Share |

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো যুক্তরাজ্য

আনসার আহমেদ উল্লাহ
 ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যশোর রোড ধরে লাখ লাখ বাঙালি শরণার্থী আশ্রয়ের খোঁজে কলকাতা পাড়ি দিচ্ছিলেন। হাজারো মৃত্যু আর ধ্বংসযজ্ঞ মাড়িয়ে অসহায় বাঙালির ছুটে চলার দৃশ্যকে এভাবেই কবিতার ভাষায় তুলে ধরেছিলেন মার্কিন কবি অ্যালান গিন্সবার্গ।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল তৎকালীন পূর্ব বাংলার ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সেই লড়াইয়ের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বের দেশে দেশে। বহুভাষায়, বহুভাবে দেশে দেশে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় উঠেছিলো। বাংলার মুক্তিকামী মানুষের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন তাঁরা। সাহায্য নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন আক্রান্ত বাঙালিদের পাশে। অনেকে যুদ্ধের ময়দানে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছিলেন স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের সাথে কাঁধে কাঁধ রেখে। বাংলাদেশিদের পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখা সেইসব বীরদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি, ফ্রান্সের দার্শনিক আঁদ্রে মার্লো, ওস্তাদ রবি শংকর, বাংলাদেশের পক্ষে কনসার্টের আয়োজন করা শিল্পী জর্জ হ্যারিসন, ব্রিটিশ সাংবাদিক সায়মন ড্রিং, এন্থোনি মাস্কারেনহাস ও মার্ক টালি, পশ্চিমবঙ্গের জ্যোতি বসু, যুক্তরাষ্ট্রের কবি অ্যালান গিন্সবার্গ, ব্রিটিশ এমপি জন স্টোনহাউস, ব্রুস ডগলাস ম্যান, মাইকেল বার্ন্স, পিটার শোর ও লর্ড ইনাল্স, পল এবং ইউকে অ্যাকশন বাংলাদেশের এলেন কনেট, জার্মান কবি গুন্টার গ্রাস, সাবেক সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পোডগরনি এবং অবশ্যই ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, যিনি বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতে অক্লান্ত চেষ্টা করেছেন। আমাদের বিদেশি এসব বন্ধুদের অনেককে সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদানের জন্য বিশেষ সম্মাননা দিয়েছে।  
বাটা কোম্পানির ডাইরেক্টর অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক ডব্লিউ অ্যা ওয়ান্ডারল্যান্ডের স্মৃতি অনেকের মনে থাকার কথা। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করেছিলেন। ওয়ান্ডারল্যান্ড বাটা’র টঙ্গি শাখার বাঙালি কর্মীদের নিয়ে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। তারা মুক্তিযুদ্ধকালীন সেক্টর ১ ও ২ এ গেরিলা যুদ্ধ চালান। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে ওয়ান্ডারল্যান্ডকে তাঁর অবদানের জন্য বীর প্রতীক পদকে ভূষিত করা হয়েছিলো। জাপানেও মানুষ মুক্তিকামী বাঙালির পক্ষে স্বরব হয়েছিলেন। প্রফেসর সুইয়োসি নারার নেতৃত্বে জাপান বেঙ্গল ফ্রেন্ডশিপ এসোসিয়েশন এবং প্রফেসর সেটসুরেই সুরুৎসিমার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সলিডারিটি ফ্রন্ট নামে দুটি সংগঠন আক্রান্ত বাঙালিদের পক্ষে মানুষকে সচেতন করে তুলতে জোর প্রচারে লিপ্ত হয়। প্রফেসর নারা বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘কেন গণহত্যার ন্যায় নির্বিচারে এমন মানুষ নিধন চলছে? পাকিস্তানী সরকারী বাহিনী কর্তৃক বাঙালিদের ওপর এমন জঘণ্য গণহত্যার আমরা তীব্র নিন্দা জানাই। এমন হত্যাযজ্ঞ থামাতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে বিশ্ব বিবেক জাগ্রত হওয়ার জন্য প্রার্থনা করছি’।  
