Share |

বায়ান্ন থেকে বারো : হীরক-বার্ষিকীর সন্ধানে

মাসুদ রানা
বায়ান্ন থেকে বারো : হীরক-বার্ষিকীর সন্ধানে

১৯৫২ থেকে ২০১২ - ষাট বছর। দশকের হিসেবে ছয় দশে ষাট, আর দ্বাদশ বর্ষীয় যুগ ধরলেও পাঁচ বারোয় ষাট। সময়ের পরিক্রমায় ষাট বছর একাধিক কারণে বিশেষত্ব দাবী করে। উদযাপনের ক্ষেত্রে ষাটতম বার্ষিকীকে হীরক-বার্ষিকী হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।


কেউ-কেউ ব্যক্তির ক্ষেত্রে ষাটতম ও ঘটনার ক্ষেত্রে পঁচাত্তরতম বার্ষিকীকে ‘হীরক’ আখ্যায়িত করেন। কিন্তু ইতিহাসের ঘটনা ও ব্যক্তি প্রায়শঃ অবিচ্ছেদ্য বলে ঘটনার ৬০ বছরও ‘হীরক’ হিসেবে উদযাপিত হয়। যেমন, এলিজাবেথ দ্বিতীয়ার ১৯৫২ সালের সিংহাসনারোহণ মোটেও কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়, তথাপি এ-ঘটনার হীরক-বার্ষিকী পালিত হচ্ছে ২০১২ সালে ষাট বছর পূর্তিতে।


আশ্চর্য্যরে বিষয়, ২০১২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী বাঙালীর ভাষা-শহীদ দিবসের ৬০তম বার্ষিকী হওয়া সত্ত্বেও এর জন বিশেষ কোনো আয়োজন নেই - অন্ততঃ আমার চোখে পড়েনি। ভাবলামঃ তবে কি আমার চোখ এড়িয়ে গেছে? নিশ্চিত হবার জন্য ফৌনে কথা বললাম লন্ডনের সাপ্তাহিক সুরমার সম্পাদক সৈয়দ মনসুর উদ্দীন ও সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক এমাদ চৌধুরীর সাথে। তাঁরাও বললেন, একুশের ষাট বছর উপলক্ষ্যে হীরক বার্ষিকী কিংবা বিশেষ কোনো আয়োজনের কথা শুনেননি।  
মনসুর বললেন, একুশের ষাট বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে বৃহৎ আয়োজনের প্রয়োজন ছিলো, কিন্তু না, কিছুই হচ্ছে না। এমাদ জানালেন, একুশের ষাট বছর উপলক্ষ্যে বিশেষ কিছু হয়নি বা হচ্ছে না, তবে গত বছর স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসের ৪০তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষ্যে অনেক বড়ো-বড়ো আয়োজন, নতুন-নতুন উপাধি ও পুরষ্কার-দান, ইত্যাদি করা হয়েছে।  বাংলাদেশে একুশের ষাটতম বার্ষিকীর আয়োজন সম্পর্কে জানার জন্য বাংলা একাডেমীর ওয়েবসাইট খুঁজলাম। পেলাম www.banglaacademy.org.bd, যা বাংলা একাডেমীর ‘অফিশিয়্যাল ওয়েবসাইট’। সাইটটিতে প্রবেশের সাথে সাথেই ভারী ধাক্কা খেলাম একটি হালকা প্রেমের গান সাইটটির পশ্চাৎপটে গীত হচ্ছে শুনে। ভাবলাম, গান যদি দিতেই হয়, তাহলে উচিত ছিলো একুশের গান দেয়া। কিন্তু নানা রকম গান বেজেই চলছে, ব্যক্তি প্রেম থেকে শুরু করে ঈশ্বরপ্রেম পর্যন্ত, বিবিধ।


