Share |

সাত মার্চ :বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ ঘটনাপুঞ্জের পূর্বাপর

৭ মার্চ ১৯৭১, ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা যে প্রত্যয়দৃপ্ত ভাষণে দেশবাসীকে যেভাবে উজ্জীবিত-অনুপ্রাণিত ও সাহসী করেছিল, আজ এত বছর পরে লিখে তা বোঝানো যাবে না। সেদিন যারা শহরের কোনো না কোনো প্রান্তে এর বিশাল জনসমুদ্রের অংশ হয়েছিলেন, তারাই উপলব্ধি করেছিলেন, এ কী অভাবিতপূর্ণ দৃশ্য ঢাকার শহরের স্বতঃস্ফূর্তভাবে রূপায়িত হয়েছে! বঙ্গবন্ধু তার ভাষণের শেষ প্রান্তে চূড়ান্ত বাক্যটি উচ্চারণ করলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলেই যে দেহ ভঙ্গি তিনি করেছিলেন, এটা কতটা অর্থবহ ছিল সেটা না দেখলে বোঝা যাবে না।
কামাল লোহানী  
৭ মার্চ ঐতিহাসিক দিন। ঐতিহাসিক গুরুত্ব পেয়েছে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। দিনটি রাজনৈতিক দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে ৪৫ বছর হলো। রাষ্ট্রে এর যে তাৎপর্য ও গুরুত্ব, তা কেবল এই বাংলার মুক্তিকামী জাতীয়তাবাদি মনমানসিকতার মানুষই বুঝতে পারবেন। পাকিস্তানের মানচিত্রে এ দিন চিড় ধরেছে আর ইতিহাস নতুন বাঁক নিয়েছে। সে বাঁকে প্রচণ্ড ঘূর্ণি। সেই ঘূর্ণাবর্তে ডুবেছে পাকিস্তান। দুর্ধষ সেনাবাহিনীর দোর্দণ্ড প্রতাপ ছিল যাদের, সেই পাকিস্তানিরা নির্লজ্জ আত্মসমর্পণে বাঁধ্য হলো ‘উপেক্ষিত’ বাংলার শৌর্য্যের কাছে। মাথা নত করে দাঁড়াল ৯৬ হাজার সশস্ত্র সেনা সদস্য, অক্ষমের করুণা ভিক্ষা করে। পাকিস্তানি ‘শের’বাহিনী অকল্পনীয় পরাভব তাই ৭ মার্চ দিনটিকে আরো অর্থবহ, সমুজ্জ্বল করে তুলেছে।
৭ মার্চ একটি দিন, যার পূর্ব আছে, আছে পর এবং সেই পূর্বাপরই বাংলার সাড়ে সাত কোটি সরলপ্রাণ মানুষের মুক্তির প্রবল আকাঙক্ষা, প্রত্যাশা তৈরির ইতিহাস। সে কারণেই বোঁধহয় সব মানুষের মনে এত জিজ্ঞাসা এই দিনটি নিয়ে।

পূর্বের পর্ব
ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক শোষণ এবং শাসনের দুঃসময় আমাদের জন্য ছিল ২৩টি বছর। এই সময় হলো পাকিস্তানি জামানা। মুসলিম লীগ দুঃশাসনের জেল-জুলুম, ত্যাগ-তিতিক্ষা, শ্রেণি নয়- মানব-বৈষম্যের নির্মম যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে এই বাংলার সব মানুষকে। সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত আবহাওয়া তল্লাটটাকে কলুষিত করে ফেলেছিল। তারপর কলঙ্কিত সেই অধ্যায়ের সুযোগে সামরিক বাহিনী লালসাসিক্ত মনোবাসনা পূরণের দিন নির্ধারণ করে দেশে সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে কালো অধ্যায়ের সূচনা করল। নিপীড়ন আর বঞ্চনার নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করল সেনা বাহিনীর জান্তাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব-ইয়াহিয়া খান। সামরিক একনায়কত্ব মানুষের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেয় না, কেবলই নিজ স্বার্থসিদ্ধির কথা ভাবে এবং সেই মতো কাজও করে। জনগণ তাদের কাছে থোরাই কেয়ারের বিষয়। নির্যাতনের স্টিম রোলার চালিয়ে ‘রাজনীতি’কে শায়েস্তা করে, সংসদ ভেঙে দেয় এবং শাসনতন্ত্র