Share |

টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাচনী রাজনীতিতে নয়া মোড়

পত্রিকা রিপোর্ট
লন্ডন, ১০ মার্চ : টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের আসন্ন মেয়র নির্বাচনের এখনো প্রায় ২ মাস বাকি থাকলেও নির্বাচন নিয়ে প্রধান দুই শিবিরে চলছে নানা উত্তেজনা।ভোটের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই ঘটছে নতুন নতুন ঘটনা। লেবার পার্টির ১১ জন সাবেক কর্মী সম্প্রতি স্বতন্ত্র মেয়র লুতফুর রহমানের নবগঠিত টাওয়ার হ্যামলেটস ফার্স্ট গ্র“পে যোগ দিয়েছেন। তবে লেবার পার্টির দাবি এসব কর্মী অনেক আগেই দলের সদস্য পদ হারিয়েছেন। কিছুদিন আগে লেবার দলের মেয়র প্রার্থী জন বিগসের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগ এনে ইক্যুয়ালিটি এন্ড  হিউম্যান রাইটস কমিশনে নালিশ করেছেন মেয়র গ্র“পের কাউন্সিলার এবং রিসোর্সেস বিষয়ক কেবিনেট মেম্বার আলীবর চৌধুরী। লেবার পার্টি এমন অভিযোগকে নোংরা নির্বাচনী খেলা বলে আখ্যায়িত করেছে। তারপর কাউন্সিলের বাজেট পাশ নিয়ে ঘটে আরেক অপ্রীতিকর ঘটনা। উভয় গ্র“পের বাক-বিতন্ডায় সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছিল ২৬ ফেব্র“য়ারির বাজেট অধিবেশন। এত ডামাঢোলের মধ্যেই আবার লেবার দলীয় কাউন্সিলার আনোয়ার উল্লেখ্য, আসছে ২২ মে অনুষ্ঠিতব্য টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল নির্বাচনে মোট মেয়র প্রার্থীর সংখ্যা ৫ জন। কিন্তু ভোটের হিসাবে আসল লড়াই হবে বর্তমান মেয়র লুতফুর রহমান এবং লেবার দলের প্রার্থী জিএলএ মেম্বার জন বিগসের মধ্যে।  

