক ম্যাচ শেষ করে দিয়ে এসেছেন। আর এদিন উদ্বোধনী জুটিতে কিনা শূন্য!
আমির ভারতের বুকে মরণ শেলটা হানলেন পরের ওভারে। রোহিত-ধাওয়ানরা যতই রান করুন, পাকিস্তান ভালো করেই জানত, পথের আসল কাঁটা বিরাট কোহলি। ৩৩৮ রানের পাহাড়ও যাঁর সামনে নিরাপদ নয়। প্রথম সিৗপে আজহার আলী যখন কোহলির ক্যাচ ফেললেন, আলোচনা শুরু হয়ে গেল, ট্রফিটাই তিনি ফেলে দিলেন না তো! বুদ্?বুদ তোলার আগেই যা মিলিয়ে গেল। পরের বলেই যে কোহলিকে ফিরিয়ে দিলেন আমির। বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে তাঁর সঙ্গে নাম উচ্চারিত হয় আরও দু-তিনজনের। তবে ওয়ানডে ক্রিকেটকে আলাদা করে নিলে কোহলির প্রতিদ্বন্দ্বীরা কয়েক মাইল পেছনে। সেই কোহলির গায়েই বড় একটা অপবাদ আরও বেশি করে লেগে গেল। তিনি ফাইনালের চাপ নিতে পারেন না। ৮টি ফাইনালে ব্যাটিং গড় মাত্র ২২। সেঞ্চুরি দূরে থাক, একটা ফিফটি পর্যন্ত নেই।
যেখানে কোহলির মতো মহাতারকাকে ছাপিয়ে উজ্জ্বল অখ্যাত এক পাকিস্তানি ওপেনার। নাম ফখর জামান। এই চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক। সেটিও ২৭ বছর বয়সে। পাকিস্তানি মানদণ্ডে রীতিমতো ‘বুড়ো’! সেই ফখর জামান জীবনের প্রথম ফাইনাল খেলতে নেমে নিজের ব্যাটে সেটির ভাগ্য লিখে দিলেন।
ভাগ্য! ক্রিকেটে ভাগ্য কখনো কখনো ব্যাপার হয়ে ওঠে। তবে সেটির ছোঁয়া পেলে তা কাজে লাগাতে জানতে হয়। কোহলি যা পারেননি। ফখর জামান পেরেছেন। ৩ রানেই কট বিহাইন্ড হয়ে গিয়েছিলেন। ড্রেসিংরুমের দিকে অনেকটা পথ চলে যাওয়ার পর তাঁকে ফিরিয়ে আনল বুমরার নো বল। পাকিস্তানের ইনিংসের তখন চতুর্থ ওভার। স্কোর মাত্র ৮।
আজহার আলীর সঙ্গে ফখর জামানের যে উদ্বোধনী জুটি ৮ রানেই ভেঙে যাওয়ার কথা, সেটি কিনা ভাঙল ১২৮ যোগ করে ফেলার পর! সেটিও ভারতীয় কোনো বোলারের কৃতিত্বে নয়। আজহার রানআউট হয়ে যাওয়ায়। সেই রানআউটে নিজেরও দায় আছে ভেবে অপরাধবোধের কারণেই কিনা, ফখর জামানের ব্যাট ঝলসে উঠল এরপর। ১০৬ বলে ১১৪ রান করে যখন আউট হলেন, রানের পাহাড়ে ওঠার পথ অনেকটাই পেরোনো হয়ে গেছে। ৩৩ ওভার শেষে স্কোরবোর্ডে ২০০।
শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান যেখানে থামল, জিততে হলে ভারতকে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড গড়তে হতো। ওভাল মাঠের রেকর্ডও। কঠিন, কিন্তু অসম্ভব কেন হবে! কদিন আগে এই ওভালেই কি ভারতের ৩২১ রান তাড়া করে জেতেনি শ্রীলঙ্কা! ভারতের ব্যাটিং লাইন তো আরও তারকাখচিত। ৩৩৯ কেন সম্ভব নয়?
এ নিয়ে যা কথাবার্তা, তা দুই ইনিংসের মাঝের সময়টাতেই। ভারতের ইনিংস শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই যা কর্পূরের মতো বাতাসে উবে গেল। পাকিস্তান ক্রিকেটের আরেকটি রূপকথা যে লেখা শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে!
