Share |

দিপালি অথবা ক্ষয়ে যাওয়া শব্দকর

জয়নাল আবেদীন শিবু
কেউ দেখলেই দিপালির যে চেহারা চোখে ভাসবে, বুড়ো- আসলে সে বয়সে নয়; অনাহার অর্ধাহারের কারণে। ভাঙ্গা শরীরটা আর শরীর কই, অনেকটা কঙ্কাল বিশেষ! সাতচল্লিশের দিপালি সাতাত্তরের বুড়ি বলে ভুল হবেই। চৈত্রের রোদে যেনো শুষে নিছে শরীরের রূপ-রস। তার তাজা বুক শুকিয়ে অনেকটা চামড়ার সাথেই মিশে গেছে- দেখলে তাই অনুমান হয়। দিপালি যে এমন ছিল, তা নয়। তার বুকেও যুবতি মনুর জল ছলছল খেলা করতো। এ জলের পিপাসা মিটিয়ে তার স্বামী নগেন্দ্র কতোটা খুশি থাকতো। নগেন্দ্রের চোখ মুখ দেখলে কারো কাছেই তা বুঝতে কোনো অসুবিধাই হতো না। নগেন্দ্র বউ’র সাথে রসিকতা করতো; বলতো- বউ তর বুকটা আড় মাইয়া উতলা মনুর মতো। পয়লা লগি বাইয়া নৌকাটারে উজান তুলতে বড়ো সময় লাগে, পরে ভাইলা করি ছাড়লে খুব আরামেই হপাড় লই যায়।   
তখন মনুতে ব্রীজ হয়নি। নগেন্দ্র খেয়া নৌকা চালাতো। রমজান উদ্দীন, আইন উল্লারা খেয়াঘাট লিজ নিলেও ঢুলিপাড়ায় যে কয়ঘর শব্দকর আছে তারাই নৌকা চালানোর কাজ পেতো। ঢুলিপাড়ার যেকোনো ছোট চেংড়া ছেলেও লগি-বৈঠা চালাতে পারদর্শী ছিলো। খেয়া ঘাট ছিলো নগেন্দ্র শব্দকরের জীবন ও জীবিকা। এ ঘাটেই তার কচি হাতে লগি ধরেছিলো; যৌবন কাটিয়েছে।  খেয়াঘাটের আশেপাশে এপাড় ওপাড়ের লোক তাকে কাউলি নামে ডাকতো। দু’পাড়ের মানুুুুষের উৎসব-অনুষ্ঠান, বারুনি, গরু-মহিষের হাট, গরু-মহিষ-ছাগল চুরি, হারিয়ে যাওয়া, খেলাধুলা, যাত্রা, বাউল গান ইত্যাদির খবর প্রচারের জন্য ঢুলিপাড়ায় কাউলির নামই আগে ডাক পড়তো। হরিপাশা,  ভটেরবাজার, পালপুর, মিয়ারবাজার সহ আশেপাশে সব বাজারে কাউলিই ঢুুল পিটিয়ে যেকোনো খবর জানান দিতে হতো। দশ বারো গ্রামে কাউলি নামটা ছিল বড়ো পরিচিত। বারুনিতে দেখা ক্যামেরার ছবির মতোই দিপালি শব্দকরের  চোখে বড়ো পরিচিত একটা ছবি বারবার ভেসে ওঠে। নগেন্দ্র ! হ্যা নগেন্দ্র শব্দকর। তাকে সবাই কাউলি কাউলি ডাকতো। এ যেন জাত  পাতের বাছ বিচার ছাড়াই একটি আদরের নামডাক।
বুড়ির ভেতরে স্মৃতির এক বিশাল আকাশ। সেখানে স্মৃতি হয়ে হাজার চিল উড়োউড়ি করে। বুড়ি রোমন্থন করে- কাউলি তাকে এভাবে ছেড়ে চলে গেলো ! দিনশেষে হাত-পা অবশ কাউলি বাড়িতে আসে। ক’জন লোক ধরাধরি করে আনে। কী যে হলো, কিছুতেই কিছু বুঝা মুশকিল। কাউলি হাত নাড়তে পারে না। বাম পা’টা ঠান্ডা, চেতনাহীন...। কেউ একজন বলে- ও তো দুপুরে খেয়ানৌকা বেঁধে মাছের লিল্পায় নেমেছিল ডরে। কথাটিতে দিপালি হোঁচট খায়। তার মাথা ঘুরপাক দেয়। আহহ কী সব্বনাশ ডাকিয়া আনলো ঘরো ! মাছোর  নিশা যে মরদটারে মাতালোর মতো টানে। কতোবার কইছি, ঘরো একটা হুরুমানুষ, মনুর ডরো নামিওনা। দেওলারা হুনছি বিগ্রি গেলে স্বপনে ধন-সম্পদ, সোনা-রোপা, এমনকি জানও চায়। তুমিতো আর জমিদার নায়। ধন সম্পদ চাইতো নায়, তোমার রক্ত আমি পেটো ধরছি, বাইচ্চাটার মায়ায় এমন কাজ করিও না। মরদটা তবুও বুঝল না, কেনো এতো মাছোর কাঙ্গাল। অখন ঔষধ পইথ্য করব, সাইধ্য কই? ওরে নিয়া অখন আমি কিতা করি, কার গেছে যাই গো- দিপালির এমন হাহাকার আর হরি নাম জপনে সে রাত আরো দীর্ঘতর হয়েছিলো।  
