Share |

সাক্ষাৎকার

প্রবাস প্রকাশনীর আবাস আমাদের এখানে, লণ্ডনে। প্রতিবছরই বাংলা একাডেমীর বইমেলাকে কেন্দ্র করে এ প্রকাশনী হতে বেশ কয়েকটি বই এবং ছোট কাগজ বের হয়। প্রকাশনীটি এখানে হলেও যেহেতু মুদ্রণের যাবতীয় কাজ করান বাংলাদেশে, ফলে প্রকাশনা শিল্পের যাবতীয় যন্ত্রণা তাদের জন্য দ্বিগুণ হয়ে উঠে, এবং সেটা দূরত্বগত কারণেই শুধু নয়। সম্প্রতি এ প্রকাশনীর অন্যতম কর্ণধার কবি কাজল রশীদের সংগে পত্রিকার কথা হয়েছে তাদের কাজ সম্পর্কে। ঠিক সাক্ষাৎকার এটাকে বলা যায় না, বলা যায় তাদের কাজ সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকেই কথোপকথন। কিন্তু এর মধ্যেই উঠে এসেছে আনন্দ-বেদনার নানা কথা। পত্রিকার পাঠকদের জন্য কথোপকথনটি তুলে ধরা হলো।  
 পত্রিকা. শুরুতেই জানতে চাই, আপনাদের প্রবাস প্রকাশনীর যাত্রা শুরু হয়েছিলো কবে?
কাজল রশীদ: প্রবাস প্রকাশনী ২০০৩ সাল থেকে যাত্রা শুরু করে।  
প. কখন, কিভাবে শুরু করলেন? শুরুর দিকের সময়টার একটু স্মৃতিচারণ করুন।
কা:র: সাহিত্য কাগজ ‘শব্দপাঠ’ বের করতে গিয়ে প্রকাশনা বিষয়ে নানা অভিজ্ঞতা হয়। সেই সাথে  নবীন প্রবীণ লেখকদের সাথে একটা যোগসূত্র তৈরী হয়। ভালোমন্দ জানার সুযোগ গড়ে উঠে। এবং  সেই সূত্রে নবীন লেখকদের বই প্রকাশের নানা প্রতিবন্ধকতা চোখে পড়ে। নতুনদের বই প্রকাশে কোন প্রকাশকই সাধারণত এগিয়ে আসেন না। তাছাড়া অনেক ভালো লেখকের লেখা প্রচারবিমুখতার কারণে পাঠকের হাতে আসে না। অনেকে নিজের টাকায় বই প্রকাশের সামর্থ্যবান নন, তাদের ব্যাপারটাও আমরা ভেবেছি। এ সকল বিবেচনায় আমরা সিদ্ধান্ত নেই একটা প্রকাশনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে সীমিত আকারে বই প্রকাশ করার। এভাবেই যাত্রা শুরু ২০০৩ সাল থেকে। শব্দপাঠ এর সূত্রে আমরা তিনজন- প্রধান সম্পাদক আতাউর রহমান মিলাদ, সম্পাদক আবু মকসুদ এবং সহযোগী হিসেবে আমি প্রথম থেকেই জড়িত ছিলাম। আমাদের মাঝে আলোচনার মাধ্যমে আমি প্রবাস প্রকাশনীর দায়িত্ব নেই। তারা দু’জন শব্দপাঠ-এর দায়িত্বে থাকেন। আসলে ঘুরেফিরে তিনজনেই একে অপরের সহযোগী সবসময়।
শুরুতেই পরীক্ষামুলকভাবে আমাদের একজনের বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত হয় এবং কবি ও গল্পকার আতাউর রহমান মিলাদের গল্পগ্রন্থ ‘তোমার দেয়া দুঃখ’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে প্রবাস প্রকাশনী যাত্রা শুরু করে।
প. একজন প্রকাশক হিসেবে সে সময় ও এ সময়ের প্রকাশনা ক্ষেত্রে কতখানি পার্থক্য দেখতে পান?
কা:র: বর্তমানে প্রকাশনা শিল্পের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। প্রকাশনার মান ও গুণ দেখে সেটা বুঝা যায়। এখন যোগাযোগ মাধ্যম খুব সহজ হওয়ায় প্রকাশনার কাজও অনেকটা সহজ হয়েছে। এখন বাংলা টাইপ করে পুরো বই এখান থেকেই সেট করে শুধু ছাপা ও বাঁধাইয়ের কাজ দেশ  থেকে করানোতে ভুলভ্রান্তির পরিমাণ অনেক কমিয়ে ফেলা সম্ভব।  
প. প্রকাশনার ক্ষেত্রে কি কি প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতেন তখন?
