Share |

লণ্ডন টাইগার্স : সবার জন্য স্বপ্নপূরণের পৃথিবী গড়তে চায়

টাইগার। বনের এ প্রাণীটিকে অনেকেই সাহসের প্রতীক হিসেবে বিচেনা করেন। এ প্রাণীটিরই সবচেয়ে সুন্দর একটি প্রজাতির সাথে জড়িয়ে আছে বাংলার নাম। ডোরাকাটা রয়েল বেঙ্গল টাইগার যেনো বাঙালির সাহসিকতারই প্রতীক। তাই যেখানেই টাইগার শব্দটি থাকে কান খাড়া হয়ে যায় বাংলাদেশের।  লন্ডন টাইগার্সের সাথেও জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম। বাংলাদেশ থেকে দূরে থাকা বাংলাদেশের একদল উত্তরসূরির স্বপ্নের নাম লন্ডন টাইগার্স। এ স্বপ্নের শুরু হয়েছিলো ১৯৮৬ সালে। মেরিলিবোন ফুটবল ক্লাব নামে স্থানীয় পর্যায়ের ছোট্ট একটি ফুটবল ক্লাব হিসেবে এর যাত্রা শুরু। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা থেকে একদল তরুণ এর জন্ম দিয়েছিলো যাদের হৃদয়ে ভালোবাসা ছিলো তাদের পিতৃপুরুষের দেশ বাংলাদেশের জন্যও। একদম ছোট্ট পরিসরে শুরু হওয়া সে স্বপ্নটি এখন লন্ডন টাইগার্স নামের বিশাল বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। নর্থ ওয়েস্টমিনস্টারের আপার স্কুলের মাঠে ট্রেনিং নিয়ে লন্ডন টাইগার্স নামের যে স্বপ্নের যাত্রা তাদের আজ নিজেদের মাঠ আছে। ঝুলিতে জমা আছে অনেক সাফল্য। সেদিনের সেই নড়বড়ে ক্লাবটি অনেক পথ পাড়ি দিয়ে এখন লন্ডন টাইগার্স নামের প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠান। লন্ডন টাইগার্সের এ সাফল্য শুধু তাদের নিজেদেরই নয় এ সাফল্য বাংলাদেশেরও। বিলেতের বুকে এ ক্লাবটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশেরই একটি পরিচয়।  
একটি তথ্যে সকলের চোখ হয়তো কপালে উঠে যাবে, লন্ডন টাইগার্সই একমাত্র দল যে বাংলাদেশকে এনে দিয়েছে কোনো আসরে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের শিরোপা। তাও আবার যে সে শিরোপা নয় একেবারে ফুটবলের বিশ্বকাপ। হোক না সেটা প্রতীকী প্রতিযোগিতা। লন্ডন টাইগার্সের কল্যাণেই সে প্রতিযোগিতায় সবার উপরে উঠেছিলো বাংলাদেশের পতাকা। লন্ডনের ইনার সিটি ফুটবল বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে এ ক্লাবটি ছিনিয়ে এনেছিলো বিজয়ীর খেতাব। সে প্রতিযোগিতার রোল অব অনারে ২০০১ সালের বিজয়ী হিসেবে এখনও জ্বলজ্বল করছে বাংলাদেশের নাম। আর একই টুর্নামেন্টে ১৯৯৯ ও ২০০৪ সালের রানার্সআপ হিসেবেও বাংলাদেশের নাম লিখা আছে।
