Share |

রাষ্ট্রভাষা বাংলা থেকে বাংলা ভাষার রাষ্ট্র

ফরীদ আহমদ রেজা

ফেব্রুয়ারী মাস বাংলাদেশে উৎসবের মাস হিসেবে চিহিৃত। শুধু বাংলাদেশী বাঙালি নয়, পশ্চিমবঙ্গসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সকল বাঙালি জনগোষ্ঠীর কাছে মাসটি বিশেষ তাৎপর্যবহ। এ মাসে গোটা বাংলাদেশ উৎসবে মেতে উঠে। এ উৎসব ভাষার লড়াইয়ে বিজয়ের উৎসব। ভাষার লড়াইয়ে দক্ষিণ এশিয়ার একটি ছোট ও বিশ্ব মানচিত্রে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ দেশের বঞ্চিত ও নিপীড়িত জনগণ যে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে তা আজ আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সম্মানের সাথে অধিষ্ঠিত। বাঙালির ২১ ফেব্রুয়ারী জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী এখন পৃথিবীর দেশে দেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের আদি বাসিন্দা হিসেবে এটা আমাদের এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কম শ্লাঘার বিষয় নয়।
 ফেব্রুয়ারী মাস এলে স্বাভাবিক কারণেই আমরা ভাষা আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করি। ভাষার লড়াইয়ে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের সাক্ষাতকার বা স্মৃতিকথা উপভোগ করি। আমাদের আলোচনায় তারাই বেশি আসেন যারা ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক ও সামাজিক বেনিফিশিয়ারী। এমন অনেক লোক আছেন যারা ভাষা আন্দোলনের তকমা গলায় ঝুলিয়ে কোন বৈষয়িক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেননি। ভাষা আন্দোলনের গোড়াপত্তনে অসাধারণ ভূমিকা রাখার পরও তারা এর দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করেননি। সত্যিকথা বলতে কি তারাই সত্যিকার মাতৃভাষা প্রেমিক। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন হঠাৎ করে ৫২ সালে শুরু হয়ে যায়নি। ‘পাকিস্তান’ একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবার অনেক পূর্ব থেকেই আমাদের সচেতন লেখক ও বুদ্ধিজীবী রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে বক্তব্য রেখে বাংলাভাষার অবস্থান সুস্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। দুঃখের বিষয় রাজনৈতিক ডামাঢোল এবং চাপাবাজির কারণে সে সকল লেখক ও বুদ্ধিজীবীর অবদান আজকের প্রজন্মের কাছে অজ্ঞাত থেকে গেছে।
 ভাষার লড়াইয়ে যারা জীবন দিয়েছেন তাদের আত্মত্যাগই সবচেয়ে বেশী। ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদ পাঁচ জন; সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত এবং সফিউর। পার্থিব জীবনে কোন কিছু লাভ করার অনেক উর্ধে তাদের অবস্থান। কিন্তু তাদের সম্পর্কে আমাদের কৌতুহল এবং জানাশোনা খুবই সীমিত। এটা নি:সন্দেহে দু:খজনক। এর বাইরে রয়েছেন অসংখ্য জানা-অজানা ভাষা সৈনিক যারা ভাষার লড়াইয়ে অংশ নেয়ার অপরাধে দৈহিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে নিগ্রহ ভোগ করেছেন। ভাষা আন্দোলন নিয়ে আলোচনার শুরুতেই আমি তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।
ক. আসলে বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডের জনগোষ্ঠী বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে যুগ যুগ থেকে লড়াই করছে। এক সময় এ লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ ছিল আর্যরা, অন্য সময় ইংরেজরা এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানীরা। বাঙালীর হাজার বছরব্যাপী এ সংগ্রামের ইতিহাস আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। বাংলার আদি বাসিন্দাদের দ্রাবিড় নামে চিহিৃত করা হয়। সুদূর অতীতে উপমহাদেশের সর্বত্র দ্রাবিড় জাতির শাসন ও প্রভাব প্রতিষ্ঠিত ছিল। প্রতœতত্ত্ববিদ অধ্যাপক আহমদ হাসান দানীর মতে, ‘বাংগালাহ’ বলতে এক সময় এ দেশের শতকরা নিরান্নব্বই ভাগ মানুষকে বুঝাতো। পাঠান আমলে সর্বপ্রথম বর্তমান বাংলাদেশ হিসেবে পরিচিত ভূখন্ড বাংলা নাম ধারণ করে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করে। শ্রী সুখময় মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘চৌদ্দ শতকের বাংলার স্বাধীন মুসলিম সুলতান হাজী শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ প্রথমবারের মতো গংগা ও ব্রহ্মপুত্রের নিম্ন অববাহিকার ব্যাপকতর এলাকাকে ‘বাংগালাহ’ নামে অভিহিত করেন। লাখনৌতি (উত্তর বঙ্গ) ও বাংগালাকে তিনিই স্বাধীন সুলতানী শাসনের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করেন।’ (বাংলার ইতিহাসের দু’শ বছর, স্বাধীন সুলতানদের আমল, পৃষ্ঠা ২০) বাংলাদেশের এ ঐতিহাসিক পথ পরিক্রমা প্রসংগে ডক্টর নীহার রঞ্জন রায়-এর মন্তব্য হচ্ছে, ‘যে বংগ ছিল আর্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির দিক থেকে ঘৃণিত ও অবজ্ঞাত, যা ছিল পাল ও সেনদের আমলে কম গৌরবের ও কম আদরের - সেই বংগ নামেই শেষ পর্যন্ত তথাকথিত পাঠান আমলে বাংলার সমস্ত জনপদ ঐক্যবদ্ধ হল।’ (বাঙালীর ইতিহাস, আদিপর্ব)
ভারতে আর্যদের আগমন শুরু হয় খৃষ্টপূর্ব দেড় হাজার বছর আগে। সে সময় থেকেই এখানে ভাষা ও জাতিগত দ্বন্দের সুচনা হয়। রাখালদাস বন্দোপধ্যায় বাঙ্গালার ইতিহাস গ্রন্থে বলেন, ‘আর্যোপনিবেশের পূর্বে যে প্রাচীন জাতি ভূমধ্যসাগর হইতে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত স্বীয় অধিকার বিস্তার করিয়া ছিল তাহারাই বোধ হয় ঋগে¦দের দস্যু এবং তাহারাই ঐতরেয় অরণ্যকে বিজেতৃগণ কর্তৃক পক্ষী নামে অভিহিত হইয়াছে। এই প্রাচীন দ্রাবিড় জাতিই বংগ-মগধের আদিম অধিবাসী।’ বাংলার এই আদি জনগোষ্ঠী নিজেদের ভূখন্ড, সংস্কৃতি ও ভাষাকে আর্যদের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্যে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। অধ্যাপক মন্মথমোহন বসু ‘বাংলা নাটকের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ’ গ্রন্থে এ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘সমস্ত উত্তর ভারত যখন বিজয়ী আর্য জাতির অধীনতা স্বীকার করিয়াছিল, বঙ্গবাসীরা তখন সর্বমস্তক উত্তোলন করিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াইল।’ সদানীরার (করতোয়া) তীরে এসে আর্যদের বিজয় অভিযান দ্রাবিড়দের প্রবল প্রতিরোধের মুখে ব্যর্থ হওয়ার করণেই আর্য ধর্মগ্রন্থ মনু সংহিতায় বিধান দেয়া হয়, অঙ্গবঙ্গকলিঙ্গেষু সৌরাষ্ট্রমগধেষু চ তীর্থযাত্রাং বিনা গচ্ছন্ পুনঃসংস্কারমর্হতি। অর্থাৎ অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, সৌরাষ্ট্র ও মগধ দেশে কেবলমাত্র তীর্থযাত্রা ছাড়া অন্য কারণে কেউ গেলে সে পতিত বলে গণ্য হবে এবং পুনরায় প্রায়শ্চিত্ত ছাড়া জাতে ঠাঁই পাবে না। আর্য ব্রাহ্মণদের হাতেই ভারতবর্ষে লিখিত ভাষা হিসেবে সংস্কৃত ভাষার প্রচলন হয়। কিন্তু সংস্কৃত কখনো সাধারণ মানুষের ভাষা ছিলনা। কালিদাসের নাটকে আমরা দেখি সেখানে উচ্চশ্রেণীর লোকদের মুখে সংস্কৃত ভাষা উচ্চারিত হলেও বিদূষক, জেলে, মাহিলা প্রভৃতি শ্রেণীর সংলাপে প্রাকৃত ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। এই আদিম প্রাকৃত ভাষা থেকেই বাংলাভাষার বর্তমান ক্রমবিকাশ সাধিত হয়েছে।  বাংলা ভাষার উৎপত্তি সংস্কৃত ভাষা থেকে হয়েছে বলে অনেকের ভুল ধারণা আছে। এ রকম ধারণার পেছনে কোন ঐতিহাসিক কার্যকারণ বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সর্বজন শ্রদ্ধেয় বহুভাষাবিদ পন্ডিত ডক্টর মুহাম্মদ শহীল্লাহ ‘ভাষার উৎপত্তি’ প্রবন্ধে বলেন, ‘পৃথিবীতে ২৭৯৬টি ভাষা আছে। তবে এই সকল মূল ভাষা নয়। যেমন ধরুন বাংলা, আসামী, উড়িয়া, বিহারী, মারাঠী, হিন্দী, উর্দু, গুজরাটী, নেপালী, পাঞ্জাবী, সিন্ধী, কাশ্মীরী, সিংহলী এগুলি একটি মূল ভাষা থেকে জন্মেছে। সেই মূল ভাষাকে আমরা আদিম প্রাকৃত ভাষা বা কথ্য প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা বলতে পারি।’  অন্যত্র তিনি সংস্কৃত ভাষার সাথে বাংলা ভাষার সম্পর্ক নির্ণয় করতে গিয়ে বলেন, ‘বাংলার উৎপত্তি গৌড় অপভ্রংশ থেকে। সংস্কৃতের সঙ্গে তার সম্পর্কটা অতি দূরের।’ দ্রাবিড়ীয় সভ্যতার সহনশীল আবহে তদানীন্তন বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঘটে। সে সময় জনগণের মুখের ভাষা ছিল প্রাকৃত ভাষা। আর্যরা শক্তির বলে বাংলা অঞ্চল দখলে ব্যর্থ হবার পর বেদান্ত দর্শন প্রচারের উদ্দেশ্যে তীর্থযাত্রী হিসেবে এ এলাকায় আগমন শুরু করে। আর্য ক্ষত্রিয়দের সামরিক শক্তির তুলনায় ব্রাহ্মণদের ধর্মীয় প্রচারণা অধিক কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়। পরমতসহিষ্ণুতা ও সকল ধর্মের প্রতি সহনশীলতার মনোভাব বাংলা অঞ্চলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। এ কারণে ব্রাহ্মণরা সেখানে বিনা উপদ্রবে বেদান্ত দর্শন প্রচারের সুযোগ লাভ করেন। বাংলাদেশে এভাবেই বৈদিক দর্শন এবং সংস্কৃত ভাষার আগমন ঘটে যা পরবর্তীতে আর্য ক্ষত্রিয়দের আগমনের পথ প্রশস্ত করে। খৃষ্টপূর্ব চার শতকে মৌর্য এবং তারপর গুপ্ত রাজবংশ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এর আগে বাংলায় আর্যধর্ম বা সংস্কৃত ভাষার কোন প্রভাব ছিলনা। রাজশক্তি অর্জনের পর বৈদিক সংস্কৃতি এ দেশে সহনশীলতার পরিবর্তে পরমতের প্রতি আক্রমণাত্মক ভূমিকা গ্রহণ করে। আর্য ব্রাহ্মণরা জার্মান নাৎসীদের অনুরূপ দাবি করে যে তারা দেবতার আশ্রিত ও আশীর্বাদপুষ্ট। জনগণের ভাষায় তারা কথা বলতো না। জনগণের ভাষাকে তারা বলতো ‘অপভাষা’ বা ‘অসুরের ভাষা’। তারা বলতো, ‘ন ম্লেছ ভাষা শিক্ষেত’ - ম্লেছদের ভাষা শিক্ষা করো না। গুপ্তযুগের আর্যীকরণ প্রক্রিয়া শশাংকের হাতে এসে রুদ্র রূপ ধারণ করে। চরম মৌলবাদী ও ধর্মান্ধ এ রাজা নিজে ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং অন্য ধর্মের অনুসারীদের নিষ্ঠুরভাবে নির্মূল করেন। ৬৩০ সালে ভারতে আগত চীনা পরিব্রাজক হিউয়ান সাঙ শশাংক কর্তৃক প্রজা নির্যাতনের কিছুটা বিবরণ দিয়েছেন। রামাই পন্ডিতের শূন্য পূরাণেও এর বিবরণ রয়েছে। রাজা শশাংক নির্দেশ দেন, আ-সেতোর আতুষারাদ্রের বৌদ্ধানাং বৃদ্ধবালকান। যো ন হন্থি স হন্তব্যো ভৃত্যান্ ইত্যশিষন্ নৃপঃ ॥ অর্থাৎ সেতুবন্ধ হইতে হিমালয় পর্যন্ত যেখানে যত বৌদ্ধ আছে তাহাদের বৃদ্ধ ও বালকদের পর্যন্ত যে হত্যা না করিবে সে প্রাণদ-ে দ-িত হইবে - রাজভৃত্যদিগের প্রতি রাজার এই আদেশ। (শ্রী চারু বন্দোপধ্যায় : রামাই পন্ডিতের শূণ্য পূরাণ, পৃ ১২৪)। উগ্র মৌলবাদী শশাংকের বৈদিক সহিংসতার কাছে বৌদ্ধ সাধকদের নৃশংস মৃত্যু প্রকারান্তরে এ দেশের মানুষের মুখের ভাষা প্রচলনের মূলে কুঠারাঘাত করেছে। কারণ সমসাময়িককালে বৌদ্ধ পন্ডিত ও সাধকরাই ছিলেন মূলতঃ দেশীয় ভাষার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। ৭৫০ খৃষ্টাব্দে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে গোপাল নামক এক ব্যক্তি বাংলার শাসনভার গ্রহণ করেন। বাংলায় পাল বংশের শাসন এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়। পাল বংশের চারশ’ বছর বাংলা ভাষা ও লিপির ক্রমবিকাশ এবং উৎকর্ষ সাধনের যুগ হিসেবে ইতিহাসে চি?িত। পাল বংশের পতনের পর সেন রাজবংশ ক্ষমতাসীন হয়। প্রায় দেড়শ’ বছরের সেন-বর্মন-এর শাসনামল ছিল বাংলাভাষার জন্যে ঘোরতর দুর্যোগকাল। এ সময় বাংলাভাষার অবস্থা কোন্ পর্যায়ে ছিল তা ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষায়, ‘ইতরের ভাষা বলিয়া বঙ্গ ভাষাকে পন্ডিতমন্ডলী ‘দূর দূর’ করিয়া তাড়াইয়া দিতেন। হাড়ি-ডোমের স্পর্শ হইতে ব্রাহ্মণেরা যেরূপ দূরে থাকেন, বঙ্গভাষা তেমনি সুধীজনের অপাংক্তেয় ছিল, তেমনি ঘৃণার, অনাদরের ও উপেক্ষার পাত্র ছিল।’ (সওগাত, চৈত্র, ১৩৩৫)  সেন-বর্মন শাসকরা সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতার নামে বিকাশমান বাংলাভাষাকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করতে চেয়েছেন। তারা নির্দেশ জারী করেন, অষ্টাদশ পুরাণানি রামস্য চরিতানিচ ভাষায়াং মানবঃ শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ। অর্থাৎ অষ্টাদশ পুরাণ ও রামায়ন-মহাভারত যে ব্যক্তি মানুষের মুখের ভাষায় শ্রবণ করবে তার ঠাঁই হবে ভয়াবহ রৌরব নরকে। সেন রাজাদের আমলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মৌলবাদী ব্রাহ্মণদের সহিংসতার মুখে বাংলা ভাষার চরম দুর্গতির বিবরণ দিয়েছেন অধ্যাপক দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ। তিনি বলেন, ‘পাল বংশের পর এতোদ্দেশে সেন বংশের রাজত্বকালে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের চিন্তা অতিশয় ব্যাপক হইয়া উঠে ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রবাহ বিশুষ্ক হইয়া পড়ে। সেন বংশের রাজারা সবাই ব্রাহ্মণ্যধর্মী, তাদের রাজত্বকালে বহু ব্রাহ্মণ বঙ্গদেশে আসিয়া বসতি স্থাপন করে ও অধিকাংশ প্রজাবৃন্দ তাহাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করিতে বাধ্য হয়। এভাবে রাজা ও রাষ্ট্র উভয়ই বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিরূপ হইলে বাংলার বৌদ্ধরা স্বদেশ ছাড়িয়া নেপাল, তিব্বত প্রভৃতি পার্বত্য দেশে গিয়া আশ্রয় গ্রহণ করে। বাঙ্গালার বৌদ্ধ সাধক কবিদের দ্বারা সদ্যোজাত বাঙ্গালা ভাষায় রচিত গ্রন্থগুলোও তাহাদের সঙ্গে বাঙ্গালার বাহিরে চলিয়া যায়। তাই আদি যুগের বাঙ্গালা গ্রন্থ নিতান্ত দুপ্রাপ্য।’ (প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের প্রাঞ্জল ইতিহাস, অধ্যাপক দেবেন্দ্র কুমার ঘোষ, পৃ ৯-১০)  সেন রাজাদের অত্যাচারে দেশান্তরিত বাঙালি কবিদের লেখা চারখানা পুথি ১৯০৭ সালে ডক্টর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। চর্যাপদ নামক এ চারখানা পুঁথিকে বাংলাভাষার আদি নিদর্শন হিসেবে চি?িত করা হয়।