কা:র: শুরুতে অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। প্রথমত: প্রকাশনার কাজের জন্য দেশের  প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বইয়ের কাজ করাতে গিয়ে নানারকম সমস্যা পোহাতে হতো। নিজের  চাহিদামত অনেক কিছুই করা যেতো না। তাছাড়া অভিজ্ঞতাও তেমন ছিলোনা, প্রবাসে অবস্থানসহ  সবমিলিয়ে বেশ প্রতিকূল অবস্থার ভেতর দিয়ে উঠে আসতে হয়েছে।
প. যোগাযোগ ও টেকনোলজিক্যাল উন্নতি সত্ত্বেও কি কি প্রতিবন্ধকতার শিকার হন এখনও?
কা:র: সমস্যা এখনো আছে। দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ থেকে বই আনতে বেশ সমস্যা পোহাতে  হয়। সকল ব্যয়ভার ব্যক্তিগতভাবে বহন করতে হয় বলে চাপতো থাকেই। এখনও বিপণনের ব্যপারে মাঝে মাঝে সমস্যায় পড়তে হয়।
প. মূলত কাদের বা কি ধরনের লেখা ছাপেন আপনারা?
কা:র: প্রবাস প্রকাশনী মূলত সৃজনশীল লেখকদের সব ধরনের বই প্রকাশ করে থাকে। প্রকাশনার  ক্ষেত্রে মানসম্মত ভালো লেখাকেই বিবেচনা করা হয়। নবীন ও প্রতিশ্রুতিশীলদের অগ্রাধিকার দেয়া  হয়। এর বাইরে আর্থিকভাবে অসচ্ছল লেখকদের বই প্রকাশ ও বিক্রি প্রদত্ত টাকা তাদের হাতে তুলে দেয়া। প্রকাশে আর্থিক সঙ্গতির অভাব যাদের রয়েছে সেসব ভালো লেখকদের বই প্রকাশে প্রাধান্য দেয়া হয়।
প. লেখা বাছাই করেন কিভাবে?
কা:র: লেখা বাছাইয়ের প্রথম শর্তই হচ্ছে ‘লেখক নয়, লেখাই বিবেচ্য’। প্রতিবছর অনেক পাণ্ডুলিপি  জমা হয়, সেখান থেকে লেখার গুণগত মান যাচাই বাছাই করে কোন কোন বই প্রকাশ হবে তা’  সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। শব্দপাঠ সম্পাদক কবি ও ছড়াকার আবু মকসুদ, প্রধান সম্পাদক কবি ও গল্পকার  আতাউর রহমান মিলাদ ও প্রকাশক হিসেবে আমি - এই তিনজন আলাদাভাবে প্রতিটি পাণ্ডুলিপি পাঠ  শেষে সবার মতামতের ভিত্তিতে বইগুলো প্রকাশের জন্য নির্বাচন করা হয়।
প. এ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কি কি বই ছেপেছেন আপনারা?  
কা:র: এ পর্যন্ত অনেক ভালো ভালো বই প্রকাশিত হয়েছে প্রবাস প্রকাশনী থেকে। গল্পগ্রন্থ, কাব্যগ্রন্থ, উপন্যাস, সমালোচনাসাহিত্য, ছড়াগ্রন্থ ছাড়াও সম্পাদিত সংকলনসহ তিরিশের উপরে বই প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য সম্পাদিতগ্রন্থগুলো হচ্ছে কাজল রশীদ সম্পাদিত বঙ্গবন্ধু বিষয়ক ১০০ জন কবির কবিতা নিয়ে ‘বাংলাদেশের আকাশ’, বিলেতের কবিদের কবিতা নিয়ে আতাউর রহমান মিলাদ সম্পাদিত ‘তৃতীয় বাংলার কবিতা’, আবু মকসুদ সম্পাদিত ছড়া সংকলন ‘বিলেতের ছড়া’। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত বইগুলো হচ্ছে ফকির ইলিয়াস এর কাব্যগ্রন্থ ‘গুহার দরিয়া থেকে ভাসে সূর্যমেঘ’, সৈয়দ মোহিবুল আমিনের গল্পগ্রন্থ ‘জ্যোস্নালোকে যাত্রা’, আকমল হোসেন নিপুর  উপন্যাস ‘হলুদ পাখির ডাক অথবা অন্ধকারের নদী’, স্বপন নাথের ‘চিন্তা ও জগত: সাহিত্য  সংস্কৃতি’, মোহাম্মদ নুরুল হকের ‘সমালোচকের দায়’, ইসহাক কাজলের ‘সুরমা উপত্যকার চা শ্রমিক  আন্দোলন অতীত ও বর্তমান’, বিশিষ্ট ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়ার প্রিয় বাছাই ছড়া ‘ঠিক আছে ঠিক  আছে’।
প. লন্ডনে বসে দেশে নিয়মিতভাবে বই প্রকাশ করে প্রবাস প্রকাশনী। কথা হচ্ছে, দেশের একটি নিয়মিত প্রকাশনীর সাথে আপনাদের সাদৃশ্য কিংবা বৈসাদৃশ্যগুলো কি কি?