পাকিস্তান: ৫০ ওভারে ৩৩৮/৪
ভারত: ৩০.৩ ওভারে ১৫৮
ফল: পাকিস্তান ১৮০ রানে জয়ী
 আইসিসি ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিং
ফাইনালে উঠেই শ্রীলঙ্কাকে টপকে সাতে উঠেছিল পাকিস্তান। আর আজ ফাইনালে ভারতকে ধরাশায়ী করে সরফরাজ আহমেদরা টপকে গেল বাংলাদেশকেও। আইসিসির ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিংয়ে ৯৫ পয়েন্ট নিয়ে ছয়ে এখন পাকিস্তান।  
বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি শেষ হয়ে গেছে সেমিফাইনালে। এতে আইসিসির ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিংয়েও পিছিয়ে গেছে বাংলাদেশ। ভারতের কাছে হারে বাংলাদেশের রেটিং পয়েন্ট কমেছে ১। ৯৫ পয়েন্ট থেকে কমে ৯৪ পয়েন্টে এখন মাশরাফিরা। আর সে সুযোগে ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে ২ পয়েন্ট এগিয়েছে পাকিস্তান। ৯৫ পয়েন্ট নিয়ে ছয়ে অবস্থান করছে আট র‌্যাঙ্কিং নিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করা পাকিস্তান! আর এ ফাইনালে হেরে যাওয়ায় আবার তৃতীয় স্থানে ফিরে গেছে ভারত। বাংলাদেশের বিপক্ষে সেমিফাইনাল জিতে দুইয়ে উঠেছিল ভারত। কিন্তু এক হারেই দুই পয়েন্ট হারিয়ে ১১৬ পয়েন্ট নিয়ে তিনে চলে গেছে কোহলির দল। ১১৭ পয়েন্ট নিয়ে দুইয়ে অস্ট্রেলিয়া। গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিলেও শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে দক্ষিণ আফ্রিকা (১১৯ পয়েন্ট)।
বাংলাদেশের ছয় নম্বর জায়গাটি হারানো দুঃসংবাদ বটে। তবে তাতে ভয়ের কিছু নেই। সাতে নেমে গেলেও ২০১৯ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার সম্ভাবনা এখনো উজ্জ্বল বাংলাদেশের। ২০১৯ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলবে স্বাগতিক ইংল্যান্ড ও এ বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর ওয়ানডে র?্যাঙ্কিংয়ে ওপরে থাকা অন্য সাতটি দল। দুবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুর্দশা সম্ভাবনা বাড়িয়েছে বাংলাদেশের। আফগানিস্তানের সঙ্গে সিরিজ ড্র করায় ২ পয়েন্ট হারিয়েছে ক্যারিবীয়রা। ৭৭ পয়েন্ট নিয়ে নয়ে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে ১৭ পয়েন্টে। অষ্টম দল শ্রীলঙ্কাও এগিয়ে আছে ১৬ পয়েন্টে।
ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে র‌্যাঙ্কিংয়ের আট নম্বর জায়গাটির ব্যবধান মাত্র এক রেটিং পয়েন্ট হলেও ঘাবড়ানোর কিছু নেই। বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেলেও ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশের র‌্যাঙ্কিংয়ের নয়ে নেমে যাওয়ার শঙ্কা তেমন নেই। আর ওই দিনের মধ্যে আটে থাকা দলগুলো সরাসরি জায়গা করে নেবে ২০১৯ বিশ্বকাপে।
আইসিসির ওয়েবসাইটে এখনো এ তথ্য হালনাগাদ না হলেও বিস্মিত হওয়ার কারণ নেই। কারণ, একটি টুর্নামেন্ট শেষ হলেই কেবল সম্পূর্ণ র‌্যাঙ্কিং হালনাগাদ করা হয়। তথ্যসূত্র: আইসিসি।
  আইসিসির সেরা একাদশে তামিম
সদ্য সমাপ্ত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেরা একাদশ ঘোষণা করেছে আইসিসি। এই একাদশে জায়গা পেয়েছেন বাংলাদেশের তামিম ইকবাল। সোমবার বিকালে ঘোষিত একাদশের অধিনায়ক করা হয়েছে পাকিচ্চানের অধিনায়ক সরফরাজ আহমেদকে। সেরা ১১ খেলোয়াড়ের মধ্যে চার জন হলেন চ্যাম্পিয়ন পাকিচ্চানের। রানার্সআপ ভারতের ও ইংল্যান্ডের রয়েছে তিনজন করে। অপরজন হলেন বাংলাদেশের তামিম। দ্বাদশ খেলোয়াড় হিসেবে রাখা হয়েছে নিউজিল্যান্ডের কেন উইলিয়ামসনকে।
সেরা একাদশ
শিখর ধাওয়ান, ফখর জামান, তামিম ইকবাল, জো রুট, বিরাট কোহলি, বেন স্টোকস, সরফরাজ আহমেদ, আদিল রশিদ, জুনাইদ খান, হাসান আলি, ভুবনেশ্বর কুমার। দ্বাদশ ব্যক্তি: কেন উইলিয়ামসন।  
আমিরের আগুনে পুড়ল ভারত   
ওভালে মোহাম্মদ আমিরের বল শুরু থেকেই একের পর এক নিশানা খুঁজে পেতে লাগল। সে নিশানা শুধু রোহিত শর্মা, শিখর ধাওয়ান আর বিরাট কোহলির উইকেটেরই নয়, হয়তো জয়েরও।
৩৩৮ রান করে ব্যাটসম্যানরাই গড়ে দিয়েছিলেন পাকিস্তানের জয়ের ভীত। ফখর জামানের সেঞ্চুরি সবচেয়ে বড় অলংকার। কিন্তু কোহলি-রোহিতদের নিয়ে গড়া ভারতের বিধ্বংসী ব্যাটিং লাইনআপের সামনে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির চ্যাম্পিয়ন হতে সেই রানই যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে সংশয় ছিল। ব্যাটসম্যানরা দাঁড়িয়ে গেলে ৩৩৮ তো ভারত তুড়ি মেরেই উড়িয়ে দিতে পারে!