এই ব্রিটেনে বাঙালি-অবাঙালি অনেকে বাংলাদেশের মানুষের ওপর হত্যাযজ্ঞের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁরা বাঙালিদের পক্ষে সমর্থন আদায়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সাথে লবিং করেছেন। ১৯৭১ সালে ব্রিটেনে বাঙালিরা সংখ্যায় বেশি ছিলো না। তবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঙালি লন্ডন, লুটন, বার্মিংহাম এবং ম্যানচেষ্টারে বসবাস করতেন। তাদের কর্ম ও বসবাস ছিলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পাকিস্তানীদের পাশে। সেই সময় বাঙালিরা এই বিদেশের মাটিতে পাকিস্তানীদের কাছ থেকে কত যে ঘৃণার শিকার হতেন, সেই অভিজ্ঞতা অনেকের কথায় উঠে এসেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ব্রিটেনে বাঙালি এবং পাকিস্তানীদের মধ্যে মারামারির ঘটনাও ঘটেছে।  সেই সময়ের এক স্কুল ছাত্র বললেন, ‘পাকিস্তানীরা আমাদের সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করতো। তাদের ভাবখানা এমন ছিলো- যেন তারা রাজা আর আমরা তাদের কৃতদাস। তারা ভাবতো তারাই কেবল ভাল, তারা শিক্ষত এবং তারাই ভাল মুসলমান। আর মনে করতো- বাঙালিরা কৃতদাসের জাতি এবং ভাল মুসলমান নয়। আমরা তাদের প্রতি সম্মান দিয়ে কথা বললেও পাকিস্তানীরা আমাদের সাথে কথা বলার সময় মোটেই সম্মান দিতো না’।   
অন্য এক বাঙালি যিনি লুটন শহরে খুব সক্রিয় ছিলেন, তিনি বলেন, প্রথমদিকে পাকিস্তানীদের সাথে আমাদের সম্পর্ক মোটামুটি ভাল ছিল। কিন্তু যেই যুদ্ধ শুরু হলো- তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত খারাপ হয়ে গেল। আমরা তাদের প্রতি খুব বিরক্ত এবং ক্ষুব্ধ ছিলাম। যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে পাকিস্তানীরা রাস্তায় পেলে আমাদের আক্রমণ করতো। এক পর্যায়ে আমরা এর প্রতিবাদ শুরু করি। আমরা দলবদ্ধ হয়ে চলাফেরা করতাম এবং তাদের পা?া আঘাত শুরু করি।  
১৯৭১ সালের আগ থেকেই ব্রিটেনে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা রাজনীতিতে বেশ সক্রিয় ছিলো। কেননা স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পেশ করা ৬ দফা দাবিকে ব্রিটেনের বাঙালিরাও সমর্থন করতেন। ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানকে বন্দী করা হলে তাঁর মুক্তির দাবিতে আন্দোলন হয় এই ব্রিটেনেও। রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ বন্দী অন্যান্যদের মুক্ত করে আনতে এখানকার বাঙালিরা ইংলিশ আইনজীবী স্যার থমাস উইলিয়ামস কিউসিকে পাঠিয়েছিলেন।  
পাকিস্তানী বাহিনীর নৃশংসতা তুলে ধরে বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন ব্রিটেনের বাঙালিরা। তখনকার বাঙালি নারীরাও এতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ব্রিটিশ সরকারের সাথে লবিং করা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পাক বাহিনীর নৃশংসতার বিষয়ে জাগিয়ে তোলা এবং মুক্তিবাহিনী ও শরণার্থীদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা- সবই করেছেন ব্রিটেনের বাঙারিরা। এসব কাজে নেতৃত্ব দেয়া উল্লেখযোগ্য সংগঠনগুলোর মধ্যে ছিলো স্টুডেন্ট অ্যাকশন কমিটি, বাংলাদেশ উইমেন্স এসোসিয়েশন, রিজিওনাল অ্যাকশন কমিটি, ব্রিটিশ মানবাধিকার কর্মীদের নেতৃত্বে গঠিত অ্যাকশন বাংলাদেশ এবং আওয়ামী লীগের যুক্তরাজ্য শাখা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সমর্থন আদায়ে  বাংলাদেশ উইমেন্স এসোসিয়েশনের আনোয়ারা জাহান ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপিদের কাছে চিঠি দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ এমপি মাইকেল বার্ন্স ও জন স্টোনহাউসের সাথে তাঁর অত্যন্ত সুসম্পর্ক ছিল। আনোয়ারা জাহান লেবার পার্টি এবং কনজারভেটিভ পার্টির দলীয় সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দলগুলোর কর্মী ও এমপিদের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়ে সমর্থন আদায় এবং পাকিস্তানীদের নৃশংসতা ও গণহত্যার বিরুদ্ধে সচেতন করে তুলতে প্রচার চালান। বাঙালিদের ওপর নৃশংসতার চিত্র তুলে ধরে তিনি বাংলাদেশ উইমেন্স এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র প্রধানদের কাছেও চিঠি লিখেন।   
