Share |

থেরেসাকে উৎখাত চেষ্টার আভাস

পত্রিকা রিপোর্ট  
লন্ডন, ৯ অক্টোবর : মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়ে সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী পদে থেরেসা মের টিকে থাকা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে।  সাম্প্রতিক সময়ে এমন জল্পনা-কল্পনার বিষয়টি আরও জোরালো হয়েছে। গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত দলীয় সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে থেরেসা মে রীতিমত পুরো দলের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। ওই বক্তব্য প্রদানকালে একাধিক অঘটন সংঘটিত হয়। যে কারণে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের চেয়ে সংঘটিত অঘটনগুলোই সংবাদের শিরোনাম হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মাঝখানে একজন কমেডিয়ান তাঁর হাতে একটি ভুয়া পি ফোরটি ফাইভ ফরম ধরিয়ে দেন। সাধারণত চাকরি ছাড়ার সময় ট্যাক্স হিসাব সংক্রান্ত এই পি ফোরটি ফাইভ ফরমটি দেয়া হয়। ওই ফরম দেয়ার সময় কমেডিয়ান থেরেসা মে কে বলেন যে, ফরেন সেক্রেটারি বরিস জনসন ফরমটি তাঁকে দিতে বলেছেন। এমন ঘটনা থেরেসার গায়ে আগুণ ধরার ধরানোর মত একটি রসিকতা। কেননা, বরিস জনসন অনেকদিন ধরে প্রধানমন্ত্রী পদে থেরেসা মে কে চ্যালেঞ্জ করবেন বলে চাউর আছে। সম্মেলনের আগে সংবাদ পত্রে লেখা মন্তব্য কলামে বরিস জনসন ব্রেক্সিটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে থেরেসা মের অবস্থানের বিপরীতে বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। বরিসের এসব বক্তব্য প্রধানমন্ত্রী পদে থেরেসা মের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করা হয়।  
সম্মেলনের অঘটন কেবল পি ফোরটি ফাইভ ফরম দেয়ার মধ্যে সীমিত থাকেনি। ওই ফরম দেয়ার পর থেকে থেরেসা মের গলা বসে যায়। তিনি পরবর্তী সময়জুড়ে বেশ কষ্টে বক্তব্য শেষ করেন। তাঁর গলা বসে যায়, বার বার পানি খেতে হয়। চ্যান্সেলার ফিলিপ হ্যামন্ড এককবার তাঁর হাতে একটি চকলেট এগিয়ে দেন। তাঁকে গলা পরিষ্কার করার ঔষধও খেতে হয় বক্তব্য থামিয়ে। এছাড়া থেরেসা মের বক্তব্যের সময় পেছনের ব্যাকড্রপে লাগানো দলীয় সৌাগানের দুটি অক্ষর কুলে পড়ে যায়। এসব ঘটনা রাজনীতি মহলে ব্যাপক হাস্যরসের জন্ম দেয়।  
এরপর থেকে থেরেসা মের বিরোধী এমপিরা আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠে। মে কে নেতৃত্ব থেকে উৎখাতে কথা বলতে শুরু করেন দলের শীর্ষ একাধিক নেতা। দলের সাবেক চেয়ারম্যান গ্রান্ট শ্যাপস এই ষড়যন্ত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিবিসি রেডিও’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শ্যাপস পার্টির শীর্ষ পদ থেকে থেরেসার পদত্যাগ দাবি করেন। শ্যাপসের দাবি অনুযায়ী, দলেরই ৩০জন সংসদ সদস্য তার সঙ্গে রয়েছেন। নেত্বত্বের এই চ্যালেঞ্চ দলের মধ্যে বিভক্তি বাড়াবে বলে আশঙ্কা করছে কনজারভেটিভদের অনেকেই। এতে বিরোধীদের ক্ষমতায় আসার পথ সুগম হবে বলে মনে করছেন তারা। বিরোধিতাকারী এমপিদের মতে, দলীয় সম্মেলনে দেয়া ভাষণে চরমভাবে ব্যর্থ হওয়ায় দলের ওপর মের কর্তৃত্ব কমে গেছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কনজারভেটিভ দলের সাবেক চেয়ারম্যান গ্র্যান্ট শ্যাপস থেরেসাবিরোধী ষড়যন্ত্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। শ্যাপস শুক্রবার বিবিসি রেডিওকে তিনি বলেন, মে’র উচিত এই মুহূর্তে দলের নেতা ঠিক করার জন্য নির্বাচন ডাকা। ‘মে নির্বাচনে ব্যর্থ হয়েছেন, ব্যর্থ হয়েছেন মন্ত্রীপরিষদকে এক করতে। আমি বলবো তার পতনের ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে’ বলেন তিনি।
দলীয় সম্মেলন থেকে বিদায় নেয়ার পর দুদিন পর্যন্ত মে’কে জনসম্মুখে দেখা যায়নি। এরপর নিজ নির্বাচনী এলাকা মেইডেনহেডে একটি টেলিভিশন দেয়া প্রতিক্রিয়ায় থেরেসা মে নেতৃত্ব থেকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘দেশের এই পরিস্থিতিতে একটি স্থিতিশীল নেতৃত্ব দরকার, আমার মন্ত্রিসভার পূণাঙ্গ সমর্থনসমেত সেটাই আমি জাতিকে তা-ই সরবরাহ করে যাচ্ছি’।
২০১২ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী শ্যাপস বলেন, ওই দলীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে থেকেই থেরেসা মের বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছিল। ব্রেক্সিট সমর্থনকারী এবং ব্রেক্সিটের বিরোধীতাকারী-উভয় পক্ষের এমপিরাই এমন আলোচনায় সামিল রয়েছেন। তিনি বলেন, থেরেসা মের জায়গায় কাকে বসানো যেতে পারে এ বিষয়ে একমত হতে পারছেন না বিকল্প প্রত্যাশীরা। যে যোগ্য বিকল্পের অভাবে এখনও দলের কেউ প্রকাশ্যে থেরেসা মের বিপক্ষে অবস্থান জানান দিচ্ছেন না।  
