Share |

প্রাজ্ঞপুরুষের সাথে এক সন্ধ্যা

অনেক দিন পর কর্মব্যস্ত সময়ের ফাঁকে একটি বিরল সন্ধ্যা রচনা করেছিলাম আমরা কজন সংস্কৃতিকর্মী। সংস্কৃতিকর্মী ও আবৃত্তিকার মুনিরা পারভীনের বাবার লন্ডন সফরের শেষ শুক্রবারে এ বিরল আড্ডা বসে সাপ্তাহিক পত্রিকা অফিসে। তিনদিন আগে কবি আহমেদ ময়েজ মোবাইলে এ আড্ডার আয়োজকদের তালিকায় আমার নাম লিখে বললেন, হামিদ ভাই- মুনিরার বাবাকে নিয়ে বসবো। আমি সায় দিয়ে বললাম, অনেকদিন পর ভালোই কাটবে। মুনিরা বিলেতের সংস্কৃতি জগতে প্রিয়ভাজন এবং সৃজনশীল কর্মী হিশেবে আমাদের স্বজন। তার বাবাকে নিয়ে বসা সেই অর্থে অনন্য সেতুবন্ধন। দুই প্রজন্মের প্রীতিডোর। তা-ই আমরা রচনা করলাম ৬ ফেব্র“য়ারি এক জমজমাট সন্ধ্যা। আবৃত্তি, কবিতাপাঠ, স্মৃতিচারণ, পুরোনো দিনের গল্প সবই ছিলো।  
বিদ্যুতের কৃিত্রম আলোয় চাঁদনী রাতের অংকন খেলা করছিলো পত্রিকা অফিসে। মনে হচ্ছিল জোসনাভরা পুরো অফিস। ভোমরার মতো একে একে পা রাখলেন ষাটোর্ধ বয়সকে ঠেলে লেখক ইসহাক কাজল, মাসুদ রানা, ময়নুর রহমান বাবুল, ফরিদ আহমদ রেজা, তরুণ কাব্যকার উদয় শংকর দূর্জয়, সৈয়দ রুম্মান, মতিউর রহমান সাগর, সোহেল আমিন, আবদুল কাইয়ূম, আহমেদ ময়েজ, আশিষ মিত্র, সারওয়ার কবির ও তাহেরুল হাসান সিমন। এছাড়া আড্ডায় যোগ দিলেন মুক্তিযোদ্ধা আজিজুল কামাল ও সংস্কৃতিকর্মী আরিফুর রহমান খন্দকার।
মুনিরা তখন পৌঁছেননি। ফোন করে জানা গেল ট্রাফিকে আটকা পড়েছেন মটরওয়ের পেটে। সৈয়দ রুম্মানের হাতে কাগজের তিনপাতা ভর্তি স্বরচিত কবিতা। উ?েপা?ে পড়ছেন অন্যরা। হাতে হাতে ঘুরছে। মোবাইলের স্ক্রিনে সোহেল আমিন গান শোনাচ্ছেন তার নিজের লেখা। চমৎকার গাইছেন কণ্ঠশিল্পী নোলক।  
সাড়ে সাতটায় পিতাকে নিয়ে মুনিরা হাজির। ঠোঁটে হাসির ফুল। দেখে মনে হলো, যানজট ছাড়াও প্রচণ্ড ঠাণ্ডা ঠেলে এসেছেন। ফেব্র“য়ারি মাসের বিলেতের কনকনে বরফ পড় পড় শীত গায়ে জড়িয়ে পা রাখলেন আড্ডায়। সাদাসিধে বেশভূষার ছোটোখাটো মানুষটি স্নিগ্ধ হাসি ছড়িয়ে পরিচিত হলেন সবার সাথে। কুশল বিনিময়ের পর মুখ খুললেন কবি ময়েজ। মুনিরা পারভীনদের পরিবারের ঘনিষ্ঠজন হওয়ার গল্প বললেন তিনি। অন্তরঙ্গ বর্ণনায় উঠে আসে শিশু মুনিরার বেড়ে ওঠার কাহিনি। ছড়া কেটে ঘুম পাড়াতেন তার বাবা। বাংলার চিরাচরিত চাঁদনী রাতে শিশুকে ঘুমপাড়ানির দৃশ্য তখন সকলেরই চোখেমুখে খেলা করছিলো। সিলেট নগরীর সুবিদবাজারের লাভলী রোডের মল্লিকায় আশির দশকে থাকতেন মুনিরাদের পরিবার। একই বাসায় ভাড়া থাকতেন আহমেদ ময়েজরাও। সেই ছোট্ট শিশু মুনিরার সাথী হয়ে ওঠেন আহমেদ ময়েজ। এক ফাঁকে মুনিরা একটি ভাঁজ করা কাগজ মেলে ধরলেন ময়েজের সামনে। কাগজে মুনিরাকে উদ্দেশ করে লেখা একটি ছড়া কবিতা। ১৯৮৫ সালে মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশের রাজনৈতিক অচলায়তনকে ভেঙে সুদিন ছিনিয়ে আনার অঙ্গীকার নিয়ে লেখা। এটি সংরক্ষণ করেছেন তার বাবা। আমাদের অবাক করে মৃদু হাসলেন তিনি। তখনই আমার মনে হলো, এই ছোটোখাটো শরীরের মানুষটি আসলে অনেক বড়।  