জব্দ করে, নিজের খুশিমাফিক দেশ পরিচালনা করতে। কিন্তু সামরিক বাহিনীর ক্ষমতালিল্পা একজনকে অপসারণ করে আরেকজনকে গদিনশিন করে। অন্তর্দ্বন্দ্ব তাই আইয়ুব খানকে গদিচ্যুত করে তারই সেনাপতি জেনারেল ইয়াহিয়া খান ইল্পিত আসন অর্থাৎ রাষ্ট্রের অধিপতি সেজে বসার সাধ পূরণ করল। আইয়ুবি শাসনের এক দশকে দেশ ও দশের যে দূরবস্থা হলো, তার বিপরীতে ‘সদিচ্ছা’ প্রকাশ করে আবির্ভূত হলো ইয়াহিয়া। কিন্তু রাজনীতির ‘ভানুমতির খেল’ তাকে আটকে দিল নতুন এক ষড়যন্ত্রের জালে। বুঝতে পারল কি না জানি না। তবে জনপ্রিয়তা সস্তায় কেনার লোভে ‘সাধারণ নির্বাচন’-এর মহত্ত্ব দেখাতে গিয়ে ধরা খেয়ে গেল।
এদিকে বাংলার সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ছয় দফা দাবি প্রণয়ন করে দেশবাসীর অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করলে জনগণ ক্রমশ এই দাবিতে সংঘবদ্ধ হতে থাকেন। অবশেষে সামরিক শাসনকর্তা জেনারেল ইয়াহিয়া খান জনগণ নিজের আস্তা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে দেশব্যাপী সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা করলে আওয়ামী লীগ সামরিক বিধি মেনেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নেমে গেল। সামরিক জান্তা এবং পাকিস্তানের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণকারী পাঞ্জাবি কায়েমি স্বার্থবাদি মহল ভেবেছিল, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিততে পারবে না, পিপলস পার্টি সমরণায়কদের সহযোগিতায় বিজয়ী হয়ে যাবে। উ?া বুঝলি রাম। দেশের মানুষ সামরিক শাসনকে উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগকেই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয়ী করল। পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশে তো বটেই, জাতীয় পরিষদেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠনের ম্যানডেট পেয়ে গেল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান নির্বাচনে বিজয়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বলেই দিলেন, আপনিই পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু কায়েমি স্বার্থবাদি মহলের টনক নড়ে গেল। দেখল শাসন করার ভার চলে যাচ্ছে বাংলার মানুষের হাতে। তখন তারা চক্রান্ত করতে শুরু করল। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের দাবি এবং পরামর্শ হিসেবে ঢাকায় অধিবেশন ডেকেও জেনারেল ইয়াহিয়া বিশ্বাসঘাতকতা করল এবং ১৯৭১ সালের পহেলা মার্চ বেতারে ভাষণের মাধ্যমে ঢাকা অধিবেশন বাতিল ঘোষণা করল।
অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠল ঢাকা। নির্বাচিত সব প্রাদেশিক ও জাতীয় সংসদ সদস্যদের নিয়ে দলনেতা শেখ মুজিবুর রহমান বৈঠক করছিলেন সংসদে নিজেদের নীতি-কৌশল নির্ধারণের জন্য। এমন সময় খবর এল জনতার মুখে। নেতা এসে দাঁড়ালেন সমবেত মানুষের সামনে। চোখেমুখে মানুষের দীপ্ত প্রত্যাশা পার করলেন এবং প্রতিবাদ জানালেন ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশে। ডাক দিলেন হরতালের, অসহযোগের। ৭ মার্চ তিনি তার বক্তব্য এবং