Share |

মেঘের সাথে কোলাকুলি : অস্ট্রিয়ার টেলফ্সের পাহাড়

মতিউর রহমান চৌধুরী
বরফে ঢাকা সাদা টেল্্ফস পাহাড়গুলো যেন মেঘের সাথে কোলাকুলি করছে। এক পাহাড় থেকে অন্যটির উচ্চতা আরও বেশী। রোদেলা সকাল হলেও বাতাসে শূন্য ডিগ্রীর ছোঁয়া। আমরা কোফস্টেন থেকে ট্রেনে করে টেলফ্্স যাচ্ছি। ট্রেনখানি প্রায় দুইশ মাইল গতিতে চলছে। ট্রেন থেকে বরফে ঢাকা পাহাড়গুলোকে অসাধারণ লাগছিল। আজ মার্চের ১৪ তারিখ, এখনও শীতের আমেজ কাটেনি এখানে, বিভিন্ন জায়গায় বরফের স্তুপ জমে আছে। প্রচন্ড শীতের সময় কত বরফ পড়েছে আল্লাহ্ই ভাল জানেন। বিভিন্ন স্টেশনের প্লাটফর্মে এখনও ছোট ছোট নুড়িপাথর ছিটানো আছে মানুষের হাঁটাচলার সুবিধার্থে। সূর্যকিরণে পাহাড়গুলো চিকচিক করছে। আমরা ১০.৪১ এর ট্রেন ধরেছি এবং টেলফ্্স স্টেশনে পৌঁছাবো ১১.২০ এ। পথিমধ্যে ট্রেন বদল করতে হবে ইন্সব্রোকে। সবসময় বরফের সাথে বসবাসের জন্য এ এলাকায় প্রচুর স্কেটিং রিসোর্ট আছে। আমাদের গাড়ীতেও অনেক যাত্রি স্কির সরঞ্জামাদি নিয়ে উঠেছেন। এমনকি ট্রেনের প্রতি কামরায় একটি নির্দিষ্ট জায়গা আছে যেখানে যাত্রিরা তাদের এসমস্ত সরঞ্জাম রাখতে পারেন। বাংলোর আদলে তৈরি ছোট ছোট একতলা ঘর খুব আকর্ষণীয়। প্রায় সব ঘরেই সোলার প্যানেল লাগানো। চলার পথে ভাই ইমরান তার আইপ্যাডে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভণর আতিউর রহমানের বেড়ে উঠার জীবন কাহিনী পড়ছিলেন। এবং বলছিলেন, কিভাবে মানুষ কপর্দকহীন থেকে এত উপরে উঠতে পারে এবং আল্লাহ মানুষকে কিভাবে সাহায্য করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর ড. আতিউর রহমান তার জ্বলন্ত প্রমাণ। কিছুক্ষণ পরই ট্রেনখানি পাহাড়ের নীচে ঢুকে যায়। অন্ধকার পাহাড়ের নীচ দিয়ে শাঁ শাঁ শব্দে ট্রেনখানি প্রায় ৩০ মিনিট চলে। কোন কোন সময় কান বন্ধ হয়ে গেছে বাতাসের চাপে। কত শত ফুট পাহাড়ের নীচ দিয়ে এ টানেল তৈরি তা ভাবতেই অবাক লাগে। ইতোমধ্যেই ইন্সব্রুকে দুবার শীতকালিন অলিম্পিক গেমস অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৬৪ সালের ২৯ জানুয়ারী থেকে ৯ ফেব্রুয়ারী এবং ১৯৭৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারী থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারী এখানে শীতকালিন অলিম্পিক গেমস অনুষ্ঠিত হয়। ইন্সব্রোক থেকে আমরা লোকাল ট্রেনে উঠেছি। লোকাল হলেও ট্রেনখানি ঠিকই সঠিক সময় সকাল ১১.