ব্রিটেনের আকাশে লন্ডন টাইগার্স নামের এ স্বপ্নটিকে ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনের মূল কারিগর হচ্ছেন মেসবা আহমদ নামের এক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি। মেসবা আহমদের জন্ম বাংলাদেশের সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার নিদনপুর গ্রামে। বাবার হাত ধরে ১৯৭২ সালে তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। সেখানেই লেখাপড়া সম্পন্ন করেন। বাবা হাফিজ উদ্দিন ছিলেন ব্রিটেনে বাংলাদেশি কমিউনিটি আন্দোলনের একজন অগ্রসেনানী। সে সুবাদে কমিউনিটির মানুষের সুখ-দুঃখের অনেক গল্প কৈশোরেই জানা হয়ে যায় মেসবা আহমদের। কমিউনিটির দুঃখ-দুর্দশার গল্পগুলো তার কিশোরমনে গভীর দাগ ফেলে। তখন থেকেই মূলত কমিউনিটির জন্য কিছু করারস্বপ্নটি বাসা বাঁধে মেসবা আহমদের মনে।  
মেসবা আহমদ যখন যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান তখন সেখানে বাংলাদেশিদের ভিত মোটেও শক্ত ছিলো না। জীবনসংগ্রামে ব্যচ্চ মানুষগুলো অনেক সুযোগ-সুবিধার খবরই রাখতেন না। কোনো রকমে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাটাকেই তারা অনেক কিছু মনে করতেন। তাদের কোনো স্বপ্ন ছিলো না, আশা ছিলো না। নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা পেয়েই তারা সন্তুষ্ট ছিলেন। ব্রিটিশদের মতো তাদের সন্তানরাও যে সব রকম সুযোগ-সুবিধার দাবিদার সে ভাবনাটাও অনেকের মাথায় তখন ছিলো না। তাই ব্রিটিশ বা অন্য কমিউনিটির শিশুরা যখন স্কুলের শেষে খেলার মাঠে ফুটবল নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে তখন বাংলাদেশি পরিবারের একই বয়সী সন্তানটি রেস্টুরেন্টে বাবার কাজে সহায়তা করতে ব্যচ্চ ছিল। তবে সবার ক্ষেত্রে যে এমনটি ঘটেছে তা নয়। যারা সচেতন ছিলেন তারা ঠিকই নিজেদের অধিকার বুঝে নিয়েছিলেন। তাদের সন্তানরা আর সবার সাথে খেলার মাঠে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছে। মেসবা আহমদ সেই সৌভাগ্যবানদেরই একজন। ফুটবলপাগল মেসবা আহমদ স্কুলের শেষে ফুটবল নিয়ে মাঠে দাপাদাপি করেছেন। ফুটবল খেলেছেন সেমি-প্রফেশনাল পর্যায়ে। তবে শুধু নিজের সুখেই তৃপ্ত হতে পারেননি মেসবা। তিনি দেখেছেন নিজে যে সুযোগ পেয়েছেন তারই পাশের ঘরের তারই বয়সী কোনো ছেলে হয়তো অভিভাবকের অসেচতনতায় বা বেখেয়ালের কারণে সে সুযোগটি পায়নি। তাদের সকলের জন্য সুযোগ করে দিতেই মেসবা আহমদের হাত ধরে জন্ম হয় মেরিলিবোন ফুটবল ক্লাবের। স্থানীয় পর্যায়ের এ ছোট্ট ক্লাবটিই কমিউনিটির বঞ্চিত শিশু কিশোরদের সামনে স্বপ্নের দুয়ার খুলে দিয়েছিলো।  
ফুটবল ক্লাব হিসেবে যাত্রা শুরু হলেও লন্ডন টাইগার্স একসময় যুক্ত হয়ে পড়ে নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে। পিছিয়ে পড়া কমিউনিটির মাঝে স্বপ্ন ছড়িয়ে দেওয়ার স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৩ সালে  চ্যারিটি স্ট্যাটাস অর্জন করে এ প্রতিষ্ঠানটি। তারপর থেকে ‘সবার জন্য স্বপ্নপূরণের পৃথিবী’ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে লন্ডন টাইগার্স। লন্ডন টাইগার্স এখন শুধু লন্ডনেই সীমাবদ্ধ তাও নয়। এর সীমানা এখন অনেক বড়। যুক্তরাজ্যের অন্যান্য শহর ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। সংগঠনটির ৩ হাজার নিবন্ধিত সদস্যদের সহযোগিতার ফল এখন ভোগ করছেন বিশ্বের নানা প্রান্তের প্রায় ১০ হাজার মানুষ।  
