Share |

বার্লিনে তিন দিন

মতিউর রহমান চৌধুরী
শেষ পর্ব
আজ সোমবার, সাপ্তাহিক কাজের প্রথম দিন। জার্মান তথা বার্লিনের রাস্তাগুলো ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। ইউরোপের কাজের দিনগুলোর ব্যস্ততা সবাইকে মুগ্ধ করে। সকাল সাতটার আগ থেকেই মানুষ কাজে যাবার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। দুদিনের বিশ্রাম কাটিয়ে সবাই ঝাপিয়ে পড়ে দেশ গড়ার কাজে। মামার সাথে নিজেও তাঁর অফিস তথা বার্লিন বাংলাদেশ এ্যাম্বেসিতে যাবো। রুটিন হলো এরকম, বার্লিনের বাংলাদেশ এ্যাম্বেসি দেখে আবার আজও কোথাও বেরিয়ে পড়বো। সকালের নাস্তা সেরে যথারীতি আমরা রওয়ানা দেই বাংলাদেশ এ্যাম্বেসির দিকে। যদিও রাস্তায় হাজার হাজার গাড়ী কিন্তু কোথাও কোন যানজট নেই। মানুষ রাস্তায় বের হওয়ার আগেই রাস্তাগুলোকে পরিষ্কার করা হয়েছে যতœ করে। কোথাও কোন দুর্গন্ধ বা মলিনতা নেই। অসংখ্য গাছাগাছালি ও পার্কের ছড়াছড়ি চতুর্দিকে। যেদিকে চোখ যায় সবদিকেই গাছ আর গাছ। গাছ, বাগান আর পার্ক প্রিয় জার্মানবাসী। বলা হয়ে থাকে, জার্মানে প্রায় ত্রিশ ভাগ বনভূমি। সে কারণেই যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই গাছের সারি চোখে পড়বে। এছাড়া আছে মিউনিসিপ্যালিটির শহরকে সুন্দর করে সাজানোর তৎপরতা। বিদ্যুৎ বা টেলিফোনের খুঁটিতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে তাজা ফুল। ওগুলো দেখলে যে কারো চোখ জুড়াবে।

আমরা প্রায় ত্রিশ চল্লিশ মিনিটের ড্রাইভে পৌঁছে গেলাম বার্লিনের বাংলাদেশ এ্যাম্বেসিতে। শহরের ব্যস্ততম এলাকার একটি ট্রেড বিল্ডিং এর পুরো একটি ফ্লোর এবং অন্য আরেক ফ্লোরের কিছু অংশ ভাড়া নিয়ে চলছে বার্লিন বাংলাদেশ এ্যাম্বেসির কার্যক্রম। এরই মাঝে অফিসে এসে প্রায় সবাই কাজে ব্যস্ত হয়েছেন। এ্যাম্বেসেডর ছুটিতে আছেন। মামা অফিসের অন্য কর্মকর্তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বাংলাদেশের স্বার্থকে কিভাবে বিদেশে তুলে ধরা যায় বা বাড়ানো যায় সেজন্য সবাই নিরলসভাবে কাজ করছেন।  