বুড়ির মনে পড়ে কাউলিকে রাজনগরের একটি হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল। ডাক্তাররা তাকে রাখেনি, জেলার বড় হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে নেয়া হলে, হাসপাতালের নিচের একটা কামরায় তাকে রাখা হয়। একটা কাঠের বেঞ্চে কাউলি মরার মতো শুয়ে শুয়ে আঁ আঁ আঁ, উঁ উঁ উঁ করে। হাত পা নাড়তে পারে না, কেবল মাথাটা নাড়ায় আর গোঙায়। তার সারা শরীর তখন হিম শীতল! ডাক্তাররা ব্যস্ত। অন্য রোগী, অনেক রোগীর ভিড় শেষ হয়না, দেখে চলেন। দিপালি এদিক ওদিক ছুটাছুটি করে। কাকে কী বলবে।  কতজনকে ট্্রলি করে ওপরে  তোলা হচ্ছে, নিচে নামানো হচ্ছে। কেউ কেউ ভাত তরকারির টিফিন হাতে নিয়ে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে, কারো হাতে ব্যাগ, বালিশ, কাঁথা, কাপড়ের বোচকা, পানির বোতল, কলা, পাউরুটি, ঔষধ, স্যালাইন...। দিপালি ওদের কাউকে চিনে না। কাউলিকে কিন্তু তাড়াতাড়ি ডাক্তার দেখানো দরকার। গোঙাচ্ছে...। বাড়িতে রেখে আসা পবন, তার চার বছরের বাচ্চাটি হয়তো কান্নাকাটি করছে। আরতিমালা রাগী মহিলা। একটু যন্ত্রণা সহ্য করতে পারেনা, মেজাজ দপ করে জ্বলে ওঠে। পবন যদি জ্বালা-যন্ত্রণা করে! এসবও একবার ভেবে নেয় দিপালি।  
সদর হাসপাতালে এই প্রথম আসা দিপালি অনেকটা ভিতু হয়ে পড়ে। কেউ একজন তাদের দিকে চোখ তুলেও তাকাচ্ছে না! কিন্তু এভাবে বসে থাকলে তো আর হবে না, দিপালি সামনে এগোয়...। শাদা কাপড়ে মোড়া, মানানসই এপ্রোন পড়া এক নার্সকে আসতে দেখে দিপালি তাকেই ডাক্তার মনে করে আবদার করে, মানুষটারে দেখোইন আপা? দিপালির কোনো কথাই যেনো কাফনের কাপড় পরিহিতা নার্সটির কানে গেলো না, এক পা না দাঁড়িয়েই দ্রুত হেঁটে যায়। দিপালি নি?লক চোখে চেয়ে দেখে, হন হন করে পাছা দুলিয়ে কাগজের ফাইলপত্র নিয়ে উপড়ে উঠে যাচ্ছে নাদুস নুদুস মহিলাটি! তার মনে হতাশা জন্মে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। নার্সের পাছা দুলানি যে তাদেরকে অবজ্ঞা সূচক ভাষা প্রকাশ করে, এতো গভীরে যেতে চায় না দিপালি। বুকে একটু সাহস জোগাড় করে। কিছুটা ভয় কিছুটা সাহসের দোলাচলে নিজেকে আবিষ্কার করে ডাক্তারের সামনে। কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামির মতো- একটুকতা দেখোইন ছার, মানুষটার আখতা ধরি কিতা অইলো! আত পাও লাড়াইতা পারইন না।
