Share |

মাজেদ বিশ্বাসের একগুচ্ছ কবিতা

কবিদের অন্যতম সুবিধে হচ্ছে, অন্যদের যখন বয়স বাড়লে বুড়ো হতে থাকেন, কবিরা হতে থাকেন তরুণ থেকে তরুণতর। বিলাতের কাব্যমহলে সুপরিচিত মুখ মাজেদ বিশ্বাসকে দেখলে অন্তত: এমনটা মনে হবার যথেষ্ট কারণ আছে। এই ফেব্রুয়ারীতে তিনি পার করেছেন বয়সের অন্যতম মাইলফলক: ষাট বছর। অথচ এ কবি এখনো তারুণ্যে ভরপুর একজন নতুন কবিই যেন, কবিতার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসাই তাকে সদা সবুজ করে রাখে। তাই যেখানেই যান, চারপাশটিকে কবিতায় মাতিয়ে তোলেন। এ সংখ্যায় তার গুচ্ছ কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে পত্রিকা কবি মাজেদ বিশ্বাসকে তার জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। শতায়ু হোন প্রিয় কবি।  
- সাহিত্য সম্পাদক।  

মাস্টার কবি       
 আমার মৃত্যু হলে  
ইংল্যান্ডের স্বপ্নময় মাটিতে আমার কবর দিও
 ইংল্যান্ডের কিছু জায়গা  
চিরকালের জন্য বাংলাদেশ হয়ে যাবে।  আমার সারা শরীরে বাংলাদেশের ধূলি
কাদামাটি এখনো লেগে আছে
নদীপুকুরের পানি আর অকৃপণ বৃষ্টিধারা   
আমার শরীর ধুয়ে দিতো
সবুজ অরণ্য, বাংলার মায়াবী প্রান্তর
আমার হৃদয় জুড়ে
আমার দেশের মানুষ
আমাকে ভালোবাসা দিয়েছিলো
আমাকে মানুষ করে গড়ে তুলেছিল
দেশ আমার জন্য আশীর্বাদ করেছিলো।   
 

বাংলাদেশ সব সময়ই আমার মনে
প্রতিদিন স্বপ্ন দেখে
আমার রক্তধারায় বাংলাদেশ
হৃদপিণ্ডের সামান্য দুগদুগি
বাংলাদেশের কথা বলে
বাংলাদেশের চিন্তা ফিরে আসে, ফিরে আসে।

  বাংলাদেশের নয়নচেরা দৃশ্যাবলী  
বাংলাভাষার মহা কোলাহল
প্রতিটি দিনরাত্রি স্বপ্ন দেখায়
 বাংলাদেশের মানুষ সংস্কৃতি শেখায়  
প্রিয় বাংলাদেশের ছায়ায়
আমি এক মাষ্টার কবি    
আমার মনে এক টুকরো স্বপ্ন ...
  আমার মৃত্যু হলে  
ইংল্যান্ডের স্বপ্নময় মাটিতে আমার কবর দিও  
ইংল্যান্ডের কিছু জায়গা  
চিরকালের জন্য বাংলাদেশ হয়ে যাবে ।

  সেই স্থায়ী ঠিকানা  
    আমরা স্থায়ী ঠিকানাবিহীন বন্যপাখি। এই টুকরো জীবনে এক বাসা থেকে আরেক বাসায় ঘুরে ফিরি  
যাযাবর। তারপর বেলুনের মতো ফুটে গেলে মায়ার পৃথিবীর সবই শেষ।  
    
প্রামাণ্য দলিলে স্থায়ী ঠিকানা দক্ষ কারিগরের সুনিপুণ খেলা। সারা জীবন বুঝেও না বুঝার  ভান করি  
গাড়ল বুদ্ধিজীবি। কক্ষনো হুঁশ ফিরলে আর সময় অবশিষ্ট থাকে না, এমনি একরত্তি পরমাণু জীবন!  
 নদী সমুদ্রে মিশে বাঁচে জনমে জনম। পরমাণু জীবন অনন্ত বাঁচে বহমান সেই নহর পাড়ে।  
পুলসিরাত পাড়েতে আমাদের মতিভ্রম জীবন কাঁপে থরোথরো!  
 তোমার ঘর চিনে লওরে মহাজন, ভাসাও তোমার হীরক তরী।     