এই সংগঠনের আরেক বলিষ্ঠ নারী ছিলেন কুলসুম উল্লাহ। তিনি মুক্তিবাহিনী ও শরণার্থীদের জন্য তহবিল সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এক সাক্ষাতকারে কুলসুম উল্লাহ বলেন, ‘সাধারণত রোববারে আমরা র‌্যালির আয়োজন করতাম এবং এটা অনেকটা নিয়মিতভাবেই হতো। যুদ্ধের পুরো নয় মাস আমি আমার সন্তান ও পরিবারকে দূরে ঠেলে সংগ্রামের কাজে ব্যস্ত ছিলাম। ব্রিটেনের বাংলাদেশের পক্ষে অনুষ্ঠিত বৃহত্তম সমাবেশে আমরা সর্বাধিক সংখ্যক নারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করেছিলাম। আমি একাই প্রায় ১৫০ জন নারীকে নিয়ে ওই সমাবেশে যাই। বলা যায়, সবগুলো র‌্যালিগুলোতেই ব্রিটেনের বিভিন্ন শহর থেকে মানুষ এসে জমায়েত হতো। বিশেষ করে বামিংহাম, ম্যানচেষ্টার, ব্রিস্টল এবং লীডসসহ ইংল্যান্ডের শহরগুলো থেকে বেশি মানুষ আসতো’।
 বলা হয় যে, তখন বাঙালিরা তাদের সাপ্তাহিক আয়ের সমস্ত অর্থ তারা বাংলাদেশের জন্য দান করে দিতেন। এ ক্ষেত্রে একটি ঘটনা অবশ্য বিশেষভাবে উল্লেখ করার মত। বামিংহামের বদরুন্নেসা পাশা তাঁর বিয়ের সমস্ত গয়না ও উপহার মুক্তিযুদ্ধের জন্য দান করে দিয়েছিলেন। এখানে বলে নেয়া যায়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে চলমান তৎপরতাকে সমন্বয় করার জন্য ১৯৭১ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ স্টিয়ারিং কমিটি নামে সংগঠন করা হয়। ওই কমিটির অ্যাকাউটেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মোহাম্মদ ইসরাইল। তাঁর লিপিবদ্ধ করা হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশের জন্য এই ব্রিটেনে সর্বমোট চার লাখ ছয় হাজার ৮৫৬ পাউন্ড তহবিল সংগৃহীত হয়েছিলো। বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরী পরে সেই অর্থ নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে দিয়েছিলেন।
বদরুন্নেসা পাশা ছিলেন বার্মিংহাম স্টিয়ারিং কমিটির মেম্বার। বাংলাদেশে স্বাধীনতা আন্দোলনের একনিষ্ঠ নেত্রী বলা যেতে পারে এই নারীকে। বার্মিংহামের স্মলহিথ পার্কে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে বদরুন্নেসা পাশা বাঙালির মুক্তির পক্ষে এক আগুনঝরা বক্তব্য দিয়েছিলেন। বার্মিংহামের ওই পার্কটিতেই বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল।  
বদরুন্নেসা পাশার মতে, ব্রিটেনে অনেক লোক বাংলাদেশে গিয়ে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত ছিলেন। তিনি বলেন, পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে তুমুল লড়াই যখন শুরু হলো, তখন আমরা সমাবেশ আয়োজনের পাশাপাশি স্বেচ্ছায় যুদ্ধে যেতে আগ্রহী এমন যুবকদের রিক্রুট করতে একটি ক্যাম্প করলাম। বার্মিংহামে অনেক তরুণ-যুবকদের পেলাম যারা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে এবং মুক্তিবাহিনীর পক্ষে সরাসরি যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। বাছাই ও নিয়োগের জন্য রীতিমত লাইন পড়ে যেতো। এদের মধ্যে এক ইংলিশ বারম্যান এসে বললেন, আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে চাই। এটা ছিল আমাদের জন্য খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। আমরা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না- একজন শ্বেতাঙ্গ লোক বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করার কথা বলতে পারে। যুদ্ধের ওই সময়টাতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার ছিলো ব্রিটেনের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গদের সমর্থন। বিশেষ করে এ দেশের রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক, আইনজীবী এবং সাংবাদিকরা একে একে বাঙালিদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই সময়ে ওয়েস্ট লন্ডনের ব্রেন্টফোর্ড অ্যান্ড চিসউইক আসনের লেবার দলীয় এমপি ছিলেন মাইকেল বার্ন্স। তিনি যুদ্ধের মধ্যেই বাংলাদেশ ভ্রমণ করেন।
