Share |

শিক্ষকদের আন্দোলন

অজয় দাশগুপ্ত  
বছর দুয়েক আগে বাংলাদেশে অষ্টম পক্ষে স্কেল বাস্তবায়নের সময় কারও কারও প্রত্যাশা ছিল- বেতন-ভাতার মোট পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় সব পর্যায়ে দক্ষতা, কর্মোদ্দীপনা বাড়বে, দুর্নীতি-অনিয়ম কমবে। সৎ চিন্তা, মহৎ আকাক্ষায় দোষের কিছু নেই। বরং এমন চিন্তা-আকাক্ষার প্রকাশ যাতে বেশি বেশি ঘটে- সেটাই কাম্য। বেতন বা আয় বাড়লে যদি সব মানুষ সততার বরপুত্র হয়ে যেত, তাহলে দুনিয়াটা অন্য রকম হতে পারত। মনে আছে, বেতন কমিশন প্রতিবেদনে সরকার যেদিন চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়, একটি টেলিভিশন চ্যানেলে এ প্রশ্ন উঠেছিল- দুর্নীতি কমবে কি? কষ্টের সঙ্গেই বলছি- কায়মনোবাক্যে এটা চাই; কিন্তু বাংলাদেশে বেতন দ্বিগুণ হওয়ার কারণে কেউ আর ঘুষ নেবে না, কেউ অফিস ফাঁকি দেবে না, কেউ শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে অমনোযোগী হবে না- তেমন কথা বলা যাবে না। সরকারি ক্যাডার সার্ভিসে অতি মেধাবীরাও সুযোগ পান। তাদের বেতন-ভাতাও ভালো। সেখানে কেন দুর্নীতি-অনিয়ম-অদক্ষতা? একটি গবেষণা কাজ হয়েছিল বেতন বৃদ্ধির মনস্তত্ত্ব নিয়ে। একটি ঘটনায় বলা হয়েছে, এক ব্যক্তির বেতন মাসে ২০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪০ হাজার টাকা হয়েছে। এ উপলক্ষে তার স্ত্রী একটি জমজমাট পার্টির আয়োজন করলেন। পার্টিতে উপস্থিত পরিবারগুলোর অনেকেই জানালেন, তাদেরও নিজ নিজ অফিসে এভাবে বেতন বেড়েছে। এটা জেনে পার্টির আয়োজক চুপসে গেলেন। তার মন খারাপ হলো। আরেকটি ঘটনা তুলে ধরা হয় এভাবে- এক ব্যক্তির অফিসে বেতন মাসে ২০ হাজার থেকে বেড়ে ৩০ হাজার টাকা হয়েছে। এ উপলক্ষেও জমজমাট পার্টির আয়োজন হয়। কিন্তু ওই ব্যক্তির নিজের অফিসে কিংবা তার সমমর্যাদায় চাকরি করা আর কারও বেতন এভাবে বাড়েনি। এখন দুই ব্যক্তির মধ্যে সুখী কে? কার পরিবারে বেশি আনন্দ? গবেষণায় এ ধরনের কয়েকটি পরিবারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। দেখা গেছে, প্রায় সর্বসম্মত অভিমত- যার বেতন মাত্র ১০ হাজার টাকা বেড়েছে তার সন্তুষ্টির মাত্রা যার ২০ হাজার টাকা বেড়েছে তার তুলনায় বেশি। কারণ তিনি একাই এ সুবিধা ভোগ করছেন। অন্যদিকে যার বেতন মাসে ২০ হাজার টাকা বেড়েছে, তার পর্যায়ে যে উত্তীর্ণ হয়েছেন আরও অনেকে! বাংলাদেশের সরকারি কলেজ শিক্ষকরা আন্দোলন করছেন। পক্ষে স্কেল বাস্তবায়নের সময় তাদেরও বেতন বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বাংলাদেশে সরকারি কলেজগুলোতে ১৩ হাজারের বেশি শিক্ষক রয়েছেন। এখন সরকার চাইছে আরও কিছু বেসরকারি কলেজকে সরকারি করতে। এ পদক্ষেপের কারণে ওইসব বেসরকারি কলেজের শিক্ষকরা ’আপনা-আপনি সরকারি ক্যাডার’ হয়ে যাবেন। এখানেই সরকারি কলেজ শিক্ষকদের আপত্তি। তারা মনে করেন, প্রতিযোগিতামূলক বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে তারা এ চাকরি পেয়েছেন। শিক্ষাগত যোগ্যতাতেও তারা এগিয়ে। অন্যদিকে বেসরকারি কলেজে শিক্ষকদের অনেকে তাদের তুলনায় যোগ্যতায় পিছিয়ে। তাদের কেন সমান করা হবে? প্রশ্ন উঠতে পারে, এদের সঙ্গে অন্যরা এগিয়ে এসে সমান হলে আপত্তি উঠবে কেন? এখানে কি কেবলই যোগ্যতার প্রশ্ন বিবেচনায় আসছে, নাকি মনস্তত্ত্বও কাজ করছে? ১৯৯৫ সালের কথা বলছি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জগন্নাথ কলেজের এক অনুষ্ঠানে ঘোষণা দিলেন, এখন থেকে এটি বিশ্ববিদ্যালয়। রঙের খেলা হলো, আনন্দ-উৎসব হলো। বিকেলে সব পত্রিকায় প্রিন্সিপাল সাহেব নিজেকে ভাইস চ্যান্সেলর ঘোষণা দিয়ে প্রেস রিলিজ পাঠালেন। আর ভাইস প্রিন্সিপাল নিজেকে ঘোষণা করলেন প্রো-ভিসি। এ প্রত্যাশায় দোষের কিছু নেই। এমন আকাক্ষা থাকতেই পারে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। এ প্রক্রিয়ায় একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ ছিল- কলেজ শিক্ষকরা আপনাআপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়ে যাবে? এমনটি ঘটলে সেটা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না? এখন সরকারি কলেজ শিক্ষকদের আন্দোলনেও কিন্তু একই প্রশ্ন উঠছে। এর সমাধান সহজ নয়। সরকারি শিক্ষকদের ধর্মঘটে খুশি হবে না, এটাই