পূর্ববর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন, জানিয়ে দিলেন। দেশময় আগুন জ্বলে উঠল। মানুষ রাজপথে নেমে এলেন এবং প্রতিবাদে মুখর হলেন। শেখ মুজিব হলেন বঙ্গবন্ধু। পূর্ব বাংলা তখন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তো চলছে কিন্তু নিপীড়ক সামরিক জান্তার সেনাদস্যুরা প্রতিটি এলাকায় মানুষ হত্যায় মেতে উঠল। অত্যাচার বেড়ে গেল। কিন্তু দমন-পীড়নে বাংলার মানুষকে নিস্তব্ধ করে দেয়া সম্ভব হলো না। ক্ষোভে-বিক্ষোভে মানুষ যেন রাজপথেই দিনযাত্রার পাঠ গ্রহণ করলেন। তখনই উঠেছে ৗোগান : ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’ ‘তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব।’ প্রতিবাদি লড়াইয়ের বলিষ্ঠ সিদ্ধান্তে জনগণ সংঘবদ্ধ হলেন মাতৃভূমির মর্যাদা রক্ষায়। প্রতীক্ষা কেবল ৭ মার্চের, বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার অপেক্ষা।

রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চ এল
পূর্ববাংলা তো বটেই, পশ্চিম পাকিস্তান সঙ্গে তাদের দোসর রাষ্ট্রগুলো চীন, আমেরিকা, সৌদি আরবসহ অনেক দেশই উদগ্রীব-উদ্বিগ্ন, কী বলেন বঙ্গবন্ধু? ভারত প্রতিবেশী, তার গায়ে তো আঁচ লাগবে প্রথমেই, তারাও সতর্ক। শুধু কি তাই, অগণিত দেশ, দেশের সরকার, জনগণ সবাই নিশ্চয়ই শুনতে চান, ছোট্ট, এই দেশটা তাহলে কী করতে যাচ্ছে? কী বলবেন তাদের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান? মনে পড়ছে আজ থেকে ৪৫ বছর আগের ৭ মার্চ কী শোনাবেন বিজয়ী দলনেতা তার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন লাখ লাখ মানুষের এক বিশাল জনসমুদ্র। সকালেই গিয়েছিলাম প্রেসক্লাবে, সাংবাদিকের দৃষ্টি ও শ্রুতি নিয়ে আমরাও হাজির হব রেসকোর্স ময়দানে। সাংবাদিক এবং সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা আমরা কজন একই সঙ্গে যাব। ক্লাবে বসেই দেখছি খণ্ড খ- মিছিল, শুনছি প্রত্যাশিত ৗোগান। দলে দলে মানুষ যারা কোনো দলের নন তারাও পা চালিয়ে হাঁটছেন মঞ্চের কাছাকাছি জায়গা পাওয়ার আশায়। নৌকার মাঝি লগি আর বৈঠা কাঁধে, কৃষক নিয়েছেন তার লাঙ্গল, নারী নিয়েছেন ফেস্টুন, ছাত্র-যুবা গগণবিদারী ৗোগান তুলে চতুর্দিক কাঁপিয়ে বলছেন, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’। শ্রমিক বলছেন, ‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই’, কী অভাবিতপূর্ণ জনসমাগম। অবিশ্বাস্য নয়, প্রত্যাশিতই। কারণ প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিক আজ নির্দেশ নেবেন নেতার কাছ থেকে সামনে এগিয়ে চলার জন্য।
আমি আতাউস সামাদ, সলিমউল্লা, মহাদেব সাহাথ আমরা চারজন গিয়ে মঞ্চের পাশেই জায়গা করে নিলাম। নির্ধারিত সময়ের কিছু সময় পরে বঙ্গবন্ধু এলেন। সমুদ্রে উত্তাল ঢেউ উঠল। দেখলাম সহযাত্রীদের সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উঠলেন, দুহাত তুলে সমবেত জনতার দিকে হাত নেড়ে অভিবাদন ও অভিনন্দন জানালেন। তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ জনসমুদ্র স্থির হয়ে গেল। ৗোগান বন্ধ হয়ে গেল। সবাই কান খাড়া করে আছেন কী বলেন নেতা। শুরু করলেন। ভায়েরা