Share |

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য-জটিলতা

পূর্ব লন্ডনের বাঙালি পাড়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের মাত্র এক বছরের মাথায় বিষয়টি নিয়ে বিব্রতকর এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। টাওয়ার হ্যামলেটসের সিডনী স্ট্রীটে ব্যক্তিউদ্যোগে স্থাপিত এই ভাস্কর্যটি নানা অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্থানীয় কাউন্সিল এখন সরিয়ে নেওয়ার নোটিশ জারি করেছে। সিডনি স্ট্রীটের একটি বাড়ির সামনের বাগানে স্থাপিত বঙ্গবন্ধুর এই ভাস্কর্যটি গত বছরের ডিসেম্বরে লন্ডনে নিযুক্ত হাইকমিশনের কর্মকর্তা ও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে প্রয়াত মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর বাংলাদেশের অনেক মন্ত্রী-নেতা লন্ডনে এলে ভাস্কর্যে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে গেছেন। কিন্তু কেউই বঙ্গবন্ধুর মতো একজন বিশাল ব্যক্তিত্বের ভাস্কর্য ব্যক্তিউদ্যোগে একটি আবাসিক বাড়ির সামনে স্থাপন কতটুকু সঙ্গত হয়েছে কিংবা এর ভবিষ্যৎ কী তা নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলেননি। এ ভাবনা উদ্যোক্তার মনে এসেছিলো কি না আমরা জানি না। তবে এখনকার সৃষ্ট পরিস্থিতি সকল বাঙালির জন্যই বিব্রতকর। স্থানীয় কাউন্সিল বলছে, এই ভাস্কর্য স্থাপনে কর্তৃপক্ষের প্ল্যানিং নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে। একটি ভাস্কর্য স্থাপনের আবেদনে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের কথা উল্লেখ ছিলো না। ফলে এটাকে ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতা হতে পারে সে ব্যাপারে কাউন্সিল অবগত ছিলো না। ভাস্কর্য স্থাপনকারী লন্ডন আওয়ামী লীগ নেতার দাবি হচ্ছে- তিনি আবেদনে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের কথা উল্লেখ না করলেও কাউন্সিল কর্মকর্তাদের মুখে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। ধারণা করা যায়, বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি এ কাজটি করেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের স্থাপনের মতো এতো তাৎপর্যপূর্ণ একটি কাজ করতে গিয়ে তিনি কেনো এই গাফিলতি করলেন। এই তথ্য না দেওয়ায় ভবিষ্যতে ঝামেলা হতে পারে এটি তাঁর হিসেবে থাকা উচিত ছিলো। একই সাথে কাউন্সিল জানতো না বলে এখন দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। আমরা মনে করি, ভাস্কর্যের আকার যেমন তারা নির্দিষ্ট করে দিয়েছে তেমনি এখানে কি ধরনের কিংবা কার ভাস্কর্য স্থাপনের অনুমতি কর্তৃপক্ষ দিতে যাচ্ছে সেটিও স্পষ্ট করা তাদের দায়িত্ব ছিলো। এটি বলা অপেক্ষা রাখে না যে, সেই দায়িত্ব পালনে তারা ব্যর্থ হয়েছে।  আমরা মনে করি, এখন কিছু অভিযোগের প্রেক্ষিতে ভাস্কর্য সরানোর নোটিশ দিয়েই দায়মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করতে পারেনা কাউন্সিল। ভাস্কর্য স্থাপনকারী একজন ব্যক্তি। তিনি ভুল করেছেন সেটি মেনে নিয়েও বলা যায় অনুমতি দেওয়ার বেলায় এই পুরো বিষয়টি কাউন্সিল কর্তৃপক্ষও ভালো করে খতিয়ে দেখেনি বলেই এখন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে টানাহেচড়া করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।  উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সরানোর নোটিশ মোকাবেলা করতে হবে আইনী পথেই। কিন্তু এতে সফল না হলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াবে? বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য এখান থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে? এটি হবে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি অবমাননার নামান্তর। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা, দেশটির স্বাধীনতার স্থপতি। নানা রাজনৈতিক বিভক্তি ও বাদানুবাদ সত্ত্বেও কোটি কোটি মানুষের কাছে এই ব্যক্তিটি শ্রদ্ধার এবং ভালোবাসার। বাঙালি জাতির এই নেতার স্থাপিত ভাস্কর্য কারো হঠকারিতায় হঠাৎ করেই নাই হয়ে যাবে - এটি মানা কঠিন।   আমাদের দাবী হচ্ছে- যদি আবাসিক এলাকা থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সরিয়ে নিতেই হয় তবে তার আগে সেটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত কোন স্থানে পুনর্স্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে কাউন্সিলকে। বাংলা পাড়া অর্থাৎ টাওয়ার হ্যামলেটসের কোন পার্কে এটি পুনর্স্থাপনের ব্যবস্থা করাই হবে বেশি যুক্তিযুক্ত। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকলে এটি করা সম্ভব। আর এটি একান্তই সম্ভব না হলে এদেশে বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের স্মৃতিময় ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ সেন্টারের সামনে এটি স্থাপনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলকে ঐ এলাকার স্থানীয় কাউন্সিলকে রাজী করানোর দায়িত্বটুকু নিতে হবে।  আমরা বিশ্বাস করি, টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র এই জটিলতা নিরসনে যে সম্মানজনক সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন তা রক্ষায় তিনি সচেষ্ট হবেন। তবে এই উদ্যোগে বাঙালি কমিউনিটির সকলের সমর্থন ও সহযোগিতা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে - এর সাথে সমগ্র বাঙালী কমিউনিটির মান-মর্যাদার প্রশ্নটি জড়িত।