Share |

মরক্কোর দর্শনীয় স্থানগুলো

মতিউর  রহমান  চৌধুরী
 সকাল ৮.৫৫ মিনিটে আমরা মারাকেশ রেল স্টেশন থেকে ক্যাসাব্লাংকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই ট্রেনে করে। ভাড়ার তফাত থাকলেও ২য় শ্রেণী এবং প্রথম শ্রেণীর সিটগুলো প্রায় সমানই। তাই আমরা দ্বিতীয় শ্রেণীর টিকিট কেটে ট্রেনে চেপে বসলাম। বাহির থেকে ট্রেনকে এত আহামরি কিছু মনে হবে না। কিন্তু ভিতরে ঢুকলে বোঝা যায় প্যাসেঞ্জারকে আকৃষ্ট করতে ট্রেনকে কত সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে। পুরো সেন্ট্রেল এয়ার কন্ডিশনের ট্রেন চলেও যেনো বাতাসের গতিতে। ব্রিটেনের গ্রেট ওয়েস্টার্ন বা ভার্জিন ট্রেনের আদলেই সাজানো ট্রেনগুলো। সমতল ভূমিতে সর্পিল গতিতে চলা ট্রেন ভ্রমণ খুবই আরামদায়ক। বাইরে চতুর্দিকে খোলা মাঠ, পাশেই নাঙ্গা পাহাড়গুলো অপূর্ব লাগছিল। ট্রেনে চলার পথে দেলোয়ার ভাই বিভিন্ন জ্ঞানী ব্যক্তির কিছু কোটেশন আমাদের শোনান। এক মিস্ত্রি অবসরে যাবার আগে তার মালিক বল্্ল, আমার জন্য একটি ঘর বানাও। যেহেতু সে অবসরে যাবে সেজন্য কোনমতে নামকাওয়াস্তে একটি ঘর বানাল মিস্ত্রি। ঘর বানানোর পর মালিক বল্্ল, এটি তোমার ঘর। তোমার জন্যই তৈরি করিয়েছি। তখন মিস্ত্রি আফসোস করল, আমার ঘর জানলেতো আমি খুব ভালো এবং সুন্দর করে তৈরি করতাম। আমরা আখেরাতের কথা জেনেও সে অনুযায়ী আমল করছি না। ‘‘হেপিনেস ইজ এ জার্নি নট এ ডেস্টিনেশন’’। ‘‘কোথাও খুব দ্রুত যেতে গেলে একা যাও, কিন্তু দূর যেতে হলে সঙ্গী নাও’’। এক অন্ধ ব্যক্তি ভিক্ষা করতে গিয়ে আমি অন্ধ আমি অন্ধ বলছিল কিন্তু কেউ দান করছিল না। চলার পথে এক ব্যক্তি একটি প্ল্যাকার্ড লিখে তার গলায় ঝুলিয়ে দেয়, যাতে লিখা ছিল, ‘‘আজকের দিনটি কত সুন্দর কিন্তু আমি তা দেখতে পাচ্ছি না।’’ এরপর সে প্রচুর পয়সা পেতে আরম্ভ করে।  
নাজির ভাই, ক্যারল ভাই, নবাব ভাই, আউব ভাই, দেলোয়ার ভাই ও আমি মিলে ট্রেনের ভেতর আড্ডা জমে ওঠে। বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে আরম্ভ করে পৃথিবীর অনেক কিছুই আড্ডায় আসে। তাইসির ভাই অন্য সিটে ঘুমে থাকায় আড্ডায় যোগ দিতে পারেননি। খুবই দ্রুতগতিতে চলা ট্রেন থেকে দেখা যাচ্ছিল রাখাল মাঠে মেষ, ছাগল চরাচ্ছে, মাইলের পর মাইল কমলা বাগান, গম ক্ষেত। চতুর্দিকে সবুজের হাতছানি। ক্যাসাব্লাংকা শহরের কাছাকাছি বাড়িঘরের রং অফ হোয়াইট, মারাকেশের বি?িংগুলো হালকা কমলা রঙের। স্টেশন কাছাকাছি আসলে দেখা গেল বাংলাদেশের ঢাকার গুলশান বনানীর আদলে ঘরগুলো তৈরি। খুবই দামী এলাকা যেন। ঠিক ১২.