আমার। ইয়াহিয়া তার সঙ্গে পরামর্শ না করেই ঢাকা অধিবেশন বাতিলের সমালোচনায় তীব্র প্রতিবাদ জানালেন। ১৯ মিনিটের তেজোদৃপ্ত বক্তৃতায় সেনাবাহিনী, সরকার এবং সামরিক জান্তার প্রতি নির্দেশ দিলেন। অফিস-আদালত বন্ধ থাকবে, কিন্তু নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে ব্যাংক খোলা রাখার নির্দেশ দিলেন যেন গরিব মানুষ-কর্মচারীরা বেতন তুলতে পারেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে হুকুম দিলেন, ব্যারাকে থাকার জন্য এবং মানুষ হত্যা বন্ধ করার জন্য। তিনি তাদের ব্যারাকে থাকতে নির্দেশ দিলেন কিন্তু অন্যথা হলে ‘তোমাদের ভাতে মারব পানিতে মারব’ বলে হুঁশিয়ার করেও দিলেন।... সেই ঐতিহাসিক বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও নিপীড়ক হানাদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বাংলার সরলপ্রাণ অথচ অমিততেজ মানুষের উদ্দেশ্যে তিনি নির্দেশ দিলেন, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে, পাড়ায়-মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তোল।’ রেডিও পাকিস্তান ঢাকা রেসকোর্স ময়দান থেকে তার এই ঐতিহাসিক ও জাতিসত্তা রক্ষার সংগ্রামী নির্দেশনাবলিসংবলিত ভাষণটি সরাসরি সম্প্রচারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন বেতারের বাঙালি কর্মকর্তারা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে যখন সামরিক জান্তা ওই ব্যবস্থা বন্ধ করে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার বন্ধ করে দিল, বক্তৃতার সময়ই বঙ্গবন্ধুকে মঞ্চেই জানানো হলো এই সরকারি নির্দেশনার; তখনই তিনি বেতার-টেলিভিশনের বাঙালি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের এই ভাষণ প্রচার করতে না দিতে অফিসে না যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। ফলে লোকবলের অভাবে সম্প্রচার কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দেখে নিরুপায় সামরিক জান্তা পরদিন ওই ভাষণ প্রচারের অনুমতি দিতে বাঁধ্য হয়েছিল। ৭ মার্চ ১৯৭১, ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা যে প্রত্যয়দৃপ্ত ভাষণে দেশবাসীকে যেভাবে উজ্জীবিত-অনুপ্রাণিত ও সাহসী করেছিল, আজ এত বছর পরে লিখে তা বোঝানো যাবে না। সেদিন যারা শহরের কোনো না কোনো প্রান্তে এর বিশাল জনসমুদ্রের অংশ হয়েছিলেন, তারাই উপলব্ধি করেছিলেন, এ কী অভাবিতপূর্ণ দৃশ্য ঢাকার শহরের স্বতঃস্ফূর্তভাবে রূপায়িত হয়েছে! বঙ্গবন্ধু তার ভাষণের শেষ প্রান্তে চূড়ান্ত বাক্যটি উচ্চারণ করলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলেই যে দেহ ভঙ্গি তিনি করেছিলেন, এটা কতটা অর্থবহ ছিল সেটা না দেখলে বোঝা যাবে না।
এই বাক্যটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা বাংলায় যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল এবং সংঘবদ্ধ মানুষ দৃঢ় অঙ্গীকারে দুর্লঙ্ঘ পাহাড়ের মতো উঠে দাঁড়ালেন। জনসমুদ্র থেকে উত্তাল তরঙ্গে উন্মোচিত হয়ে ছড়িয়ে পড়লেন সব মানুষ। প্রতিরোধের গণপ্রাকার গড়ে উঠেছিল সেদিন জনগণের দৃপ্ত পদচারণে। প্রাণময় উদ্বেল হয়েছিল নির্ভীক সরল মানুষের। মানুষই হয়ে উঠলেন তথাকথিত দুর্ধষ সেনাবাহিনীর প্রতিদ্বন্দ্বী দেশপ্রেমের। তাই মানুষের আকাঙক্ষা জয়ী হলো।