- দেখা হবে, বসো গিয়ে। ডাক্তারের এমন নির্দেশে হতভম্ব দিপালি আরো হতাশ হয়। সে কাউলির পাশে গিয়ে বসে। কাউলির হাত পা টিপে টিপে মালিশ করে দেয়। তার গলা ভিজে আসে, আখতা ধরি কিতা অইলো গো তোমার। আমি অখন কিতা করি গো বলো।  
কাউলির নি?লক চাহনিটা দিপালির চোখে এসে তীরের মতো বিঁধে। তার চোখ থেকে গাল বেয়ে শ্রাবনের ধারার মতো জল ঝরে। নিজেকে সামলে নিতে হয়তো অবাধ্য জলকে কাপড়ের আঁচল দিয়ে শুকিয়ে নিতে চায়। কাউলির উঁ উঁ উঁ , মাআআআ শব্দে দিপালির আস্বস্তি আরো বাড়িয়ে দেয়। তার নিজেকে বড়োই নিরুপায়, অসহায় মনে হয়। এমন জন্মের জন্য মনে মনে দুঃখ করে- ভগবান, কেনো আমাদের জন্ম দিলে? জন্ম দিলে তে কেনো ছোট জাত করে দিলে? মানুষ যে বড়ো ঘিণœা করে আমাদের। গেরামেও বাইচ্চা কাইচ্চা নিয়া মানুষোর লাত্থি উষ্ঠা খাইয়া বাঁচি! জ্ঞাতি গোষ্ঠীর মাঝে আরো বড়ো জ্বালা! আমরার উপর কেনে তোমার অতো অভিশাপ? মোমবাতির শরীর জ্বলতে জ্বলতে নিঃশেষ হওয়ার মতো এক সময় দিপালিও শান্ত হয়। নিজেকে সান্ত¡না দিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনে...
 এর প্রায় চার ঘন্টা পর ডাক্তার কাউলিকে দেখে ডায়গনিসের নির্দেশ দিলে দিপালির চোখ মুখ থেকে যেনো এক ঔৎসুক স্ফূলিঙ্গ বেরোয়- রোগ কিতা ছার?  
- প্যারালাইসের সম্ভাবনা। এখান থেকে পরীক্ষাগুলো করে নিয়ে এসো তাড়াতাড়ি। বলে ডাক্তার একটা কাগজ তুলে দেয় দিপালির হাতে। দিপালি থতমত আঙুলে কাগজটি হাতে নিয়ে, গভীরভাবে চোখ মেলে ধরে এর উপর। নিরক্ষর দিপালির কাছে এর মাথামুণ্ডু কিছুই পরিস্কার হয়না। মুর্তির মতো অনড় দাঁড়িয়ে থাকে সে।  
- দাঁড়িয়ে আছো কেনো? বেড থেকে সরাও।  
- আমরা গরীব মানু ছার, টেকা পয়সা নাই। একটুক দয়া করোইন, ঠাকুরোর আর্শিবাদ পাইবা।
- সরকারি হাসপাতালে বিনা টাকায় চিকিৎসা করা হবে, আর কি দয়া চাও? হেঁ। ডাক্তারের বিরস কণ্ঠে দিপালির মুখখানা ছোট হয়ে আসে। তার মনের আকাশে ভাসতে থাকে বিষাদের এক দীর্ঘছায়া।  
অনন্যোপায় হয়ে কাউলিকে নিয়ে সেদিন বাড়িতে এসেছিলো দিপালি। ঢুলিপাড়াসহ আশপাশের গ্রামের মুসলিম-হিন্দু, যাদের কাজে কাউলির ডাক পড়তো আগে, কেউ কেউ কিছু টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করলেন। ওঝা দিয়ে কতো ঝাঁড় ফুঁক দেয়া হলো, কিছুতেই কিছু হলো না, মাস খানেক পর কেবল দিপালির জীবনে নয়, খেয়াঘাটের পাশে ও ঢুলিপাড়ায় একটি অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে গিয়েছিলো।
