Share |

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সম্পর্ক নিয়ে বিপাকে টিউলিপ

পত্রিকা রিপোর্ট
লন্ডন, ৪ ডিসেম্বর : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সম্পর্ক থাকার কারণে চরম বিপাকে পড়েছেন ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক। তাঁরা সম্পর্কে খালা-বোনঝি। সম্প্রতি চ্যানেল ফোর-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, টিউলিপ ইরানে বন্দী এক ব্রিটিশ নাগরিককে উদ্ধারে জোর আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। অথচ বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও বাংলাদেশে নিখোঁজ একজনকে কোনো সাহায্যই করছেন না টিউলিপ। বাংলাদেশে তাঁর খালা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী। খালাকে একটি ফোন করে সহজেই সাহায্য করতে পারেন টিউলিপ।  যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলীর ছেলে মীর আহমেদ বিন কাসেমকে বাংলাদেশের আইনশৃৃখলা বাহিনী গুম করে রেখেছে বলে অভিযোগ। তাঁকে উদ্ধারের ব্যাপারে পরিবারের পক্ষ থেকে টিউলিপের সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু টিউলিপ তাতে কোনো সাড়া দেননি।
 টিউলিপ দাবি করেন, খালার সাথে কেবল তাঁর পারিবারিক বিষয়ে আলাপ হয়। বাংলাদেশ সরকারকে প্রভাবিত করার কোনো সামথ্য তাঁর নেই, ইচ্ছাও নেই। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের রাজনীতির সাথে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি একজন ব্রিটিশ এমপি। তিনি বাংলাদেশি নন। লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড কিলবার্ণ এলাকার বাসিন্দাদের প্রতিনিধিত্ব করতেই তিনি নির্বাচিত হয়েছেন।   
টিউলিপের এসব দাবির বিপরীতে প্রমাণ হাজির করে চ্যানেল ফোর বলছে, এমপি নির্বাচিত হওয়ার আগে টিউলিপ তাঁর ব্যক্তিগত প্রোফাইলে নিজেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মূখপাত্র বলে দাবি করেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর উচ্ছাস প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দেন। ওই নির্বাচনে খালার পক্ষে প্রচারণায় নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষেত্রেও নিজের কৃতিত্ব দাবি করেন। এছাড়া এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর বাংলাদেশ সফরে গিয়ে এক অনুষ্ঠানে বলেন, বাংলাদেশ কিংবা ব্রিটেন যেখানেই তিনি রাজনীতি করেন না কেন, আসল কাজ হলো মানুষের জন্য কাজ করা। বাংলাদেশের মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছা ব্যক্ত করে টিউলিপ ওই অনুষ্ঠানে বলেন, রাজনীতিবিদরা যে কোনো জায়গা থেকে মানুষের জন্য কাজ করতে পারেন।  কিন্তু আহমদ বিন কাসেমকে উদ্ধারে কেন একটি ফোন করছেন না-এমন প্রশ্নে টিউলিপ বলেছেন, তিনি ব্রিটিশ রাজনীতিক; বাংলাদেশি নন।  ইরানি বংশোদ্ভূত নাজানিন জাগহারি রেডক্লিপ টিউলিপের আসনের বাসিন্দা। নাজানিন গত বছর ইরানে বেড়াতে গেলে সেখানে ইরান সরকার তাঁকে গোয়েন্দাগিরির দায়ে বন্দি করে। নাজানিনকে ছাড়িয়ে আনতে জোর আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন টিউলিপ। এছাড়া দেশে বিদেশে বিভিন্ন মানবাধিকার ইস্যুতে সরব টিউলিপ।  