২০ এ আমাদের টেল্্ফসে পৌঁছে দেয়। আজ আমরা এখানে মার্কোপলের বাড়ীতে যাবো। স্টেশন থেকেই আমরা টেক্সি জোগাড় করেছিলাম, কিন্তু মার্কোপলে ফোনে জানালেন তিনি ৩০ মিনিটের ভিতর আসছেন। অতএব টেক্সিক্যাবে যাওয়া বাতিল করে তার জন্য অপেক্ষা। স্টেশন থেকে মার্কোপলের বাড়ী ৩০ মিনিটের ড্রাইভ। আমরা যাচ্ছি দুধারে সারি সারি পাহাড়ের মাঝ দিয়ে। বরফ ঢাকা পাহাড়গুলো ধব ধবে সাদা। ছোট একটি পাহাড়ি গ্রামে মার্কোপলের বাস। দুধারে কয়েক হাজার ফুট পহাড়ের ঢালে তাদের গ্রাম ও বাড়িগুলো। বাড়ী থেকে যে দিকেই দৃষ্টি যাবে সেদিকেই পাহাড় এবং অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছোঁয়া লাগবে চোখে। শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশ, এলাকার মানুষকেও যেন ঐভাবে শান্ত করে গড়ে উঠায়। তাকে জিগ্যেস করলাম প্রচন্ত শীতে তারা কিভাবে চলাফেরা করে? জানালেন শীতের সময় তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ২০ ডিগ্রীতে নেমে আসে। তখন যেদিকে চোখ যাবে মনে হবে বরফের সমুদ্র। সে সময় সরকারের নিয়োজিত বিশেষ ধরনের গাড়ী আছে যেগুলো সবসময় ব্যস্ত থাকে বিশেষকরে রাস্তার বরফ কেটে মানুষের যাতায়াত স্বাভাবিক রাখার কাজে। সেজন্য বরফের সমুদ্রেও তাদের চলাফেরা করতে অসুবিধা হয় না। তাদের এলাকার বেশীরভাগ ঘরেই ইলেকট্রিক হিটারের পাশাপাশি আছে হিটিং বয়লার। এ বয়লারে ৭/৮ ঘন্টা কাঠের আগুন জ্বলে এবং এর তেজেই পুরো ঘর গরম থাকে সারাদিন।  
  মার্কোপলের বোনের জামাই ফিরতি পথে আমাদের ইন্সব্রোক নামিয়ে দিয়ে যান। আমরা এখান থেকে আজ রাতেই জুরিখ যাবো। চলতি পথে তিনি জানালেন এখানের কোন কোন পাহাড়ের উচ্চতা এগারো, বারো হাজার ফুট। কোন কোন পাহাড়ে বারো মাস বরফ থাকে। আবার সামারের সময় তাপমাত্রা কখনও কখনও ত্রিশ ডিগ্রীতে উঠে আসে। এত তাপমাত্রাতেও অনেক পাহাড়ের বরফ গলে শেষ হয়ে যায় না। লোকেরা একপাশে সাতার কাটে অন্যপাশে গিয়ে স্কেটিং করে। এজন্য এ এলাকায় শত শত স্কেটিং রিসোর্ট আছে। অনেক খোঁজাখুজির পর আমরা ইন্সব্রুকের স্টেশনের কাছেই একটি টার্কিশ মসজিদ পেয়ে যাই। নামাজ আদায় করে পাশের রেস্টুরেন্টে কিছু খাওয়ার জন্য গেলে মালিক বিনয়ের সাথে জানালেন তার রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি নিজেই আমাদের সাথে এসে আরেকটি রেস্টুরেন্টের দিকনির্দেশনা দিলেন। ওখানেও পছন্দের কিছু না পাওয়ায় দুবোতল পানি কিনলাম সাথে থাকা কেক/ব্রেড সাবাড় করবো বলে। ইন্সব্রোক থেকে রাত ৭.৪৪ মিনিটের ট্রেনে উঠেছি আমরা সুইজারল্যান্ডের জুরিখ যাবো। প্রায় তিন ঘন্টার জার্নি। খুবই সুন্দর ও প্রশস্ত ট্রেন। লোকের ভিড় নেই। ট্রেনের ব্যুফে কার থেকে রাইস ও ভেজিটেবল কারির ব্যবস্থা হলো। ওগুলো সাবাড় করে আমরা জুরিখে পৌঁছার অপেক্ষায় থাকলাম।