‘হীরক’ প্রত্যাশায় বাংলা একাডেমীর সমগ্র ওয়েবসাইট তন্ন-তন্ন করে খুঁজলাম। প্রথমেই চোখে পড়লো সেখানে ‘খোঁজা’র বদলে লেখা হয়েছে ‘খোজা’। এক দিকে কৌতুক অন্য দিকে দুঃখ অনুভব করলামঃ বাংলা একাডেমী যাঁরা চালান, তারা কি ‘খোঁজা’ ও ‘খোজা’ শব্দ দুটোর পার্থক্য বুঝেন না?  
বাংলা একাডেমীকে এ-বেলায় কে শেখাবে যে, ‘খোজা’ অর্থ নপুংসক? মুঘল বাদশাহদের হেরেমে কাজ করার জন্য পুরুষদের যৌনকর্মে অক্ষম করে রাজকীয় নারীদের ‘সতীত্ব’ রক্ষার প্রয়োজনে ‘খোজা’ তৈরী করা হতো। কিন্তু এ-যুগে বাংলা একাডেমীতে ‘খোজা’ থাকার কথা নয়। আসলে অজ্ঞতার কারণে কিংবা অযত্নের কারণে ‘খোঁজা’র স্থলে লেখা হয়েছে ‘খোজা’।  আরও লক্ষ্য করলাম, ওয়েবসাইটের শীর্ষে লেখা ‘বাংলা একাডেমী’, আর বাঁয়ে বিভাগীয় তালিকায় লেখা ‘বাংলা একাডেমি’। বুঝলাম, ‘একাডেমি’ না ‘একাডেমী’ সেটি নিশ্চিত হতে পারেনি সংস্থাটি।  প্রচুর বানান-ত্রুটি চোখে পড়লো। ‘পাণ্ডুলিপি’র স্থলে লেখা হয়েছে ‘পান্ডুলিপি’। অর্থাৎ ‘ণ’ ও ‘ন’র পার্থক্য বিষয়ে নির্বিকার বাংলা একাডেমী। ‘পথিকৃৎ’ না লিখে লেখা হয়েছে ‘পথিকৃত’। স্পষ্টতঃ ‘কৃৎ’ ও ‘কৃত’ একাকার হয়ে গিয়েছে।


‘একুশের গ্রন্থমেলা’ বিভাগে ঢুকে দেখতে পেলাম একটি ‘লগো’, যেখানে লেখা আছে ‘অমর একুশের ৬০ বছর ১৯৫২-২০১২’। ব্যস, এতোটুকুই। এর সাথে সংযুক্ত বা সম্পর্কিত কিছু পেলাম না। তবে ভয়ঙ্কর অনুভূতি নিয়ে পড়লাম ‘এবারের গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত টপ ২০ লেখক এর নাম ও বইয়ের সংখ্যা’। তার উপরের শিরোনামেও লেখা ‘টপ ২০’। বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো বাংলা ভাষার বিকাশ ও প্রসারের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বকালে। আজ এই প্রতিষ্ঠানটি এমনই এক স্তরে পৌঁছেছে যে, বাংলার উন্নতি ও প্রসার তো দূরের কথা, সে বাংলায় ‘শীর্ষ ২০’ লেখার বদলে ইংরেজি ট্র্যান্সলিটারেশনে ‘টপ ২০’ লিখে নিজের চরম দৈন্যতা প্রকাশ করছে।  
আরও লক্ষ্য করলাম, পুরুষদের নামের আগে নির্বিচারে ‘জনাব’ যুক্ত করে দেয়া হয়েছে। যেমন, ২০০৯ সালের সাহিত্য পুরষ্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে দুটো নাম উল্লেখযোগ্যঃ ‘জনাব অরম্নণাভ সরকার’ ও ‘জনাব সুশামত্ম মজুমদার’। নাম দুটোর বানান ভুল সম্ভবতঃ মুদ্রণ-ত্রুটি। ধারণা করি, নাম দুটি হবে অরুনাভ সরকার ও সুশান্ত মজুমদার। কিন্তু নির্বিচার ‘জনাব’-এর সংযুক্তিটি একটি নীতিগত প্রয়াস বলেই মনে হয়েছে। সম্ভবতঃ ভারতে নির্বিচারে ‘শ্রী’র বাংলাদেশী সংস্করণ হচ্ছে ‘জনাব’। তবে সুখের বিষয় যে, বাংলা একাডেমী ‘জনাব রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর’ লিখেনি।