বাংলাদেশে গুম হওয়া আহমেদ বিন কাসেমকে উদ্ধারে টিউলিপের সাহায্য চেয়েছিল মীর কাসেমের পরিবার। টিউলিপ কোনো সাড়া দেননি। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য টিউলিপের সাক্ষাতকার নেয়ার অনুরোধ করেছিল চ্যানেল ফোর। তাতেও সাড়া দেননি টিউলিপ।   গত সপ্তাহে নিজ নির্বাচনী এলাকায় নাজানিনের সমর্থনে এক সভা করেন টিউলিপ। সেখানে নাজানিনের বিষয়ে কথা বলার জন্য আগাম সময় নিয়ে রাখে চ্যানেল ফোর। নাজানিনের বিষয়ে আলাপ শেষে বাংলাদেশে ‘নিখোঁজ’ আহমেদ বিন কাসেমের প্রসঙ্গ তুলেন চ্যানেল ফোরের প্রতিবেদক অ্যালেক্স টমসন। তিনি ব্রিটিশ এমপি, বাংলাদেশের নন বলে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চান টিউলিপ। বঙ্গবন্ধুর নাতনি টিউলিপ সিদ্দিক চ্যানেল ফোরের প্রতিবেদক ওই প্রসঙ্গ তুললে টিউলিপ তার কাছে জানতে চান, তিনি (বিন কাসেম) ব্রিটেনের নাগরিক বা হ্যাম্পস্টিডের নাগরিক কি না, তিনি কোনোটাই নন। তিনি বলেন, “আমি লেবার পার্টি থেকে হ্যাম্পস্টিড ও কিলবার্নের এমপি, আমি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একজন সদস্য। এ বিষয়ে সতর্ক থাকুন।  
এরপরও প্রযোজক ডেইজি অ্যালিফ আবারও টিউলিপের কাছে একই প্রশ্নের উত্তর চাইতে চান। টিউলিপ আবারও বলেন, “আমি বাংলাদেশি নই এবং যে ব্যক্তির কথা আপনি বলছেন তার বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই। এটাই আমার শেষ কথা।” তারপরেও বিষয়টি নিয়ে কথা হওয়ার এক পর্যায়ে চ্যানেল ফোরের প্রযোজক সন্তান সম্ভববা ডেইজিকে অ্যালিফিকে টিউলিপ বলেন, “এখানে আসার জন্য ধন্যবাদ ডেইজি। আশা করি ভালোভাবে তোমার সন্তানের জন্ম হোক, কারণ সন্তান জন্মদান খুব কঠিন।” এতে বাড়ে বিপত্তি।
 এমন মন্তব্য করে টিউলিপ ‘দৃশ্যত সন্তান জন্মদান নিয়ে হুমকি দিয়েছেন’ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন টমসন। ওই অনুষ্ঠানের সম্পাদক বেন ডে পিয়ার বিষয়টি নিয়ে এমপি টিউলিপকে বলার পাশাপাশি লেবার পার্টিতে অভিযোগ দেন।  টিউলিপ শুরুতে চ্যানেল ফোরের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে টিউলিপের ওই মন্তব্য নিয়ে খবর প্রকাশ হতে থাকলে তিনি ওই মন্তব্যের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে টুইটারে একটি বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে টিউলিপ বলেন, “চ্যানেল ফোরের প্রযোজককে করা মন্তব্যের জন্য আমি দুঃখপ্রকাশ করছি।”
ওই পরিস্থিতি বিরূপ মনে হওয়ায় তা সামালে অপ্রস্তুত বোধ করার কথা স্বীকার করে তিনি লিখেছেন, “আমি কখনও তাকে কষ্ট দিতে চাইনি। আশা করছি, বিষয়টি তিনি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।”
বিবৃতিতে আহমেদ বিন কাসেমকে নিয়ে প্রশ্নের বিষয়ে টিউলিপ বলেছেন, “চ্যানেল ফোরের নিউজ রিপোর্ট এবং শনিবারের ঘটনা নিয়ে আমি স্পষ্ট করে বলছি, আমার জন্ম লন্ডনে এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে আমি সেবা দিয়ে যাচ্ছি।
“হ্যাম্পস্টিড অ্যান্ড কিলবার্নের বাসিন্দা, যারা আমাকে নির্বাচিত করেছে, তাদের জন্য কিছু করাই আমার কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য। এটা সত্য যে, বাংলাদেশে আমার পরিবারের কিছু সদস্য রাজনীতিতে জড়িত, যা দীর্ঘ দিন সবার জানা এবং বিষয়টি আমি গোপনও করিনি। “বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা বা উদ্দেশ্য কোনোটাই আমার নেই।”