শুধু বাংলাদেশি কমিউনিটি নয় পিছিয়ে পড়া অন্যান্য কমিউনিটির মানুষদের জন্যও কাজ করছে লন্ডন টাইগার্স। মূলত খেলাধুলার মাধ্যমে কিশোর-তরুণদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পথ তৈরি করে দেওয়াই লন্ডন টাইগার্সের লক্ষ্য। সুযোগ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কিশোর-তরুণরা যাতে বিপথে চলে না যায় এ লক্ষ্যেই কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রথমে ফুটবল দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও এখন ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন খেলাও যুক্ত হয়েছে লন্ডন টাইগার্সের তালিকায়। সাফল্যও ধরা দিচ্ছে নিয়মিতই। ফুটবলের পাশাপাশি ইতোমধ্যেই যুক্তরাজ্যের সেরা এশিয়ান ক্রিকেট দলের খেতাবও অর্জন করে নিয়েছে লন্ডন টাইগার্স। লন্ডন টাইগার্সের রয়েছে অনুর্ধ্ব-৭ থেকে সেমি প্রফেশনাল ফুটবল টিম, আর ক্রিকেটের ক্ষেত্রে রয়েছে জুনিয়র থেকে অ্যাডা? পর্যন্ত সব পর্যায়ের টিম। ছেলেদের নিয়েই নয় লন্ডন টাইগার্স ভাবছে মেয়েদের নিয়েও। খেলাধুলার সাথে মেয়েদেরকে সম্পৃক্ত করতে ক্রিকেট টিম রয়েছে ক্লাবটির। মেয়েরা এখনও প্রফেশনাল পর্যায়ে না খেললেও ঠিকই জানিয়ে দিচ্ছে তারা তৈরি হচ্ছে আগামীর জন্য।  
অংশগ্রহণই নয় খেলাধুলাকে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজেও যুক্ত রয়েছে লন্ডন টাইগার্স। ক্যাপিটাল কিডসের সাথে লন্ডন টাইগার্স যৌথভাবে আয়োজন করছে লন্ডন সিক্সেস ক্রিকেট প্রতিযোগিতা। যে প্রতিযোগিতাটি মিডলস্ক্সে ক্রিকেট বোর্ডের অনুমোদনে ও ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের সহায়তায় অনুষ্ঠিত বার্ষিক এ প্রতিযোগিতাটি একমাত্র আন্তর্জাতিক সিক্স এ সাইড ক্রিকেট প্রতিযোগিতা যা কমিউনিটি পর্যায়ের ক্রিকেটারদের সুযোগ করে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটারদের সাথে খেলার। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ান কমিউনিটির নতুন প্রজন্মকে উৎসাহ প্রদানের জন্য প্রতিষ্ঠান দুটি ২০১৪ সাল থেকে আয়োজন করছে টি টুয়েন্টি এশিয়া ব্লেজ। ইংল্যান্ড, ওয়েলস, মিডলসেক্স ও এসেক্সের ক্রিকেটের সহযোগিতায় আয়োজিত প্রতিযোগিতায় প্রতিনিধিতত্ব থাকে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, আফগানিচ্চান ও ইংল্যান্ডের।  