 কতো ঘটন অঘটনের মধ্য দিয়ে ঢুলিপাড়ার জীবন প্রবাহিত; দিপালি শব্দকর তা প্রত্যক্ষ করে আসছে। গত বিশ পঁচিশ বছরে ঢুলিপাড়ার আশপাশের কতই পরিবর্তন হয়েছে। ছন-বাঁশের ঘরের ভিটোর বুকে গজিয়ে উঠেছে ইটের দালানকোটা। পরিবর্তন লাগেনি কেবল হরিপাশা বাজারের উত্তরে, জেলা সড়কের পশ্চিমে যে কয় ঘর ঢুলি আছে তাদের। সন্ধ্যা হলে চারিদিক ইলেকট্রিকের আলোয় ফক্ফক্ করে ভেসে উঠলেও ঢুলিপাড়ার জীবনে নামে আদিম অন্ধকার! তারা সংখ্যায় বারো চৌদ্ধ ঘরের বেশি নয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের সাথেও তাদের ধর্মীয়, বৈষয়িক তেমন মিলমিশ নেই। তবে রুটি রোজগারের জন্য অন্য জাতের সাথে যতটুকু মেশা প্রয়োজন তার বেশি কেউ মিশে না। ওরা নীচুজাত! ব্রাহ্মণ তো দূরের কথা কায়স্থ’র ঘরেও এদের দানপানি হারাম! এরা ঢুলি। বংশ পরম্পরায় ঢোল বাজিয়ে আসছে। এটাতো তাদের পৈতৃক পেশা। রোজগার কম হলেও অনেক শ্রাস্ত্র ভঙ্গের ভয়ে এর বাইরে যেতে চায় না। ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাদেরও ঢোলের তালিম দেয়া হয় ঢুলিপাড়া জুড়ে। এ যেনো বাচ্চাদের শিক্ষাজীবনের হাতে খড়ি! আর যাই হোক, ঢুলিপাড়ার শ্যামবর্ণ, হ্যাংলা, পাতলা, নগ্ন শিশুদের সব তো আর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যায় না। দু একটাকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হলেও এক দুই চার পাঁচ দিন পর আর যেতে চায় না। বাড়িতে পিটুনি খেলে আবার যায়। আবার দু’চার দিন পর বন্ধ। এভাবেই কেউ কেউ মুটোমুটি দু’তিন শ্রেণির পাঠ চুকিয়ে রাস্তাঘাট, হাটবাজারে খেলাধুলা, টুকটাক কাজকাম কিংবা নদীর জলে ভেসে আসা লাকড়ি কুড়াতেই বেশি পছন্দ করে। পড়ালেখা পছন্দ করবে কি করে? বিদ্যালয়ের প্রতি বাচ্চাদের অনীহার কারণ শব্দকর শ্রেণির কেউ খতিয়ে দেখতে চায় না অথবা দেখার মতো আকল-বুদ্ধিও আছে বলে মনে হয়না। আর থাকলেও এ নিয়ে কেউ বেশি মাথা ঘামাতে চায়ও না।
 বাচ্চারা এমনিতেই স্কুল পালায়নি। বিদ্যালয়ে গেলে আলাদা থাকতে হয়। অন্য ছেলেমেয়ে মেশে না এবং তারাও মিশতে পারে না অন্যদের সাথে। শব্দকর ঢুলিমালির বাচ্চাদের বসতে দেয়া হয় পেছনের বেঞ্চে। ঢুলিপাড়ার বাচ্চাদের কাছে এটা আরোও সুবিধা ঠেকে। তারা এ সুযোগে নিজেদের মধ্যে হাতাহাতি, টানাটানি, কখনো আচ্ছামতো ঝগড়াঝাটিও করে নিতে পারে। তবে শিক্ষকের জন্য তারা পুরো স্বাধীনতা পায় না। দেখলেই স্যার বেশ চড়াও হয়ে উঠেন। বেতের ঘা বসানোর সাথে সাথে মুখেও খিস্তি খেউড় চলে- কাটুয়ার ছাওয়াইন, ঢুলির ঘরো ঢুলি অইবায়নাতে জজ বারিস্টার অইবায়নিরে? ক্লাসো আইয়াউ লাগাও খালি কুচ্চি আর টানাটানি, হ্যেঁ। নিরাই বও ভুতোর বাচ্চাইন।
পবন সেদিন ক্লাস থেকে বেরিয়ে আসার সময় সামনের একটি ছেলের সাথে ধাক্কা খেলে, ছেলেটি তাকেও দ্বিগুন জুরে ধাক্কা দেয়। রীতিমতো জাপটাঝাপটি শুরু হলে দিপক স্যার দুটোকে দুই চড় দিয়ে ছাড়িয়ে দেন। পবনের কান ধরে, মলা দিয়ে ভেংচি দেন- এমড়ার ছাও দৌঁড় বাড়িত। পবন কেঁদে কেঁদে বাড়িতে আসলে দিপালি ছেলেকে সান্ত¡না দিয়েছিলো- তুই তারার লগে ঝগড়া করিছনারে পুত। মনে মনে বলে হায়রে কপাল! কত কিছু সইতে অইবো?
