Share |

গাজায় ইসরাইলি বিমান হামলা, চারজন নিহত

লন্ডন, ১০ ডিসেম্বর : ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন দুইজন। এ ছাড়া ৬ শিশুসহ কমপক্ষে ৩৫১ জন আহত এবং কাঁদানে গ্যাসের বিষক্রিয়ায় ৭৪৮ জন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। গাজা উপত্যকা থেকে রকেট হামলার জবাবে এ হামলা চালানোর দাবি করেছে প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। স্থানীয় সময় শুক্রবার রাতে এ বিমান হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে রাশিয়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আরটি। এর আগে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভরত ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় আরো দুই ফিলিস্তিনি নিহত এবং সাত শতাধিক আহত হন।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম টুইটারে আইডিএফ জানায়, শুক্রবার হামাসের রকেট হামলার জবাব দিতে গাজায় এ হামলা চালানো হয়েছে। হামাসের একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও অস্ত্রাগার এ হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল। ইসরাইল দাবি করে, শুক্রবার প্রথমে ইসরাইলকে লক্ষ্য করে তিনটি রকেট ছোড়ে হামাস। তবে ওই রকেট হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না তা জানা যায়নি। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ায় গত বৃহস্পতিবার জেরুসালেম, পশ্চিম তীর ও গাজা শহরে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন ফিলিস্তিনিরা। ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে শুক্রবার ‘ক্ষোভ দিবসের’ ডাক দেয়া হয়। এ সময় ইসরাইলি বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে কমপক্ষে দুই ফিলিস্তিনি নিহত এবং সাত শতাধিক আহত হন।
গত বুধবার (৬ ডিসেম্বর) জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন ট্রাম্প। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্বকে আরো সঙ্কটময় করবে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া এই পদক্ষেপ ইসরাইল-ফিলিস্তিন সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের চলমান প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত করবে। ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তে বেশ শঙ্কিত আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা। এ বিষয়ে নিজেদের প্রতিক্রিয়ার কথা জানিয়েছেন তারা। জেরুসালেমে ইসরাইলের রাজধানী স্থানান্তর ‘ভয়াবহ পরিণতি’ ডেকে আনবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জর্দান। একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানায় তুরস্কও।
জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণার সিদ্ধান্তটি বেশ পুরনো। ১৯৯৫ সালেই মার্কিন কংগ্রেসে অনুমোদিত এক আইনে ইসরাইলের মার্কিন দূতাবাস তেলআবিব থেকে জেরুসালেমে স্থানান্তর করার নির্দেশ দেয়া হয়। তবে সাবেক সব প্রেসিডেন্টই ক্ষমতায় থাকাকালীন ওই প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর একই পথে হেঁটেছিলেন ট্রাম্পও। তবে এবার বেঁকে বসেন তিনি। গত বুধবার জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুসালেম দখল করে নেয় ইসরাইল। পরে ১৯৮০ সালে তারা পূর্ব জেরুসালেমকে একীভূত করে নেয় ইসরাইলের অংশ হিসেবে। তবে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটি বেআইনি পদক্ষেপ এবং ওই অঞ্চলকে দখলকৃত ভূখণ্ড হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।
ইসরাইল-ফিলিস্তিন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ফের শুরুর আহ্বান রাশিয়ার
জাতিসঙ্ঘে রাশিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি ভাসিলি নাবেনজিয়া শুক্রবার বলেন, মস্কো দুই জাতির জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সঙ্ঘাত অবসানের উপায় খুঁজে বের করতে জরুরি ভিত্তিতে একটি ‘অর্থবহ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া’ ফের শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে। ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে জেরুজালেমকে স্বীকৃতি দেয়ার ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পর জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ জরুরি অধিবেশন আহ্বান করে। এ অধিবেশনে নাবেনজিয়া আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ওয়াশিংটনের এমন পদক্ষেপ ফিলিস্তিন-ইসরাইল সম্পর্কের ক্ষেত্রে এবং এমনকি এটি পুরো অঞ্চলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্বি-রাষ্ট্র সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ফিলিস্তিন-ইসরাইল সঙ্ঘাতের চূড়ান্ত ও টেকসই সমাধান খুঁজে বের করার উপায় হিসেবে একটি অর্থবহ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া জরুরিভাবে আবারো শুরু করার বিষয়টি একেবারে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে ফিলিস্তিনিদের জেরুসালেম ছাড়তে বলল সৌদি আরব!  
