Share |

বর্ণবৈষম্যের ব্রিটেন : মুখোশ খুলে দিলো সরকারী নিরীক্ষা

সংখ্যালঘুদের প্রতি নানা ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও পরিসেবা খাতের আচরণের চিত্র তুলে ধরে প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। ‘রেসিয়াল ডিজপেয়ারিটি অডিট’ নামের এই নিরীক্ষায় বেরিয়ে এসেছে কল্যাণরাষ্ট্র ব্রিটেনের জন্য কিছু ‘বিব্রতকর সত্য’। বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্রিটেনের বর্ণবৈষম্যের ওপর অতীতে নানা রিপোর্টে এসব চিত্র তুলে ধরা হলেও প্রধানমন্ত্রীর কমিশনকৃত এই রিপোর্টে যা খোলাসা হয়েছে তা নজীরবিহীন। নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থেরেসা মে গত বছর আগস্টে ব্রিটেনের বর্ণগত ও অর্থ-সামাজিক বৈষম্যের চিত্র পেতে একটি নিরীক্ষার (অডিট) নির্দেশ দেন। নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেছিলেন, এই নিরীক্ষার ফলাফল ব্রিটিশ সমাজে বিদ্যমান অবিচারের ক্ষেত্রগুলোতে আলো ফেলবে। রিপোর্ট প্রকাশের পর সেই আলোতে দেখা গেলো, প্রাগ্রসর ব্রিটেনের রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রেই অন্ধকারের চর্চা চলছে। বর্তমান গণতান্ত্রিক বিশ্বে সংখ্যালঘুদের প্রতি অন্যায্য আচরণ এবং বৈষম্য ‘অগ্রহণযোগ্য‘ বিবেচিত হলেও খোদ ব্রিটেনে এর এমন জোরালো উপস্থিতি ইমিগ্রেন্ট কমিউনিটির জন্য দু:সংবাদ বৈ কিছু নয়।  
শুধু সংখ্যালঘু কমিউনিটির মানুষজনই নয়, শ্বেতাঙ্গ মেহনতি শ্রেণীর সাথে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পরিসেবা যেমন, এনএইচএস, স্কুল, পুলিশ এবং আদালত কেমন আচরণ করে থাকে তা পর্যবেক্ষণের তাগিদও ছিলো এই নিরীক্ষায়। গত ১০ অক্টোবর প্রকাশিত নিরীক্ষায় আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় দেখা গেছে, সংখ্যালঘু কমিউনিটির (বাংলাদেশি, পাকিস্তানী ও কৃষ্ণাঙ্গ) মানুষের বাস দরিদ্র এলাকাগুলোতে। এশিয়ান পরিবারের প্রতি ৪ শিশুর ১জন দরিদ্র এবং তার এই দারিদ্র স্থায়ী। অথচ শ্বেতাঙ্গ পরিবারের ক্ষেত্রে এ হিসাব প্রতি ১০ জনে মাত্র ১জন। এশিয়ান আর কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারে দারিদ্র বেশি আর তা স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি।  
পড়ালেখায় উন্নতি এবং অপেক্ষাকৃত ভালো অর্জনের পরও চাকুরী লাভের ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুদের অবস্থান শ্বেতাঙ্গদের অনেক পেছনে। বাংলাদেশি, পাকিস্তানী ও কৃষ্ণাঙ্গরা প্রতি ১০ জনে ১জন বেকার। পক্ষান্তরে শ্বেতাঙ্গদের বেলায় এই চিত্র প্রতি ২৫ জনে ১জন। একইভাবে বাসাবাড়ির মালিকানা থেকে শুরু করে ওভারক্রাউডিং  কিংবা তাদের সাথে পুলিশের আচরণের চিত্রেও বর্ণবৈষম্যেও প্রকট চিত্র ওঠে এসেছে এই নিরীক্ষায়। সবচেয়ে ভয়ানক হলো, বিচার ব্যবস্থায়ও সংখ্যালঘুদের দীর্ঘ দণ্ডপ্রাপ্তির চিত্র। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ ইউনিটের এই নিরীক্ষায় সরকারী চাকরি ক্ষেত্রেও ব্যাপক বৈষম্যের চিত্র কারো জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। এনএইচএসের ১৮% কর্মী সংখ্যালঘু কমিউনিটির হলেও মাত্র ৭% উচ্চপদের কর্মকর্তা কিংবা ১১% সিনিয়র ম্যানেজার পদে রয়েছেন।  
ব্রিটেনে নিয়োগের ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ কিংবা এনিয়ে নানা সংস্থার রিপোর্ট নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু এবারের সাথে সেগুলোর পার্থক্য হচ্ছে- সরকারের সর্বোচ্চ কার্যালয় প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে এই নিরীক্ষা প্রকাশ করে তা স্বীকার করে নেওয়া হলো।  বিগত কয়েক দশক ধরে ব্রিটিশ সমাজে সংখ্যালঘুদের আনুপাতিক হার বাড়লেও তাদের প্রতি বৈষম্য কমেনি। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অবদানের কথা মুখে বলা হলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নেই। বর্ণবৈষম্যের এই রিপোর্ট প্রকাশের পর প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এ থেকে আমাদের সমাজ, সরকার এবং সরকারী প্রতিষ্ঠানের লুকোবার সুযোগ নেই।
আমরা মনে করি, সাম্য আর ন্যায্যতার দাবীদার রাষ্ট্র ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দেশটির যে চিত্র বেরিয়ে এসেছে তা দূর করতে তিনি সক্রিয় হবেন। তা না হলে সমালোচকরা যে বলছেন -সরকার কোন ব্যাপারে যখন কিছুই করতে চায় না তখনই এধরনের কিছু একটা করে বেড়ায় কিংবা সংখ্যালঘুদের ভোট টানতে থেরেসা মে-র এই সহানুভূতি প্রদর্শন- তা-ই সত্যি হয়ে দেখা দেবে। আমাদের প্রত্যাশা এই নিরীক্ষা ব্রিবতকর হলেও তা ব্রিটেনের ইমিগ্রেন্টদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের অবসানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।