Share |

লিথ্যুনিয়ান মুসলিম তাতারদের টিকে থাকার জীবন সংগ্রাম

মতিউর রহমান চৌধুরী  
শত শত বছর ধরে লিথ্যুনিয়ান মুসলিমরা সংগ্রামের মাধ্যমে টিকে আছে লিথ্যুনিয়ায়। তাদের এ সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি। আগামীর পথচলাকে মসৃণ করতে তারা কঠোর পরিশ্রম করছেন।  
লিথ্যুনিয়ার কাউনাস বিমানবন্দরে আমরা যখন অবতরণ করলাম তখন স্থানীয় তাপমাত্রা দুই ডিগ্রী। সুন্দর ছিমছাম পরিপাটি বিমানবন্দর। কাউনাস হলো লিথ্যুনিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। ১৯২০ সালে কাউনাস লিথ্যুনিয়ার রাজধানী ছিল। আজকের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী হলেও কখনও কখনও শীতের সময় তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ৩৩ ডিগ্রীতে নেমে যায়। আবার গ্রীষ্মের সময় কখনও তা ৩৫ ডিগ্রীতেও উঠে যেতে পারে। বিমানবন্দরে আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে এসেছেন লিথ্যুনিয়ার গ্র্যান্ড মুফতি রামাদান ইয়াকুব। আমরা এখানে যে ক’দিন থাকবো সে ক’দিন তিনিই আমাদের সহযোগিতা করবেন। সামান্য দাড়ি এবং ট্রাউজার-সার্ট পরিহিত মুফতিকে দেখলে অনেকেরই খটকা লাগতে পারে এই ভেবে যে, এ আবার কেমন মুফতি। কিন্তু তিনি সুশিক্ষিত। দীর্ঘদিন লেবানন এবং তুরস্কে লেখাপড়া করে ইসলামী জ্ঞান অর্জন করেছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে আহরণ করেছেন অভিজ্ঞতা। তিনিই ১৯৯৪ সাল থেকে লিথ্যুনিয়ান মুসলিমদের সঠিকভাবে ইসলামের চর্চায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন।
উত্তর ইউরোপীয় দেশ লিথ্যুনিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াস। আয়তন ২৫,২০০ বর্গমাইল। জনসংখ্যা তিন মিলিয়নের কাছাকাছি। মুদ্রা ইউরো এবং ব্রিটেনের সাথে সময়ের তারতম্য দুঘন্টা। মুফতির গাড়ী এবং আরও একটি গাড়ীতে করে আমরা হোটেলের দিকে রওয়ানা দিলাম। পথিমধ্যে তিনি আমাদের লিথ্যুনিয়া সম্পর্কে বর্ণনা দিলেন। তিনটি বা?িক রাষ্ট্রের একটি হলো লিথ্যুনিয়া। ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এ দেশ রাশিয়ান কমিউনিস্ট শাসনের অধীনে ছিল। এ সময় মুসলিম তাতারদের অসহনীয় নির্যাতন পোহাতে হয়। ধ্বংস ও বন্ধ করে দেয়া হয় বেশীরভাগ মসজিদ, মিউজিয়াম, সংস্কৃতি। এমনকি মুসলিম কবরস্থানও ধ্বংস করা হয়। হাজার হাজার মুসলিম তাতারকে দেশ থেকে সাইবেরিয়া, মরুভূমিতে বিতাড়ন করা হয়, যাদের বেশীরভাগই পথিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেন।
 ১৩৯৭ সালে অর্থাৎ ৬২০ বছর আগে মুসলিমরা এদেশে আসেন ক্রাইমিয়া থেকে। তাই তাদের পূর্বপুরুষ হলেন ক্রাইমিয়ার মুসলিম তাতার। মূলত গ্র্যান্ড ডিউক ভিতেতাস ঐ সময় ব্ল্যাক-সীতে মিলিটারি মহড়া সেরে আসার সময় বহু ক্রাইমিয়ার মুসলিম তাতারকে তার সঙ্গে নিয়ে আসেন লিথ্যুনিয়ার প্রতিরক্ষার জন্য। যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতার সুনাম এবং মোঙ্গলীয় বংশধর তাতাররা