বাংলা অভিধানে ‘ফেলো’ শব্দের অর্থ ‘বিদ্বৎসমিতির বিশিষ্ট সভ্য’। তা সত্ত্বেও বাংলা একাডেমীর ওয়েবসাইটে ‘ফেলোগণ’ নামে একটি বিভাগ দেখলাম। সেখানে গিয়ে বজ্রাহত হলাম বিশিষ্ট নারীদের নামের আগেও ‘জনাব’ যুক্ত করা হয়েছে। এ-রকম কয়েকটি নামের মধ্যে রয়েছেঃ ‘জনাব নুরুন্নেসা খাতুন বিদ্যাবিনোদিনী’, ‘জনাব ফিরোজা বেগম’, ‘জনাব রওশন আরা বাচ্চু’, ‘জনাব ফেরদৌসী মজুমদার’। আমার ভয় হচ্ছিলো কোথায় না চোখে পড়ে ‘জনাব শেখ হাসিনা’ কিংবা ‘জনাব খালেদা জিয়া’।
এখানে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, বাংলা একাডেমীর ওয়েবসাইটের অধিকাংশ বিভাগই শূন্য। অবশ্য, ‘প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো’ বিভাগে গিয়ে দেখলাম ‘প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো’ কথাটাই ১২ বার লেখা রয়েছে।  উপরে যে-বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরষ্কার ২০০৯-এর কথা উল্লেখ করেছি, সে-পাতাতে যদিও লেখা আছে যে পুরষ্কার প্রতি  বছরই দেয়া হয়, কিন্তু ২০০৯ এর পর বিভাগটির আর হালনাগাদ করা হয়নি। যদিও এ-বছরের গ্রন্থমেলা উদ্বোধন সম্পর্কে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি রয়েছে ওয়েবসাইটটিতে, কিন্তু ভাষা আন্দোলনের কিংবা সালাম-বরকত-রফিক-জব্বারের আত্মত্যাগের ষাট বছর উদযাপনের বিশেষ আয়োজনের কথা কোথাও কিছু নেই।
সর্বশেষে যেটি চোখে পড়ার মতো, তা হচ্ছে বাংলা একাডেমীর দাবী ‘বাংলা একাডেমী বাঙালি জাতিসত্তার প্রতিক’। বলা বাহুল্য, সেখানে খোদ ‘প্রতিক’ বানানটিও ভুল। সত্যিই কি বাংলা একাডেমী বাঙালী জাতিসত্তার প্রতীক? এতো অযতœ, অজ্ঞতা ও অদক্ষতার পরও এই বাগাড়ম্বর? শুরু করেছিলাম একুশের হীরক বার্ষিকীতে মহা-আয়োজন অনুসন্ধান করে। আমার প্রত্যাশা ছিলো, ষাটতম বার্ষিকীকে একটি মাহেন্দ্রক্ষণ বিবেচনা করে বাংলাদেশ কোনো একটি নতুন মাত্রা যোগ করবে বাংলা ভাষার বিকাশের পথে। কিন্তু যা দেখলাম, তাতে হতাশ হলাম। হীরকের খোঁজে গিয়ে ভষ্মে পতিত হলাম।