১১ জন লেবার কর্মীর মেয়র গ্র“পে যোগদান
গত ৭ মার্চ শুক্রবার লেবার দলের ১১জন কর্মী একযোগে মেয়র লুতফুর রহমানের নবগঠিত টাওয়ার হ্যামলেটস ফার্স্ট গ্র“পে যোগদান করেছেন। পূর্ব লন্ডনের মন্টিফিউরি সেন্টারে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে তারা লেবার পার্টি ছেড়ে মেয়র গ্র“পে যোগদানের বিষয়টি জানান। যোগদান করা লেবার কর্মীরা হলেন টাওয়ার হ্যামলেটস লেবার পার্টির সাবেক সেক্রেটারি এবং লেবার দলের সাবেক কাউন্সিলার স্টিফেন বেকেট, পপলার বাথসের চেয়ার লিলিয়ান কলিন্স, শ্যাডওয়েল লেবার পার্টির সাবেক সেক্রেটারি স্টুয়ার্ট মেডওয়েল, ২৫ বছর লেবার দলের সদস্য থাকা ক্যাথি ম্যাকটেস্নি, মিলওয়াল ওয়ার্ডের সাবেক চেয়ার এবং জিম ফিটজপেট্রিক এমপি’র সাবেক এজেন্ট জন ক্রে, চার্লটন এবং চেলসির সাবেক ফুটবলার মিকি এমব্রোজ, পার্টি হুইপ এবং সাবেক কাউন্সিলার শহীদ আলী, ১৫ বছর ধরে লেবার সদস্য আবদুস সালাম, লেবার দলের সোমালী ফার্স্ট গ্র“পের ক্যাম্পেইনার মোহাম্মদ ইসমাইল, লেবার দলের এথনিক মাইনোরিটি কমিটির সাবেক সদস্য মুনিরুজ জামান সাইদ এবং লেবার দলের আইল্যান্ড গার্ডেন শাখার সাবেক চেয়ার বেলাল আহমদ।  
লেবার দলকে ত্যাগের কারণ হিশেবে এদের সকলে অনেকটা অভিন্ন কক্তে বলেছেন, তাদের প্রত্যাশিত লেবার গ্র“প এখন আর টাওয়ার হ্যামলেটসে নেই। ২০১০ সালে মেয়র নির্বাচনের সময়ও এরা লুতফুর রহমানকে অন্যায়ভাবে দল থেকে বহিষ্কারের বিপক্ষে ছিলেন। তারা বলেন, লেবার পার্টি ধনী ব্যক্তিদের কাছে বন্দী হয়ে গেছে। সাধারণ সদস্যদের দলে কোনো মূল্যায়ন নেই।  
স্টিফেন বেকেট বলেন, ১৯৯৪ সালে জন বিগসের প্রশাসনে তিনি টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে কাজ করেছেন।  তার দাবি, তিনি দেখেছেন ভিন্ন ভাষাভাষী এবং অ-শ্বেতাঙ্গ মানুষের প্রতি বিগসের আচরণ। তিনি মেয়র নির্বাচনের আগে জন বিগসকে তার বৈষম্যমূলক আচরণপূর্ণ অতীত পরিচ্ছন্ন করে নেয়ার আহবান জানান। স্টুয়ার্ট মেডওয়েল  বলেন, ১৯৭০ সাল থেকে তিনি লেবার দলের কর্মী। তিনি দেখেছেন, টাওয়ার হ্যামলেটস লেবার দল কীভাবে দিন দিন গণবিচ্ছিন্ন দলে পরিণত হচ্ছে। তিনি বলেন, মেয়র লুতফুর রহমানের বিরুদ্ধে বর্তমান লেবার দল কনজারভেটিভ দলের ভোট নিয়ে লড়াই করতে নেমেছে। কনজারভেটিভ দলের ভোট দিয়ে তারা লেবার প্রার্থীকে জয়ী করিয়ে আনতে চায়।  
সংবাদ সম্মেলনে মেয়র লুতফুর রহমান বলেন, লেবার ত্যাগ করে আসা এসব কর্মীদের তিনি আসছে কাউন্সিল নির্বাচনে তাঁর দল টাওয়ার হ্যামলেটস ফার্স্ট থেকে কাউন্সিলার প্রার্থী হিশেবে মনোনয়ন দেবেন। তিনি আরো জানান, এবার তিনি তাঁর নেতৃত্বে ৪৫টি কাউন্সিলেই কাউন্সিলার প্রার্থী মনোনয়ন দেবেন।
লেবার কর্মীদের মেয়র গ্র“পে যোগদানের বিষয়ে লেবার পার্টির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না পাওয়া গেলেও পার্টি সূত্রে দাবি করা হয়েছে- দলত্যাগীদের কেউই বর্তমানে লেবার পার্টির সদস্য নয়। কেউ কেউ আগেই দল ছেড়েছেন আবার অনেকের সদস্য পদ এমনিতেই বাতিল হয়ে গেছে।  

