Share |

ভিয়েনায় দশ ঘন্টা

মতিউর রহমান চৌধুরী
আলবেনিয়া যাবার পথে ১০ ঘন্টার অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় যাত্রাবিরতি এবং এই সুযোগে পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন শহরটি ঘুরে দেখার সুযোগ হলো। প্রায় ২ মিলিয়ন জনগণের এ নগরী পৃথিবীর প্রথম দশটি পরিচ্ছন্ন শহরের মাঝে একটি। আধুনিক নগরকে গড়ে তোলা হলেও আছে চতুর্দিকে সবুজের সমারোহ। শহরের মাঝেও সবুজকে ধরে রাখার যেন এক প্রাণান্ত চেষ্টা। এখানকার দূষণমুক্ত নির্মল বাতাসে যে কেউ আরও সতেজ হয়ে উঠবেন। অস্ট্রিয়ার জনগণও একারণে বোধহয় সুস্বাস্থ্য আর সুঠাম দেহের অধিকারী। অস্ট্রিয়ার আয়তন প্রায় ৩২ হাজার বর্গমাইল। জনসংখ্যা ৮ মিলিয়নের কিছু উপরে। পৃথিবীর ধনী রাষ্ট্রের তালিাকায় অস্ট্রিয়ার অবস্থান চতুর্দশ। বিশ্বব্যাপী রিসেশনের মাঝেও অস্ট্রিয়া তাদের অর্থনীতিকে ধরে রেখেছে। ট্যুরিজম প্রতিবছর দেশটির অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখে।
২০১১ সালের জুলাই মাসে আমরা একটি গ্রুপ বসনিয়া ভ্রমণ করেছিলাম। আমরা অনেকেই জানি যে, ১৯৯৫ সালের ১১ জুলাই বসনিয়ার গণহত্যায় ৮ হাজারের বেশী মুসলমানকে হত্যা করে গণকবর দেয়া হয় যা সেব্রেনিসকা ম্যাসাকার হিসাবে পরিচিত। এখনও প্রতিবছর ১১ জুলাই ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে কিছু লাশকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং জানাজা করে আবার কবর দেয়া হয়। এরপর থেকেই আমরা এ গ্রুপ প্রতি বছর চেষ্টা করি পৃথিবীর নতুন কোন দেশ ভ্রমণ করতে। এরই অংশ হিসাবে আমাদের ভিয়েনা হয়ে আলবেনিয়ার তিরানা যাত্রা। আমাদের গ্রুপে ছিলেন জাজ বেলায়েত হোসেইন, এলএমসি ডিরেক্টর দেলোয়ার হোসেন খান, জনমত সম্পাদক নবাব উদ্দীন, লেকচারার জামাল উদ্দীন, ব্যারিস্টার নাজির আহমেদ, দেশ সম্পাদক তাইছির মাহমুদ, ইউরোবাংলার সাবেক প্রধান সম্পাদক আব্দুল মুনিম ক্যারল, এলইএ সাবেক প্রধান শিক্ষক মুসলেহ ফারাদী।    
অস্ট্রিয়ান এয়ারলাইন্স ভিয়েনার উদ্দেশ্যে লন্ডন হিথ্রো এয়ারপোর্ট থেকে সকাল ৯টা ৫ মিনিটে ছেড়ে যাবে। তাই খুব ভোরেই আমাদের এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে হলো। পহেলা সেপ্টেম্বরের বৃহ?তিবারের সকাল হলেও দেখা গেল প্লেইন কানায় কানায় পূর্ণ। স্থানীয় সময় সকাল ১২.২৫ মিনিটে প্লেইন ভিয়েনা বিমানবন্দর স্পর্শ করলো। ভিয়েনা এটোমিক এনার্জি অফিসে কর্মরত এম এ হাশেম ভাই এয়ারপোর্টে আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন। ইমিগ্রেশন কার্যক্রম শেষে দুটি গাড়িতে করে আমাদের নিয়ে হাশেম ভাই ছুটলেন শহর অভিমুখে। পথিমধ্যে হাশেম ভাই আমাদের অস্ট্রিয়ায় বাঙালিদের অবস্থান সম্পর্কে বর্ণনা দিতে থাকলেন। তিনি জানালেন, ভিয়েনায় প্রায় ১৪% মুসলিমের বাস। পুরো অস্ট্রেয়ায় তা ৭% হবে। মুসলিম বেশীরভাগই তার্কিশ, এরপর আছে আলবেনিয়দের বাস। বর্তমানে অনেক সিরীয় ও আফগানরা আসছেন। অস্ট্রিয়ায় বাংলাদেশী প্রায় ৫ হাজারের মতো হবেন। এদের বেশীরভাগ এসেছেন ৯০‘র দশকে। অনেকেই আবার অন্যদেশ যেমন ব্রিটেনে চলে গেছেন। তিনি জানালেন, ব্রিটেন বা আমেরিকার মতো এখানে এখনও দ্বিতীয় প্রজন্ম গড়ে উঠেনি। তারা এখনও লেখাপড়া করছে। এখানে বাংলাদেশী ডিগ্রীর স্বীকৃতি অনেকটা শর্তসাপেক্ষে। ভাষা হলো জার্মান। ইউনাইটেড ন্যাশনস/এটোমিক এনার্জি অফিসে প্রায় তিন হাজার লোক কাজ করেন। কিন্তু বাঙালিদের সংখ্যা হাতেগোনা প্রায় ১৬/১৭জন হবেন। আমাদেরকে সহযোগিতা করছেন মাহেরুল হক শামীম ভাইও। তিনিও এখানকার ইউএন অফিসে কাজ করেন। অস্ট্রিয়ায় এখনও ধর্মীয় কড়াকড়ি নেই বলে তিনি জানালেন।  