ওই যুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তান ক্রিকেট টিমের ইংল্যান্ডে খেলতে আসার কথা ছিলো। মাইকেল বার্ন্স মনে করলেন, পাকিস্তানকে এমন সুযোগ দেয়া হবে চরম অন্যায়। তিনি পাকিস্তান দলের ইংল্যান্ড ভ্রমণ বন্ধ করতে পার্লামেন্টে মোশন আনলেন। পার্লামেন্টে দেয়া বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান বাংলাদেশে নৃশংসতা চালাচ্ছে, তাদের ক্রিকেট দলকে ইংল্যান্ডে এসে খেলতে দেয়া কোনোভাবেই উচিত হবে না’। এ সময় তিনি বাংলাদেশে গণ্যহত্যার কিছু ছবি পার্লামেন্টে তুলে ধরেন।  
আরেক ব্রিটিশ কূটনীতিক মিস্টার মাইলসের কথা না বললেই নয়। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ভারতের কলকাতায় ব্রিটিশ ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মিস্টার মাইলস বলেছেন, কীভাবে তিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন দিয়েছিলেন। কলকাতায় লাখ লাখ শরণার্থীর দুর্ভোগের সাক্ষী ছিলেন মিস্টার মাইলস। ব্রিটিশ ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে তিনি কলকাতার বিভিন্ন শরাণার্থী ক্যাম্প ভিজিট করেন। পাক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ আর নৃশংসতা থেকে বাঁচতে প্রায় এক কোটি বাঙালি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। মিস্টার মাইলস ১৯৭৮ এবং ১৯৭৯ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ব্রিটেনের বাঙালি কমিউনিটির ভূমিকা, শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের অবদান কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে ব্রিটেনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনাবলির বিস্তারিত তুলে ধরে কোনো ইতিহাস এখনো রচিত হয়নি। তবে মুজিব নগর সরকারের বিশেষ দূত বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরী, লেখক আব্দুল মতিন, কমিউনিটি হিস্টোরিয়ান ইউসুফ চৌধুরী, স্টিয়ারিং কমিটির শেখ আব্দুল মান্নান এবং বাংলাদেশ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাঙালিদের অবদানের ইতিহাস রচনায় কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ হাই কমিশন এবং কিছু স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল, ফারুক আহমদসহ কয়েকজন গবেষক তাদের প্রকাশনায় প্রবাসীদের অবদানের কথা স্বীকার করেছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রবাসীদের সম্মাননাও দেয়া হয়েছে। সেন্ট্রাল লন্ডন ডেভেলাপমেন্ট ট্রাস্ট নামে একটি সংগঠন- দ্য লিগেসি অব উইমেন্স কন্ট্রিবিউশন ইন ১৯৭১- নামে একটি বই প্রকাশ করেছে। এতে ১৭ জন নারীর যুদ্ধকালীন স্মৃতি ও অবদানের কথা তুলে ধরা হয়েছে।  
ব্রিটেনভিত্তিক সংগঠন স্বাধীনতা ট্রাস্ট ২০০৫ সালে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে একটি প্রকল্প শুরু করে। ওরাল হিস্ট্রি প্রজেক্ট নামে ওই প্রকল্পের মাধ্যমে মুক্তযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এমন ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য রেকর্ড করা হয়। এতে মুক্তিযুদ্ধের সচিত্র স্মৃতি, কমিউনিটির সম্পৃক্ততা, বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের ভূমিকার কথা উঠে আসছে। উঠে আসছে একেবারে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাও। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণে এটি নিসন্দেহে একটি ভাল উদ্যোগ। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে যে আন্দোলন এই ব্রিটেনে হয়েছে তার সম্পূর্ণটা আমরা আজো জানি না। এই ইতিহাসের অনেক তথ্যই এখনো উদঘাটনের বাকী রয়ে গেছে।
 লণ্ডন, ২০ মার্চ ২০১৬
লেখক : সাংবাদিক