কা:র: নিয়মিত প্রকাশনী সংস্থা ও প্রবাস প্রকাশনীর মধ্যে সাদৃশ্যের চেয়ে বৈসাদৃশ্যই বেশী। দু’টোর  কাজই হচ্ছে বই প্রকাশ করা। নিয়মিত প্রকাশনী সাধারণত বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত হয়, সেকারণে  প্রচুর পরিমাণ বইপত্র প্রকাশ করতে হয়। বিক্রি ও বিপননের সুযোগ সুবিধা পর্যাপ্ত থাকে। প্রবাস  প্রকাশনী ব্যক্তিগত অর্থায়নে পরিচালিত হয় এবং অলাভজনক বলে আমাদের সীমাবদ্ধতা অনেক।  প্রতিবছর ২/৪টা বই প্রকাশ করে থাকে।
প. এধরনের প্রবাসের প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে সরকারী কোন পৃষ্ঠপোষকতা আছে কি ? কা:র: অন্যান্য প্রকাশনীর ব্যাপারে তেমন জানা নেই, কিন্তু প্রবাস প্রকাশনী কোন প্রকার সরকারী  পৃষ্ঠপোষকতা পায় না।  
প. সরকারীভাবে যদি এধরনের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহযোগিতার দেওয়ার কথা উঠে, কি পরামর্শ থাকবে আপনার?  কা:র: শিল্প ও সাহিত্যের বিকাশ ও বিস্তারে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার অভাব সবসময়ই পরিলক্ষিত  
হয়। তারপরও যদি সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া যায় তাহলে কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অনেক  
সহজ হয়। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ের লেখকদের ভালো লেখা নিয়ে বইপত্র প্রকাশ করে তাদের মাঝে উৎসাহ উদ্দীপনা সৃষ্টি করা যায়। দুঃস্থ লেখকদের বইপত্র প্রকাশ করে আর্থিক সাহায্য করা যায়। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ছোটদের ভালো বই প্রকাশের ব্যবস্থা করা যায়।
আবার একই সঙ্গে মনে রাখা দরকার, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার জন্য তাদের নিজস্ব কিছু নিয়মনীতি মেনে চলতে হয় যা অনেক ক্ষেত্রেই প্রকাশক বা প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত করে।  
প. কোন বিশেষ ধরণের ভবিষ্যত পরিকল্পনা আছে কি আপনাদের?
কা:র: আপাতত তেমন বড় পরিকল্পনা নেই। আমাদের সীমাবদ্ধতা অনেক, চাইলেই অনেক কিছুই  করতে পারিনা। তবে ভবিষ্যতে বেছে বেছে লেখকদের পূর্ণাঙ্গ ‘রচনা সমগ্র’ প্রকাশের চেষ্টা করবো  যাতে একজন লেখককে পুরোপুরি তুলে ধরা যায়। এব্যাপারে আমরা আগেও চেষ্টা করেছি এবং এ  পর্যন্ত রম্যলেখক আব্দুল ওয়াহাব চৌধুরী, ষাটের দশকের শক্তিশালী কবি শাহজাহান হাফিজ, কবি  শহীদ সাগ্নিকের রচনা সমগ্র ১ম খন্ড প্রকাশিত হয়েছে। আগামীতে একজন লেখকের সকল লেখা  একত্র করে বের করার চিন্তা ভাবনা আছে যাতে এক বইয়ে একজন লেখকের লেখা পাঠ করা যায়।  
প. কি কি বই বেরুচ্ছে বইমেলা ২০১৬ এ?  
কা:র: এবারের মেলায় দু’টো বই বেরুচ্ছে, আকমল হোসেন নিপু’র কাব্যগ্রন্থ ‘দুঃখের কোন প্রতিবেশী  
নেই’ ও কাজল রশীদ’র কাব্যগ্রন্থ ‘উত্তর মুলাইম’।  
প. বই বিতরণ করেন কিভাবে?  
কা:র: সাধারণত ৩/৪টা প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনীর মাধ্যমে আমাদের বইগুলো বিক্রী, বিপণন ও প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। তাছাড়া দেশের পাবলিক
লাইব্রেরিগুলোতে আমাদের প্রকাশনা ফ্রি বিতরণের মাধ্যমে পাঠকের হাতে পৌছে দেয়া হয়।
পত্রিকা: কবি ও প্রকাশক, আপনাকে ধন্যবাদ আমাদের সাথে?কথা বলার জন্য। আপনাদের জন্য শুভকামনা।
কা.র: পত্রিকাকেও ধন্যবাদ এ বিষয়টি নিয়ে আমাকে কিছু কথা বলার সুযোগ করে দেবার জন্য। পত্রিকার পাঠকদের জন্য থাকলে অশেষ শুভকামনা।