Share |

ম্যান্ডেলা থেকে হাসিনা এবং হিংসার অবতার সু চি

ফারুক যোশী
সেই তারুন্যে নেলসন ম্যন্ডেলা আমাদের হৃদয়ে আলোড়ন তুলতেন। স্রাাজ্যবাদী শাষন-শোসনের বিরুদ্ধে সারা বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের হৃদয় থেকে উৎসারিত একটা নাম ছিলো ন্যালসন ম্যান্ডেলা। সাতাশ বছরের কারান্তরীন থাকা আফ্রিকার কালো মানুষের সেই নেতা হয়ে গিয়েছিলেন সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের চিরচেনা এক বিস্ময়মাখা নাম। আফ্রিকার মানুষের অধিকার ফিরিয়ে এনে সেই কিংবদন্তি মানুষটা শেষ পর্যন্ত আলোচনা-সমালোচনার বিষ্ময় থেকেই দেশের একজন নেতা হয়েই অবসরে চলে যান, ক্ষমতার অংশীদার না হয়েই বীরের ন্যায় তার আনা স্বাধীন দেশেই জীবনের শেষ দিনটি কাটিয়ে চলে যান মৃত্যুর ওপারে। কিন্তু এখনও তিনিই আফ্রিকার প্রধান নেতা, পথ প্রদর্শক। পৃথিবীর দেশে দেশে মুক্তিকামী জনতার আরেক বিস্ময়, আগামীর দিনগুলোতেও।
যে সময় ম্যান্ডেলাকে দেখে আমার মতো কৈশোর উত্তীর্ণ অসংখ্য তরুন মুক্তির অলি-গলি খোঁজছিলো, তখন আরেকটা নাম আমাদের চোখে ভাসতো। একজন কালো কিটকিটে মানুষের পাশে আমরা তখন দাঁড় করাতাম আরেকজন মানুষকে। দক্ষিণ এশিয়ার নির্যাতিত মানুষের প্রতিনিধি হিসেবেই ভাবতাম তাকে। তার চিকন দেহের মায়াময়ী মুখটা দেখলে কেন জানি গনতন্ত্র -স্বাধিকার, আন্দোলন-সংগ্রামের আরও কাছের মানুষ মনে হতো নিজেদের। সামরিক স্বৈরশাসকের অত্যাচারে পালিয়ে বেড়ানো অং সাং সু চিকে আমরা কোন না কোনভাবে মনেই করতাম তিনিও মুক্তির জন্যে লড়ছেন। কিন্তু সত্যি কথা হলো  পশ্চিমের ঔরসে তিনি আরও ‘বিচক্ষন’ হয়ে উঠতে থাকেন এবং কোনপ্রকার নির্যাতন-নিপিড়ন সহ্য না করেই তিনি আবারও জনসমক্ষে আসতেই থাকলেন। প্রাসাদের মাঝে গৃহবন্দী থেকে রাজনীতিতে আবার প্রবেশ ঘঠে তার। পশ্চিমের আঁকা ছক নিয়ে কাজ শুরু করেন শেষত্বক। স্রাাজ্যবাদীদের মাকড়সার মতো বিস্তৃত জাল সম্প্রসারনের দায়ীত্ব পালন করতে তৃতীয় বিশ্বের দু’একজন মানুষের মতো তিনিও হয়ে উঠলেন ‘শান্তির আরেক বিস্ময়’। নোবেলেই হয়ে উঠলেন তিনি অশান্তির প্রতিক, মায়ানমারে হিংসা ছড়িয়ে দেয়ার নতুন দূত।   
পশ্চিমের সেই শান্তির দূত ব্রিটেনে-আমেরিকায় সফর করেছেন বিভিন্ন সময়। ২০১২ সালে ব্রিটেনে সফরের সময়ও রোহিঙ্গাদের হত্যা করা হচ্ছিল মায়ানমারে। তখন ব্রিটেনে আশ্রিত রোহিঙ্গারা এখানে প্রতিবাদী হয়েছে। তখনও তিনি নির্বকার থেকেছেন। স্বাভাবিকভাবে ধরে নিতেই হবে, পশ্চিমারা তা-ই হয়ত ছাইছিলো। সেজন্যে তখন পশ্চিমারাও কিছুই বলেনি। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে ইতিহাসের এক জগন্যতম ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে মায়ানমারে এখন ক্ষমতাসীনরা। হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে তারা, কত নারী ধর্ষিতা হয়েছে, কিংবা যুবকদের কতজন হারিয়ে গেছে, তার কোন ইতিহাস পৃথিবীর কেউ পাবে না কোনদিন। মায়ানমার প্রশাসন অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে স্বীকার করেছে ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছে রাষ্ট্রীয় এই নির্যাতনে। অথচ নিহত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা কয়েক হাজার। এখনও পালাচ্ছে মানুষ, রাখাইনে এখন জনশূন্য ১৭৬ রোহিঙ্গা গ্রাম।  