৭ মার্চ ভাষণের পর
পথে পথে মিছিলের প্রতিরোধ আর ঘরে ঘরে প্রস্তুতি সেই ‘দুর্ধষ’ সেনাবাহিনীর ট্যাংক, মর্টার, মেশিনগান, রাইফেলের নিরন্তর আক্রমণের মধ্যে ‘জেনে শুনে বিষ পান’ করার মতোই মানুষ যেন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতেই উদ্যত। এ যে সশস্ত্র বাহিনীর হায়েনাদের সঙ্গে দেশপ্রেমের লড়াই। বুক চেতিয়ে মানুষ রুখে দাঁড়ালেন। আধুনিক অস্ত্রের মোকাবেলায় বাঁশের লাঠি, নৌকার বৈঠা, ব্যানার, ফেস্টুনে তো হবে না। তবু যার যা ছিল তাই নিয়ে মেয়ে-মরদ-বৃদ্ধ-জোয়ান প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। অসহযোগ আন্দোলনের কী অভূতপূর্ব দৃষ্টান্তই না সৃষ্টি করলেন বাঙালি জাতিসত্তা, সেই সঙ্গে আদিবাসী জনগণের ঐক্য, আমাদের অসাধারণ গণ-ঐক্যের মহান মঞ্চ মুক্তিযুদ্ধে পৌঁছে দিল।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতায় মানুষের প্রাণ যেতে থাকল তবু পিছু হটার নয় বাংলার অকুতোভয় মানুষ। সংঘবদ্ধ মানুষের অপ্রতিরোধ্য সাহসে মুক্তির লক্ষ্যে থানা লুট করে পুরোনো রাইফেল আসতে থাকল। সাঁওতালরা হাজারে হাজারে মাতৃভূমি রক্ষায় জান কবুল করে তীর-ধনুক আর সড়কি-বল্লম নিয়ে আগ্নেয়াস্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রাণ দিয়েছেন অকাতরে কিন্তু পিছু হটেননি।
৭ মার্চেই তো ঘোষিত হলো মুক্তির, স্বাধীনতার এখন কর্তব্য আমাদের। সুতরাং নির্যাতিত মানুষের শীর্ণ দেহের পাঁজর দিয়ে যে জনযুদ্ধ শুরু হলো, তাই আমাদের বিজয়ের মুক্তিযুদ্ধে পরিণত হলো। আমরা লড়ে গেলাম। শত্রুবধে পেলাম ওদের অস্ত্র। অস্ত্র এল পরাজিত শত্রু নেতাদের কাছ থেকে। বন্ধুর সহযোগিতায় জুটল আবার প্রবাসী বাঙালিরাও সমরাস্ত্র নিয়ে এগিয়ে এলেন। প্রতিরোধের লড়াই বিভ্রান্ত করতে পশ্চিমা রাজনীতির কুটিল কুশীলব এবং সামরিক জান্তার শলাপরামর্শে নতুন চক্রান্ত পাকিরা তোলা হলো মুজিব ইয়াহিয়া সংলাপের টোপ ফেলে। কিন্তু দৃঢ়চিত্ত বঙ্গবন্ধু অনমনীয় রাজনৈতিক প্রত্যয়ে সামরিক এ চক্রান্ত ব্যর্থ হলো। তবে পাকিস্তানিরা এই সংলাপে কালক্ষেপণকে কাজে লাগিয়ে সেনা সদস্য বৃদ্ধি, গোলা-বারুদের আমদানি করে জাহাজ ভর্তি করে। আলোচনা ব্যর্থ হলে জনগণ যে ৗোগান দিয়ে আসছিলেন ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ কিংবা ‘পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’ ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’ ‘তোমার নেতা আমার নেতা, শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’ এসবই বাস্তবায়িত হওয়ার পথে আমরা প্রস্তুত তো ছিলাম এবার শত্রুবধের পালা।
৭ মার্চ সারা বাংলার সব মানুষকে পথ প্রদর্শন করেছিল শত্রুর সঙ্গে লড়ার। দেখিয়েছিল কোন পথে এগোতে হবে, কেমন করে, তারও তো নির্দেশনা ছিল বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক, নির্দেশনামূলক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে।
কামাল লোহানী: সাংবাদিক ও কলাম লেখক। বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক