Share |

ফিরে দেখা : দ্য টেস্টিমনি অব সিক্সটি

শামীম রেজা
 ’৭১ এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় এবং শরণার্থী পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, তা বিশ্ববাসির কাছে তুলে ধরতে অক্সফাম-ইউকে ষাটজন বিশিষ্ট জনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা একত্রিত করে প্রকাশ করেছিল ‘দ্য টেস্টিমনি অব সিক্সটি’। একই বছর অক্টোবরে সংকলনটি মার্কিন কংগ্রেসের রেকর্ডেও অন্তর্ভূক্ত হয়। প্রায় ৪৫ বছর পরও প্রভাবশালী এ দলিলটি আজও আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা, রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, মানবাধিকার ও ত্রাণকর্মী এবং সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক অসাধারণ অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই প্রামাণ্য দলিলে যাঁরা লিখেছিলেন, তাঁরা স্বাধীনতা যুদ্ধে লিপ্ত একটি জাতির নারী-পুরুষেরা যে সর্বাত“ক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছেন তা প্রত্যক্ষ করেছেন। মুক্তিকামী মানুষের দুর্দশা ছিল বর্ণনার অতীত। ষাটজনের সাক্ষ্যে সেই মানবিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতার চিত্র ফুটে উঠেছে। এই অসামান্য দলিল বাংলাদেশের সংগ্রামী মানুষের কণ্ঠ তুলে ধরেছে। তাদের বক্তব্যের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। একটি বিয়োগান্তক সময়ের সাক্ষী হয়ে আছে ওই ষাটটি বর্ণনা।  
ষাটজন লেখকের অনেকেই তাঁদের সময়কালে খ্যাতিমান ছিলেন। অনেকে পরবর্তী সময়ে নিজ নিজ পেশায় তাঁদের অবদানের জন্য সুপরিচিত হয়েছেন। বর্ণনাকারীদের মধ্যে মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি এবং মাদার তেরেসা বিশ্বে পরিচিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা জগতে পরিচিত ছিলেন এমন সাংবাদিকদের অনেকে তাঁদের চাক্ষুষ বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন। সংবাদকর্মীর চোখ দিয়ে যাঁরা এই অসাধারণ দলিলে তাদের সাক্ষ্য তুলে ধরেছেন, তাদের মধ্যে মাইকেল ব্রানসন (আইটিএন), ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ (ডেইলি টেলিগ্রাফ), ক্লদ মুস (রেডিও সুইস), ফ্রেডরিক নসাল (টরনটো টেলিগ্রাফ), জন পিলজার (ডেইলি মিরর), নিকোলাস টমালিন (সানডে টাইমস) প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। এছাড়া যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং ভারতের বিভিন্ন সংস্থার অভিজ্ঞ ত্রাণকর্মী এবং উন্নয়কর্মীরা ‘দ্য টেস্টিমনি অব সিক্সটি’র জন্য লিখেছিলেন।
অক্সফাম-ইউকে’র তৎকালীন পরিচালক এইজ লেসলি কার্কলি, সিবিই স্বাক্ষরিত (২১ অক্টোবর ১৯৭১, অক্সফোর্ড) এই প্রামাণ্য দলিলে সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি শরণার্থী শিবিরগুলোতে তাঁর সফরের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ‘মোজাইক অব মিজারি’-তে। তাঁর ভাষায়, ‘পূর্ব পাকিস্তানের বিয়োগান্তক পরিস্থিতি কেবল পাকিস্তানের বিপর্যয় নয়। এটা কেবল ভারতের জন্য বিপর্যয় নয়। এই মর্মন্তুদ পরিস্থিতি সারা বিশ্বের জন্য বিপর্যয়ের। বিশ্ব সম্প্রদায়ের দায়িত্ব হবে একসাথে এই সংকট মোকাবেলা করা।’ দ্য মিশনারিজ অব চ্যারিটি-র মাদার তেরেসা তাঁর স্বাক্ষরিত সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে বাংলার, ভারতের এবং ভিয়েতনামের বিপর্যস্ত মানুষের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘তারা যেখানেই থাকুক, তারা ঈশ্বরের সন্তান। তারা একই হাতের সৃষ্টি।’ একটি প্রত্যক্ষদর্শী বর্ণনা লিখতে বলায় জেরা? স্কার্ফ বলেছিলেন, আমি ‘লেখার মানুষ নই’। লেখার বদলে তিনি এই প্রামাণ্য দলিলের জন্য কিছু অসাধারণ কিছু ড্রইং করে দিয়েছিলেন। ওইসব ড্রইংয়ে শরণার্থী বাঙালিদের নিদারুণ কষ্টের চিত্র ফুটে উঠেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় বাঙময় হয়ে ওঠা ষাটজনের স্বাক্ষ্য যুদ্ধরত একটি দেশের সাধারণ মানুষ এবং লক্ষ লক্ষ শরণার্থীদের বিভীষিকাময় পরিস্থিতিকে উন্মুক্ত করে। এইসব বর্ণনা তাড়িত, গৃহহীন এবং মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া মানুষের ইতিহাস। ‘দ্য টেস্টিমনি অব সিক্সটি’ কেবলমাত্র বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের উপর পকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী এবং সামরিক জান্তার শোষণ ও নির্মমতার ইতিহাস নয়; আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যারা এই নৃশংসতা ও  মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়ে অবগত ছিলেন না, তাদের বিবেক জাগ্রত করেছিল। বিশ্ব মোড়ল এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে কেবল সাহায্যের আবেদন নয়; এই প্রমাণ্য দলিল বিশ্ব মানবতার কাছে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে অকুণ্ঠ সমর্থনের দাবি তুলেছিল। স্বাধীনতার জন্য একটি জাতির মহৎ ত্যাগ স্বীকারের ইতিহাস মানবতাবাদী মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত রাখতে ‘দ্য টেস্টিমনি অব সিক্সটি’ এক অনন্য সাধারণ অনুঘটক হয়ে থাকবে। লণ্ডন, ২০ মার্চ ২০১৬
লেখক : শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে ইউনির্ভাসিটি অব লন্ডনে গবেষণারত।