 সমাজ, ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক কত চাপ এই ঢুলিপাড়ার উপর দিয়ে চলে গেছে এবং যাচ্ছে- দিপালি বুড়ির তা অজানা নয়। সামাজিকতো বটেই, ধর্মীয় প্রধান উৎসবগুলো থেকেও ঢুলিপাড়ার লোকেরা বঞ্চিত। অবশ্য কেবল দেবতা কালির পূজা দিয়েই তারা তাদের আত্মতুষ্টি অর্জন করে। কালিই তাদের মা, পালক, কল্যাণকামী সবকিছুই। বছরে একবার কালিকে পূজা দিতে হয়। কালি পূজার সময় এলে ঢুলিপাড়ায় আলাদা পরিবেশ বিরাজ করে। ছেলে-বুড়ো, শিশু-নারী-পুরুষ সব বয়েসের লোকের উদ্বেলিত আনন্দে ঢুলিপাড়ার বাতাস তখন উথলে উঠে। বাতাসের এই উতরোল ঢুলিপাড়ার সীমা ছেড়ে আশপাশের অন্তত দশ বারো গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। জাতপাতের বিচার না করেই এসব গ্রামের লোকের মধ্যে একটা শিহরণ জাগে। কিসের সে শিহরণ? তারা নিজেরাই এ হিসেব মেলাতে যায় না কখনো। কালি পূজাকে উপলক্ষ্য করেই চড়ক পূজা। শেষ চৈত্রের দিনটিতে চড়ক পূজার আয়োজনে হরিপাশা স্কুলের সামনে বসে বিরাট বারুনি মেলা। ছোটবড়ো সকলেরই মুখে এ খবর ফেনায়িত হয় তখন বেশি। চড়ক পূজা দেখার কৌতূহলই তাদেরকে টানে। বিরাট চড়কি গাছ, সারাবছর পাথরের মতো ডুবে থাকে বড়পুকুরের জলে। বারুনির দিন পূজার নানা পসারি সাজিয়ে, ধূপধুনা জ্বালিয়ে পুকুরের জলে নেমে গাছটি ভেসে উঠার জন্য প্রার্থনা করতে হয়। ঢুলিপাড়ার মানুষ বিশ্বাস করে পূজার পর গাছটি পানিতে ছেড়ে দিলে পাতাল দেবির কাছে চলে যায়। তাই শেষ চৈত্রের দিন ঢুলিপাড়ার শিশু কিশোরদের বুকে, গালে, কপালে, পিঠে ধারালো শিক গেঁথে দেবির কাছে চড়কি গাছের জন্য আরাধনা করে তারা। এই শিক গাঁথাকে অশেষ পূণ্যের কাজ মনে করে তারা। এভাবে আরাধনা, ঢোল, ডপকি, করতালের আওয়াজে কালি দেবি স্থির থাকতে পারেন না- তার বস্যদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে তাদের জন্য চড়কি গাছ ভাসিয়ে দিলে তবেই না তোলা হয় গাছটি।  গাছটি মাটিতে পুঁতে উপরে চড়কি লাগানো হয়। বড় বড় কলওয়ালা বড়শি গেঁথে ছোটছোট বাচ্চাদের লটকানো হয় চড়কিতে। নিচ থেকে চড়কি ঘুরপাক দিলে হাত-পা টাঙানো বাচ্চারা পাখির ছানার মতো ঘুরতে থাকে, উড়তে থাকে। হিন্দু, মুসলিম, ঢুলিমালি ভেদাভেদ ভুলে বাচ্চাদের কোলাহলে বড়োরাও তখন পিছিয়ে থাকে না। শুরু হয় কলা, চিড়া-মুড়ির নাড়ু, তিলুয়া, বাতাসা ছিটানো আর লুফে নেয়া, কুঁড়িয়ে খাওয়ার এক মহা উৎসব। বাতাসে ভাসতে থাকে হে হে, হৈ হৈ, হরি হরি, হরিবল, হরিবল, জয় কালি...
