Share |

রোহিঙ্গা গণহত্যা : মায়ানমারে নৃশংসতা বন্ধে সোচ্চার হতে হবে

অকথ্য নির্যাতন চলছে মায়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর। গত আগস্টের ২৬ তারিখ থেকে তাদের ওপর আবারো নেমে এসেছে অত্যাচার আর চরম নির্যাতনের খড়গ। পুলিশ চৌকিতে রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর আক্রমণের পা?া হিসেবে ‘সন্ত্রাসী নির্মূল’ অভিযানের নামে দেশটির সামরিক বাহিনী সাধারণ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর হামলে পড়ে।
রোহিঙ্গাদের ওপর আক্রমণ নির্যাতন ও তাদেরকে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছাড়া করার ঘটনা মিয়ানমার সরকারের জন্য নতুন নয়। নিজ দেশে নির্যাতন থেকে পরিত্রাণ পেতে গত চার দশকে ৫ লক্ষের ও বেশী রোহিঙ্গা শরনার্থীর বাংলাদেশে আগমনের কথা আমরা জেনেছি। কিন্তু সাম্প্রতিককালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নির্মূলের সরকারী পরিকল্পনা এতো স্পষ্ট এবং নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে যে, সেদেশের সেনাবাহিনী নির্বিকার গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ পুড়িয়ে মারছে। তাদের বর্বরতার মাত্রা এবং ধরন বর্ণনাতীত। প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যম আর সামাজিক মিডিয়ায় যেসব ছবি আসছে তা রীতিমতো ভয়ংকর। কোন সুস্থ মানুষের পক্ষে এ ধরনের অত্যাচার কল্পনাও কারও সম্ভব নয়।  
এই অত্যাচার থেকে প্রাণ বাঁচাতে গত তিন সপ্তাহে ৩ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী ইতোমধ্যে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে বলে জানা গেছে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে এই মানবিক বিপর্যয়ের ঢেউ এসে বাংলাদেশে পড়া স্বাভাবিক। এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ কাজ নয়। এতে বাংলাদেশের মতো একটি দেশে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, বাংলাদেশেও তাদের আশ্রয় মিলছে না সহজে। উ?ো নানা কথা বলা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে। বলা হচ্ছে, এরা বাঙালি নয়, এরা সন্ত্রাসী। অথচ এ দুটো বক্তব্যই সঠিক নয়। আর মৃত্যুর হাত থেকে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসা বিপন্ন মানুষকে কিভাবে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব তা বোধগম্য নয়।  
বিশেষ করে বাংলাদেশের সে অভিজ্ঞতা তাতে এইসব বিপন্ন মানুষ হয়তো আশা করেছিলো প্রাণ বাঁচাবার আশ্রয়টুকু মিলবে প্রতিবেশী এই দেশটিতে। আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কি ভুলে গেছে, মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানী হানাদারদের নির্যাতন থেকে বাঁচতে প্রতিবেশী ভারতে দেড় কোটি বাঙালির আশ্রয় লাভের কথা? গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া আর লক্ষ লক্ষ নারীর সম্ভ্রম লুণ্ঠনের ক্ষতচি? কি এই দেশ ভুলে যেতে পারে এতো তাড়াতাড়ি? অথচ মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের গণহত্যার ক্ষত নিয়েই বাংলাদেশ আজ স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার শিকার হয়েছে যে জাতি সেই জাতি যে কোন গণহত্যার ঘটনায় দৃঢ় অবস্থান নেবে সেটি আশা করা অসঙ্গত নয়। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অস্পষ্ট অবস্থান, ক্ষেত্রবিশেষে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পীড়াদায়ক।
আমরা মনে করি, বিপন্ন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে আপাতত মানুষের জীবন রক্ষা করে বাংলাদেশের মানবতা প্রদর্শন করা জরুরী। পাশাপাশি শরণার্থীদের প্রয়োজনীয় আশ্রয় ও অন্যান্য নূন্যতম চাহিদা মেটাতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে জোর দাবি তোলা প্রয়োজন।  আমাদের বোঝা দরকার, এই বিপন্ন জনগোষ্ঠী নিজ দেশের রাজনৈতিক পরিকল্পনার শিকার। জাতিসংঘ বলছে, রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার সংখ্যালঘুকে নিশ্চি? করে দেওয়ার অভিযান। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। এর বিরুদ্ধে সবাইকে দাঁড়াতে হবে। এই নৈতিক অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের দাঁড়ানো দরকার।  
সতেরো/আঠারো কোটি মানুষের দেশ আরো কয়েক লক্ষ মানুষের দায়িত্ব নিতে পারবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। মায়ানমার সরকারের প্রপাগান্ডায় বিভ্রান্ত না হয়ে আমাদের সকলের উচিত বিপন্ন মানবতার সহায়তায় এগিয়ে আসা। সুতরাং সমালোচনা নয়- এখন প্রয়োজন সমর্থন ও সহমর্মিতা এবং সর্বাত্মক সহযোগিতা।