Share |

জনসভায় খালেদা জিয়া : হাসিনার অধীনে নির্বাচন নয়

ঢাকা, ১৩ নভেম্বর : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না, হতে পারে না। দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। হাসিনার অধীনে তো হবেই না। নির্বাচন হতে হবে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। সেই নির্বাচনে জনগণ যেন নির্বিঘেœ-নির্দ্বিধায় ভোটকেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে, সেরকম সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতকরণে ম্যাজেস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। আওয়ামী লীগের প্রস্তাব অনুযায়ী নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতির ব্যবহার করা যাবে না। ৭ নভেম্বরের ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে রবিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপি আয়োজিত বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে খালেদা জিয়া এসব কথা বলেন।
বিকাল চারটা ১০ মিনিটের দিকে বক্তব্যের শুরুতে খালেদা জিয়া সমাবেশে লোকজন যেন আসতে না পারে সেজন্য সরকার বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, আমিও যাতে সমাবেশে আসতে না পারি, জনগণের সামনে উপস্থিত হতে না পারি-সেজন্য আমি বাসা থেকে রওনা হওয়ার পর গুলশান দুই নম্বর চত্বরে সড়কের ওপর চালকবিহীন খালি বাস রেখে বাধা সৃষ্টি করা হয়। এছাড়া নেতা-কর্মীদের বাড়িতে, বিভিন্ন হোটেলে পুলিশ তল্লাশি চালিয়েছে। যানবাহন বন্ধ করে দিয়েছে।
সমাবেশে উপস্থিত নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে প্রশ্ন রেখে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আপনারা বলুন-শেখ হাসিনার অধীনে কি সুষ্ঠু নির্বাচন হবে?’ এসময় সমস্বরে নেতা-কর্মীরা বলে ওঠেন ‘না, না; হবে না।’ এরপর তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘হাসিনার অধীনে নির্বাচন হলে আপনারা কি ভোট দিতে পারবেন?’ এবারও নেতা-কর্মীদের জবাব, ‘না, না, পারবো না।’ এরপর বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগের গুন্ডাবাহিনী থাকে, আর পুলিশ সেটা পাহারা দেয়। মানুষ ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে না, কেন্দ্র থেকে অন্যদের এজেন্ট বের করে দেয়। ক্ষমতায় থাকার জন্য এ সরকার আরেকটি একদলীয় নির্বাচন চায়। সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, নিরপেক্ষ নির্বাচন দিয়ে যাচাই করুন মানুষ কী চায়। নিরপেক্ষ নির্বাচন দিয়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা যাচাই করুন, আমরাও যাচাই করতে চাই। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদেরও বলতে চাই, আপনারা যদি সত্যিকারের নেতা হয়ে থাকেন তাহলে জনগণের কথা শুনুন, জনগণের পাল্স বোঝার চেষ্টা করুন।
আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপি প্রধান আরও বলেন, জনগণের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। এজন্য নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন হতে হবে। এ সরকারের অধীনে স্থানীয় নির্বাচনে পর্যন্ত কারচুপি হয়েছে, আমাদের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র পর্যন্ত জমা দিতে পারেননি, শিক্ষকদের নির্বাচনেও এরা চুরি করে। সেখানে জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। যারা চুরি করে ও জনগণকে পাশ কাটিয়ে ভোটে জিততে চায়, তারা জনগণের সামনে আসতে ভয় পায়। কারণ চুরি করে জেতার মধ্যে কোনো আনন্দ নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তো ছিল এই আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের, দাবি আদায়ে তারা ১৭৩ দিন হরতাল করেছে। তিনি বলেন, আমরা জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে চাই। দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সুশাসন, জবাবদিহিমূলক সরকার ও সংসদ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে চাই।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, আপনারা সরকারের কথা শুনতে পারেন, তবে অন্যায় আদেশ মানতে পারবেন না। দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার দায়িত্ব আপনাদের। নির্দলীয় সরকার হতে হবে। ইভিএম চলবে না। সেনাবাহিনী মোতায়েন করা না হলে আওয়ামী লীগের গুন্ডারা ভোটকেন্দ্র দখল করে নেবে, মানুষকে অত্যাচার-নির্যাতন করবে।
সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, এ সরকার আপনাদের ভয় দেখাচ্ছে-বিএনপি এলে আপনাদের চাকরি যাবে। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আপনাদের পদায়ন ও পদোন্নতি হবে যোগ্যতা-দক্ষতার ভিত্তিতে, সেখানে রাজনৈতিক পরিচয় দেখা হবে না।
জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, আমাদের রাজনীতি জাতীয় ঐক্যের। এজন্য আমি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলাম। মত-পথের পার্থক্য থাকবে, কিন্তু জনগণ ও দেশের স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তাহলেই দেশের উন্নয়ন করা সম্ভব। রাজনীতিতে সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে চাই। দেশে গণতন্ত্র থাকতে হবে, কথা বলার অধিকার থাকতে হবে। আজ এসব অনুপস্থিত। যতদিন এসব না হবে ততদিন সত্যিকারের গণতন্ত্র ফিরে আসবে না। প্রধান বিচারপতির পদ থেকে এস কে সিনহার পদত্যাগ প্রসঙ্গ টেনে খালেদা জিয়া বলেন, দেশে আজ বিচার বলে কোনো জিনিস নেই। প্রধান বিচারপতিকে অসুস্থ বানিয়ে জোর করে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর তিনি দেশে ঢুকতে চেয়েছিলেন, ঢুকতে দেওয়া হয়নি। বিদেশেও গোয়েন্দা সংস্থার লোক পাঠিয়ে চাপ দিয়ে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। কারণ তিনি কিছু সত্য কথা বলেছিলেন। তিনি (এস কে সিনহা) বলেছিলেন- সরকার নিম্ন আদালতকে নিয়ন্ত্রণ করছে, এখন উচ্চ আদালতকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এই সত্যটি বলেছেন বলেই তাকে বিদায় নিতে হয়েছে।
সরকারের সমালোচনা করে বিএনপি প্রধান বলেন, দেশে সরকার বলে কিছু নেই। এই সরকার ও সংসদ সম্পূর্ণ অবৈধ। ২০১৪ সালের যে নির্বাচন, সেটা কোনো নির্বাচন হয়নি। ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হয়ে গেছেন। অনেকে নাকি নিজেরা নির্বাচনই করেননি, তারপরেও এমপি। বাকিরা নিজেরাও নিজেদের ভোট দিতে ভোটকেন্দ্রে যাননি। তারা পাঁচ শতাংশ ভোটও পাননি। তিনি বলেন, বিরোধী নেতা হলেন রওশন এরশাদ, তার দলের লোকেরা বিরোধী দলেও আছেন আবার সরকারের মন্ত্রীও। এটা কেমন করে হয়! কাজেই সংসদে এখন কোনো বিরোধী দল নেই।
ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, ফখরুদ্দীন-মইনের সময় কত অত্যাচার-নির্যাতন হয়েছে! আমি এক বছর জেলে ছিলাম। পরিবার নিয়ে দেশের বাইরে চলে যাওয়ার জন্য বলেছিল। আমি বলেছি, দেশের বাইরে যাব না, এই দেশ আমার ঠিকানা, এদেশের মাটি ও জনগণের সঙ্গেই আমি থাকবো। তারা আমার দুই সন্তানকে নির্যাতন করেছে। একজন পঙ্গু, আরেকজন মৃত্যুবরণ করেছে। তিনি বলেন, এবার আমি যখন চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাই তখন অপপ্রচার চালানো হয় যে- আমি নাকি আর দেশে ফিরবো না। আমার ঠিকানা এই দেশ ও জনগণ, আমি সেটা প্রমাণ করেছি। সরকারের লোকজনের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরে খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগের অপকর্মের শেষ নেই। এদের সময়ে নারী-শিশু নির্যাতন কয়েকগুণ বেড়েছে, চলন্ত বাসেও নারীরা আজ নিরাপদ নন। এরাই বাসে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে জীবন্ত মানুষ হত্যা করেছে। এবার আমার সফরের সময়ও এরা ফেনীতে বাসে আগুন দিয়েছে ও বোমা মেরেছে। এরা আমাদের নেতা-কর্মীসহ বহু মানুষকে গুম-খুন করেছে। বিদেশিরা সব জানে, তারা বলার পরেও সরকার গুম-খুন বন্ধ করছে না। আওয়ামী লীগকে এই গুম-খুন বন্ধ করতে হবে। এ সরকারের লোকজন জনগণের সম্পদ লুট করছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় আসে শেয়ারবাজার লুট হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের লোকেরা অর্থ পাচার করে সুইস ব্যাংকে জমা করছে। ২০১৫ সালে শুধু এক বছরে সুইস ব্যাংকে এদের জমার অর্থ বেড়েছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। গত ১০ বছরে এরা সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা পাচার করেছে। রাস্তা-ব্রিজ নির্মাণের নামে তিন/চার গুণ বেশি অর্থ নিয়ে যাচ্ছে। পদে-পদে তারা দুর্নীতি করছে। অথচ দুদক এদের ধরে না, তদন্ত দূরের কথা-দুদকের চোখটাও তাদের দিকে যায় না। আর আমরা কিছু না করা সত্ত্বেও দুদক শুধু আমাদের পেছনে লেগে আছে।
আগামীতে সরকার গঠন করতে পারলে বিএনপি কি কি করবে তা তুলে ধরে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, আমরা ইতোমধ্যে ‘ভিশন-২০৩০’ ঘোষণা করেছি। আমরা ক্ষমতায় গেলে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ফিরিয়ে দেব। সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করব। যারা এক বছরের বেশি বেকার থাকবে তাদেরকে বেকার ভাতা দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে সবার জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু করা হবে। স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করা হবে। গ্রামের মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবো, যেন গ্রামের মানুষ শহরমুখী না হয়। দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে মানবসম্পদের উন্নয়ন করা হবে।
খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, এ সরকার ও আওয়ামী লীগের ভয় জনগণ আর বিএনপিকে। সংঘাত সৃষ্টি করে তারা এই জনসভা পণ্ড করতে চেয়েছিল। সরকারকে বলবো- বাধা দেবেন না, আপনারাও একটা জনসভা ডাকুন- আমরাও ডাকি, চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি- দেখুন কার জনসভায় লোক বেশি হয়। তিনি বলেন, এই জনসভাকে কেন্দ্র করে দলের বহু নেতা-কর্মীর গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি তাদের মুক্তি চান। এছাড়া আবদুস সালাম পিন্টু ও লুৎফুজ্জামান বাবরসহ দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি থাকা দলের নেতাদের অবিলম্বে মুক্তি দাবি করেন। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে তিনি রাশিয়া, চীন ও ভারতসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।