পশ্চিমা গনমাধ্যমে মায়ানমার উপেক্ষিতই ছিলো। আল জাজিরা ভেসে উঠছে রাখাইন আর রোহিঙ্গার গনহত্যার  কিছু চিত্র। অতি সম্প্রতি বিবিসি রিপোর্ট করেছে মায়ানমারের গণহত্যা নিয়ে। দু’একটা ঝিলিক এসেছে স্কাই টিভিতেও। ব্রিটেনের কয়েকটা পত্রিকার ভেতরের পাতায় রিপোর্ট হচ্ছে মাঝে মাঝেই। কিন্তু মূলত সোশিয়েল মিডিয়াই খোলে দিয়েছে পৃথিবীর চোখ। যদিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভৎস চিত্রের একটা অংশ জুড়ে ছিলো প্রপাগান্ডা। কিন্তু তারপরেও এটাই চন্দ্র-সূর্যের মতো সত্যি যে, বর্তমান সভ্যতায় পৃথিবীর নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ চলছে মায়ানমারে। নির্বিকার থেকে সেনাদের হত্যা-ধর্ষণ দেখছেন আর নির্দেশনা দিচ্ছেন শান্তির অল্পরী অং সাং সু চি। রোহিঙ্গা নামক জাতিটিকে নিশ্চি? করার ক্রেডিট নেবার জন্যে তিনি মরিয়া হয়ে উঠেছেন। পশ্চিমাদের পাতানো খেলায় তিনি অধিনায়কের ভৃমিকা নেবার প্রত্যয় নিয়েই শান্তির প্রচারক হয়েছিলেন তিনি। হত্যা-ধর্ষনে অধিনায়কত্ব করার কোন ক্রেডিট থাকলে তিনি তা ঠিকই পালন করছেন রক্তাক্ত হাতে। ব্রিটেনের সংসদ সদস্যরা মায়নমারে সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধের জন্যে সরকারের কাছে দাবী তোলেছেন। এমনকি সামরিক সহায়তা বন্ধেরও দাবী তোলেছেন তারা। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে মায়ানমার বিষয়ক সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটির কো-চেয়ার রুশনারা আলীর নেতৃত্বে ব্রিটিশ পরারাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে দেয়া এক চিঠিতে মায়ানমারে ইতিহাসের জগন্যতম মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্রটি তোলে ধরেছেন। তারা চিঠিতে নারী-পুরুষ-শিশুদের নৃশংসভাবে খুন মহিলাদের ধর্ষন প্রভৃতি চিত্র তোলে ধরে মায়নমারে সশস্ত্র বাহিনীর প্রশিক্ষন দেয়া থেকে ব্রিটেনকে বিরত থাকতে রাষ্ট্রের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।
 গনতন্ত্রের কথা বলা সু চি ক্ষমতায় এসেই রোহিঙ্গাদের ভোটের ব্যাপারটা অস্বীকার করলেন, এমনকি তাদের মায়ানমার কিংবা বার্মার নাগরিক বলতেই অনিহা প্রকাশ করতে লাগলেন, যা তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে কোন রাখ-ঢাক ছাড়াই বলেছেন। এবং সেসময় থেকেই মূলত রোহিঙ্গা নিধনের এজেন্ডাটি কার্যকর করতে শুরু করেন তিনি। দারীদ্র এই মানুষগুলোর সব কিছুতেই একটা সীমাবদ্ধ গন্ডি ছিলো অনেকদিন থেকেই, ভোটের অধিকার ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিলো অনেক আগেই। এদের চলা-ফেরায়ও ছিলো সীমাবদ্ধতা, শিক্ষার সুযোগকে একেবারে শেষ করে দেয়া হয়। দারিদ্রক্লিষ্ট এই রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বসতি হলেও এই এলাকা এখনও খনিজ সম্পদে ভরপুর। গ্যাস-পেট্রল প্রভৃতি সম্পদের একটা সমৃদ্ধ জায়গা এই রাখাইন। হয়ত ভারত-আমেরিকা কিংবা হয়ত ব্রিটেনেরও ঈগল চক্ষুর কারণেই সুচিকে দিয়ে তাই একটা জাতিকে স্থানচ্যুত করানো হচ্ছে। রাষ্্রীয় পর্যায় থেকে সেজন্যেই এই দেশগুলো রহস্যজনকভাবেই নিরব। এমনকি এই রোহিঙ্গাদের মাঝে হিন্দু অনেক পরিবারও খুন-ধর্ষনের শিকার হয়েছে, হচ্ছে। তবুও হিন্দুত্ববাদে উগ্র বিজেপি’র মোদী সরকারও ধৈর্য ধরেই এই খুন-ধর্ষনকে মেনে নিচ্ছে। বরং বৌদ্ধিষ্ট উন্মাদনা ছড়িয়ে দিতে পরোক্ষ সহায়তা করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।    
অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যখন তাঁর দেশের কাংখিত স্বপ্ন পূরণের জন্যে লড়ছেন, ঠিক তখনই গোটা দেশটাতেই একটা কৃত্রিম ভূমিকম্প তৈরী করে সু চি রোহিঙ্গাদের ঠেলে দিচ্ছেন বাংলাদেশের দিকে। এমনিতেই চার লাখ রোহিঙ্গা নিয়ে বাংলাদেশ এক অস্বস্থিকর অবস্থায়, ঠিক এমনি সময় আরও তিন লক্ষাধিক রোহিঙ্গাদের জায়গা দিতে হয়েছে বাংলাদেশে। এ ভার সইবে কিভাবে বাংলাদেশ ! চারদিকে হাহাকার, রক্তাক্ত নাফ নদীর পানি আর আকাশ বিদারী শিশুর চিৎকারে মানবিক আবেদনে সাড়া দিয়েছে বাংলাদেশ। সৌদিআরবের মতো তথাকথিত মুসলিম রাষ্ট্র যেখানে সু চি’র নৃশংসতার পক্ষে সাফাই গাইছে, সেখানে শেখ হাসিনা এবং তার সরকার মানবতার এক বিস্ময়কর উদাহরন-ইতিহাস সৃষ্টি করলেন সারা পৃথিবীর কাছে। ব্রিটেনের মতো দেশে গণমাধ্যমে তাইতো শেখ হাসিনা ‘মানবতার মা’। পশ্চিমা বিশ্ব সহজে কিছু দিতে চায় না। সব কিছুতেই তাদের চাওয়ার থাকে, তাদের প্রাপ্তি হিসেব করেই প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়। তাইতো সরকারের পক্ষ থেকে নয়, ‘মানবতার মা’ শব্দ দুটো থেকে উঠে এসেছ ব্রিটেনের গণমাধ্যমের নির্বিকার থাকার অনুশোচনা। এমনকি তারা যা পারে নি, একটা উন্নয়নশীল দেশের সংগ্রামমুখর সরকার তা-ই করতে পেরেছে। হয়ত সে কারনেই কোন না কোন গণমাধ্যম ’মানবতার মা’ শব্দ দুটোর মধ্যি দিয়ে তাদের অনুশোচনার এই দায়টুকু সেরেছে।  
বাংলাদেশে একটা ব্যাপার পরিস্কার যে, রোহিঙ্গা নিয়ে এবার রাজনীতি করার সুযোগ কেউ পায় নি। মানবতা মানবতা বলে চিৎকার করে সরকারের গায়ে মানবতাহীন বলে কোন দায় দেবার সুযোগ দেয় নি বাংলাদেশ সরকার। বিএনপি’র ত্রাণ আটকানো নিয়ে যে কথাগুলো জনসমক্ষে আনার চেষ্ঠা করা  হয়েছে, তা সরকারকে ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখিন করতে পারেনি। স্বাভাবিকভাবেই সরকার রোহিঙ্গাদের মনিটর করবে। কারন সারা পৃথিবীতেই শরনার্থীদের মাঝে একটা অংশ কোন কোনভাবে বিভিন্ন অপতৎপরতায় জড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন জঙ্গী গোষ্ঠী এদের ব্যবহার করতে তৎপর থাকে। বাংলাদেশেও রোহিঙ্গাদের এর বাইরে রাখার কোন সুযোগ নেই। তাছাড়া রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে রিপোর্ট মোটেই ভালো নয়, সৌদি আরবে এরা নানা অপকর্মে বিভিন্ন সময় জড়িয়েছে। এবং অপকর্মের দায়টা তখন তারা অনেক সময়ই সেখানে বাংলাদেশের উপর দিয়েছে। সেহিসেবে ত্রান মনিটর করা কোন অযৌক্তিক বিষয় নয়। সমালোচনা থাকতে পারে, যারা ত্রান নিয়ে যাচ্ছেন, রাজনৈতিক দল হোক কিংবা দেশ-বিদেশের স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন হোক সবাইকে সরকারের নজরদারীর মধ্যে রেখেই সুষ্ঠ ত্রান বন্টন করা উচিৎ।  