৪৫ মিনিটে আমরা ক্যাসাব্লাংকা স্টেশনে নামি। অন্য ট্রেন ধরার জন্য স্টেশনে অপেক্ষমান যাত্রীদের ভিড়। কিন্তু কোন তাড়াহুড়ো নেই। ট্রেন আসছে যাচ্ছে, মানুষ শৃঙ্খলাভাবে যে যার গন্তব্যে রওয়ানা দিচ্ছে। প্লাটফর্মেই ছোট মসজিদ আছে। অনেকেই যোহরের নামাজ সেরে নিচ্ছেন। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো যাত্রী সাধারণ প্লাটফর্মে ঢোকার সময়ই টিকিট চেক করা হয়। বের হওয়ার সময় খুব একটা চেকিং হয়না। তবে ট্রেনে একজন বা দুজন টিকিট চেকার টিকিট চেক করেন। স্টেশন থেকে বের হতেই দেখা গেল ট্রামের ছড়াছড়ি। ক্যাসাব্লাংকাতে আমাদের হোটেলের নাম হোটেল সেন্ট্রেল। হোটেলের পাশেই ক্যাসাব্লাংকা পোর্ট। বন্দরে নোঙ্গর করা বড় বড় জাহাজের মাস্তুল দেখা যাচ্ছে। মাইকে জোহরের নামাজের আজান শুনে অনেকদিন পর যেন প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। এখানে প্রতিটা মসজিদে মাইকে আজান দেয়া হয়। হোটেলে এসে ফ্রেস হয়ে আমরা বেরিয়ে পড়ি দুপুরের খাবার ও হাসান মসজিদ পরিদর্শনের জন্য। স্থানীয় স্কালা রেস্টুরেন্টে আমরা আহার সারি। এটি খুবই বড় রেস্টুরেন্ট। প্রায় চারশত মানুষ একসাথে খাবার খেতে পারবেন। ছোট ছোট বসার চেয়ার দেখলে মনে হবে এক আঙুলে তোলা যাবে। কিন্তু আলগা করে দেখেন না। একেকটা চেয়ারের ওজন দশ কেজির কম হবে না। কৃত্রিম ছাতার নীচে কলাগাছ, ফুলগাছ, অরেঞ্জ গাছ ও ফুয়ারার আবেশে আমরা যেন কোন গ্রামে দুপুরের খাবার খাচ্ছি। ক্যাসাব্লাংকা মরক্কোর বাণিজ্যিক ও শিল্প নগরী। আফ্রিকার অন্যতম এ বড় শহরে প্রায় ৪ মিলিয়ন মানুষ বাস করেন। ক্যাসাব্লাংকা পোর্ট পৃথিবীর অন্যতম বড় কৃত্রিম পোর্ট।

 হাসান মসজিদ
মসজিদে যাবার পথে দেখা গেল পোর্টের লাগোয়া সমুদ্রকে সামনে রেখে বিশাল বিশাল বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে ক্যাসাব্লাংকা মেরিনা নামে। ফরেন ইনভেস্টমেন্টের মাধ্যমে এ মেরিনা তৈরি করা হচ্ছে দুবাই বুর্জের আদলেই। খুব বিশাল এলাকা নিয়ে এ মেরিনা তৈরি হচ্ছে। বাণিজ্যিক রাজধানীকে অসাধারণ স্থাপত্যশৈলি দিয়ে ভবিষ্যতের জন্য মোড়ানো হচ্ছে যেন। রোদেলা দুপুরে সূর্যের আলো খুবই কড়া মনে হলেও তা যেন সেভাবে কড়া নয়। সবসময় বাতাস প্রবাহিত হতে থাকায় রোদ এসে গায়ে হামলা করতে পারছে না।  
হাসান মস্কে না আসলে এর বিশালত্ব অনুমান করা যাবে না। মসজিদটি আটলান্টিক মহাসাগরে ভাসছে যেন। আটলান্টিক মহাসগরের কুল ঘেষে স্থাপিত এ মসজিদের দেয়ালে সাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ছে অনবরত। মরক্কোর বর্তমান শাসকের পিতা হাসানের নামানুসারেই মসজিদের নামকরণ করা হয় হাসান মস্ক ২ নামে। অত্যন্ত দামী মোজাইক পাথরে নির্মিত এ মসজিদে একসাথে ২৫,০০০ হাজার মানুষ নামাজ পড়তে পারেন। বাইরে আরও ৮০,০০০ হাজার মানুষের নামাজ পড়ার জায়গা আছে। হাসান মস্ক আকর্ষণীয় ট্যুরিস্ট