যে-বাংলাদেশের স্বাধীন রাজনৈতিক অভ্যূদয়কে বাংলাভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে রাজনীতিকেরা উচ্চকণ্ঠে বর্ণনা করেন, সেখানেই বাংলাভাষা আজ চরম অবহেলিত। বাংলা একাডেমীর ওয়েবসাইটে তার ছায়া পড়েছে মাত্র। ক’দিন আগে ইউকেবেঙ্গলিতে প্রকাশিত ‘অন্তিম অন্ধকারঃ যার অন্ন জোটে বর্ণমালা ব্যবহার করে, সে-ই জানে না বর্ণমালা বলে কাকে’ শিরোনামের একটি লেখায় দেখিয়েছি, বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতে সর্বপ্রধান বলে দাবীদার ‘প্রথম আলো’ ভাষাজ্ঞানে কি রকম দারিদ্র-পীড়িত। বর্ণমালা কাকে বলে সে-বোধটি পর্যন্ত নেই পত্রিকাটির। পত্রিকাটি লিখেছে, ‘চাকমা বর্ণমালা প্রধানত ৩৩টি’; বার-বার লিখেছে ‘বর্ণমালাগুলো’, যা ইঙ্গিত দেয় মুদ্রণ ত্রুটি নয় বলে।  
 যেখানে একটি বর্ণমালার থাকে একাধিক অংশগ্রহণকারী ভাষা (যেমন, রৌমান বর্ণমালার আছে ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, জার্মান ইত্যাদি, কিংবা বাংলা বর্ণমালার আছে বাংলা, অসমিয়া, ত্রিপুরী, ইত্যাদি), সেখানে কীভাবে চাকমা ভাষার একারই থাকে ৩৩টি বর্ণমালা? পরে বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম যে, ‘বর্ণ’ ও ‘বর্ণমালার’ মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারেনি প্রথম আলো। ‘প্রথম আলো’ কিংবা ‘বাংলা একাডেমী’র হাস্যকর বাংলা, যা তাদের ভাষাগত দারিদ্রের প্রতিফলন, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আজ স্বাধীন বাংলাদেশের উচ্চ ও মধ্যবিত্তরা বাংলাভাষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তাদের শ্রেণীগত অবস্থানই আজ এমন যে, তারা বাংলার মধ্যে তাদের উন্নয়নের কোনো আলো দেখতে পায় না।


১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানী অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক আমলে মুষ্টিমেয় যে ক’টি বাঙালী উচ্চবিত্ত পরিবার ছিলো, তারা শাসক চক্রের অংশে পরিণতি হবার প্রত্যাশায় বাংলাভাষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলো। তাদের আরাধ্য ভাষা ছিলো ইংরেজি ও উর্দূ।  কিন্তু বিকাশ প্রত্যাশী বাঙালী মধ্যবিত্তের বাংলা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিলো না। তাই বাংলাকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিলো তার বঞ্চনার অনুভূতি, আবেগ ও জাত্যাভিমান। সে-কারণেই সে সৃষ্টি করতে পেরেছিলো ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং এরই ধারাবাহিকতায় শেষ পরিণতি হিসেবে সে পেয়েছে একটি পূর্ণ স্বাধীন দেশ, যা এখন ভোগ করার জন্য তার সামনে নিষ্কন্টক উন্মুক্ত।
 অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক আমলের মধ্যবিত্তরা স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলো। সে-সময় শক্তি সঞ্চয়ের প্রয়োজনে সে সাড়ে-সাত কোটি প্রান্তিক মানুষের কাছে মুক্তি ও সাম্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখিয়েছিলো। কিন্তু স্বাধীনতার পর নেতৃত্বদানকারী মধ্যবিত্ত শ্রেণী  নিজের দেয়া প্রতিশ্রুতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে অবারিত লুণ্ঠনের মাধ্যেম উচ্চবিত্তে পরিণত হয়েছে। তারাই আজ শতো-শতো ও হাজার-হাজার কোটি টাকার মালিক। দরিদ্র শ্রেণীর সস্তা শ্রম কিনে তার ফল বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি করে তারা আজ ‘আন্তর্জাতিক’ হয়ে উঠেছে। তাই, বাংলা আর তাদের কাছে আবেদন হারিয়েছে। কারণ বাংলা আজ তার স্বার্থ মেটাতে পারছে না। আজ তাদেরই নেতৃত্বে বাংলাদেশে চলছে বাংলার চরম দুর্দিন। অধুনা উচ্চবিত্ত-তো বটেই, তাদের উচ্ছিষ্ট-ভোগী মধ্যবিত্ত থেকে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণী পর্যন্ত আজ ইংরেজির পেছনে ছুটছে। তাদের প্রায় কেউই আর নিজ সন্তানদের বাংলায় পড়াতে চায় না। জাতীয় পাঠ্যসূচিও নাকি এখন ইংরেজিতে পড়াবার ও পড়ার ব্যবস্থা হয়েছে।
সর্ব-বিবেচনায় বাংলাদেশে বাংলাভাষা তার প্রকৃত মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। ‘দুঃখিনী বর্ণমালা’ এখনও দুঃখিনীই রয়ে গিয়েছে। ভূগোলে স্বাধীন হলেও বাংলাদেশ কার্য্যতঃ সাংস্কৃতিকভাবে পরাধীন, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পরাধীন। রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করেছে বাঙালী বুদ্ধিজীবীরা ‘প্রজাতান্ত্রিক’ হিসেবে। ‘রাজা’ ছাড়া ‘প্রজা’ হয় না বলে, আমরা দেখি দেশটিতে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে একাধিক রাজপরিবার। সমগ্র জাতি তাদের প্রজা হয়ে এক অদ্ভূত ‘প্রজাতন্ত্র’ গড়ে তুলেছে খণ্ডিত বাংলার একাংশে। জনগণের জনতন্ত্র এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রটি কার্য্যতঃ রাজতান্ত্রিক। বিকট শ্রেণী-বিভক্ত বাংলাদেশের উচ্চবিত্ত শাসক শ্রেণী সমগ্র জাতির উপর চাপিয়ে দিয়েছে এক মৃত্যুদায়ী পরাধীনতা।  এহেন বাংলাদেশে একুশে ফেব্রুয়ারী এলেই শুরু হয়ে যায় লোক দেখানো বাংলা-প্রীতি। যাঁরা দেখান এবং যাঁরা দেখেন, তাঁরা সবাই মনে-মনে জানেন, বাংলা শেখার চেয়ে ইংরেজি শেখা অনেক গৌরবের, বাংলা বলার চেয়ে ইংরেজি বলা অনেক সম্মানের। তাই, ফেব্রুয়ারীর তিন সপ্তাহের বাংলা-প্রীতি ২২শে ফেব্রুয়ারীতেই সমাপ্ত হয় যায়।


