Share |

বড় স্বপ্ন নিয়ে লন্ডন থেকে ফিরছেন ওলিজা মনোয়ার

নজরুল ইসলাম বাসন
আমরা যারা ৫০ এর দশকের শেষ দিকে জন্ম নিয়েছি পূর্ব-পাকিস্তানে এবং৬০-৭০এর দশকে বেড়ে উঠেছি আমাদের বিনোদনের একমাত্র  মাধ্যম ছিল চলচ্চিত্র বা সিনেমা। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর ইন্ডিয়ান সিনেমা পূর্ব-পাকিস্তানে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। তখন শুরু হয় পাকিস্তানী উর্দু ছবি ও গানের আগ্রাসন। বাংলা সিনেমার তখন দুর্দশা আর দুর্ভিক্ষ।
এই সময় ঢাকার পরিচালক সালাউদ্দিন নির্মান করলেন কালজয়ী চলচ্চিত্র রুপবান। ঐ ছবিতে সুজাতার অনবদ্য অভিনয় তাকে রুপবান কন্যার স্বীকৃতি দিয়েছিল। সেই থেকে শুরু হয় বাংলা সিনেমার জয়জয়াকার। এরপর একে একে নির্মিত হল নবাব সিরাজদৌলা, সাত ভাই চম্পা, এত টুকু আশা, কাঞ্চনমালা। আজিম-সুজাতা, রাজ্জাক-কবরী-সুচন্দা, শাবানা, ববিতা-জাফর ইকবাল হয়ে উঠেছিলেন বাংলা ছবির পর্দা কাঁপানো হিরো-হিরোইন। জীবন থেকে নেয়া ছবিটি আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের একটি মাইলস্টোন। মুক্তিযুদ্ধের পর হিট হল রঙবাজ, শুরু হল অন্য ধারার ছবি। এরপর অনেক বছর পর বেদের মেয়ে জোছনা এবং কেয়ামত থেকে কেয়ামত এর নায়ক সালমান শাহ উঠে আসেন বাংলা ফিল্মে। পাশাপাশি আরেকটি নতুনধারা নিয়ে উঠে আসেন অভিনেতা-নায়ক-পরিচালক প্রযোজক মনোয়ার হোসেন ডিপজল। ডিভিডি-সিডি আর পাইরেট ফিল্মে মগ্ন হওয়া দর্শকদের সিনেমা হলে ফিরিয়ে আনেন মনোয়ার হোসেন ডিপজল। নায়ক ডিপজলকে নিয়ে আরও অনেক কথা বলা যায় তবে আমার আজকের লেখা মনোয়ার হোসেন ডিপজলকে নিয়ে নয়। আজকের লেখা তার একমাত্র কন্যা ওলিজা মনোয়ারকে নিয়ে।
ওলিজা মনোয়ার লন্ডনের ব্রুনেল ইউনিভার্সিটিতে ডিগ্রি করতে এসেছিলেন। গ্রাজুয়েশনের এর ফাঁকে ফাঁকে মেকআপ আর্টের উপর লেখাপড়া করে নিজেকে একজন দক্ষ মেকআপ আর্টিস্ট হিসাবে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। লন্ডনের রেডব্রীজ কলেজে সহকারি শিক্ষক হিসাবে পাঠদান করেছেন মেকআপ আর্টের কোর্সে। ইতোমধ্যে তিনি বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানের ফ্যাশন শো ও ছবিতে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। এরমধ্যে ‘সামান্থাস চয়েস’ নামে একটি শর্টফিল্ম কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে।
ওলিজা মনোয়ারে একটি সংক্ষিপ্ত ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম। এলবি২৪ অনলাইন টেলিভিশনে আমার উপস্থাপনায় কথোপকথন অনুষ্ঠানে তার সাথে অনেক কথা হল বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম নিয়ে। চটপটে এবং শিক্ষিত তরুনী ওলিজা অকপটে বল্লেন, বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনার দেশ। আমার বাবার প্রজন্ম যে কাজ করে গেছেন তা মাথায় রেখে আমাদেরকে নতুন প্রযুক্তি ও মেধা দিয়ে আরো সৃজনশীল কাজ করতে হবে এজন্যে আমাদের আরো অধ্যয়ন ও প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই।  আমার সৌভাগ্য যে, আমি লন্ডনে লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু দেশের অনেকের সাধ আছে সাধ্য নেই। আমি সেসব প্রতিভার স্বপ্ন যাতে মরে না যায় সেজন্যে ঢাকায় মেকাপ আর্টিস্টদের জন্যে ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করতে চাই। ওলিজা আরো বলেন, বাংলাদেশকে নিয়ে পজিটিভ চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। আমার প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের অনেক সৃজনশীল ক্ষমতা রয়েছে। আমরা ভাল সঙ্গীত, ভাল চলচ্চিত্র তখনই নির্মাণ করতে পারবো যখন আমাদের কলাকুশলীরা চলচ্চিত্র ও মিডিয়াকে পেশা হিসাবে নেয়ার জন্যে অধ্যয়ন ও প্রশিক্ষণ নেবেন। আর তখনই তারা ভাল পারিশ্রমিক পাওয়ার মত চাকুরি পাবেন বলে আমি মনে করি।
ওলিজা মনোয়ার ঢাকা ও লন্ডনে অধ্যয়ন ও কোর্স সম্পন্ন করে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষিত করে তুলতে চান । আমার এই লেখাটি শেষ করার আগে বলতে চাই আজ থেকে ৫-৬ দশক আগেও ঢাকায় নির্মিত ছবি জাগো হুয়া সাভেরা, সোয়ে নদীয়া জাগে পানি, চকোরি, রুপবান, বেহুলা, বেদের মেয়ে জোছনা বক্স অফিস হিট করেছে, পেয়েছে আন্তর্জাতিক পুরস্কার। বর্তমানে বাংলাদেশে ভাল মুভি-টেলিফিল্ম-নাটক ইত্যাদি নির্মিত হচ্ছে। ওলিজা মনোয়ার প্রোস্তেটিক মেকআপ বা স্পেশাল ইফেক্ট নিয়ে কাজ করতে চান। তিনি ইতোমধ্যে বিখ্যাত ফ্যাশন হাউস ভোগ ও জিকিউ-এর ফ্যাশন শো-র মডেলদের মেকাপ করে দিয়েছেন। লন্ডনের কভেন্ট গার্ডেনে আরবান ডিকে শীর্ষক ফ্যাশন শো-তে মেকাপ আর্টিস্টদের টিম লীডার হিসেবে কাজ করেছেন। এক্ষেত্রে বলা যায়, বাংলাদেশ বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে এবং এতে নেতৃত্ব দিচ্ছে দেশের তরুণ সমাজ। তারুণ্যের প্রতিনিধি ওলিজা মনোয়ার যে স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে যাচ্ছেন তার সেই স্বপ্ন পুরণ হোক এই প্রত্যাশা থাকলো।
 ২৬ শে আগস্ট ২০১৬