 সে বছর পূজার দিন ঘনিয়ে আসলে ঢুলিপাড়ার আয়োজনও পুরোমাত্রায় চলে। বারুনির দিন ভোরবেলা থেকেই চড়কি গাছের প্রার্থনায় জলে নামে পনের বিশ জন লোক। প্রার্থনায় প্রার্থনায় বেলা গড়ায়। মেলার দোকানপাট বসতে শুরু করে। ভেসে ওঠে না চড়কি গাছটি! তারা পুকুরের জলে ডুব দেয়, খুঁজে। না, দেবির কোনো সায় পায় না। পাড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যারা দেখছিলো, তাদের চোখ কপালে উঠে। কেউ কেউ জলে নামে। তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয় পুকুরে। খবরটি ঢুলিপাড়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। মহিলারাও ন্যাংটো শিশু নিয়ে ছুটে আসে। সকলের মুখে মুখে ভাসতে থাকে অমঙ্গলের অনুভূতি। তারা মনে করে দেবি তাদের উপর অখুশি হয়েছেন। ঢুলিপাড়ার এই হতদরিদ্র সন্তানদের উপর দেবির কেনো যে এতো অভিমান- এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে জোয়ান বুড়ো সকলেরই ভেতরে ভেতরে একটা ভীতি কাজ করে। তারা কালির নামে যার যার সাধ্যমতো মানত করে। ঢুলিপাড়ার ঠিক উপরে তখন সূর্য। বারুনিতে লোকজনও আসতে শুরু করেছে। সবার সন্দেহ দূর করতে হুরাজাল টানা হলেও তারা গাছের কোনো সন্ধান পায় না। পবন শব্দকর নিজের মনেই এর একটা হিসেব মেলায়- গাছটিতো পুকুরের পানিতেই থাকে। এতোদিন থেকেই তো আছে, এখন যাবে কই? বেশ দামী ও শক্ত কাঠ; তবে কি কেউ চুরি করে তুলে নিলো! উপস্থিত সকলকে বুঝাতে চেষ্টা করে- আমাদের ইতা পাতাল দেবি টাতাল দেবির ধারনা মনো কয় ঠিক নায়, গাছটা কেউ চুরি করি নিয়া গেছে; নাইলে যাইবো কই? পবনের কথায় বয়স্ক কে একজন খাকাড়ি তুলেন- তুমিতো ধরমর বারে কথা কও। কালিদেবির আর্শিবাদোর গাছ চুরি করা যায় নাকি? দীপেন শব্দকর উত্তেজিত হয়- পবন হকল সময়ই এজাত কথা কয়। হে কুনু ধরমো করমোও করেনা। শাস্ত্র টাস্ত্রও বুঝেনা। দীপেন আরোও যোগ করে- দু’বছর আগেও হে একবার আমাদের শাস্ত্র ভঙ্গ করছে। তার মায় মান্নত করার পরও হে পূজার দিন ভড়ি গিঁথলো না। আমরার কথাও হে হুনেনা। ঢুলিপাড়া থাকি তারে বারকরি দেওয়া দরকার। সেদিন দীপেনের কথায় অনেকেই সহমত পোষণ করেছিলো।