 আজ স্পষ্টতঃ বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের কাছে বাংলা ভাষার পক্ষে সমর্থনদায়ী কোনো সমন্বিত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তত্ত্ব নেই। আর যতোক্ষণ না পর্যন্ত এ-রকম তত্ত্বের সৃষ্টি হবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশে ও বাঙালীর কাছে বাংলাভাষা বাস্তবে অনাদরে অবহেলিত হয়েই থাকবে।  বিপরীতে, যাঁরা বাংলার প্রতিষ্ঠা ও মর্যাদা চান, তাঁদেরকে তাঁদের প্রত্যাশার পরিপূরক বাংলাভাষার পক্ষে একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত তত্ত্ব গড়ে তুলতে হবে। আর এই তত্ত্ব গড়ে উঠতে পারে একমাত্র বাস্তব প্রয়োজন বোধ থেকে। প্রশ্ন হচ্ছে, বাঙালী কি বাংলার মাথায় হীরক-মুকুট পরিয়ে তাকে আপন মর্যাদায় বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়? এই বোধ জাগিয়ে তোলাও বুদ্ধিজীবীদের কাজ।


 আমি পুনঃপুন লিখছি, পৃথিবীতে বাঙালী হচ্ছে দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষাজনজাতি, ইংরেজিতে যাকে ‘এথনোলিঙ্গুয়িস্টিক গ্রুপ’ বলা হয়। চীনা হান্দের পরই বাঙালীর স্থান। ভাষা হিসেবে বাংলাকে এখন ৬ষ্ঠ ধরা হয়। কিন্তু ১৯৯৯ সালে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ‘এথনোলগ’ বাংলাকে ৪র্থ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিলো। চাইনিজ ম্যান্ডারিন এখনও ১ম, স্পেনিশ ২য়, ইংরেজি ৩য়, হিন্দি ও আরবিকে ৪র্থ ও ৫ম স্থানে আগু-পিছু করে দেখানো হয়।  সরল পরিসংখ্যানে এটি স্পষ্টঃ স্প্যানিশ, ইংরেজি, আরবী ও হিন্দি ভাষাভাষীদের মধ্যে রয়েছে একাধিক জনজাতি। ইউরোপীয় স্প্যানিশ ভাষী ও লাতিন আমেরিকার স্প্যানিশ ভাষী এক জনজাতির নয়। একই কথা প্রযোজ্য ইংরেজী, আরবি ও হিন্দির বেলায়। সুতরাং চাইনিজ ম্যান্ডারিনের পর-পরই আসে বাংলাভাষা, যার ব্যবহারীরা কেন্দ্রীভূতরূপে জনজাতিগত পরিচয়ে বাঙালী।
প্রসঙ্গক্রমে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে,  ২০০৪ সালে চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবসহ বেশ কয়েকটি সংগঠনের পক্ষ থেকে আমি জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানের কাছে যুক্তি ও পরিসংখ্যান তুলে ধরে দাবী করেছিলাম- বাংলাকে সংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেবার জন্য।  
আমার চিঠির অনুলিপি পাঠিয়েছিলাম বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপায়ী, পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টচার্য্য, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার এবং আমাদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের কাছে। চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার করে উত্তর এসেছিলো মহাসচিব কফি আনান ও প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের কাছ থেকে। কফি আনানের পক্ষ থেকে করণীয় সম্পর্কে পরামর্শও দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারত থেকে প্রাপ্তি স্বীকার-করা কোনো উত্তরও পাইনি, যদি পরবর্তীতে লন্ডনের কৃতিত্ব ঢাকাতে ছিনতাই করা হয়েছে (সৌভাগ্যবশতঃ আমার কাছে কফি আনান ও টনি ব্লেয়ারের পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠি দুটো এখনও সংরক্ষিত আছে)। আজকের এই বিশ্বায়নের যুগে কোনো ভাষাই তার বৈশ্বিক আবেদন ছাড়া আপন ঘরে টিকতে পারবে না। একটি জাতির ভাষার বিষয়টি তার অর্থনৈতিক, কৃৎকৌশলিক, সামরিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক ক্ষমতার দ্বারা অবয়বপ্রাপ্ত। আবার, একটি জাতির অর্থনৈতিক, কৃৎকৌশলিক, সামরিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক ক্ষমতার প্রকাশও ভাষার দ্বারা বাহিত। এখানে একটি দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক বিরাজমান।
বাঙালীকে টিকে থাকতে হলে তাকে আপন পরিচয়ে সুসংহত হয়ে বিশ্ববোধে উজ্জীবিত হতে হবে এবং তার বিশাল জনশক্তির উপর নির্ভর করে বিশ্ব পরিসরে অবস্থান শক্তিশালী করতে হবে। এই শক্তি হতে হবে অর্থনৈতিক, কৃৎকৌশলিক, সামরিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক ক্ষেত্রে।  বাঙালীর এগিয়ে যার পথে যেটি প্রথম পদক্ষেপ তা হচ্ছে তার আত্মপরিচয়গত সংহতি, যার কেন্দ্র রয়েছে বাংলা ভাষা। তার দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে- তার বিশাল জনসংখ্যাকে জড়িয়ে একটি আত্মমর্যাদা-বোধ-সম্পন্ন, সৃষ্টিশীল, শক্তিমান ও তেজস্বী জাতির আত্মবোধ তৈরী করে বিশ্বে তার স্থান স্থান নিরূপণ করে গন্তব্য স্থির করা।
ইংরেজিতে যাকে আইডেন্টিটি ও ডেস্টিনী বলা হয় বাঙালীর জন্য বাংলায় সেই ‘আত্মপরিচয়’ ও ‘বৈশ্বিক গন্তব্য’ নির্ধারণ করাই আজকের দিনের একুশের চেতনায় করণীয় কর্তব্য। বাঙালীর ভাষা-শহীদ দিবসের হীরক বার্ষিকীতে এই বোধই হোক উজ্জ্বল হীরক খণ্ড ।

লেখক : শিক্ষক, সংস্কৃতি কর্মী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব
বুধবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০১২