Share |

অফস্টেডের ঘোষণা: হিজাব নিয়ে প্রশ্ন করা হবে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের

পত্রিকা রিপোর্ট
লন্ডন, ২৭ নভেম্বর : ইংল্যান্ডের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘অফিস ফর স্ট্যান্ডার্ডস ইন এডুকেশন, চিলড্রেন্স সার্ভিসেস এন্ড স্কিল্স’ (অফস্ট্যাড) ঘোষণা দিয়েছে যে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষার্থী হিজাব পরিধান করে তাদেরকে হিজাব বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে। অফস্ট্যাডের পরিদর্শকরা হিজাবি শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চাইবে- কেন তারা হিজাব পরিধান করছে। গত ১৯ নভেম্বর অফস্টেডের প্রধান অ্যামান্ডা স্পাইলম্যান এমন ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার পর যুক্তরাজ্যে হিজাব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। মুসলিম কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলছেন যে, হিজাব পরা মেয়েদের আলাদা করে এমন প্রশ্ন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা চরম বৈষম্য।  
বাংলাদেশি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে নতুন মাত্রা পেয়েছে এ হিজাব বিতর্ক। অফস্টেডের এই নতুন নিয়ম কার্যকর ঠেকাতে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের মেয়র জন বিগসের কাছে কিছু দাবি তুলে ধরে একটি পিটিশন চালু হয়েছে। ইন্ডিপেনডেন্ট গ্রুপের নেতা রাবিনা খানের চালু করা ওই পিটিশনে দাবি করা হয়, মেয়র জন বিগস যাতে অফস্টেডের কাছে চিঠি লেখেন, যাতে তারা হিজাব নিয়ে প্রশ্ন করার এই উদ্যোগ থেকে সরে আসে। মুসলিম কমিউনিটি ও এর নেতৃস্থানীয় সংগঠনগুলোর ব্যাপকভিত্তিক মতামত যাচাইয়ের জন্য মেয়র জন বিগস যেন অফস্টেডের কাছে অনুরোধ জানান। সোমবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত এ পিটিশনে এক হাজার ৮০ জন স্বাক্ষর করেছেন।  অফস্ট্যাডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চার-পাঁচ বছর বয়সের মুসলিম ছাত্রীদের হিজাব পরালে সেটি ‘সেক্সুয়ালাইজেশন’ হিসাবে অনেকে ব্যাখ্যা করতে পারে; সেই পরিস্থিতি এড়াতেই তাদের এই উদ্যোগ। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মুসলিম ছাত্রীদের আলাদাভাবে বেছে নেয়ার কারণে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেনসহ মুসলিম কমিউনিটির বিভিন্ন অংশ।
প্রাইমারী স্কুলের মুসলিম ছাত্রীদের হিজাব/স্কার্ফ পরিধানের বিষয়ে জানার জন্য যে ঘোষণা এসেছে তা এখনও সুপারিশ আকারে রয়েছে। সুপারিশটি করা হয়েছে অফস্ট্যাডের পরিদর্শকদের প্রতি। এখনও সেটি নথিভূক্ত হয়নি। গত সপ্তাহে অফস্ট্যাডের প্রধান আমান্দা স্পিলম্যানের সাথে বৈঠক করেন স্কুলে হিজাব পরিধানের বিরোধী ক্যাম্পেইনাররা। বৈঠকে ছিলেন স্যোশাল অ্যাকশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশনের কো-ডাইরেক্টার আমিনা লৌন। সেই বৈঠকের পরই অফস্ট্যাডের প্রধান আমান্দা স্পিলম্যান স্কুল পরিদর্শকদের প্রতি বিতর্কিত ওই আহবানটি জানান। আমান্দা স্পিলম্যান বলেন, অধিকাংশ ইসলামি শিক্ষকের মতে, মেয়েরা বয়ো:সন্ধিকালে পৌঁছালে হিজাব পরিধানের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু চার-পাঁচ বছরের মেয়েদের হিজাব/স্কার্ফ পরিয়ে দিলে সেটি ‘সেক্সুয়ালাইজেশন’ হিসাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন অনেকে। সেই পরিস্থিতি এড়াতেই জিজ্ঞাসাবাদের ওই আহবান জানানো