Share |

ভাবির বিরুদ্ধে ননদদের সংবাদ সম্মেলন : সিলেটে বাড়ি দখলের অভিযোগ

পত্রিকা রিপোর্ট  
লন্ডন, ৯ অক্টোবর : ভাবির বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন চার ননদ। ৯ অক্টোবর, সোমবার ব্রিকলেনের ক্যাফে গ্রিল রেস্টুরেন্টে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। অভিযুক্ত ভাবী এবং অভিযোগকারী ননদরা সবাই ব্রিটেন প্রবাসী।  
অভিযুক্ত নারী যুক্তরাজ্য আওয়ামী মহিলা লীগের কর্মী রাহেলা শেখ। রাহেলা শেখের শ্বশুরবাড়ি ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার বাদে দেউলী গ্রামে। তাঁর শ্বশুর মরহুম তফজ্জুল আলী। মরহুম তফজ্জুল আলীর ৮ মেয়ে আর একমাত্র পুত্র শেখ তাহির আলী। ৮ মেয়ের মধ্যে ৫ জনই লন্ডনে থাকেন। বাকী ২জন থাকেন বাংলাদেশে, ১ বোন বছর কয়েক আগে মারা গেছেন। আর অভিযুক্ত রাহেলা শেখ হলেন শেখ তাহির আলীর স্ত্রী।
মরহুম তফজ্জুল আলীর চার কন্যা সালেমা জামান, ফরিজা বেগম, হাসনা আলী ও মরিয়ম ইসলাম সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন যে, তাদের একমাত্র ভাইয়ের বউ রাহেলা শেখ তাদের পৈতৃক বাড়ি দখল করে নিয়েছেন। এই বাড়ি দখলে রাখার ষড়যন্ত্রের কৌশল হিসেবে  রাহেলা শেখ সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে স্থানীয় এমপি মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরীকে জড়িয়ে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন। তারা বলেন, পারিবারিক সম্পত্তি এককভাবে দখলে নিতে রাহেলা শেখ বিষয়টিকে রাজনৈতিক রূপ দেয়ার চেষ্টা করছেন।   
প্রসঙ্গত, গত ৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লন্ডন সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে রাহেলা শেখ তার বাড়ি দখলের অভিযোগ এনে নালিশ করেছেন। এখন ননদরা রাহেলা শেখের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে বাড়ি দখলের পালটা অভিযোগ তুললেন।   
একই দিন রাহেলা শেখের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ তুলে সিলেট প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন বাংলাদেশে অবস্থানরত তাঁর অপর দুই ননদ মাহমুদা খানম ও হামিদা বেগম।  
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, তাদের পৈতৃক বাড়ি দখল করেছেন তাদের আপন ভাইয়ের স্ত্রী রাহেলা শেখ। তাদের নিজ পৈতৃক ভিটায় যেতে দিচ্ছেন না রাহেলা শেখ। পৈতৃক ভিটায় গেলে তিনি তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরসহ নানা ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি দিচ্ছেন।  
সোমবার সংবাদ সম্মেলনে ৪ বোন তাদের ভাবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে রাহেলা শেখ যে অভিযোগ করেছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তিনি অভিযোগের মাধ্যমে ফায়দা হাসিলের উদ্দেশে কাল্পনিক বক্তব্য দিয়েছেন। এ বিষয়ে সিলেট-৩ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরীকে জড়িত করার হীন অপচেষ্টা করেছেন। এ বিষয়ে সংবাদ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় জনমনে নানা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। আমরা রাহেলা শেখের উত্থাপিত মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ এবং তার অনৈতিক কর্মকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।  
সংবাদ সম্মেলনে পঠিত লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, তাদের পিতা মরহুম তফজ্জুল আলীর জীবদ্দশাতেই ফেঞ্চুগঞ্জের বাদে দেউলী গ্রামের পৈত্রিক বসতবাড়িটি তাদের বোনদের কাছে সাফকাবালা দলিল করে বিক্রি করেন। পাঁচ বোনের পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ফরিজা বেগমের ছেলে মো: সামাদ মিয়া। এতে বলা হয়, আমাদের পিতা মরহুম হাজী তফজ্জুল আলী যুক্তরাজ্য প্রবাসী হওয়ায় তিনি তার একমাত্র পুত্রের নামে লন্ডনে একটি বাড়ি ক্রয় করেন। পরবর্তীতে আমাদের ভাই বাংলাদেশে গিয়ে আমাদের একই উপজেলার রাজনপুর গ্রামের বাসিন্দা মহিউদ্দিন খান উরফে জড়ি খানের কন্যা রাহেলাকে বিয়ে করে যুক্তরাজ্যে আনেন। তারা আমাদের পিতার ক্রয়কৃত বাড়িতেই বসবাস করতে থাকেন। এর কিছুদিন পর সেটেলমেন্ট ভিসায় আমাদের মা ও ৪ বোনকে আমাদের পিতা যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসেন এবং ঐ বাড়িতেই তুলেন। কিন্তু আমাদের ভ্রাতৃবধু আমার মা বোনদেরকে সাদরে গ্রহণ করেননি। এক রাতে স্ত্রীর প্ররোচণায় আমাদের ভাই শেখ আবু তাহির, আমাদের বাবা-মা ও বোনদেরকে ঐ বাসা থেকে বের করে দেন। আমাদের ৪ বোনকে নিয়ে মা-বাবা প্রায় এক বছর আমাদের এক আত্মীয়ের বাসায় আশ্রিত হিসেবে বসবাস করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে আমাদের ভাই ও ভাবী আমাদের বাবা-মায়ের সাথে কোন সম্পর্ক রাখেননি। আমার ৫ বোন বিভিন্ন চাকুরী-বাকুরী করে আমাদের পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের ব্যয় বহন করি। দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে আমাদের ঐ ৫ বোনের দেয়া অর্থেই আমাদের বাবা গ্রামের বাড়ি বাদে দেউলী গ্রামে একটি ঘর নির্মাণ করেন।
লিখিত বক্তব্যে আরো বলা হয়, আমাদের পিতা বৃদ্ধ বয়সে বাংলাদেশে চলে যান এবং আমাদের নিজ বাড়ি বাদে দেউলী গ্রামে বসবাস করেন। তার জীবদ্দশাতেই তিনি আমাদের বোনদের পাওনা মেটাতে আমাদের মূল বাড়ির ৫৬ শতক ভূমি আমাদের ৬ বোনের নামে সাফকাবালা দলিল করে দেন। ফলে, আমরা নির্বিঘেœই বোনেরা পিতৃসম্পত্তি ভোগাধিকার করে আসছি। আমাদের বোনদের খরিদা ভূমি ছাড়াও আমাদের পিতার রেখে যাওয়া অপরাপর সম্পত্তি আমরা এজমালি হিসেবে ভোগদখল করে আসছি। আমাদের পিতা-মাতা কেউ-ই বর্তমানে জীবিত নেই। আমাদের মা হনুফা খাতুন প্রায় ৫ বছর আগে যুক্তরাজ্যে মারা গেলে আমরা বোনেরা আমাদের মায়ের লাশ নিয়ে দাফন করতে দেশে যাই। দেশে গেলে আমরা বোনেরা আমাদের পিতৃভিটায় আমাদের বোনদের অর্থে নির্মিত বাড়িতে বসবাস করি।
