Share |

স্থায়ীবাসের আবেদন প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক বিলম্ব : ভোগান্তিতে শত শত অভিবাসী

পত্রিকা রিপোর্ট
লন্ডন, ৯ অক্টোবর : ব্রিটেনে স্থায়ীবাসের আবেদন করে (ইন্ডিপেনডেন্ট লিভ টু রিমেইন) চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন শত শত অভিবাসী। আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সিদ্ধান্ত জানাতে হোম অফিসের অস্বাভাবিক কালক্ষেপণের কারণে এমন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন অভিবাসীরা। তাঁরা একদিকে আবেদনের ফলাফল কী হবে তা জানেন না, অন্যদিকে তাদের পাসপোর্ট হোম অফিসের কাছে আটক থাকার কারণে নিজ দেশে ভ্রমণেও যেতে পারেন না। এতে আত“ীয় স্বজনের জন্ম মৃত্যু থেকে শুরু করে পারিবারিক জীবনের সুখ-দুঃখের নানা ঘটনা থেকে তাঁরা বঞ্চিত হন। আবার অনেক ক্ষেত্রে আবেদনকারীরা কাজের অনুমতি না থাকার নিজের চলার ব্যবস্থা করতেও হিমশিম খান।  গত ৩ অক্টোবর বিবিসির এক প্রতিবেদনে স্থায়ীবাসের আবেদনকারীদের এমন দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরা হয়।  
অভিবাসন নিয়ে কাজ করেন এমন আইনজীবীরা হোম অফিসের আচরণকে অমানবিক আখ্যায়িত করে বলেছেন, যেসব অভিবাসী ব্রিটেনে স্থায়ীভাবে বসবাসের আবেদন করেন তাদের বেশির ভাগই বৈধভাবে ব্রিটেনে অবস্থান করেছেন। হোম অফিস বলছে, জটিলতা আছে এমন আবেদনের ক্ষেত্রে তাদের একটু বেশি সময় লাগে। তবে ভুক্তভোগীরা অস্বাভাবিক বিলম্বের জন্য হোম অফিসের ভুল এবং গাফিলতিকে দায়ী করছেন।  বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের জুলাই পর্যন্ত আবেদনকারীদের সিদ্ধান্ত জানার জন্য সর্বোচ্চ ৭১৯ দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। আর একই সময়ে সর্বোচ্চ ১০০১ দিন পর্যন্ত আবেদনপত্র ফেলে রাখার ঘটনা ঘটেছে।  
যুক্তরাজ্যে যারা টানা ১০ বছর বৈধ উপায়ে বসবাস করেন তারা স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করতে পারেন। আবার যারা নির্ধারিত আয়ের শর্ত মেনে পাঁচ বছর ওয়ার্ক পারমিটে থাকেন তারাও স্থায়ী হওয়ার আবেদন করতে পারেন। প্রতি বছর বছর হোম অফিস অন্যান্য ভিসা আবেদনের পাশাপাশি স্থায়ীবাসের আবেদনের ফিও অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়েছে। চলতি বছরেরর ৬ এপ্রিল থেকে স্থায়ীবাসের আবেদনের জন্য একজন আবেদনকারীকে ২ হাজার ২৯৭ পাউন্ড ফি গুনতে হয়। অথচ ওই আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হোম অফিসের খরচ হয় মাত্র ২৫২ পাউন্ড। পূর্ব লন্ডনের একটি ব্যাঙ্কুয়েটিং হলে ওয়েইটার হিসেবে কাজ করেন মোহাম্মদ সাইফ। তিনি স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে বাংলাদেশ থেকে ব্রিটেনে আসেন। লন্ডনে তাঁর স্ত্রী এবং এক সন্তানও আছে। ১০ বছর ব্রিটেনে বৈধভাবে থাকার পর তিনি স্থায়ী হওয়ার আবেদন করেন। সেই আবেদনের পর  প্রায় ১০ মাস পার হয়েছে কিন্তু হোম অফিসের সিদ্ধান্তের কোনো খবর নেই।