এলাকাও। ইউরোপ, আমেরিকা তথা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ আসেন হাসান মস্ক দেখতে। ছোট ছেলেমেয়ে থেকে আরম্ভ করে বড়রাও সাগরের ঢেউয়ের সাথে জলকেলি খেলছেন। হাসান মস্কের মিনার পৃথিবীর অন্যতম উচ্চতম মিনার। যার উচ্চতা ২১০ মিটার। ১৯৮৯ সালে কিং হাসানের ৬০তম জন্মবার্ষিক উপলক্ষে উদ্বোধনের ইচ্ছে নিয়ে ১৯৮০ সালে এ মসজিদের নির্মাণ কাজ আরম্ভ হয়। কিন্ত তা না হয়ে মসজিদটি উদ্বোধন হয় ১৯৯৩ সালে। এ মসজিদ নির্মাণে ব্যয় হয় ৮০০ মিলিয়ন আমেরিকান ডলার। মার্বেল ও গ্রানাইট পাথর দিয়ে তৈরি এ মসজিদ ইসলামি স্থাপত্যকীর্তির এক অসাধারণ নিদর্শন।  

বাদশার বাড়ী  
ফেরার পথে আমরা পুরান ঢাকার ধোলাই খালের মতো এক গলি দিয়ে আসি। যেখানে পুরাতন গাড়ী মেরামত থেকে আরম্ভ করে কাঠের দোকান, খাট-আলমিরা-চেয়ার-টেবিল তৈরির কাজ চলছে। বিভিন্ন এলাকার মানুষজন কম মূল্যের জিনিসপত্র ক্রয় করতে ভিড় করেছেন।  
আমাদের হোটেলের সামনের মাঠে আজ বাচ্চাদের কুংফু- কারাতে প্রতিযোগিতা হবে। যিনি বা যে দল বিজয়ী হবে তারা পাবে উপহার। সেজন্য সকাল থেকেই এখানে সাজ সাজ রব। ব্যান্ডদল থেকে আরম্ভ করে স্থানীয় লোকেরা ভিড় করেছেন প্রতিযোগিতা উপভোগ করতে। শনিবারের বিকেল কাজকর্মে অবসর থাকায় সবার মাঝে একটা প্রাণচঞ্চল্য লক্ষ্য করা গেছে। বাচ্চারা রাস্তায় খেলছে, বড়রা কফি শপে আড্ডা দিচ্ছে, মেয়েরা গল্প করছে- প্রতিবেশীর খবর নিচ্ছে।  
বিকেল ৭.৩০টার দিকে হোটেলে ফিরে আমরা আবার বেরিয়ে পড়ি ৮টার দিকে বাদশার বাড়ী দেখবো বলে। আমাদের হোটেলের পাশেই ও? মদিনা মার্কেট। কম দামে, আকর্ষণীয় মুল্যে ট্যুরিস্টরা কেনাকাটা করেন এ মার্কেটে। আসার পথে আমরাও কিছু কেনাকাটা করি। আমরা দেরীতে যাওয়ায় ইতোমধ্যে বাদশাহ বাড়ীর ফটক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আর্মি পোশাকে সজ্জিত প্রহরীরা বাদশাহর দরবার রক্ষায় টহল দিচ্ছে অনবরত। বাইরে থেকে দেখা যায় যায় কয়েকশ একর জায়গা জুড়ে বাদশার সুবিশাল এলাকা। তিনি যে সবসময় এখানে থাকেন তা নয়। ক্যাসাব্লাংকায় যখন আসেন তখন হয়তো পদচি? পড়ে এখানে। মধ্যপ্রচ্যের বাদশাহদের এধরনের বাড়ী বিভিন্ন শহরে থাকে আমরা জানি। নির্মিত বাড়িঘরগুলোর দিকে তাকালে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এ এলাকা খুবই দামী। বাড়ীঘরগুলো নতুন আধুনিক ডিজাইনে তৈরি। ভাবলাম বাদশাহর বাড়ীতো আর যেকোন স্থানে হতে পারে না। স্থানীয় মসজিদে আমরা মাগরিবের নামাজ আদায় করি। খুবই বড় ও প্রাচীন মসজিদ। বাইরে লোকের ভিড় থাকলেও মসজিদে ভিড় নেই। মরক্কোর বিভিন্ন শহরে দেখা যায় প্রায় একই ডিজাইনের মসজিদগুলো শত শত বছর আগে তৈরি। অত্যন্ত আকর্ষণীয় স্থাপত্যকীর্তির মাধ্যমে তৈরি মসজিদগুলোতে প্রায় তিন/চার হাজার মানুষ নামাজ পড়তে পারবেন একসাথে।