হয়েছে বলে জানান স্পিলম্যান। তিনি বলেন, নিজেদের সংস্কৃতিতে ছেলে-মেয়েদের বড় করার বিষয়টিকে শ্রদ্ধা করার পাশাপাশি যদি প্রাইমারি স্কুলের ছাত্রীদের হিজাব পরিধানের একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়, তাহলে বিষয়টিকে অনেকেই ছোট মেয়েদের ‘সেক্সুয়ালাইজেশন’ হিসাবে দেখতে পারে। তিনি বলেন, এই উদ্বেগ দূর করতে এবং স্কুলগুলো ঠিকভাবে ইকুয়েলিটির পলিসি অনুসরণ করছে কিনা সেটি পরিমাপ করতে স্কুল পরিদর্শকরা হিজাব/স্কার্ফ পরিধানের বিষয়ে জানার চেষ্টা করবেন। তিনি আরো বলেন: কোনো মৌলবাদী গ্রুপ স্কুলের নীতি নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করছে কি-না কিংবা ইকুয়েলিটি আইন ভঙ্গ করছে কি-না, সে বিষয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হলে তা সংশ্লিষ্ট স্কুলকে অভিযোগ আকারে জানানোর জন্য অথবা সরাসরি অফস্ট্যাডকে জানানোর জন্য অভিভাবক ও সাধারণ জনগণের প্রতি আহবান জানিয়েছেন স্পিলম্যান।
তবে অফস্টেডের এ নিয়ম চ্যালেঞ্জ হতে পারে মন্তব্য করে কেউ কেউ বলছেন, স্কুলকে প্রশ্ন না করে শিক্ষার্থীদের কেন প্রশ্ন করা হবে। শিক্ষার্থীরা নিশ্চয়ই স্কুলের বেঁধে দেয়া  ড্রেসকোড অনুযায়ী পোশাক পরিধান করে। ফলে বিষয়টিতে স্কুলকেই জবাবদিহি করা উচিত। এই যুক্তিতে অফস্টেডের পরিকল্পনাকে বোধহীন এবং বৈষম্যমূলক বলে  আখ্যায়িত করেছেন জ্যান ট্রাস্টের প্রধান সাজদা মোগল। তিনি বলেন, অফস্টেডের এমন বিতর্কিত নীতির কারণে উগ্রবাদীরা মুসলিম শিশুদের মনে- আমরা বনাম তারা- মনোভাব ঠুকিয়ে দেয়ার সুযোগ পাবে।
মানবাধিকার ক্যাম্পেইনার আয়শা আলী খানও এ বিষয়ে স্কুলকে জবাবদিহি করার আহবান জানিয়ে বলেন, বয়সন্দিক্ষনের আগে ইসলামও মেয়েদের হিজাব পরানোর কথা বলেনি। ফলে স্কুলগুলো কেন ছোট ছোট শিশুদের হিজাব পরানোর অনুমোদন দিচ্ছে তার জবাব স্কুলগুলোরই দেয়া উচিত।  তবে সোস্যাল একশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশনের আমিনা লোন বলেন, হিজাবের ব্যাপারটি শিশু এবং শিশুর মায়ের সিদ্ধান্তের ব্যাপার।  ব্রিটেনের স্কুলগুলোতে ধর্মীয় পোশাক পরিধানের বিষয়ে কোনো ধরাবাধা নিয়ম নেই। স্কুলগুলোই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। ন্যাশনাল সেকুলার সোসাইটির এক জরিপ মতে, ব্রিটেনের ২৭টি প্রাইমারি স্কুলসহ মোট ১৪২টি ইসলামিক স্কুলের ৫৯টি স্কুলের ইউনিফরমে হিজাব বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।  
২০১৪ সালে বার্মিংহাম থেকে ‘ট্রজান হর্স’ কেলেঙ্কারি নামে একটি ইস্যু বিস্তার লাভ করে দেশজুড়ে। তখন অভিযোগ উঠেছিল যে, সরকারী স্কুলগুলোতে ইসলামিক প্রভাব বাড়ানো হচ্ছে। এরপরই ডিপার্টমেন্ট অব এডুকেশন এবং অফস্ট্যাড স্কুলগুলোলোতে ব্রিটিশ মূল্যবোধ শিক্ষাদানের উপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। সম্প্রতি বার্মিংহামের আরেকটি সরকারী ইসলামিক স্কুলকে ঘিরে শুরু হয়েছে আইনী লড়াই। ওই স্কুলে ছেলে ও মেয়েদের আলাদাভাবে বসিয়ে পাঠদানের কারণে অফস্ট্যাড তাদের রিপোর্টে স্কুলটিকে ‘ইনএডিকুয়েট’ হিসাবে শ্রেণিভূক্ত করে। এর বিরোধিতা করেই আইনী লড়াইয়ের শুরু। ২০১৪ সালেরই আরেকটি ঘটনায় একটি ইসলামিক স্কুল পরিদর্শনের সময়ে নয় বছরের শিক্ষার্থীকেও সমকামীতা বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গী জানতে চেয়েছিলেন স্কুল পরিদর্শকরা। অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের এমন প্রশ্ন করার বিষয়টিকে মেনে নিতে পারেননি।