ফিলিস্তিনিদের জেরুসালেমের অধিকার ছাড়তে বলেছে ইসরাইলের মিত্র সৌদি আরব। সেই সাথে ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শান্তি স্থাপনের জন্য জেরুসালেমের পরিবর্তে অন্য একটি স্থানকে ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে বেছে নেয়ারও পরামর্শ দিয়েছে আরব রাষ্ট্রটি। অধিকৃত জেরুসালেমের পাশেই ফিলিস্তিনের আবু দিস শহরকে এর রাজধানী হিসেবে বেছে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে সৌদি আরব।
তবে সৌদি আরবের এ ধরনের প্রস্তাবের প্রতিবাদ জানিয়েছে ফিলিস্তিনের জনগণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘জেরুসালেমই আমাদের রাজধানী’ বলে হ্যাশটেগ দেয়া শুরু করেছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, গত মাসে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের রিয়াদ সফরকালে সৌদি যুবরাজ প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন।
এ প্রস্তাব অনুযায়ী, পশ্চিমতীর ও গাজা অংশের মধ্যে ফিলিস্তিনিরা একটি আংশিক রাষ্ট্র পাবেন, যার ওপরে তাদের কেবল আংশিক সার্বভৌমত্ব থাকবে এবং পশ্চিমতীরে ইহুদিরা সংখ্যাগুরু হিসেবে থাকবে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে, প্রস্তাবটিতে সাড়া দেয়ার জন্য সৌদি আরব আব্বাসকে দুই মাস সময় দিয়েছে। আবু দিস একটি দখলকৃত পূর্ব জেরুসালেমের কাছাকাছি ফিলিস্তিনি শহর। অসলো চুক্তি অনুসারে এটি বি ক্যাটাগরির একটি এলাকা যা ইসরাইল ও ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ উভয় দ্বারা পরিচালিত হয়।
এদিকে সৌদি আরবের সরকারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল জুবায়েরকে বরখাস্ত করে সেই পদে বাদশাহ সালমানের ছোট ছেলে প্রিন্স খালেদকে বসানো হচ্ছে। আরব বিশ্বের বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমে বুধবার প্রকাশিত হয়েছে খবরটি।
একটি কূটনৈতিক সূত্র সৌদি রাজপরিবারের নতুন এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে নিশ্চিত করেছে মিডলইস্ট আইকে। এ ছাড়া লেবাননভিত্তিক আল-মাসদার নিউজ গত শুক্রবার এক রিপোর্টে বিষয়টি প্রকাশ করে। তারও আগে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এসপিএর বরাত দিয়ে এ খবরটি প্রকাশ করেছে আল ইত্তেহাদ নামে একটি আরবি সংবাদমাধ্যম। তবে এ বিষয়ে সৌদি সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বাদশাহ সালমানের ছেলে ও ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ছোট ভাই প্রিন্স খালেদ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত। এর আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের কলম্বাস বিমান ঘাঁটি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এফ-১৫ বিমানের ফাইলট হিসেবে যোগ দিয়েছেন সৌদি বিমান বাহিনীতে। বরখাস্ত হওয়া আদেল আল জুবায়ের সৌদি আরবের ইতিহাসে রাজপরিবারের সদস্য নয় এমন দ্বিতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ২০১৫ সালে তিনি প্রিন্স সৌদ আল ফয়সালের কাছ থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে কাজ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত হিসেবে।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে ব্যাপক সমালোচনা করেছে ওয়াশিংটন। ইয়েমেন, কাতার ও লেবানন ইস্যুতে সৌদি আরবকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন। গত বুধবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইয়েমেনের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সৌদি সরকারকে। এর প্রতিক্রিয়ায়ই এ পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জেরুসালেম প্রশ্নে মুসলিমদের নেতৃত্ব দিতে চান এরদোগান
জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী স্বীকৃতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একপেশে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানানো অনিশ্চিত হওয়ায় এ ক্ষেত্রে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করতে চান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ ঘোষণার আগ পর্যন্ত এরদোগান ফিলিস্তিন ইস্যুতে সবচেয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছেন।
প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেন, ফিলিস্তিন নাগরিকেরা মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত পূর্বাঞ্চলের শহর জেরুজালেমকে তাদের ভবিষ্যৎ রাজধানী হিসেবে মনে করে। ট্রাম্পের সতর্কতাকে উপেক্ষা করে এরদোগান ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্যান ইসলামিক গ্রুপের শীর্ষ সম্মেলন আহ্বান করার ব্যাখ্যা দেন।
২০১০ সালে তুর্কি জাহাজ গাজার ওপর অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করার সময় ইসরাইলি সেনাদের হামলা ও প্রাণহানির ঘটনার পর ইসরাইলের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের অবনতি হয়। পরে ২০১৬ সালে তুরস্ক আবার ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। তবে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের চেয়ে ফিলিস্তিনের হামাসের সাথেই সম্পর্ক বজায় রাখতেই তুরস্কের জনগণ বেশি আগ্রহী।
সৌদি-মিসরের সম্মতিতেই জেরুজালেম নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত
 নিউজ টেন নামের একটি ইসরায়েলি টেলিভিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আর ও মিসরের সবুজ সংকেত পেয়েই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল দূতাবাস তেল আবিব থেকে দখলকৃত জেরুজালেমে স্থানান্তরে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনার প্রতিও সমর্থন দিয়েছে সোদি আরব ও মিসর। তবে এ ইস্যুতে দেশ দুটি এখন যে প্রতিক্রিয়া ও নিন্দা জানাচ্ছে সেটা তাদের প্রকৃত অবস্থান নয়। বরং এটা বিভ্রান্তিকর।
ইসরায়েলি সাংবাদিক এবং নিউজ ১০-এর আরব ডেস্কের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জভি এহেজকেলি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ট্রাম্প এবং তার আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে সমন্বয় ছাড়া এই ঘোষণা আসা সম্ভব ছিল না।
তিনি বলেন, জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসনের স্বীকৃতির ঘোষণায় আরব দেশগুলো যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। তবে তাদের ওই প্রতিক্রিয়াও গুরুতর কিছু নেই।