মরক্কোতে মটরসাইকেলের উৎপাত খুবই বেশী। বিকট আওয়াজের মটরসাইকেল আপনার কান ঝালাপালা করে ছাড়বে। পুরুষ, মহিলা, ছোট বড়রা দেদারসে মটরসাইকেল চালায়। চায়না ও কোরিয়ার তৈরি এসব মটরসাইকেল খুব বেশী দামী না হওয়ায় সবাই তা ব্যবহার করতে তৎপর।   


আইনের প্রতি শ্রদ্ধা
লক্ষনীয় বিষয় হলো ট্যাক্সিগুলো ট্রাফিক আইন মোতাবেক বেঁধে দেয়া প্যাসেঞ্জারের বেশী একজনও উঠাবে না। একজনের জন্য প্রয়োজনে অন্য ট্যাক্সি নিতে হবে। ছোট ট্যাক্সি হলে পিছনে দুজন এবং সামনে একজন আর বড় হলে পিছনে তিনজন ও সামনে একজন বসতে পারবেন। এর ব্যত্যয় হয় না বা করে না ড্রাইভাররা সাধারণত। এক ড্রাইভার অতিরিক্ত একজন যাত্রী উঠিয়েছিল কিন্তু সামনে ট্রাফিক সার্জেন্ট দেখে সে ট্যাক্সি থামিয়ে রাখে এবং প্রায় একঘন্টা খোঁজাখুজির পর বড় একখানি ট্যাক্সি জোগাড় করে তাদের ঐ ট্যাক্সিতে উঠিয়ে দিয়ে যেন সে রেহাই পায়। আইনের প্রতি ট্যাক্সি ড্রাইভারেরই যে শ্রদ্ধা তা দেখে আমরা অভিভূত হয়েছি। এ থেকে বুঝা যায় দেশের বেশীরভাগ মানুষ আইন মান্য করে চলে। রাতে আমাদের হোটেলের পাশেই কাসা ফিস রেস্টুরেন্টে মরোক্কান সালাদ, মাছ, কুচকুচ, ফ্রাইড রাইস দিয়ে রাতের আহার সারি।  


 ফজরের নামাজ
ফজরের নামাজ জামাতে কোন মসজিদে পড়ব টার্গেট করে ভোর ৪টায় ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে শুয়ে পড়ি। ভোরে উঠে নামাজের জন্য রেডি হওয়ার পরও দেখা গেল এখনও আজান হয়নি। রাতে হোটেল ম্যানেজার বলেছিলেন ৪.৩০টায় জামাত। আসলে ঐ সময় আজান হয় এবং জামাত ৫টার দিকে। ৪.৩০টায় বাংলাদেশের মসজিদগুলোর মতো বিভিন্ন প্রান্তের মসজিদ থেকে সুমধুর আজানের ধ্বনি আসতে থাকে এবং আমাদের জানান দেয় ঘুম থেকে নামাজ উত্তম। মসজিদ ও মসজিদের রাস্তা কোনদিকে তা চিনতে না পারায় ক্যারল ভাই একজন লোককে বুঝাতে চেষ্টা করলেন যে আমরা মসজিদে যাবো। তিনিও মসজিদ কোনদিকে চিনতে না পারায় ইতস্তত করতে থাকেন। ঐ সময়ই আমরা দেখলাম লম্বা জোব্বা পরিহিত একজন লোক এদিকে আসছেন। বুঝা যাচ্ছিল তিনি মসজিদে যাচ্ছেন। ইশারায় আমরা বুঝালাম আমরাও মসজিদে যাবো, তিনি তার সংগে হাঁটার নির্দেশ দিয়ে হাটতে লাগলেন। প্রায় ৮/১০ মিনিট হাঁটার পর আমরা তাঁর সাথে মসজিদে প্রবেশ করি। এ মসজিদটিও অনেক বড়। প্রায় হাজার বছর আগের পুরনো মসজিদ। কম করেও দুহাজার মানুষ একত্রে নামাজ পড়তে পারবেন। কিছু কিছু মসজিদে কার্পেটের বদলে শীতল পাটি বিছানো। এ মসজিদও দেখলাম কার্পেটের বদলে খুব দামী শীতল পাটি দিয়ে পুরো মসজিদ মোড়ানো। তুলনামূলকভাবে ফজরের জামাতে মুসল্লিদের সংখ্যা কম নয়। লন্ডনে দেখা যায় অন্য জামাতগুলোতে লোকের সংখ্যা বেশী হলেও ফজরের জামাতে নামাজি কম থাকেন। কিন্তু এখানে ফজরে নামাজি কম নয়।