ফরিদ আহমেদ রেজা মুনিরার বাবার পরিচয় তুলে ধরে বললেন, তাঁর সাথে পরিচয় হবিগঞ্জের ইকবাল ভিলায় ত্রিশ বছর আগে। এক বন্ধুর সাথে যাওয়া। আলাপে পরিচয় পান তিনি জ্ঞানচর্চায় ঋদ্ধ একজন মননশীল শিক্ষক। বাসার নাম ইকবাল ভিলা দেখে ফরিদ আহমদ রেজার মনে উদিত প্রশ্ন ছিলো- আপনার নাম শওকত আলী, বাসার নাম কেন ইকবাল ভিলা, নিজের কারো নাম আছে নাকি। সবিনয়ে জবাব পেলেন কবি ইকবাল তাঁর প্রিয় কবিদের একজন, তাই কবি ইকবালের নাম উতকীর্ণ করে বাসার নাম রেখেছেন ইকবাল ভিলা। আর আরবী ভাষায় সুশিক্ষিত স্বদেশী আন্দোলনে ঋদ্ধ পুরুষ তাঁর বাবা সে সময়ের ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের অবিসংবাদিত খেলাফতনেতা মওলানা মোহাম্মদ আলী ও শওকত আলী ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রতি অনুরক্ত হয়ে দুপুত্রের নাম রেখেছিলেন মোহাম্মদ আলী ও শওকত আলী। আমাদের আজকের অতিথি শওকত আলী। ব্যক্তিগত জীবনে তারা মোহাম্মদ আলী ও শওকত আলী হতে না পারলেও তাদের বাবার স্বপ্ন বৃথা যায়নি। মোহাম্মদ আলী ছিলেন দর্শনের প্রথিতযশা শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের রেজা?ে অদ্যাবধি তার রেকর্ড ভঙ্গ হয়নি। তিনি প্রকৃতপক্ষেই দু হাতে লিখতে পারতেন।  
ফরিদ আহমদ রেজা বললেন, ইংরেজী, পার্সী, উর্দু, সংস্কৃত, আরবী ও বাংলা ভাষার পণ্ডিত এই প্রাজ্ঞ ব্যক্তির সাথে সম্পর্কের আর ছেদ পড়েনি। তাঁর কাছ থেকে শেখা একটি সংস্কৃত শ্লোকের একটি পঙক্তি আওড়িয়ে বললেন তিনিই মমার্থসহ বলবেন। সেই সঙ্গে সবাই ধরলেন, অন্যদের আবৃত্তি পরে হবে, আগে শুনতে হবে তাঁর মুখ থেকে নানা গল্প, কবিতা।  
পাঠশালা থেকে শেষ বিদ্যাপীঠের পড়ালেখার ধারাবাহিক বর্ণনা এমনভাবে দিলেন যে, সন তারিখ বার সময় কিছুই বাদ পড়লো না। আর বলার সময় দাঁড়িয়ে বলার গুরুত্ব দিয়ে বললেন, সারা জীবন শিক্ষকতা করেছি, দাঁড়িয়ে বলতে অভ্যস্ত। দাাঁড়িয়ে বলতে বয়স তাকে আটকে রাখেনি। দেখতেও মনে হয়না বয়স তাকে কাবু করেছে। একজন অভিভাবক দাঁড়িয়ে কথা বলবেন, মনে হচ্ছিল বেমানান লাগবে। কিন্তু তাঁর বলার ধরণ এতই চমৎকার, যতই বলছিলেন ততই মনে হচ্ছিল নতুন কিছু শুনছি, নতুন জ্ঞানের সমৃদ্ধ নগরে প্রবেশ করছি। পারসী কবি ও দার্শনিক শেখ সাদী, রুমী, হাফিজ, ওমর খৈয়াম ও কবি ইকবালের কবিতা পার্সী ও বাংলায় আবৃত্তি করে যাচ্ছিলেন। বললেন, পার্সী কবি নবরতেœর কথা। কবি ইকবাল উর্দু ভাষী হলেও পার্সী সাহিত্যে সুনাম অর্জন করেন। নবরতেœর পরেই দশম রতœ কবি ইকবাল।  
এরপর সংস্কৃত ও বাংলা সাহিত্য থেকে কবিতা ও শ্লোক আবৃত্তি শুনে একটি অনন্য সন্ধ্যাকে ধন্যবাদ জানাতেই হলো। শুধু কবিতা কেন মীর মোশাররফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধু থেকে পাঠ, মোহাম্মদ বরকত উল্লাহ, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, গিরীশ চন্দ্র ঘোষের পার্সী কাব্যানুবাদ শোনালেন।  সব শেষে মুখস্ত বিদ্যার এলোমেলো একটি চমৎকার ফিরিস্তি শুনিয়ে হাসির রোল তুললেন। আর অবাক করলেন বাংলাদেশের একশ রেল স্টেশনের নাম চাটগায়ের নাজিরহাট থেকে ছাতকবাজার পর্যন্ত এক নিঃশ্বাসে বলে।  
তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও মেধার জোর দেখে উপস্থিত সকলেই আক্ষেপ করে বললেন, আরো আগে তাকে নিয়ে বসলে হয়তো অনেক বেশি শেখা যেতো। তাঁর প্রখর স্মৃতিশক্তির প্রশংসা করা বাতুলতা মাত্র। এক ফাঁকে সিলেট সরকারি পাইলট স্কুলে ১৯৬১ সালে কবি জসিম উদ্দিনের আগমণ ও মানপত্র তাঁর হস্তলেখায় পঠিত এবং নিজের কাছে কপি এখনো সংরক্ষিত রাখার মুগ্ধতাপূর্ণ বর্ণনা দিলেন।  
শওকত আলী বানিয়াচং উপজেলার স্বনামধন্য যাত্রাপাশা গ্রামের সন্তান। ১৯৪১ সালে জন্ম। বাবা মওলানা সানাউল্লাহ। ১৯৪৬ সালে পাঠশালা শুরু। বিদ্যালয়ের নাম ব্রজনাথ প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৬২ সালে সিলেট পাইলট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৬৪ এমসি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৬৭ সালে এমসি কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। কুমিল্লা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে ১৯৭৪ সালে বিএড, ১৯৮৫ সালে ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে এমএ ইন এডুকেশন ডিগ্রি নেন।  
চট্টগ্রাম রেলওয়ে হসপিটাল কলোনী হাইস্কুলে ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা শুরু। পরে জগন্নাথপুরের শ্রীরামসি হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষক, চুনারুঘাটের রাজারবাজার সরকারি হাইস্কুল, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমীতে শিক্ষকতা এবং সুনামগঞ্জ ও সিলেট পিটিআইয়ে সুপারিণ্টেডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৪ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর সিলেট শাহজালাল উপশহরের বেসরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত টিচার্স ট্রেনিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জালালাবাদ টিটি কলেজে ৫ বছর এবং বর্তমানে সিলেটে সীমান্তিক টিটি কলেজে অধ্যাপনায় রত আছেন।  
শওকত আলী যখন থামলেন তখন অনেকেই আর আবৃত্তি করতে আগ্রহ না দেখিয়ে আরও শুনতে চাইলেন। কিন্তু তিনি না শোনা হয়ে বললেন আবৃত্তি শুনবো। সৈয়দ রুম্মান তার পকেট থেকে ভাজ করা কাগজ বের করে সৈয়দী বৈঠক নামে কবিতা গুচ্ছ পড়লেন। একে একে আশিষ মিত্র, কাইয়ূম, দূর্জয়সহ অনেকেই কবিতা পড়লেন। সবাই তখন অপেক্ষা করছেন মুনিরার আবৃত্তির। মুনিরা শৈশবে বাবাকে জ্বালাতন করা ও বাবার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখা ও জানার গল্প বললেন ছোট্ট ভূমিকায়। মায়ের অবদানকে মূল্যায়ন করে মুনিরা সেই ছোট্টবেলা তার হাত ধরে সকালে স্কুলে, বিকেলে গান, আবৃত্তি ও নাচের স্কুলে শিশু একাডেমীতে নিয়ে ছুটে যাওয়ারও গল্প বললেন। এরপর সবার অনুরুদ্ধ হয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কেউ কথা রাখেনি কবিতাখানি অপূর্ব মমতা দিয়ে আবৃত্তি করলেন। মুগ্ধ সময় যাপনের পাশাপাশি মাঝে মাঝে চলছিলো চানাচুর, বিস্কুট, মিষ্টি ও সিঙ্গারার সদ্ব্যবহার। সবশেষে আহমেদ ময়েজ একটি আধ্যাত্মিক গানের কয়েকটি কলি গলা ছেড়ে গাইলেন। গানের রেশ শেষে একটি আনন্দঘন আড্ডার গন্ধ গায়ে মেখে বেরুতেই শীতের তীব্রতা হলো সকলের সঙ্গী। সবাই ছুটলেন নিজ নিজ ঘরে।