কিন্তু সব ওড়াউড়ি শুরুতেই থামিয়ে দিয়ে বোলিংয়ের আগুনে উ?ো ভারতকেই পোড়াতে শুরু করেন আমির। ৩৩৮ রান তাড়া করে জিততে যাঁদের ব্যাটগুলো তলোয়ারের ফলা হয়ে ওঠা দরকার ছিল, ভারতের সেই তিন ব্যাটসম্যানকে ফিরিয়ে দিলেন আমির একাই। আমিরের করা ইনিংসের প্রথম ওভারের তৃতীয় বলে রোহিত এলবিডব্লু। তৃতীয় ওভারে কোহলি একবার জীবন পেয়েও পরের বলে ক্যাচ দেন পয়েন্টে। দুর্দান্ত ক্ষিপ্রতায় সেটা মুঠোয় পোরেন শাদাব খান। আমিরের পরের উইকেটটা আরেক বিস্ফোরক ব্যাটসম্যান ধাওয়ানকে হালকা ইনসুইংয়ে কট বিহাইন্ড করে।
৬ ওভারের বিধ্বংসী স্পেলে ১৬ রান দিয়ে দুই মেডেন ওভার আর ৩ উইকেট। ভারতকে শুরুতেই লাইনচ্যুত করা আমিরকে এরপর আর বল হাতে নিতে হলো না। তাঁর দেখানো পথে হাসান আলী, শাদাব খানরাই উপড়ে ফেলেন বাকি বাধাগুলো। ম্যাচ শেষে মাঠে জানানো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আমির অবশ্য ভারতের শিরোপা কেড়ে নেওয়ার কৃতিত্ব ভাগ করে দিলেন সবাইকে, ‘আমি বলব দলের সবার পারফরম্যান্সই আমাদের জিতিয়েছে। সবাই যেভাবে ব্যাটিং, বোলিং, ফি?িং করেছে, এককথায় অসাধারণ।’
স্পট ফিক্সিংয়ের অপরাধে ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে পাঁচ বছরের জন্য বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। বয়সে তরুণ হলেও ক্যারিয়ারের শুরুতেই ক্রিকেটের অন্ধকার জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া আমিরের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়েছিল। কিন্তু আমির আত্মবিশ্বাসী ছিলেন আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরবেন। ২০১৫ সালে বিপিএল খেলতে বাংলাদেশে এসে প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন তাঁর স্বপ্নের কথা, ‘আমি সব সময় ছোট ছোট লক্ষ্য নিয়ে এগোনোয় বিশ্বাসী। ছোট লক্ষগুলো অর্জন করতে পারলে দিন শেষে সব লক্ষ্যই পূরণ হয়।’ ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরে নিজের কথা প্রমাণ করে দেখান পাকিস্তানের বাঁহাতি ফাস্ট বোলার। টি-টোয়েন্টি দিয়ে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় পর্ব শুরু করা আমির ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতেই নেন ৩ উইকেট। আমিরের বলের আগুন এরপরও জ্বলেছে অনেকবার।
 একজন অচেনা ফখরই নায়ক   
ফাইনালে তাঁর খেলারই কথা ছিল না। আগের দিন অসুস্থ বোধ করছিলেন। খেলতে পারবেন না ভেবে বিষণœ মনে টিম হোটেলে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। দলের ফিজিও এসে পিঠে হাত রেখে দিয়েছেন ম্যাচের সকালেই সেরে ওঠার আশ্বাস। ফিজিওর কথাই সত্যি হয়েছে। কাল সুস্থতা নিয়েই ঘুম ভেঙেছিল ফখর জামানের। অসাধারণ এক সেঞ্চুরি করে পাকিস্তানের জয়ের পথ বেঁধে দিয়েছেন এই টুর্নামেন্টেই ওয়ানডেতে অভিষিক্ত বাঁহাতি ওপেনার।