অত্যন্ত অনুগতও। এজন্য তাদেরকে তিনি তার দূর্গের আশেপাশেই বসবাসের সুযোগ করে দেন। যখন পশ্চিম ও দক্ষিণ ইউরোপীয় দেশগুলো মৌলবাদী খৃস্টান দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিল এবং পূর্ব ইউরোপ ইসলামের দিকে ধাবিত হচ্ছিল তখন গ্র্যান্ড ডাচি অব লিথ্যুনিয়া প্যাগান ধর্মবিশ্বাসে পরিচালিত হতো। একসময় জার্মানী তাদের খৃস্টান ধর্মবিশ্বাস লিথ্যুনিয়দের উপরও চাপিয়ে দিতে চাইল। ক্রুসেডাররা তাদেরকে ধর্মান্তরিত করতে চাইলে ভিতেতাস বিরাট সেনাবাহিনীর দল গঠন করেন এবং সে দলে মুসলিম যোদ্ধাদেরও আমন্ত্রণ জানান। ১৪১০ সালের ১৫ জুলাই দুপক্ষ জার্মানীর ট্যানেনবার্গে ব্যাটল অব গ্রানওয়া?ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। মুসলিম তাতারসহ লিথ্যুনিয়ান, পোলিশ, চেক এবং রাশিয়ান সেনাবাহিনী মিলে প্রায় ত্রিশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী ক্রুসেডারদের মোকাবেলা করে। এ যুদ্ধ ছিল ভিতেতাসের জন্য নিজের ধর্ম রক্ষার লড়াই। যুদ্ধে ভিতেতাস জয়ের মুকুট পরেন এবং মুসলিমরা ‘‘বা?িক হিরোর’’ খেতাব লাভ করেন।  
মুসলিম তাতারদের বসবাসের জন্য তিনি লিথ্যুনিয়ার ট্রাকাইর দক্ষিণে, পোলিশ শহর বেইলস্টোক এবং বেলারাশিয়ান রাজধানী মিনস্কে প্রচুর জমি দান করেন। এরপর থেকেই মুসলিমরা এসমস্ত এলাকায় বসবাস করে আসছেন প্রায় সাত শত বছর ধরে। ভিতেতাসের শাসনের সময় মুসলিমরা বিভিন্ন সরকারী উচ্চপদে চাকুরী করেন। মিলিটারীর উচ্চপদেও মুসলিম জেনারেল ছিলেন। তিনি মুসলিমদের ধর্ম পালনের পুরো স্বাধীনতা দান করেন। এখানে ১৫৫৮ সালে মসজিদ গড়ে উঠে। ফর্টি তাতার ভিলেজে মুসলিমরা সংখ্যার দিক থেকে তৃতীয় হলেও মসজিদ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য খোলা হয় না। গুরুত্বপূর্ণ দিন যেমন জুমা, ঈদ এবং জানাজার জন্য খোলা হয়। ফর্টি তাতার ও অন্যান্য উডেন মসজিদ দুভাগে ভাগ করা আছে, এক ভাগে মহিলারা এবং অন্যভাগে পুরুষরা নামাজ পড়ে থাকেন। পিছনে আছে কিছু বেঞ্চের সারি, যারা দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে পারেন না, তারা বেঞ্চে বসে নামাজ পড়তে পারবেন। বর্তমানে বিভিন্ন এলাকায় যেসকল তাতার বাস করছেন তাদের পূর্ব পুরুষরাই ছিলেন ক্রাইমিয় তাতার। একসময় লিথ্যুনিয়া এবং আশেপাশের এলাকায় লাখের উপর মুসলিমের বাস ছিল। বর্তমানে পুরো লিথ্যুনিয়ায় তা হবে মাত্র ১০ হাজারের মতো। কাউনাস এলাকায় বাস করেন মাত্র ৩০০ মুসলিম।
২০১১ সালের জুলাই মাসে আমরা বসনিয়া ভ্রমণ করেছিলাম। অনেকেরই জানা আছে ১৯৯৫ সালের ১১ জুলাই বসনিয়ার গণহত্যায় ৮ হাজারের বেশী মুসলমানকে হত্যা করে গণকবর দেয়া হয় যা সেব্রেনিস্কা ম্যাসাকার নামে পরিচিত। এখনও প্রতিবছর ১১ জুলাই ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে কিছু লাশকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং জানাজা করে আবার কবর দেয়া হয়। এরপর থেকেই আমরা এ গ্রুপ প্রতি বছর চেষ্টা করি পৃথিবীর নতুন কোন দেশ ভ্রমণ করতে। এরই অংশ হিসাবে এবার আমাদের যাত্রা উত্তর ইউরোপীয় দেশ লিথ্যুনিয়া। এবার লিথ্যুনিয়া সফরে আমাদের গ্রুপে ছিলেন জাজ বেলায়েত হোসেন, লন্ডন মেট্রোপলিটান ইউনিভার্সিটির কোয়ালিটি এনহ্যান্সমেন্ট ইউনিটের ডেপুটি হেড হাবিবুর রহমান, এলএমসি ডিরেক্টর দেলোয়ার হোসেন খান, ভিরিডিয়ান হাউজিং এসোসিয়েশনের সিনিয়র অফিসার আইউব খান, ব্রিট কলেজের সিইও মুসাদ্দিক আহমেদ, হেড অব এ্যাসেট এন্ড ফেসিলিটিস ইএলএম আসাদুজ্জামান, মুসলিম এইডের সাবেক সিইও সাইফ আহমাদ, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের এডুকেশন অফিসার আব্দুল মালিক, ব্যারিস্টার নাজির আহমেদ, ইউরোবাংলার সাবেক প্রধান সম্পাদক আব্দুল মুনিম ক্যারল, চ্যানেল এস এর চীফ রিপোর্টার মুহাম্মদ জুবায়ের, হালাল ফুড অথরিটির সিনিয়র এ্যাডমিনিস্ট্রেটর আকবার হোসেন ও অল সিজন ফুডসের ডাইরেক্টর পারভেজ আহমেদ। ২০ এপ্রিল বৃহস্পতিবার লিথ্যুনিয়ার উদ্দেশে আমাদের আমরা লন্ডন থেকে রওয়ানা হলাম।  
বিমানবন্দর থেকে মাত্র ত্রিশ মিনিটের ড্রাইভে আমরা হোটেলে পৌছে যাই। আমাদের হোটেলের নাম হলো কাউনাস সিটি হোটেল। রিসিপশনে রুম বুঝে পাওয়ার পর পরিচ্ছন্নতা সেরে আমরা দুপুরের খাবারের জন্য বেরিয়ে পড়ি। এখানে আলু, টমেটো, কিউকিম্বারের ফলন হয় বেশী। স্থানীয় তাজিকিস্তান নামের হালাল রেস্টুরেন্টে আমরা দুপুরের খাবারের জন্য যাই। স্যুপ, সালাদ, মাছ এবং ল্যাম্ব বিরিয়ানির সুস্বাদু আইটেমের মাধ্যমে আমরা খাবার সারি। খাওয়া-দাওয়ার পর আমরা কাউনাস মসজিদে যাই নামাজ আদায়ের জন্য। খুবই সুন্দর ছোট ছিমছাম মসজিদ। এ মসজিদের কাজ আরম্ভ হয় ১৯২৮ সালে, ১৯৩০ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও শেষ হয় ১৯৩৩ সালে এবং ১৫ জুলাই ১৯৩৩ সালে মসজিদ ইবাদতের জন্য খোলে দেয়া হয়। সোভিয়েত শাসনের সময় ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত মসজিদ বন্ধ ছিল। ঐ সময় এখানে সার্কাস শিক্ষা দেয় হতো এবং শিশুদের জন্য লাইব্রেরি হিসাবে ব্যবহৃত হতো। কমিউনিজমের পতনের পর প্রায় ২ বছর মেরামত কাজ সেরে ১৯৯১ সালের ৬ জুলাই মসজিদটি পুনরায় খুলে দেয়া হয়। মসজিদের সামনে মুসলিম কবরস্থান ছিল, কমিউনিস্ট শাসনের সময় তা মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়। এ সময় শুধুমাত্র মুসলিমের নয় অন্য ধর্মীয় কবরস্থানও ধ্বংস করা হয়। মসজিদ তৈরির জন্য এ জায়গা ক্রয় করা হয় ১৮৯৬ সালে এবং জায়গার পরিমাণ দুই একরের উপরে। এরপর স্থানীয় সুপার মার্কেটে কিছু কেনাকাটার পর হোটেলে চলে আসি। বৈকালিক আড্ডা এবং চা-কফি পানের পর আমরা ঘুমুতে যাই।  