৮০/৯০/১০০ বছরের বয়স্ক মানুষেরাও লাঠি ভর করে করে মসজিদে এসেছেন নামাজ আদায় করতে। এত পুরনো হলেও শৈল্পিকভাবে তৈরি এ সমস্ত মসজিদগুলো এখনও সুন্দরতার বহির্প্রকাশ করে যাচ্ছে। সকালের মৃদুমন্দ বাতাসের আবেশে, ঘুঘুর কলতানে, মানুষের ব্যস্ততায়, পোর্টে বড় বড় জাহাজের নোঙ্গরের সৌন্দর্যে ভোরের প্রকৃতি অন্যরকম লাগছিল।  


সমুদ্র সৈকত
আটলান্টিক মহাসাগরের লাগোয়া সি সাইডে যাবার পালা আজ আমাদের। ১০টায় সি সাইডের উদ্দেশ্যে বের হবো টার্গেট নিয়ে আমরা ৯টা থেকে ১০টার ভিতর নাস্তা সেরে নেই আমাদের হোটেলের ডাইনিং এ। ব্রেড, জ্যাম, ডিম, বাটার, পনির, অরেঞ্জ ড্রিংকের সমন্বয়ে সুস্বাদু নাস্তা হয়। আগেই কথা ছিল আমরা ট্রামে করে যাবো সি সাইডে। ট্রামগুলো দেখতে খুবই সুন্দর। স্টেশনগুলোর নাম আব্দেল মোমেন, সার্ব ঘেলাফ, রিভাইরা প্রভৃতি। ট্রাম স্টেশনগুলোর সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য দুপাশেই সারিবেঁধে খেজুর গাছ রোপণ করা হয়েছে। আস্ত আস্ত খেজুর গাছ এনে রোপন করে যতœ নেয়া হচ্ছে। আছে বাহারি ফুলের বাগানও। এলাকা যে দামী তা বাড়ীঘরের আদল দেখলেই বুঝা যায়। একতলা বাড়ীগুলো খুবই সুন্দর করে তৈরি করা হয়েছে। সমুদ্র সৈকতের পাশের স্টেশনের নাম, ‘‘ইয়ান দিয়াব প্লেজ টার্মিনাস’’। স্টেশন থেকে প্রায় ১০ মিনিটের পথ সমুদ্র সৈকত। রোদের এত তেজ না থাকলেও সময়ের তালে তালে তা যেন বেড়েই চলছে। শত শত গাড়ী ও বাসের সমারোহে হাজার হাজার মানুষ যেন উপচে পড়ছে সৈকতে। সমুদ্রের একটানা গর্জনের ঢেউ উপচে পড়ছে তীরে। লোকেরা ফুটবল খেলছে, কেউবা রোদ পোহাচ্ছে, ঘোড়া চড়ছে। প্রচন্ড ঢেউগুলো কখন আসে তা যেন কর্তৃপক্ষ জানে। তাই মাঝে মাঝে হুইসেল বাজিয়ে পানিতে ভাসমান লোকদের সতর্ক করে তীরে নিয়ে আসা হয়। অন্যথায় ঢেউ তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। সৈকতে রোদে বসতে আমরা ৭টি চেয়ার বুক করি। চেয়ারে গা গরম করে অনেকেই বালি ও সাগরের পানিতে সাঁতার কাটতে নেমে পড়েন। সৈকতে চেয়ার এবং ছাতার ব্যবসা করতে হলে সরকারের কাছ থেকে লীজ নিতে হয়। আমরা যার তত্ত্বাবধানে বসেছি তিনি ৯০টি ছাতা-এলাকা এনেছেন সামারের জন্য সরকারের কাছ থেকে ৩০ হাজার দিরহামে। এ ধরনের হাজার হাজার ছাতার সমন্বয়ে সমুদ্র সৈকত। ভাবুন, সৈকত থেকেই সরকার কত দিরহাম আয় করছে বছরে। আসার পথে দেলোয়ার ভাই, আইউব ভাই, নাজির ভাই ও আমি ট্রামে উঠতেই ট্রাম ছেড়ে দেয়। পিছনে থাকেন নবাব ভাই ও ক্যারল ভাই। আমরা পরের স্টেশনে নেমে যাবো কিনা দেলোয়ার ভাই ফোনে নবাব ভাইর সাথে কনফার্ম করার পর তিনি বললেন তাদের ট্রাম ছাড়তে আরও ৮ মিনিট দেরী আছে। আমরা যেন হোটেলে চলে যাই। হোটেলে এসে গোসল ও নামাজ সেরে স্থানীয় রেস্টুরেন্টে আমরা খেতে নামি।

হাম্মাম না স্পা  
খাওয়ার আড্ডায় মোটামুটি সিদ্ধান্ত হয় আমরা হাম্মামে যাবো। কিন্তু নবাব ভাই ও আউব ভাই যেতে চাচ্ছেন না। কি আর করা, আমরা বাকীরা হাম্মামের পথে পা বাড়াই। খাবার টেবিলে অবশ্য নাজির ভাই জানতে চেয়েছিলেন হাম্মাম বা স্পা কি জিনিস? তাকে বুঝানো হয় অনেক সময় নারিকেলের আঁশ বা পুরলের সাথে সোডা বা বাংলা সাবান মিশ্রিত করে মর্দনের মাধ্যমে দেহের ময়লা পরিষ্কার করা হয়। এরপর তেল মর্দন করা হয়। এর নামই হলো হাম্মাম। আমরা রওয়ানা দিলাম হাম্মামের দিকে। খাবার হোটেল থেকে আমাদের একটা নির্দেশনা দেয়া ছিল। কিন্তু হাম্মামের ম্যানেজার বললেন, আপনারা যা করাতে চাচ্ছেন তা বসে বসে দেখার মতো, এতে কাজের কাজ কিছুই হবে না। শরীরে তেজ পেতে হলে পা করাতে হবে। ম্যানেজারের চাপে উচ্চমূল্যে পার দিকেই আমরা পা বাড়ালাম। নাজির ভাই বললেন, ভাই পাতে নিয়ে কি করবে? আমরা বললাম বড় তসবীহ পড়ুন। কাপড় বদলেই আমাদের স্টীম রুমে ঢুকিয়ে দেয়া হলো। স্টীমের গরমে দম বন্ধ হওয়ার জোগাড় প্রায়। ওখানে প্রায় ১৫ মিনিট বসার পর এক এক করে অন্য সেকশনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। নাজির ভাই বললেন, এখন আবার কোথায় নিচ্ছে? আমরা বললাম রিমান্ডতো জীবনে পাননি বা দেখেননি, এখন তারা রিমান্ডে নিচ্ছে। শরীর মর্দনে শ্যাম্পু, সাবানের অত্যাচারে শরীরের ময়লা পালাতে বাধ্য হয়। নাজির ভাই পা করার পর বলেছেন, শরীরের উপর যে অত্যাচার হয়েছে তা যদি একটু দুর্বল-হার্ট লোকের উপর হতো তাহলে কোন দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারতো। হোটেলে ফিরে দেখি নবাব ভাই অপেক্ষা করছেন মেলন/অরেঞ্জ নিয়ে। ফলাহারের পর আমরা আবার রাতে হাঁটতে বের হই। ও? সিটির পাশেই নিউ সিটি গড়ে উঠছে। আছে ম্যাগডোনালস, কেএফসি, চার্টার্ড ব্যাংক, পাঁচ তারকা হোটেলগুলো। পুরনো ও নতুনের এক সেতুবন্ধন হচ্ছে যেন। রাতে হোটেলে ফিরে আবার কিছু সময় আড্ডা দেই। আড্ডায় ওঠে আসে নানা কথা। সকলেই বললেন, এদেশে এসে মনে হয়েছে ক্রাইম একেবারেই কম। গভীর রাতেও মহিলারা অবাধে চলাফেরা করছে, ট্যুরিস্টরা হাঁটছেন। ড্রাগের ছড়াছড়ি চোখে পড়লো না। ছোট ছোট গলি দিয়ে গভীর রাতে আমরা ঘুরাঘুরি করেছি। কেউ থামিয়ে বলেনি, যা আছে সব দিয়ে সামনে পা বাড়া।  
আগামীকাল ৯ জুন সকালে আমাদের কাফেলা দুভাগ হয়ে যাবে। একভাগ চলে আসবেন মারাকেশে লন্ডন ফিরতে। আর আমিসহ অন্যরা রওয়ানা দেবো মরক্কোর অন্য দর্শনীয় শহর ফেজের উদ্দেশ্যে।   
ক্যাসাব্লাংকা, ৮ জুন ২০১৪
লেখক : সাংবাদিক, পত্রিকার বিশেষ প্রদায়ক।