তবে কনজারভেটিভ দলের ভাইস-চেয়ারম্যান চার্লস ওয়াকার বিবিসি রেডিওকে বলেন, গ্র্যান্ট শ্যাপস এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি আরও  বলেন, গ্র্যান্টের অনেক প্রতিভা রয়েছে। তবে একটি জিনিস তার নেই সেটি হচ্ছে দলের মধ্যে তার কোন অনুসারী। তাই একেবারে সৎভাবে বলতে গেলে আমি মনে করি, এই ষড়যন্ত্র কয়েকদিনের মধ্যেই নাই হয়ে যাবে।
আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নেত্বত্বের চ্যালেঞ্জ’ করতে ৪৮ জন কনজারভেটিভ এমপি দলের ১৯২২ সালে গঠিত কমিটির (দ্য কনজারভেটিভ প্রাইভেট মেম্বার্স কমিটি) চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করতে হবে। অনেক কনজারভেটিভ অ্যাক্টিভিস্টের ধারণা, এই মুহূর্তে কোন নেত্বত্বের চ্যালেঞ্জ ব্রেক্সিট বিষয়ে দলকে দুইভাগে বিভক্ত করে দেবে। উল্লেখ্য, এই একই ইস্যুর কারণে পূর্বের তিন মন্ত্রী- ডেভিড ক্যামেরুন, জন মেয়র ও মার্গারেট থ্যাচারের পতন ঘটেছিল। নেত্বত্বের চ্যালেঞ্জ নতুন একটি নির্বাচনের সূচনাও ঘটাতে পারে। অনেক কনজার্ভেটিভের ধারণা এমনটি হলে ক্ষমতায় চলে আসবে বিরোধী দল।   
ইউরোপিয় ইউনিয়নে ব্রিটেনের সদস্যপদ রাখা প্রশ্নে অনুষ্ঠিত গণভোটে ব্রেক্সিটপন্থীদের বিজয়ের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যর্থতার দায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ডেভিড ক্যামেরন। সেটি ২০১৬ সালের ঘটনা। এরপর নানা নাটকীয়তার মধ্যদিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন থেরেসা মে। এমন প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী বদলের ঘটনায় সাধারণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি উঠে। কিন্তু জেরেমি করবিনের নেতৃত্ব নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বিভক্ত লেবার পার্টির দুর্বলতার কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনের সেরকম জোরালো দাবি উঠেনি। কিন্তু শুরু থেকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা নাকচ করে দেয়া থেরেসা মে বছর শেষে হুট করেই  মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঘোষণা দেন। কনজারভেটিভ দলের আশা ছিল জেরেমি করবিনের নেতৃত্বের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ওই নির্বাচনের মাধ্যমে লেবার দলকে আরও ঘায়েল করা হবে। কনজারভেটিভ দল অন্তত একশ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরতে। এতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থেরেসা মের নেতৃত্ব আরও বেশি শক্তিশালী হবে এবং ইচ্ছামাফিক ব্রেক্সিটের মত বিতর্কিত ইস্যুর সমাধান দিতে পারবেন।  কিন্তু সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জনদরদী ইশতেহার ঘোষণা করে জেরেমি করবিন রাতারাতি রাজনীতির হিরো বনে যান। যার ফলে লেবার পার্টি আসন হারানোর বদলে উলটো ৩২টি আসন বেশি পেয়ে যায়। বিপরীতে ১৩টি আসন হারিয়ে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দল সংসদে নিজেদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। ফলে নর্দান আয়ারল্যান্ডের  ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির সঙ্গে সমঝোতা করে থেরেসা মে কে সরকার গঠন করতে হয়েছে।  
নির্বাচনের ব্যর্থতার জন্য কনজারভেটিভ দলের এমপিরা থেরেসা মেকে দায়ী করেন। থেরেসা মে নিজে একাধিকবার নির্বাচনের ব্যর্থতার জন্য নিজ দলের সমর্থক ও এমপিদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সর্বশেষ গত সপ্তাহের দলীয় সম্মেলনে তিনি আবারও দুঃখ প্রকাশ করেন।  
কনজারভেটিভ দলের এমপিরা চান থেরেসা মে কে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিতে। কিন্তু থেরেসা মেকে সরালে ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের কি হবে এবং দলের হাল ধরবেন কে তা নিয়ে মতভেদ আছে। এছাড়া ক্ষমতাসীন দলে নেতৃত্বের পরিবর্তন  হলে আবারও সাধারণ নির্বাচনের প্রশ্ন উঠবে। যদি আবার সাধারণ নির্বাচন হয় তাহলে জেরিমি করবিনের নেতৃত্বে লেবার দলের ক্ষমতায় ফেরা ঠেকানো যাবে না বলেই রাজনীতি বিশ্লেষকদের ধারণা। তাই নতুন নির্বাচনে আসন হারিয়ে বেকার হওয়ার চেয়ে মের নেতৃত্বকে আপাতত মেনে নিচ্ছেন কনজারভেটিভ দলের এমপিরা।