আজ শুক্রবার (২১ এপ্রিল)। আমরা জুমার নামাজ পড়তে যাবো আবারও কাউনাস মসজিদে। সকালে নাশতা সেরে বেড়াতে বের হই স্থানীয় আইল্যান্ডে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যঘেরা আইল্যান্ড লেকে অনেকেই মাছ ধরছেন। সকালের ফুরফুরে বাতাসে আইল্যান্ড বেড়ানো আমাদের সতেজ করে তুলে। প্রায় ১১টার দিকে হোটেলে এসে আমরা তৈরি হয়ে নেই জুমার নামাজের জন্য। মুফতি রামাদান ইয়াকুব খুৎবা প্রদান করেন। খুতবায় বিশ্ব মুসলিমের ঐক্যের কথা বলা হয়। নামাজের পর মসজিদেই খাওয়া দাওয়া এবং পরিচিতি হয়। তিনজন বাংলাদেশী ছাত্রের সাথে আমাদের দেখা হয় যারা এখানে পড়তে এসেছেন। বিকেলে কাউনাস ও? টাউনে বেড়াতে যাই। এখনও ঐ এলাকায় প্রায় পরিত্যক্ত সরকারি ও বেসরকারি ভবনগুলো পুরনো দিনের ব্যস্ততার জানান দিচ্ছে।  
আজ শনিবার আমরা লিথ্যুনিয়ার কিছু ঐতিহাসিক মুসলিম গ্রাম দেখতে যাবো। মুফতি সকাল সাড়ে ৯টায় চলে এসেছেন। আমরা নাশতা সেরে সকাল দশটায় বেরিয়ে পড়ি। ১৬ সিটের মিনিবাস প্রস্তুত রাখা হয়েছে আমাদের আজকের ভ্রমণের জন্য। যাবার পথে আমরা লিথ্যুনিয়ার প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করি। কিছু কিছু এলাকায় সবুজের সমারোহ আমাদের নজর কাড়ে। কাউনাস থেকে ৭৫ কিলোমিটারের দুরত্ব প্রায় দেড় ঘন্টার ড্রাইভে আমরা প্রথম গ্রামে আসি। এ গ্রামের নাম ‘রেইজিই’। এক সময় এ এলাকাই ছিল তাতারদের প্রধান কেন্দ্র। এখানে আছে সবচেয়ে বড় মসজিদ এবং মুসলিমদের জন্য বরাদ্দকৃত বিরাট কবরস্থান। একসময় এ গ্রামখানি ছিল পুরো মুসলিম অধ্যুষিত। ছিল হাজার হাজার মুসলিমের বাস। বর্তমানে গ্রামে কয়েকশো মুসলিম বাস করেন। কমিউনিস্ট শাসনের সময় দেশের সব মসজিদ বন্ধ করে দিলেও রেইজিই মসজিদ খোলা ছিল। প্রায় একশ বছর আগে এ মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখান থেকে কিছু দুরেই আছে বিশাল মুসলিম কবরস্থান। প্রায় ৪০০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এ কবরস্থানে লিথ্যুনিয়ার মুসলিমদের কবর দেয়া হয়। কে কত সালে মারা গেছেন এবং তার নাম ফলকে অঙ্কিত আছে। ঐ সময় ইসলাম দেশের সরকারি ধর্ম হিসাবেও গণ্য হতো। মুফতির দাদারও কবর আছে এখানে। পুরোনো কবরস্থানে ১৬২১ সালের মুসলিম তাতারের কবর আছে। সরকারই এর দেখভাল করে।  ইসলামী জ্ঞান শিক্ষা দেয়ার জন্য মুফতি এ এলাকায় প্রায় ৫/৬ বছর ধরে আসছেন। একসময় লিথ্যুনিয়া এবং আশেপাশের এলাকায় শতাধিক মসজিদ ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরেও লিথ্যুনিয়ায় ২৫টি মসজিদ ছিল। বর্তমানে আছে মাত্র ৪টি মসজিদ। ১৮শতকের দিকে তাতার ভাষা এখানে হারিয়ে যায়। মুফতি জানান, সোভিয়েত সময় আমাদের জন্য সবচেয়ে খারাপ সময় ছিল। ইসলামী পন্ডিত ব্যক্তি এবং যাদের সামান্য ইসলামী জ্ঞান ছিল তাদের হয় হত্যা করা হয় নতুবা সাইবেরিয়াতে পঠিয়ে দেয়া হয়। ইসলামী বইপত্র এবং আর্কাইভ জ্বালিয়ে ধ্বংস করা হয়। মসজিদসমুহ বন্ধ এবং ধ্বংস করা হয়। ইসলাম তথা ধর্মপালন নিষিদ্ধ করা হয়। প্রথম জীবনে রামাদানও ইসলাম সম্বন্ধে তেমন কিছু জানতেন না। যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিভিন্ন দেশের মুসলিম ছাত্ররা আসতে থাকে লিথ্যুনিয়ায়, তখন তার দৃষ্টি খুলে যায়। তিনি ইসলামী জ্ঞান আহরণের জন্য পাড়ি জমান লেবাননে। এরপর তুরস্ক এবং লিবিয়াতেও লেখাপড়া করেন। ইসলামী জ্ঞান আহরণের পর তিনি দেশে ইসলামের প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন।  