সাইফ পত্রিকাকে বলেন, তিনি স্টুডেন্ট ভিসায় ছিলেন। এরপর স্থায়ী হওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। সাধারণত ৬ মাসের মধ্যে আবেদনের সিদ্ধান্ত জানানোর কথা থাকলেও এখনো সিদ্ধান্ত পাননি। তবে হোম অফিস এক চিঠিতে তাঁর আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগবে বলে জানিয়েছে। কিন্তু তা কতদিন সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলেনি।  আবার আবেদন সম্পর্কে কোনো অনুসন্ধান না করতে পরামর্শ দিয়েছে হোম অফিস।  সাইফ বলেন, স্টুডেন্ট ভিসার নিয়ম অনুযায়ী তাঁর বর্তমানে কাজ করার কোনো অনুমতি নেই। কেননা, নতুন ভিসা হাতে আসার আগ পর্যন্ত আগের ভিসার নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে চলতে হবে। তিনি বলেন, বৌ-সন্তান নিয়ে তাঁকে বেশ কষ্টে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। পরিস্থিতির কারণে তিনি অল্প অর্থের বিনিময়ে বিয়ের অনুষ্ঠানে ওয়েটার হিসেব কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।  
স্থায়ী বসবাসের অনুমতি হাতে পেলে তিনি দ্রুত মূলধারার কোনো কোম্পানিতে কাজ পেয়ে যাবেন বলে আত“বিশ্বাসী।   অভিবাসন বিষয়ক আইনজীবী হারজাব সিং ভঙ্গল বিবিসিকে বলেন, হোম অফিসের এমন কালক্ষেপনের কারণে হাজার হাজার পরিবার ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অথচ এসব আবেদনকারীদের অনেকেই বৈধভাবে ব্রিটেনে ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে বসবাস করেছেন। এই আইনজীবী বলেন, দিনে দিনে আবেদনের ফলাফল পেতে যেসব আবেদনকারী বাড়তি ফি দিয়ে প্রিমিয়াম সার্ভিসের জন্য যান, তাদের আবেদনের সিন্ধান্তও চার মাসের বেশি সময় ধরে ঝুলিয়ে রাখার ঘটনা ঘটছে। আবেদনকারীরা বিপুল অর্থ ফি বাবদ দেয়া সত্ত্বেও ভাল সেবা পাচ্ছেন না বলে মন্তব্য করেন এই আইনজীবী।  
জ্যান ডোফেল নামে আরেক ইমিগ্রেশন বিষয়ক আইনজীবী বিবিসিকে বলেন, হোম অফিসের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কালক্ষেপ, আপিল হিয়ারিংয়ে ক্ষেত্রে বিলম্ব করা-এসব হচ্ছে ইমিগ্রেন্টদের জন্য কঠোর একটি পরিবেশ তৈরির অংশ। ইমিগ্রেন্ট ভোগান্তির বৃদ্ধির মাধ্যমে বিতাড়নের উদ্দেশ্যে এমনটি করা হয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।   
২০১৫ সালে পার্লামেন্টারি ও হেলথ সার্ভিস অম্বাডসম্যান হোম অফিসের গাফিলতি এবং সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার দুর্বলতাকে কালক্ষেপনের জন্য দায়ী করে।  লেবার দলীয় শ্যাডো হোম সেক্রেটারি ডায়ান অ্যাবোট বিবিসিকে বলেন, হোম অফিসের উচিত এসব অভিযোগের বিষয়ে পরিষ্কার জবাব নিয়ে হাজির হওয়া। তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দল ব্রেক্সিট নিয়ে তাড়াহুড়ো করে হোম অফিসের উপর বাড়তি কাজ চাপিয়ে দেয়াকেও বিলম্বের জন্য দায়ী করেন তিনি। তবে আবেদন প্রক্রিয়ায় বিলম্বের জন্য ব্রেক্সিটকে দায়ী করার অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে হোম অফিস।  হোম অফিসের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, সিদ্ধান্ত প্রদানে বিলম্বের কারণে আবেদনকারী এবং তাদের পরিবারের যে ভোগান্তি হয়, সে বিষয়ে হোম অফিস অবগত আছে। তবে তারা সম্ভাব্য দ্রুততার সাথে আবেদন নিষপত্তির চেষ্টা করে।  হোম অফিসের কাছে সঠিক সিদ্ধান্ত প্রদানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান ওই মূখপাত্র।  
ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দল মোট ইমিগ্রেশনের সংখ্যা বছরে এক লাখের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য পূরণে কাজ করছে। আগামী বছরের মধ্যে ব্রেক্সিট পরবর্তী ইমিগ্রেশন আইন কেমন হবে তা নির্ধারণে কাজ করছে সরকার। এ বিষয়ে পরামর্শ দেয়ার জন্য সরকার ইতিমধ্যে ইমিগ্রেশন এডভাইজরি কমিটিকে (এমএসি) দায়িত্ব দিয়েছে। তারা চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ব্রেক্সিট পরবর্তী ইমিগ্রেশন আইনের রূপরেখা উপস্থাপন করার কথা।