 আমরা বোনেরা পিতার নিকট থেকে সম্পাদিত সাফকাবালা দলিলমূলে ঐ বাড়ির মালিক হওয়া সত্বেও আমাদের একমাত্র ভাই দেশে গেলে ঐ বাড়িতেই থাকতেন। আমরা কখনোই তাকে বাধা প্রদান করিনি। চলতি বছরের ১০ জুলাই আমাদের ২ বোন হাছনা আলী ও রাজনা চৌধুরী আমাদের পিতা-মাতার কবর জিয়ারত ও শিরণী করার উদ্দেশ্যে গ্রামের বাড়ি বাদে দেউলী গ্রামে যান। বাদে দেউলি গ্রামে আমাদের নিজ বসত ঘরে গিয়ে আমার বোনরা দেখতে পান ঘরটি তালাবদ্ধ করা। এ সময় আমরা আমাদের বাড়ির কেয়ারটেকার মছব্বিরকে ঘর খুলে দিতে বললে সে জানায়, আমাদের ভাই শেখ আবু তাহির ঘর খুলে না দেয়ার জন্য বলেছেন। কেয়ারটেকার মছব্বির ঐ ঘরে আমাদের নিজ টাকায় কেনা আসবাবপত্র তালাবদ্ধ করে রাখে। নিরুপায় হয়ে আমাদের দুই বোন ঐ রাতে পার্শ্ববর্তী বোনের বাড়িতে রাত্রিযাপন করেন এবং পরবর্তীতে পঞ্চায়েতের মুরব্বীয়ানদের সহায়তায় আমাদের বোনেরা ঘরে প্রবেশ করেন। বাংলাদেশে অবস্থানের পুরো সময়টাই ২ বোন ঐ বাড়িতে কাটান। আমাদের বোনেরা আমাদের বসত বাড়িতে বসবাস করতে থাকলে আমাদের ভ্রাতৃবধু শেখ রাহেলার ভাই আল মারুফ খান বাদী হয়ে আমাদের ২ বোনসহ ৫ জনকে আসামী করে সিলেটের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি চুরির মামলা দায়ের করে (মামলা নং-৪৪/২০১৭)। এছাড়া, উক্ত কেয়ারটেকার মছব্বির আমাদের বিরুদ্ধে অনধিকার প্রবেশের অভিযোগ এনে ফেঞ্চুগঞ্জ থানায়ও একটি মামলা দায়ের করে (মামলা নং- ৯/৬৭, তাং-২৭/০৯/২০১৭ ইং)। দুটি মামলাই এখন তদন্তাধীন আছে। ঐ মামলাগুলোতে আমাদেরও আসামী করা হলে আমরা আদালত থেকে জামিন নিতে বাধ্য হয়েছি।
লিখিত বক্তব্যে আরো বলা হয়, এসব ঘটনার সাথে আমাদের স্থানীয় সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর কোন সংশ্লিষ্টতা না থাকা সত্বেও আমাদের ভ্রাতৃবধু রাহেলা শেখ ঘটনার গুরুত্ব বাড়াতে পরিকল্পিতভাবে মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরী এমপির নাম জড়ানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত হন। তিনি তার কথিত জায়গা দখলের কাল্পনিক অভিযোগে এমপি মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরীকে জড়িয়ে আমাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন বরাবরে অভিযোগ দিয়েছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি।  
এব্যাপারে এমপি মাহমুদ-উস-সামাদ কয়েছ চৌধুরী কয়েস দৈনিক ইনকিলাবকে সম্প্রতি দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, রাহেলা শেখের স্বামী শেখ তাহির আলী। তারা ৮ বোন, ১ভাই। পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য প্রবাসী। জায়গা জমি নিয়ে তাদের পরিবারের বিরোধ দীর্ঘদিনের। তাদের বিরোধ নিস্পত্তিতে স্থানীয় পঞ্চায়েত ভূমিকা রাখছেন। তাদের অনুরোধে আমি এ বিষয়টি মীমাংসায় উদ্যোগী হই। কেউ যদি ব্যক্তিস্বার্থে আমাকে হেয় করার চেষ্টা করে তাহলে বিষয়টি চরম দুঃখজনক। কারণ এখানে আমার বৈষয়িক কোন স্বার্থ জড়িত নয়। আমি জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে সেবার মানসিকতা নিয়ে বিরোধ নি?ত্তিতে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছি মাত্র।
মরহুম তাহির আলীর কন্যারা তাদের পৈতৃক ভিটায় যাতায়াতের অনুমতি এবং তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা তুলে নেওয়ার আহবান জানান।