বিস্ময়ের বিষয় যে, সেন রাজাদের বাংলা বিরোধী সর্বাত্মক অভিযানের মধ্যেও কিছু লোক বাংলাভাষার চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। তারা কারা - এর একটু ইঙ্গিত দিয়েছেন ডক্টর নীহাররঞ্জন রায়। তিনি বলেন, ‘ইসলামের প্রভাবে প্রভাবান্বিত কিছু লোক বোধহয় বাংলার কোথাও কোথাও সেই প্রাকৃতধর্মী বৌদ্ধ সংস্কৃতির ধারা অক্ষুন্ন রেখেছিলেন; ‘সেক শুভোদয়া’ গ্রন্থের ভাষায় তার কিছুটা আভাস পাওয়া যায়।’ (বাঙালীর ইতিহাস, আদিপর্ব, পৃষ্ঠা ১৭৬) এর অর্থ হচ্ছে- বাংলাদেশে তখনো মুসলিম বিজয় সম্পন্ন না হলেও মুসলমানদের আগমন শুরু হয়ে গেছে এবং তারা দেশীয় ভাষা বাংলার চর্চা করা শুরু করে দিয়েছেন। ইতিহাস সাক্ষী, বখতিয়ার খলজির বঙ্গ বিজয়কে বাংলার সাধারণ মানুষ জালেম শাসকদের বিরুদ্ধে মজলুমের বিজয় হিসেবে দেখেছে। বর্ণবাদী সেন রাজাদের অত্যাচার থেকে মুক্তির আশায় বাংলার জনগণ মুসলিম শাসকদের স্বাগত জানিয়েছে। ত্রয়োদশ শতকে রামাই পন্ডিতের লেখা ‘শূন্য পুরাণ’ এবং আধুনিক গবেষক ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেনসহ অনেক লেখকের বর্ণনায় এ দিকটা আলোচিত হয়েছে। ডক্টর সেন বলেন, ‘বৌদ্ধ ও নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের আধিপত্যবাদী নির্মূল অভিযানের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে বাংলার মুসলিম বিজয়কে দু’ বাহু বাড়িয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিল।’ (বৃহৎবঙ্গ, পৃষ্ঠা ৩৩৩)। বাংলাভাষা সম্পর্কে তার মন্তব্য হচ্ছে, ‘বঙ্গভাষা মুসলমান সম্রাটদের কৃপায় দ্বিতীয়বার জন্মগ্রহণ করিয়া দ্বিজের ন্যায় সম্মান লাভ করিল।’ সুলতানী আমল সম্পর্কে শ্রী সুখময় মুখোপাধ্যায় লিখেন, ‘আলোচ্য পর্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য এই যে, এই পর্বে বাংলাদেশ একটানা দুশো বছর ধরে নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা ভোগ করেছে। এই সুদীর্ঘ কাল ধরে বাংলাদেশের সম্পদ বাংলার ভিতরেই ছিল - বাইরে যায়নি। তা ছাড়া এই পর্বের অধিকাংশ সময় বাঙালীরাই বাংলাদেশ শাসন করেছেন বলা যায়। ... ... এই পর্বে বাংলা সাহিত্যের লক্ষণীয় বিকাশ ঘটে। কয়েকজন দিকপাল কবি এই পর্বে আবির্ভূত হয়ে বাংলা সাহিত্যকে সুগঠিত ও সমৃদ্ধিসম্পন্ন করেন। তাদের অনেকেই বাংলার রাজা ও রাজকর্মচারীদের কাছে পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন। কাজেই বাংলার ইতিহাসে আলোচ্য এই পর্বটি সবদিক দিয়েই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। এই পর্বে যে সব সুলতান বাংলাদেশের শাসন করেছিলেন তাদের মধ্যে অনেকেই অসাধারণ ছিলেন।’ (বাংলার ইতিহাসের দুশো বছর : সুখময় মুখোপাধ্যায়) বাংলায় মুসলিম শাসন সম্পর্কে আরেকটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। আমরা জানি ’৫২ সালে ভাষার লড়াইয়ে বিজয়ের পরও ’৭১ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত অফিস আদালতে বাংলার প্রচলন হয়নি। কিন্তু এটা আমাদের অনেকের অজানা যে বৃটিশ-পূর্ব মুসলিম শাসনামলে কোন আন্দোলন ছাড়াই বাংলা অঞ্চলের সরকারী কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। একটা প্রচারণা রয়েছে যে, বৃটিশ-পূর্ব সময়ে মুসলমান শিক্ষিত শ্রেণী চিরকাল বাংলাকে ঘৃণা করে এসেছে এবং তারা বাংলা ভাষার পরিবর্তে ফার্সী বা উর্দুকে নিজের ভাষা হিসেবে গণ্য করতো। বাংলা ভাষা সম্পর্কে মুসলিম অভিজাত শ্রেণীর এ মনোভাব ছিল বলে যারা প্রচারণা করেন তারা সঠিক কথা বলছেন না। এর পেছনে কোন সত্যতা নেই এবং তা তথ্যভিত্তিক ও প্রমাণিত নয়। এটা ঠিক যে, মুসলিম শাসকরা উচ্চ পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় কাজে ফার্সী এবং কোন কোন স্থানে আরবী ভাষা ব্যবহার করেছেন। এর পাশাপাশি তারা শুধু বাংলাভাষা চর্চায় উৎসাহ দিয়ে ক্ষান্ত হননি, এর সাথে বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিয়ে অফিস-আদালতের বিভিন্ন কাজে এর ব্যবহার নিশ্চিত করেছেন। বিশিষ্ট গবেষক ডক্টর এস এম লুৎফর রহমান ১৭১০ সাল থেকে সরকারীভাবে বাংলা ব্যবহারের প্রায় পঞ্চাশটি নমুনা সংগ্রহ করেছেন। এ সকল নমুনা থেকে দেখা যায়- সে সময় প্রশাসনিক কাজকর্ম, বিচারালয়ে আর্জি পেশ ও হুকুমনামা জারি ইত্যাদি কাজে বাংলাভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। নবাব শায়েস্তা খানের সময় সরকারী সিলমোহরযুক্ত এ রকম একটি অনুমতিপত্র বাংলায় লেখা হয়েছে এবং সেখানে বাংলা সন-তারিখ ‘১ আষাঢ় ১০৭৪ সন’ ব্যবহৃত হয়েছে। সংগৃহীত আরেকটি নমুনা মূলতঃ আদালতের পরওয়ানা বা হুকুমনামা। সেখানে তারিখ দেয়া হয়েছে ৮ মাঘ, ১১১৩ সন। সময়টা মুর্শিদকুলি খানের রাজত্বের সময়। হুকুমনামায় শিকদারদের অত্যাচার থেকে প্রজাদের জান-মাল হেফাজতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ সকল দৃষ্টান্ত থেকে এ কথা নিশ্চয়তার সাথে বলা যায় যে, বৃটিশ-পূর্ব মুসলিম শাসনে বাংলার রাষ্ট্রভাষা ছিল দুটি- ফার্সী এবং বাংলা। কোন রকম আন্দোলন ছাড়াই বাংলার মুসলিম শাসকরা রাজকার্যে বাংলাভাষা চালু করেন।
খ. ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে মুসলমানদের জন্যে স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন তখন থেকে দানা বাঁধতে শুরু করে। কিন্তু এর অনেক পূর্ব থেকেই অর্থাৎ বিশের দশকেই ভারতবর্ষে রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে বিতর্ক শুরু হয়। শুধু বাংলাদেশ ছাড়া তখন গোটা ভারতবর্ষের সকল মুসলমান উর্দুর পক্ষে মতামত প্রকাশ করেন। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায় হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার জন্যে জনমত গঠন শুরু করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সে সময় ভারতের একমাত্র এবং সদ্য নবেল বিজয়ী কবি। তিনি পর্যন্ত ১৯১৮ সালে হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার জন্যে মোহনচান্দ করমচান্দ গান্ধীর কাছে লিখিতভাবে দাবি উত্থাপন করেন। কংগ্রেস এবং হিন্দু সমাজের দাবির সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে গান্ধীজীর ঘোষণা ছিল, স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রীয় ভাষা হবে ‘হিন্দি-হিন্দুস্থানী