এসব ঘটনার পর চ্যানেল ফোর এ বিষয়ে আরও একটি সংবাদ প্রকাশ করে। ওই সংবাদে বলা হয়, চ্যানেল ফোর-এর প্রথম সংবাদটি প্রচারের আগেই বাংলাদেশে মীর কাসেমের পরিবারে আইনশৃৃখলা বাহিনীর লোকেরা গিয়ে ধমক দিয়ে এসেছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর অস্ত্রধারী আইনশৃৃখলা বাহিনীর লোকেরা আবারও ওই পরিবারে যায়। এ পরিস্থিতিতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছে বিন কাসেমের পরিবার।   চ্যানেল ফোরের করা দ্বিতীয় প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সরকারের সাথে টিউলিপের ঘনিষ্ঠতা ?ষ্ট করতে আরও বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, টিউলিপের আপন চাচা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামরিক উপদেষ্টা আর ভাই শেখ হাসিনা সরকারের প্রচার-প্রচারণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন।   ব্রিটেনের টাইমস ও ডেইলি মেইল বিভিন্ন পত্রিকা টিউলিপের সাথে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্টতা তুলে ধরে সংবাদ প্রচার করে।  ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান লিখেছে, গুপ্তচর বৃত্তির অভিযোগে দুই বছর ধরে ইরানে কারাবন্দি নাজানিন জগহারি-র‌্যাটক্লিফের মুক্তি দাবিতে চলমান আন্দোলনে সামনের কাতারে রয়েছেন টিউলিপ সিদ্দিক। তিনি লন্ডনের যে এলাকার এমপি, সেই হ্যাম্পস্টিডের ভোটার নাজানিন। ২০১৫ সালে তেহরানে মেয়েসহ গ্রেপ্তার হন নাজানিন, এরপর গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর আপিলের রায় ঘোষণার পর গত বছর ১০ অগাস্ট ব্যরিস্টার আহমেদ বিন কাসেমকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে যায় বলে তার পরিবারের অভিযোগ।

টিউলিপের পাশে দাঁড়ালেন রূপা হক
টিউলিপ সিদ্দিক ও রূপা হকএক অন্তঃসত্ত্বা সাংবাদিককে নিয়ে মন্তব্য করে বিতর্কে জড়িয়ে পড়া যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের পাশে দাঁড়িয়েছেন দলটির আরেক এমপি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রূপা হক। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মীয় হওয়ার কারণেই সেখানকার ঘটে যাওয়া বিষয়ে টিউলিপ সিদ্দিককে মুখপাত্র হিসেবে আশা করা অন্যায়।’ চ্যানেল ফোরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টিউলিপ সিদ্দিকের সঙ্গে একজন টিভি সাংবাদিকের ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় রূপা হক এসব কথা বলেন। এ প্রসঙ্গে রূপা হক বলেন, ‘টিউলিপের মতো আমিও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক। তাদের (সমালোচকদের) ইচ্ছা অনুযায়ী আমাকেও বাংলাদেশের সব বিষয়ের প্রতিনিধিত্ব করতে হবে? তাহলে  আর কোনও চাপ থাকবে না?’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানবাধিকার যে কারও জন্য বিশাল ব্যাপার হতে পারে। এজন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন ও পররাষ্ট্র দফতর আছে, যারা এ নিয়ে সঠিক মাধ্যমে কথা বলবেন। আমাদের মতো পেছনের বেঞ্চের এমপিরা নন, বৈদেশিক ও কমনওয়েলথ অফিসই এসব নির্ধারণ করে।  
বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক কার্যক্রমে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে বলে স্বীকার করে রূপা বলেন, ‘এ বছর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত পার্লামেন্টারি ডেলিগেশনে আমি বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশকে সতর্ক করেছি। অসাম্প্রদায়িক ব্লগারদের অপহরণ ও গুমের ঘটনায় যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছি।’  তবে এটা তার আসল কাজ নয় বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আমার কাজ হলো ব্রিটেনে আমার এলাকার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করা।’