বুকের ভেতর গহীনে
   বুকের ভেতর গহীনে বাজে পানির ছলাৎছল। রঙিন পালে চেনাপথে যাওরে সওদাগর। তোমার  
নৌকা ভর্তি  মধুর ভালোবাসা ফেরি চমৎকার। তোমার ঘরের হিংস্র হাসে ঘুণপোকা সন্ত্রাসী।  
ভীতবিহ্বল আজিকার যীশু নিরালা নীরব ভেতর ভুবন।     
 মনের ভেতর নিজের যুদ্ধ গভীর গাঙে ঝড়। সেই জাত যুদ্ধ থামাতে ব্যর্থ জংধরা জাতিসঙ্ঘ। যুদ্ধে
 পরাজিত মানুষের ইতিহাস রচিত হয় না কোনকালে। আকাশ জুড়ে বিজলি চমক মনেতে ভীষণ  
ভয়। উন্নত শির লোপাট ধরাতলে যুগের ধর্ম পরগাছা।       এখন তো ধূলায় ধূসরিত শূণ্য চারিদিক হাহাকার বিরাণ মরুভূমি। শূণ্যের ভেতরে আসা-যাওয়া  
মানুষের মহাশূণ্যে বসত আয়ুষ্কাল। শেষ নিঃশ্বাসে ধন-সম্পদ ধূ ধূ ময়দান গুমরে কাঁদে নিশিদিন।  
তবুও হিংসাদ্বেষে ভরা হীরক তরী বুকেতে ঢেউয়ের ছলাৎছল। তোপের মুখে ভয়েডরে জুুবুথুবু সুধী  
সর্বজন সভা।      আজকাল তোমার এই বুকের ভেতর গহীনে পানির ছলাৎছল বাজে হাহাকার নিশিদিন।    

        তবুও স্বাভাবিক মানুষ 
   মাতাল পথঘাটে উদ্ভট উপদ্রব অজান্তে ভাঙে খানখান মানবিক মূল্যবোধ। ঘরের ভেতরে সদম্ভ সন্ত্রাস  
ঘটে আজকাল অহরহ। তুমি নিষ্ঠুর সন্ত্রাসীর কবলে গোটা জীবন করলে মিছে বরবাদ। দিনরাত  
চব্বিশ ঘন্টা খোলা অফ লাইসেন্স, ইচ্ছেমতো আবোলতাবোল গলাফাটানো ভাষণ। ন্যাড়া মাথায় লাটিম ঘোরে দিনরাত, বিপদ উদ্বেগ মগজে কোষে
কোষে। নাবিক সমুদ্রে মাতালে চুর দিশেহারা তবুও স্বাভাবিক ভেতরের আধুনিক মানুষ। মুখে যত বড়ই  
মহামানব তত বড় নহে সেই মানব কোনকালে। আজিকার আধুনিক মানুষ জাগে অকারণে অথবা  
নিশিদিন নিদ্রা মৃত লখিন্দর। ঘরবাড়ি পরিবার দেশমাতৃকা বেভুল ভুলে আত“নিমগ্ন নির্বিরোধ মানুষ।  
তোমার কুম্ভকর্ণ ঘুম ভাঙবে এমন আশা আর দেখি নাতো এই টুকরো জীবনে।   
মনের ভতর শূন্য হাহাকার ময়দান ডানাভাঙা স্বপ্নপাখি নির্জন বনভূমে নিশ্চুপ। সেই স্বপ্নপাখি  
অনর্থক ডানা ঝাপটায় করুণ ফ্যালফ্যাল দৃষ্টি অসহায় পশু কোরবানী। মাথা ঘামায়ে নাজেহাল  
হয়রাণ আজিকার তথাকথিত সুশীল সমাজ। মাতাল বাড়লে পাপ কমে বাড়ে না আক্রমণ দারুণ  
দর্শন। মাতালে মাতালে ভরে ওঠে আজিকার জংলি বাগান বসুন্ধরা।      হে আমার স্বপ্নপাখি, কেউ শুনুক আর না শুনুক তুমি শোনাও তাদের সেই স্বপ্নপারের অনন্ত জীবন  সংগীত ।