ইসলামিক রিলিজিয়াস অথরিটি ইন অস্ট্রিয়া মুসলমানদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারের সাথে দেন দরবার করে। অস্ট্রিয়ায় সম্প্রতি অনেক রিফিউজি ঢুকলেও তারা সবাই জার্মান চলে গেছেন বলে তিনি জানালেন। এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি আমরা এসেছি ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এদেশের প্রথম মসজিদে নামাজ পড়তে। সৌদি আরবের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত এ মসজিদে প্রায় দেড় হাজার মানুষ এক সাথে নামাজ পড়তে পারেন।  
নামাজের পর আমরা দেখা করলাম এই ইসলামিক সেন্টার ও মসজিদের ডিরেক্টর ড. হাশেম আল মাহরো‘র সাথে। তিনি বললেন, যেকোন কাজই আমদের শান্তভাবে করা উচিত। যেকোন পদক্ষেপে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। কাজ আদায় করতে হলে মানুষের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে হবে প্রথমে। পৃথিবীর মুসলিমরা বিভিন্ন বিষয়ে এখনও সজাগ নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদেরকে সজাগ হতে হবে। আমাদেরকে প্রজ্ঞার সাথে কাজ করতে হবে।  
এরপর কেন্ট নামে তার্কিশ রেস্টুরেন্টে আমরা দুপুরের খাবার সারি। বাঙালিদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত মসজিদুল ফালাহ্্ আমরা দেখি যেখানে প্রায় ২৫০ জন মানুষ একসাথে নামাজ পড়াতে পারেন। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে প্রাথমিক ইসলামি জ্ঞান শিক্ষাও তারা দিয়ে থাকেন। ভিয়েনায় শহরের রাস্তাগুলোও অনেক বড়। গাড়ী চলাচলের জন্য শহরের ভিতরই কয়েক লেনের রাস্তা। পাশাপাশি আছে পথচারি ও সাইকেল চলাচলের লেনও।  
এরপর আমরা সরাসরি চলে আসি ভিয়েনার কালেনবার্গে, যেখান থেকে পুরো শহরকেই দেখা যায়। এ কালেনবার্গ পাহাড়ের উচ্চতা ৪৮৪ মিটার বা ১৫৮৮ ফিট। এলাকাটি ভ্রমণকারীদের খুবই প্রিয়। দেখলাম হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেছেন পাহাড় থেকে শহর দেখার জন্য। অনেক উঁচু থেকে শহর দর্শনের সৌন্দর্যই যেন আলাদা। এরপর আমরা চলে আসি রাজবাড়ী দর্শনের জন্য। শোনব্রান রাজপ্রাসাদ হলো প্রাক্তন রাজাদের গ্রীষ্মকালীন আবাসস্থল। ১৪৪১ রুমের এ প্রাসাদ এখনও স্থাপত্য শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন। শত শত বছরের পুরনো বি?িং এর দেখতে এখনও নতুন মনে লাগে। ঐতিহাসিক এই স্থান দেখতে আসা মানুষের ভিড় লেগেই আছে। ১৯৯৬ সালে প্রাসাদটি ইউনেস্কো ওয়ার্? হেরিটেজ তালিকায় স্থান পায়। রাজপ্রাসাদের সামনের বাগানগুলো দেখতে অসাধারণ। খুব যতœ করে সাজানো বাগানের সামনে ছবি তুলতে মানুষের আগ্রহের যেনো শেষ নেই।  রাজপ্রাসাদ দেখার পর আমরা দুটি টেক্সীতে করে সরাসরি ভিয়েনা এয়ারপোর্টে। আমাদেরকে বিদায় জানাতে আসেন আব্দুস সাত্তার ও তার বন্ধু। প্রায় বছর খানেক হয় তাঁরা ভিয়েনা এসেছেন। তাদের একজন ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে এবং অন্যজন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্স করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। ইউরোপের মাটিতে কিভাবে নিজেদের খাপ খাওয়াবেন এবং প্রতিষ্ঠিত হবেন সে ভাবনাই এখন তাদের মাথায় ঘুরেফিরে। স্থানীয় সময় ১০.২০ মিনিটে আমরা আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। পরবর্তী কিস্তিতে তিরানার গল্প পড়ার আমন্ত্রণ থাকল।
লেখক : সাংবাদিক, সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রদায়ক।
লণ্ডন, ২০ নভেম্বর ২০১৬