Share |

পুলিশের অপহরণ বাণিজ্য এবং কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব

রাষ্ট্রীয় আইনশৃৃখলা রক্ষা ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানই হচ্ছে একটি দেশের পুলিশবাহিনীর প্রধান কাজ। অপরাধীদের বিচারের সম্মুখীন করে সমাজে শান্তি ও শৃৃখলা রক্ষার দায়িত্ব তাদের হাতেই ন্যস্ত। কিন্তু বাংলাদেশে বিষয়টি যেনো একেবারেই উ?ো। জনগণের ট্যাক্সের অর্থে প্রতিপালিত এই বাহিনীর সদস্যরা দিন দিন অপহরণ, হত্যা আর দুর্নীতিতে কেমন বেপরোয়া হয়ে উঠছে তা গত সপ্তাহের দুটি ঘটনা নতুন করে আমাদের জানান দিয়ে গেলো।  
প্রথম ঘটনার নায়ক এক পুলিশ সুপার। ফরিদপুরের এসপি সুভাষ চন্দ্র সাহা ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা উপার্জনের অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। ১৯টি এফডিআরে তাঁর সঞ্চিত টাকার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা। দুদকের দায়ের করা মামলার এজাহার অনুযায়ী আইনশৃৃখলার রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপদে আসীন এই ‘রক্ষক’ অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন লঙ্ঘন করেছেন। ২০১৩ থেকে ২০১৭- এই চার বছরেই এই বিশাল অর্থের পাহাড় জমিয়েছেন তিনি। আর এসব অপরাধী কর্মকাণ্ডে সহায়তা করছেন এসপির করিৎকর্মা স্ত্রী রীনা চৌধুরীও।  
দ্বিতীয় ঘটনাটি রিপোর্ট হয়েছে দুদিন পর ২৬ অক্টোবর। ঘটনাটি কক্সবাজারের। টেকনাফের কম্বল ব্যবসায়ী আব্দুল গফুর কক্সবাজার গিয়েছিলেন আয়কর রিটার্ন জমা দিতে। কাজ শেষে খাওয়ার জন্য রেস্টুরেন্টে ঢুকলে গোয়েন্দা পুলিশের পরিচয় দিয়ে কয়েকজন তাকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর তার কাছে এক কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবী করা হয় গোয়েন্দা পুলিশের অফিসে নিয়ে গিয়ে। এরপর চোখ বেঁধে নির্যাতনের পর দরকষাকষি এবং?ক্রসফায়ারসহ নানা হুমকি-ধামকি দিয়ে ১৭ লক্ষ টাকায় রফা। এরপরও ‘মৃত্যুকূপ’-এর ঠিকানাও দেখানো হয় তাকে।
তবে পুলিশের এই রমরমা অপহরণ বাণিজ্যে বাধ সেধেছে সেনাবাহিনী। আব্দুল গফুরের ভাই ১৭ লক্ষ টাকা চাঁদাবাজ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করার পর বিষয়টি অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পে অবহিত করলে টাকাসমেত ডিবির সাত পুলিশ সদস্য সেনাসদস্যদের হাতে আটক হন।
কতটুকু মাত্রায় বেপরোয়া হলে পুলিশ এমন কুকর্মে লিপ্ত পারে তা সহজেই অনুমেয়। অতীতে এই এলাকার পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির বহু অভিযোগের পরও কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়না। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার কারণেই তাদের সাহস বেড়েছে। এরা বেপরোয়া হয়ে উঠছেন।
পৃথিবীর এমন কোন দেশ নেই কিংবা সমাজ নেই সেখানে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে না। দেশে দেশে আইনশৃৃখলা বাহিনীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ ওঠে। কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে সভ্য দেশে এসবের প্রতিকার হলেও বাংলাদেশে অভিযোগের কোন সুরাহা হয়না। পুলিশ হোক আর সরকারী কর্মকর্তা হোক - দুর্নীতি করে, অপরাধ সংঘটিত করে উচ্চমহলের সহায়তায় এবং প্রশ্রয়ে এরা বহাল তবিয়তেই থাকে। ফলে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এবং অপরাধীরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠে।  
বাংলাদেশে পুলিশের এই কুকর্মগুলো এমন এক সময় প্রকাশিত হয়েছে যখন দেশটিতে ‘কমিউনিটি পুলিশের ডে’ উদযাপিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, দশ বছর আগের পুলিশ আর এখানকার পুলিশ এক নয়। তিনি ঠিকই বলেছেন, তবে পরিহাসের বিষয় হলো- পুলিশের ব্যাপারে মানুষের আস্থা গত দশ বছরে কমেছে বৈ বাড়েনি। সৎ কর্মকর্তা এই বাহিনীতে থাকলেও সার্বিকভাবে পুলিশবিভাগের মান-মর্যাদা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা এখন তলানীতে। আগে অসৎ ও দুর্নীতিবাজ পুলিশ কোন মামলার সূত্র ধরে কিংবা অপরাধীর কাছ থেকে উৎকোচ আদায় করতো। এখন তারা মিথ্যা ঘটনা সাজিয়ে সাধারণ মানুষকে নির্যাতনের মুখে ফেলে মুক্তিপণ আদায়ে নেমে পড়েছে।  
এধরনের একটি ঘটনাই সভ্য সমাজের কেঁপে ওঠার জন্য যথেষ্ট। আমরা আশা করবো, এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় যথাযথ পদক্ষেপ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের সর্বোচ্চ মহল নেবে।