লন্ডন টাইগার্সের কার্যক্রম পূর্ণতা পায় ২০১৩ সালে এসে। ওই বছরের ২৫ জুলাই পশ্চিম লন্ডনের ইলিং কাউন্সিলের কাছ থেকে স্পাইক্সব্রিজ পার্ক স্পোর্টস কমপ্লেক্সটি বুঝে পায় ক্লাবটি। অনেক দিনের স্বপ্ন ও চেষ্টার ফসল হিসেবেই এ স্পোর্টস কমপ্লেক্সটির দায়িত্ব লন্ডন টাইগার্সের হাতে উঠে আসে।  পরের মাঠে খেলার কারণে নিজেদের সব ভাবনা-পরিকল্পনাকে ঠিকমতো মেলে ধরতে পারছিলো না লন্ডন টাইগার্স। স্পাইক্সব্রিজ পার্ক স্পোর্টস কমপ্লেক্সটি স্বপ্ন বাচ্চবায়নের নতুন সুযোগ  করে দেয়। বিভিন্ন কমিটির কিশোর তরুণদের স্বপ্ন মেলে ধরার প্লাটফর্ম হিসেবে গড়ে উঠার পথে স্পাইক্সব্রিজ পার্ক নতুন মাত্রা এনে দেয় লন্ডন টাইগার্সকে।  
স্পাইক্সব্রিজ নামের যে পার্ক এক সময় অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য ছিলো লন্ডন টাইগার্সের কল্যাণে সেটি আজ কিশোর-তরুণদের স্বপ্নভূমিতে পরিণত হয়েছে। মাদক আর গ্যাং সংস্কৃতির কারণে যে পার্কটির দুর্নাম ছিলো গোটা লন্ডনজুড়ে এখন সেটি যুক্তরাজ্যের সফল একটি স্পোর্টস ভেন্যু। ২০১৫ সালের নভেম্বরে ১ হাজার প্রতিযোগীর মাঝ থেকে লন্ডন টাইগার্স স্পোর্টস কমপ্লেক্সটি জিতে আউটস্ট্যান্ডিং লন্ডন স্পোর্টস ভেন্যু অ্যাওয়ার্ড। স্পাইক্সব্রিজে লন্ডন টাইগার্স স্পোর্টস কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এখানে রয়েছে ইয়ুথ ক্লাব, ফুটবল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, ক্রিকেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, উইমেন্স ফিটনেস প্রোগ্রাম। স্পোর্টস কমপ্লেক্সের সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে ৩টি ঘাসের পিচ, ১টি থ্রিজি আর্টিফিশিয়েল পিচ, ২টি এইট/নাইন এ সাইড থ্রিজি আর্টিফিশিয়েল পিচ, ১টি সেভেন এ সাইড ঘাসের পিচ, ৪টি সিক্স এ সাইড থ্রিজি আর্টিফিশিয়েল পিচ, ৩টি ক্রিকেট লেন, ১টি কাউন্টি ক্রিকেট পিচ, একটি এনটিপি ক্রিকেট পিচ, ইনডোর হল, ড্যান্স স্টুডিও, রান্নার সুবিধাসহ ক্লাব হাউজ, চেঞ্জিং রুম, কার পার্কিং। লন্ডন টাইগার্সের সদস্যদের পাশাপাশি যে কেউ চাইলে ভাড়া নিয়েও এ সুবিধাগুলো ভোগ করতে পারেন।  সব মিলিয়ে লন্ডন টাইগার্স হয়ে উঠেছে পিছিয়ে পড়া কমিউনিটিগুলোর আশার বাতিঘর। সুযোগ থাকলেও নানা প্রতিকূলতার কারণে যারা খেলাধুলা বা অন্য কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারছিলেন না কিংবা যারা ইচ্ছে থাকলেও নিজেদের সন্তানদের ডানা মেলে উড়ে বেড়ানোর পথ তৈরি করে দিতে পারছিলেন না তাদের জন্য সম্ভাবনার দুয়ার মেলে ধরেছে লন্ডন টাইগার্স। লন্ডন টাইগার্সের স্বপ্নও এমনই। তাদের চাওয়া এই সময়ের শিশু-কিশোররা যেনো সুযোগের অভাবে হারিয়ে না যায়।
  ৩ নভেম্বর, ২০১৭
  মেইডেনহেড, বার্কশায়ার,
  লেখক : একাউন্টিং পড়ার পাশাপাশি যুক্তরাজ্যে একটি চ্যারিটি সংগঠনে কর্মরত।