বর্ণবাদের অভিযোগ
গত ১৯ ফেব্র“য়ারি টাওয়ার হ্যামলেটস ফার্স্ট গ্র“পের কাউন্সিলার এবং রিসোর্সেস বিষয়ক কেবিনেট মেম্বার আলীবর চৌধুরী লেবার দলের মেয়র প্রার্থী জন বিগসের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী আচরণের  অভিযোগ তুলে ইক্যুয়ালিটি এন্ড হিউম্যান রাইটস কমিশনে নালিশ করেছেন। তিনি জন বিগসের বিরুদ্ধে আনীত এ অভিযোগকে গুরুত্ব সহকারে নিয়ে দ্রুত এ বিষয়ে তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। ই-মেইল মারফত করা এ অভিযোগের অনুলিপি লেবার পার্টির ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটি চেয়ার এঞ্জেলা ইগল, লেবার পার্টির বিএএমই ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটি চেয়ার কামালজিত জান্দু এবং গ্রেটার লন্ডন অথোরিটি মনিটরিং অফিসারের কাছে পাঠানো হয়েছে।  
আলীবর চৌধুরীর অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বিবিসি’র সানডে পলিটিক্স অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বলেন, মেয়র লুতফুর রহমানের কেবিনেটের সকল সদস্যই বাংলাদেশী। কাউন্সিলের নীতি প্রণয়নে মেয়রের প্রাথমিক গুরুত্বই থাকে একটি বিশেষ কমিউনিটির দিকে যেটা বাংলাদেশী কমিউনিটি।  
আলীবর চৌধুরী এমন মন্তব্যকে বর্ণবাদী হিশেবে আখ্যায়িত করে অভিযোগ পত্রে বলেছেন, জন বিগস এমন সময়ে এসব মন্তব্য করলেন যখন ইস্ট লন্ডন মসজিদসহ টাওয়ার হ্যামলেটস বর্ণবাদী দল ইংলিশ ডিফেন্স লীগের আক্রমণের শিকার। জিএলএ মেম্বারের মত একটি বড় পদে আসীন থেকে জন বিগসের এমন মন্তব্য বর্ণবাদী গোষ্ঠীকে উস্কে দিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরো দাবি করেন, লেবার দলের অসহযোগিতার কারণেই মেয়রের কেবিনেটে কোনো শ্বেতাঙ্গ সদস্য নেই। কারণ কেবিনেট পদের জন্য মেয়র যখন সব দলের কাউন্সিলারদের কাছে আবেদনপত্র আহবান করেন তখন লেবার দল তাদের  কাউন্সিলারদের মেয়রের আমন্ত্রণ গ্রহণ না করতে কড়া হুশিয়ারি দেয়। ফলে বাধ্য হয়েই মেয়র শুধুমাত্র বাংলাদেশীদের নিয়ে তাঁর কেবিনেট গঠন করেছেন।  

লেবার দলের প্রতিক্রিয়া
আলীবর চৌধুরীর এমন অভিযোগের তীব্র ক্ষোভ জানিয়ে লেবার দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক কৌশলে হেরে গিয়ে বর্ণবাদের নোংরা খেলায় মেতেছে মেয়র গ্র“প। দলটির পক্ষ থেকে আরো বলা হয়, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের এমন অভিযোগ বর্ণবাদের শিকার প্রকৃত ভুক্তভোগীদের প্রতি উপহাস স্বরূপ। লেবার দলীয় এমপি বেথনাল গ্রীন এন্ড বো আসনের রুশানারা আলী এবং পপলার এন্ড লাইম হাউজের জিম ফিজপেট্রিক এক যৌথ বিবৃতিতে বর্ণবাদের এমন অভিযোগকে মিথ্যা এবং আক্রমণাত্বক দাবি করে বলেছেন, লুতফুর রহমান যদি মনে করেন বর্ণের কারণে লেবার পার্টি তঁর বিরোধিতা করছে তাহলে তাঁর বাস্তবে ফিরে আসা উচিত। তারা বলেন, এবারের নির্বাচনে লেবার পার্টি টাওয়ার হ্যামলেটসকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে কাজ করছে। এ জন্য একজন অভিজ্ঞ এবং ভালো মানুষকে লেবার পার্টি তাদের দলীয় প্রার্থী হিশেবে মনোনয়ন দিয়েছে। তারা সকল পক্ষ থেকে নির্বাচনে ইতিবাচক প্রচারণা আশা করেন।