আজ আমার বের হওয়ার কথা সেলডনের সাথে। সেলডন হলেন এ্যাম্বেসির ড্রাইভার যিনি মামার গাড়ী চালান। অরিজিনেলি তিনি কানাডিয়ান। ২০০০ হাজার সাল থেকে তিনি জার্মানীতে বসবাস করছেন। তার স্ত্রী জার্মান। তিনি কানাডাতে আর্ট পড়তে গিয়েছিলেন। সে সূত্রেই ওখানে সেলডনের সাথে পরিচয় ও পরিণয়। বর্তমানে তার স্ত্রী বার্লিনের ন্যাশনাল মিউজিয়ামে চাকরি করেন। তারা শহর থেকে খুব দুরে নয়, কাছেই বসবাস করেন। সুন্দর গোছানো জীবন, এখনও কোন সন্তানাদি নেই। সেলডনের সাথে বের হয়ে আরও একটি ভাল সুযোগ হলো জার্মান সম্পর্কে জানার। তবে আগে সেলডন সম্পর্কে কিছু তথ্য দিয়ে দেই। তিনি হলেন একজন আধুনিক মানুষ। সবাইকে আপন করে নিতে ভালবাসেন। জানালেন, বাংলাদেশ এ্যাম্বেসিতে তার কাজ হয়েছে প্রায় তিন মাস হলো। এরই মাঝে তিনি সবার সাথে একটা সম্পর্ক গড়ে তুলে নিয়েছেন। তিনি প্রধানত কমার্শিয়েল কাউন্সিলারের গাড়ী চালান। কমার্শিয়েল কাউন্সিলার বদলি হয়ে যাচ্ছেন শুনে তিনি আছেন মহা চিন্তায়। নতুন বস কেমন হবেন বা তার সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারবেন কিনা সেজন্য তিনি কিছুটা চিন্তিত। কানাডা ও বার্লিনের মানুষের আচার আচরণ এমনকি তাদের সরকার সম্পর্কেও তিনি ধারনা রাখেন। জানালেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানীকে গড়ে তুলেছে মূলত তুর্কী জনগণ। প্রায় ৭০ বছরের কাছাকাছি এসেও জার্মানরা তুর্কীদের এখনও পুরোপুরি গ্রহণ করেনি। প্রধানত জার্মানের তিনটি এলাকায় তার্কিশরা বসবাস করে। বার্লিন, কোলোন ও হ্যামবার্গে তাদের প্রধান আবাস। কথা প্রসঙ্গে তিনি জানালেন, এদেশে বাস করতে হলে প্রচুর আয় করতে হয়। একজন মানুষের সাধারণভাবে থাকা খাওয়ার জন্য প্রতি মাসে কম করে হলেও এক হাজার ইউরো আয় করা লাগবে। মনে হয়, জার্মানরা ইমিগ্র্যান্ট তথা অন্য দেশের মানুষদের যেনো অপছন্দ করে। কিন্তু কানাডা সব মানুষকে আপন করে নেয়, তাকে কানাডিয়ানের মতোই সুযোগ সুবিধা দেয়, হেয় করে না। আর তাই বিদেশীরা কানাডিয়ানদের মতোই সমাজে মিশে যেতে পারে। কানাডাতে প্রায় ২০% ইমিগ্র্যান্ট আছেন। কিন্তু তারা আছেন কানাডিয়ানদের মতো, তাদের প্রতি কোন বৈষম্য করা হয়না। তুর্কীরা ছাড়াও জার্মানীতে রাশিয়া ও পোল্যান্ডের লোক বাস করে। ইউরোপের অন্য দেশের লোকরা এখানে কাজ করতে আসে। তার ভাষায়, প্রায় পনের বছরের কাছাকাছি আমি এ দেশে আছি, আমার মনে হয়েছে এরা মানুষকে কাছে টানে না, দূরে সরিয়ে দেয়।

সুঠাম দেহের অধিকারি সেলডন অত্যন্ত স্বজ্জন ও ভদ্র মানুষ। কমর্শিয়েল কাউন্সিলারের আত্মীয় হিসাবে আমার যাতেকরে কোন অসুবিধা না হয় সেজন্য তিনি সজাগ। যাত্রাপথেই দুজনে এক তার্কিশ রেস্টুরেন্টে সুস্বাদু খাবার খেলাম। তিনি জানালেন, ১৯৮৯ সালে জার্মান ওয়ালের পতনের পর এক রাতেই পূর্ব জার্মান থেকে প্রায় ৫ মিলিয়ন মানুষ পশ্চিম জার্মানে ঢুকেছে। আজ ২৫ বছর পর পঞ্চাশোর্ধ পূর্ব জার্মান লোকেরা তাদের দেশকে তথা এলাকাকে মিস করছে। রাজনীতির যাতাকলে বার্লিন ওয়ালের সৃষ্্িট না হলে দুজার্মান তৈরি হতো না এবং মানুষগুলোর এ টানাপোড়েন হতো না। আমাদের গাড়ী এ্যাম্বেসী পাড়ার দিকে মোড় নিয়েছে। দেখলাম এখানে সব দেশের এ্যাম্বেসীর অফিস কাছাকাছি অবস্থিত। আছে জাপান, ইটালি, সৌদি আরাবিয়া, ডেনমার্ক, চীন, রাশিয়ার এ্যাম্বোসিগুলো কাছাকাছি।