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের যে কঠিন সিদ্ধান্ত, তা মানবতার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। স্বাভাবিকভাবেই এটা প্রশংসিত হচ্ছে সারা বিশ্বে। আশা করা যাচ্ছে, শেখ হাসিনার সরকার এ নিয়ে কুটিৈনতক আলোচনায়ও স্বার্থকতা পেতে পারে। ব্রিটেনে দেখা যাচ্ছে, শুধু আপাতত মানবিক দিকগুলো তোলে ধরে মায়ানমারে দূতাবাসের সামনে কিংবা হাউস অব পার্লামেন্টে ধর্না দেয়া হচ্ছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে বিশ্বের দায়ের ব্যাপার খুব একটা আলোচনায় আসছে না। এখানে বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা শুধু মানবিক দায়টুকুই তোলে ধরছেন, এবং এতে করে বাংলাদেশকে একটা চাপের মাঝে রাখার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। একটা ব্যাপার উল্লেখ করতে হয়, দেখা গেছে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে ব্রিটেনে বিভিন্ন সভায়-সমাবেশে এখানকার মৌলবাদী মপযছ বর্তমান সরকারের বিরোধী গ্রুপ তৎপর। এমন কি একটা সভায় দেখা গেছে যুদ্ধাপরাধী চৌধুরী মাইনুদ্দিনও প্রতিবাদে যোগ দিয়েছেন। তার এই অংশ নেয়াটা কোন অপরাধ নয়। কিন্তু এই মিমাংসিত অপশক্তি যাতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোন অযথা চাপ সৃষ্টি না করতে পারে কিংবা বাংলাদেশের উপর দায় চাপিয়ে কোন রাজনৈতিক ফায়দা না নিতে পারে,সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সত্যি কথা বলতে কি এখানেই ব্যর্থ হচ্ছে ব্রিটেনের আওয়ামী রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টরা। রোহিঙ্গা ইস্যু’র মানবিক দায় মেটানোর সফল কারিগর শেখ হাসিনাকে নিয়ে শুধু স্তুতিই গেয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু রোহিঙ্গাদের নিয়ে সারা বিশ্বের যে দায়, কিংবা শেখ হাসিনার এই সাফল্য অব্যাহত রাখতে ব্রিটেনসহ পশ্চিমা বিশ্বের আগ্রহ সৃষ্ঠি করতে ব্যাপক উদ্যোগ নিতে যা প্রয়োজন, তা কি করতে পারছে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। আওয়ামীলীগসহ সরকারের অংশীদার রাজনৈতিক দলগুলো, এখানকার বাংলাদেশী রাজনীতি যারা করেন এবং প্রগতিশীল বলে নিজেদের বিভিন্ন সময় প্রচার-প্রচারনা চালান, তারাও এই উদ্যোগে এগিয়ে আসতে হবে। ইতিমধ্যে কুটনৈতিক তৎপরতায় ভারত কিছুটা হলেও তাদের সমর্থন দেখাচ্ছে, আমাদের শক্তি-সহযোগিতা প্রসারিত না করলে বরাবরের মতোই মৌলবাদী প্রতিক্রিয়াশীল অপশক্তি ব্রিটেনে সুযোগ নেবে। সেজন্যে অযথা তাদের সমালোচনা না করে মুক্তিযুদ্ধে পক্ষের শক্তির উদ্যোগী ভূমিকা এখানে প্রয়োজন।