স্বাভাবিক। এ ধর্মঘটের কারণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তাদের দু’দিনের পরীক্ষা স্থগিত করেছে। ডিসেম্বরে বিজয়ের মাসের জন্য আন্দোলন স্থগিত- এ ঘোষণা দিয়ে বলা হয়েছে, জানুয়ারিতে কঠোর আন্দোলন। এটা এখন স্পষ্ট যে, দুই বছর আগে বেতন-ভাতা বাড়লেও সরকারি কলেজ শিক্ষকদের আন্দোলনের ইস্যুর অভাব হয়নি। তারা পড়াশোনার কাজে বিঘœ ঘটিয়েই আন্দোলনে নেমে পড়েছেন। তাদের আন্দোলনের প্রভাব পড়বে যেসব কলেজকে সরকারিকরণের তালিকায় রাখা হয়েছে, তাদের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের ওপর। ঢাকার কয়েকটি সরকারি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার প্রতিক্রিয়ায় ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন আমরা দেখেছি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের দ্বন্দ্বে পরীক্ষা গ্রহণ স্থগিত ছিল মাসের পর মাস। এটাকে অনেকে আখ্যায়িত করেছেন ’ইগো’ হিসেবে। তবে এটা ঠিক যে, ছাত্রছাত্রীরা চাইছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে। কারণ তাদের সার্টিফিকেটে এখন থেকে লেখা হবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষকদেরও খুশি হওয়ার কথা। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম-মর্যাদা অনেক বেশি। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে- এই ’ইগো’র জেরেই কিন্তু সিদ্দিকুর রহমানের চোখ গেছে...। বাংলাদেশে শিক্ষকদের মান নিয়ে অনেকে প্রশ্ন করেন। কোচিং সেন্টার ও গাইড বুক নিয়ে প্রশ্ন করেন। শিক্ষকদের অনেকে কোচিং সেন্টার-টিউশনি নিয়ে ব্যস্ত, সে অভিযোগও অমূলক নয়। নানা পর্যায়ের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী এ জন্য অন্যদের সঙ্গে শিক্ষকদের একাংশকেও দায়ী করছেন। পরীক্ষার হলের সর্বময় কর্তৃত্ব থাকে শিক্ষকদের। উত্তরপত্রও দেখেন তারা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, খাতা দেখায় শিক্ষকদের অমনোযোগিতার কারণে ছাত্রছাত্রীদের ক্ষতি হচ্ছে। মেধাবী হিসেবে পরিচিত ছাত্র বা ছাত্রী খুব কম নম্বর পেয়েছেন। ঢাকা বোর্ডের এক চেয়ারম্যান একবার বলেছিলেন একটি করুণ কাহিনী- এক ছাত্রী এসেছে তার কাছে, সে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অঙ্কে ফেল করেছে। ছাত্রীটি বলেছে, স্কুলের সব পরীক্ষায় সে কখনও ১০০-এর কম নম্বর পায়নি। তাকে অঙ্কের জাহাজ বলে কেউ কেউ অভিহিত করত। তাহলে কেন সে মাধ্যমিক পরীক্ষায় ফেল করবে? মেয়েটি বারবার অনুরোধ করেছে, তার খাতাটি পুনর্মূল্যায়ন করার জন্য। কিন্তু বোর্ডের সে নিয়ম নেই! ওই চেয়ারম্যান বলেছেন, ওই মেয়ের আকুতি তার এখনও মনে পড়ে, তাকে কাঁদায়। মেয়েটি বলেছিল, স্যার- আমি সব পেপারে ৭০-৭৮ নম্বর পেয়েছি। আমি কী করে অঙ্কে ফেল করতে পারি? এখন আমার বাবা আর আমাকে পড়াবে না, বিয়ে দিয়ে দেবে। অথচ আমি ডাক্তার হতে চেয়েছি! শিক্ষকরা আন্দোলন করছেন। তাদের দাবি ন্যায্য হতে পারে। কিন্তু এ আন্দোলনের কারণে ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষা সময়মতো গ্রহণ করা হয়নি। তারা মেধাবী ছাত্র বা ছাত্রী ছিলেন বলেই বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের মধ্যেও প্রচুর যোগ্য শিক্ষক রয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্নিষ্ট সবাই মিলে এ সমস্যার সমাধানে ব্রতী হতে পারেন বৈকি। শিক্ষার মান বাড়ানোর সমস্যা নিয়ে তারা ভালো পরামর্শ-সুপারিশ দিতে পারেন। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, অনেক কলেজ ও স্কুল শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় সরকারি হচ্ছে। অনেক এলাকার এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যান এমনকি নিজের এলাকার বিশ্ববিদ্যালয়েও রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতে চান। এই রাজনৈতিক প্রভাবেই অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান কমছে। পরীক্ষায় নকলের বিস্তার, শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, এমনকি ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে রাজনৈতিক নেতাদের অনেকের সম্পর্কে। এসব বিষয়ে নজর না দিয়ে শুধু শিক্ষকদের আন্দোলনকে দোষারোপ করার কোনো অর্থ হয় না।