 পবন শহরের বস্তিতে চলে যাবার পর অসহায় দিপালির আর কিছুই করার থাকে না। ছায়াহীন মাথার উপর দুঃখের কালো মেঘ উড়াউড়ি করে। এক গভীর সমুদ্রে হাবুডুবু খাওয়া দিপালি কূল পায়না। দিপালির মনে পড়ে- এরপর থেকেই গা-গতর খাটিয়ে পেট বাঁচিয়ে চলেছে সে। শরীরটাকে বুড়ো করেছে। আজ সে হাড্ডিসার বুড়ি! বড়োই ক্লান্ত দেহ। অথচ সন্ধ্যায় দেবতাকে জলপান করানোর মান্নত করেছে, নগেন্দ্রের জন্য পূজা দেবে। এ সময় সূর্যটা ধীরে ধীরে ঢুলিপাড়ার পশ্চিমে তার শেষ আলোটা মিলিয়ে দেয়।  
 বুড়ির চোখে এখন আর বর্ষার ফোঁটা ফোঁট জল নেই। তবে দেখলে অনুমান করা যাবে শ্রাবণের ধারা বয়ে গিয়েছে কিছু আগে। দুঃখে কাঁদেনি, কাঁদতে চায়ওনি। ঘর সংসারের প্রতিটি লোমকূপে তার সকল দুঃখ গেঁথে গেঁথে স্বশব্দ কান্না একেবারে থেমে গেছে। নিঃশব্দ কান্নায় তার বুক ভেসে গেলেও, চোখে নামে না এখন এক ফোঁটা জল। বুড়ির ভাঁজপড়া মুখের চামড়ায় জমে থাকা শ্রাবণের ধারা ইচ্ছায় নামে নি। দেবতাকে পূজা দিতে, দেবতার পদধুলি নিতে গেলে আরতিমালা দিপালিকে উদ্দেশ্য করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে- দেবতা কেনে যে তোর জলদান ভোগ করে না গো ভইন? কোন পাপকাম করছিলে? হয়তো আগোর জন্মোর কুনু পাপোর ছায়াও পড়তো পারে তর উপর। নাইলে তোর এ যৌবন রাখিয়া নগেন্দ্র চলিয়া গেলো। তোর কূল ভরিয়া যে আশা দিছিল, হেও এ বুড়া বয়সে তোর কাছে থাকলো না।  
দিপালি বুড়ি কান ভরে আরতিমালার কথাগুলো শুনে, নির্বাক হয়ে। দেবতার পায়ে ভক্তি দিয়ে নিঃশব্দে চলে আসে নিজের ঘরে। ঢুলিপাড়া জুড়ে তখন উ-লু-লু, উ-লু-লু, উ-লু-লু আর ঢুলের ডুমডুমাডুম শব্দের উন্মাতাল পরিবেশ। ঘরে এসে  কোরোসিন প্রদীপ জ্বেলে সলতেটা আধো নামিয়ে রাখে বুড়ি। সারাদিন খাটিুনির পর অনেকটা হাঁপ ছেড়ে বসে। আরতিমালার কথাগুলো তাকে কাঁটার মতো বিদ্ধ করে চলে ক্রমশ...।  
বুড়ির চোখের সামনে ভেসে যায় ঢুলিপাড়ার এক নীরব স্রোত। সে স্রোত কত বছরের- বুড়ি হিসেব মিলাতে পারে না। মনুর খেয়াঘাট, নগ্রেন্দ্রের মৃত্যু, চড়ক পূজা, পবনের শহরে চলে যাওয়া, ইলেকট্রিকের আলো, তার ভাঙ্গা ঘুপড়িঘর সবকিছু উড়তে থাকে ঝড়ে ওড়া খড়পাতার মতোন। নেভার আগে শেষ আলোটুকু দপ করে জ্বলে ওঠে কেরোসিনের প্রদীপে। বুড়ির চোখ ফিরে আসে। তার চোখে মুখে বিষণœতা, নেই কোনো আকাঙ্খা। তবে ক্ষোভে চোখের মণিগুলো ধীরে ধীরে স্ফিত হয়ে ওঠে। সলতের আলোটা শেষ হয়ে এলে, অন্ধকার ঘিরে ধরে তাকে। ঘরে কেরোসিন নেই। বুড়ি পা বাড়ায় আরতিমালার ঘরের দিকে। বাইরে অন্ধকার। তার শিম ঝোপ, আরতিমালার ঘর ঘন অন্ধকারে ডুবে আছে। কোথাও কোনো আলো নেই, নেই কোনো শব্দও। বুড়ি তবু উঠানে পা রাখে...