১৯৪৫ সালে পশ্চিম ও পূর্ব জার্মান ভাগ হওয়ার পর বিরাট এলাকা ছিল ‘নো ম্যান্স ল্যান্ড’। বর্তমানে ওখানেই গড়ে উঠছে জার্মানের আধুনিক স্থাপনাগুলো। ওখানেই গড়ে উঠছে জার্মানীর শিল্প নগরী। কাছেই আছে সিম্বলিক ট্রাফিক লাইট। সেলডন জানালেন, প্রায় দেড়শ বছর আগে জার্মানরাই প্রথম ট্রাফিক লাইটের প্রচলন করে। সে কারণে প্রতীক হিসাবে ঐ পুরনো ট্রাফিক লাইট তারা রেখে দিয়েছে। তাছাড়া জার্মানদের তৈরি মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ, আউডি, পোর্শে ইত্যাদি পৃথিবী বিখ্যাত ব্র্যাণ্ডের গাড়ীগুলো তাদের আধিপত্যের জানান দিচ্ছে। সেলডন জানালেন, বার্লিনে প্রায় চার মিলিয়ন লোক বাস করে। কাছেই আমরা ন্যাশনাল মিউজিয়াম ও ন্যাশনাল লাইব্রেরি দেখতে গেলাম। স্ট্রীট ১৭ রাস্তা দেখতে গেলাম। বার্লিনবাসীর গর্ব এ রাস্তা। দেশের বিভিন্ন ইভেন্টে জার্মানরা এখানে সমবেত হয়। গত বিশ্বকাপের খেলা দেখা ও বিজয়ের আনন্দ ভাগ করতে প্রায় দুই মিলিয়ন জার্মান স্ট্রীট ১৭-এ ভিড় করেছিল।

১৮১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হামবো? ইউনিভার্সিটিতে আমরা ঢু মারি। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর মিলন মেলা এ বিশ্ববিদ্যালয়। ইউরোপ তথা পৃথিবীর অন্যতম সেরা এ বিশ্ববিদ্যালয়। এখান থেকেই ২৯ জন নোবেল প্রাইজ বিজয়ী বের হয়ে আসেন। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার যেখান থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন এবং পরবর্তীতে যেখানে তিনি আত্মহত্যা করেন সে ব্যাংকার আমরা দেখতে যাই। হিটলারের ইতিহাসাকে জার্মানরা এখন আর ঐভাবে তুলে আনে না। এ ব্যাপারে সবসময় একটা লুকানো ভাব লক্ষ্য করা যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযদ্ধের পরই কো? ওয়ারের সূচনা। এ যুদ্ধের কারণেই বিভিন্ন দেশের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। পৃথিবী কমিউনিস্ট ও পুঁজিবাদে বিভক্ত হয়। ১৯৯০ সালে কমিউনিজমের পতনে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদের একচ্ছত্র আধিপত্য। কয়েক ঘন্টা সেলডনের সাথে বাইরে বেড়ানোর পর আবার এ্যাম্বেসীতে ফিরে আসি। আজই আবার লন্ডনে ফিরবো। মামা সেলডনকে বিদায় দিয়ে দিলেন। উনার সাথে বাসায় এসে খাওয়া-দাওয়ার পর মামাই আমাকে নিয়ে সনেফে? এয়ারপোর্টের দিকে রওয়ানা দেন। ইমিগ্র্যাশন সেরে মামা-মামীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বিমানের দিকে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো মাত্র তিনদিনেই বার্লিনের অনেক স্মৃতি নিয়ে ফিরছি।

লেখক : সাংবাদিক, সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রদায়ক।

লন্ডন, ৫ ফেব্র“য়ারি ২০১৫