ভ্রমনের সময় মুফতি জানান, অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে কোন বড় পদক্ষেপ নিতে পারছেন না। নতুন প্রজন্মের শিক্ষা দেয়ার জন্য তিনি লিথ্যুনিয়ায় ইসলামিক সেন্টার গড়ে তুলতে চান। পাশাপাশি তিনি ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠারও স্বপ্ন দেখেন। ইসলামের জন্য তিনি যা করছেন তা শুধুমাত্র আল্লারওয়াস্তেই করছেন। মাসে ৬০০ ইউরো বেতনে একটি পরিবার মোটামুটি চলতে পারে এখানে। শিক্ষকের বেতন মাসে ৬৫০ ইউরো। এত স্বল্প বেতন হলেও জন্য কাজ পাওয়া সহজ নয়। যেজন্য অনেক লিথ্যুনিয়ান লেখাপড়া এবং কাজের জন্য ব্রিটেনে চলে আসেন। তিনি জানালেন, বর্তমানে ব্রিটেনে প্রায় অর্ধমিলিয়ন লিথ্যুনিয়ান বাস করেন।   
রেইজেইর পর আমরা চলে যাই ‘ফর্টি তাতার’ ভিলেজে। এখানেও একসময় মুসলিমরা প্রধান ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে আছে মাত্র কয়েকটি পরিবার। অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার জন্য নতুন প্রজন্ম শহরের দিকে ধাবিত হওয়ায় গ্রামের মুসলিম জনসংখ্যা কমে যাচ্ছে বলে তিনি জানান। প্রতিটি গ্রামেই মসজিদের পাশে আছে কমিউনিটি হল। কোন অতিথি আসলে এখানেই তাদের অভ্যর্থনা জানানো হয়। কমিউনিটি হলে অজু সেরে নিয়ে আমরা যাই রাস্তার ওপারের মসজিদে নামাজ আদায় করতে। প্রতিটি মসজিদেই মহিলাদের জন্য নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা আছে। কমিউনিটি সেন্টারে আমাদের জন্য দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। গরুর কিমা দিয়ে তৈরি পিঠা, পেস্ট্রি এবং কেক ছিলো খাবারের তালিকায়। এপর আমরা রওয়ানা দেই ক্রাকাই-এর উদ্দেশে। এই ক্রাকাই দূর্গেই ডিউক ভিতেতাস বসবাস করতেন। বিশ্বস্ততার সুনামের কারণে ঐ সময় রাজার অনেক দেহরক্ষী ছিলেন মুসলিম। পাশাপাশি ঐ সময় প্রায় ২৬ জন আর্মি জেনারেল ছিলেন মুসলিম। চতুর্দিকে লেকের মাঝখানে দূর্গটি দেখতে এখনও অসাধারণ লাগে। প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী দূর্গ দেখতে এখনও ভিড় জমাচ্ছেন। লেকের মাধ্যমে চতুর্দিক ঘেরাও করে ক্যাসলকে সুরক্ষিত করা হয়েছে। লেকের পানি খুবই স্বচ্ছ। শীতের সময় পানি জমে বরফ হয়ে যায়।  
দূর্গ দেখার পর স্থানীয় গিফ্ট সপ থেকে আমরা কিছু কেনাকাটা সেরে নেই। প্রায় দু’ঘন্টায় আমরা আবার কাউনাসে ফিরে আসি। পরদিন অন্য জায়গায় নির্ধারিত মিটিং থাকায় আসতে পারবেন না বিধায় মুফতি আমাদের উদ্দেশে কিছু উপদেশমূলক বক্তব্য রাখলেন। এই ক’দিন লিথ্যুনিয়া ভ্রমণে তার সহযোগিতার জন্য আমরাও তাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানালাম। পরদিন দুপুরে আমাদের ফিরতি ফ্লাইট থাকায় সকালে হোটেলে নাশতা সেরেই কাউনাস বিমানবন্দরের দিকে রওয়ানা দেই।
লেখক : সাংবাদিক, সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রদায়ক।
লন্ডন, ৩ মে ২০১৭