ভাগ্য তাহলে ফখরের সঙ্গী হয়েছে ঘুম ভাঙার সময় থেকেই। ভাগ্য ব্যাটিংয়ের সময়ও ছিল তাঁর ছায়াসঙ্গী। এমনিতে পিঞ্চ হিটার। কিন্তু কাল শুরুটা করেছিলেন দেখেশুনে। প্রথম বাউন্ডারি পেয়েছেন মুখোমুখি হওয়া দশম বলে। এর আগেই অবশ্য ফিরে যেতে পারতেন প্যাভিলিয়নে। জসপ্রিত বুমরার একটি বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন। মহেন্দ্র সিং ধোনি ক্যাচটি তালুবন্দীও করেন। কিন্তু ওই যে ভাগ্য! বুমরার বলটি ছিল ‘নো’। আউট হওয়ার বদলে ‘ফ্রি হিট’ পেয়ে যান ফখর। এটিকে ভাগ্য বলে মানছেন নিজেও, ‘আমি ভাগ্যবান ছিলাম যে বলটি নো ছিল। ভারতের বিপক্ষে ফাইনাল। আমি শুধু উপভোগ করতে চেয়েছি।’
ভাগ্যের ছোঁয়ায় ‘জীবন’ ফিরে পাওয়ার সুযোগটা দুহাত ভরে নিয়েছেন ফখর। আজহার আলীকে সঙ্গে নিয়ে ওপেনিংয়ে ১২৮ রানের জুটি গড়ে পাকিস্তানকে বড় স্কোরের ভিত গড়ে দিয়েছেন। আজহারের পরই যখন আউট হয়েছেন, পাকিস্তান ৩৩.১ ওভারে ২ উইকেটে ২০০। পাকিস্তানের ইনিংস শেষে ফখরকে কথার বলার জন্য ক্যামেরার সামনে টেনে নিয়ে যায় স্টার স্পোর্টস। ১০৬ বলে ১২টি চার ও তিনটি ছয়ে ১১৪ রান করা ফখর সেখানে নিজের ইনিংস নিয়ে কথা বলেছেন, ‘শুরু করতে আমি সময় নিয়েছি। উইকেট বুঝতে চেষ্টা করেছি। এরপর নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলেছি।’ স্বাভাবিক খেলা খেলে যে সেঞ্চুরিটা পেয়েছেন সেটি তাঁকে এনে দিয়েছে ম্যাচসেরার পুরস্কারও। সাঈদ আনোয়ার (২) ও শোয়েব মালিকের পর চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে এটি পাকিস্তানের হয়ে চতুর্থ সেঞ্চুরি। আর ভারতের বিপক্ষে বৈশ্বিক কোনো টুর্নামেন্টের ফাইনালে পাকিস্তানের প্রথম।
অথচ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির আগে ফখরকে কজনই বা চিনতেন! এ বছরেরই মার্চে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর আবির্ভাব। কিন্তু নিজেকে চেনানোর মতো কিছু করতে পারেননি তখন। দুই ইনিংসে করেছিলেন ২৬ রান। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে উঠতি তারকাদের তালিকায় তাঁকে রাখার লোক খুব বেশি ছিল না। নিজেদের প্রথম ম্যাচটি এই ভারতের বিপক্ষেই খেলেছে পাকিস্তান। কিন্তু একাদশে সুযোগ পাননি ফখর। ওই ম্যাচে আহমেদ শেহজাদের ব্যর্থতাই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সুযোগ করে দেয় ফখরকে। ওয়ানডে অভিষেকে ৩১ রান করেন এই ওপেনার। পরের ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৩ উইকেটের জয়ে করেছেন ৫০ রান, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে ৫৭। ইংল্যান্ডের ওভাল, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত-এই নামগুলো ফখর হয়তো কখনোই ভুলবেন না। ওয়ানডেতে আবির্ভাবেই যে চারপাশটা আলোকিত করলেন, এর সঙ্গে যে জড়িয়ে আছে নামগুলো।