Share |

ঘুষ কেলেঙ্কারীর অভিযোগে তোলপাড় টাওয়ার হ্যামলেটস : প্ল্যানিং পারমিশন পাইয়ে দিতে ২ মিলিয়ন পাউন্ড দাবি

পত্রিকা রিপোর্ট
লন্ডন, ১১ ডিসেম্বর : ঘুষ কেলেঙ্কারীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্রিটেনের জাতীয় সংবাদমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রীতিমতো তোলপাড় চলছে টাওয়ার হ্যামলেটসে। এ নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে কমিউনিটিতে।
 একটি বহুতল ভবন নির্মাণের প্ল্যানিং পারমিশন পাইয়ে দেয়ার বিনিময়ে ২ মিলিয়ন পাউন্ড ঘুষ দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ। এ কেলেঙ্কারীর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নির্বাহী মেয়র জন বিগসের ডেপুটি হিসেবে কাজ করা কাউন্সিলার সিরিয়া খাতুন এবং কমার্শিয়াল রোডে অবস্থিত আমানা বিজনেস সেন্টারের মালিক আবদুস শুকুর খালিসাদার।  
২০১৫ সালের মেয়র নির্বাচনে আবদুস শুকুর মেয়র জন বিগসের পক্ষে ভোট টানতে জোরালো ভূমিকা রাখেন। টাওয়ার হ্যামলেটস লেবারের খুবই ঘনিষ্ঠজন বলেও পরিচিত এই ব্যবসায়ী।
ডেভেলপার কোম্পানির সাথে ঘুষ লেনদেনের কাজটির দায়িত্ব নিয়েছিলেন আবদুস শুকুর। এর আগে কাউন্সিলার সিরিয়া খাতুন আবদুস শুকুরকে ডেভেলপার কোম্পানির এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন।  
গত ১০ ডিসেম্বর রোববার টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলকে জড়িয়ে দুর্নীতির এই মহাপরিকল্পনার চিত্র সবিস্তারে তুলে প্রতিবেদন প্রকাশ করে সানডে টাইমস। গুরুতর এই দুর্নীতির পরিকল্পনা ফাঁস হওয়ার ঘটনায় লেবার পার্টিতে রীতিমত তোলপাড় তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, নির্বাহী মেয়র জন বিগসের ভূমিকা নিয়ে। ঘুষ দাবির বিষয়টি ডেভেলপার কোম্পানির পক্ষ থেকে মেয়র জন বিগসকে জানানো হলেও মেয়র এ বিষয়টি পুলিশকে জানাতে সময় নিয়েছেন কয়েকমাস। পরে অবশ্য সংশ্লিষ্ট ডেভেলপার কোম্পানির প্ল্যানিং আবেদনকে প্রত্যাখ্যান করে দেয়া হয়। যে কারণে লন্ডন মেয়র অফিস এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়।  
এসব ঘটনার কয়েক মাস পর মেয়র জন বিগস বিষয়টি তদন্তে একটি অ্যাকাউন্টিং ফার্মকে (ইওয়াই) নিয়োগ দেন। দুর্নীতির বিষয়ে পুলিশে না গিয়ে মেয়র অ্যাকাউন্টিং ফার্মের কাছে কেন গেলেন সেটিও একটি বিরাট রহস্য। ঘুষ নিয়ে আলাপের সময় মোট চারজন রাজনীতিক এ অর্থ পাবেন বলে উল্লেখ করা হয়। এ চারজন কারা, তা নিয়েও আছে বড় প্রশ্ন।
এ কেলেঙ্কারির ঘটনায় কোনো অর্থের লেনদেন হয়নি। কারণ ডেভেলপার কোম্পানি গোপনে সব কথা রেকর্ড করে এবং বিষয়টি মেয়র জন বিগসকে জানায়। পরবর্তীতে ওই গোপন রেকর্ডিং সানডে টাইমের কাছে ফাঁস করে দেয়া হয় যার ভিত্তিতে ঘটনার প্রায় দুই বছর পর গত রোববার বিরাট প্রতিবেদন প্রকাশ করে পত্রিকাটি।
টাওয়ার হ্যামলেটসের সাবেক ইন্ডিপেনডেন্ট মেয়র লুতফুর রহমানের বিরুদ্ধে লেবার পার্টি দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিল। ভোট জালিয়াতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে আদালতের মাধ্যমে লুতফুর রহমানকে অপসারণে বাধ্য করা হয়। কিন্তু লুতফুর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের কোনো অভিযোগ কখনো পাওয়া যায়নি।
লুতফুর রহমানকে অপসারণের সুযোগ নিয়ে লেবার দলের প্রার্থী জন বিগস ২০১৫ সালের জুনে মেয়র নির্বাচিত হন। নির্বাচনী প্রচারে তিনি টাওয়ার হ্যামলেটসকে দুর্নীতিমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি বারবার উচ্চারণ করেন। অথচ নির্বাচিত হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই জন বিগসের প্রশাসন এই ঘুষ লেনদেনের দফারফা শুরু করে বলে উঠে এসেছে টাইমসের প্রতিবেদনে যাতে ভূমিকা ছিলো জন বিগসের ডেপুটি কাউন্সিলার সিরিয়া খাতুন।  টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, হংকং ভিত্তিক প্রপার্টি ডেভেলপার কোম্পানি ফার ইস্ট কনসোরটিয়াম কেনারি ওয়ার্ফের লাগোয়া এলাকায় আলফা স্কয়ার নামে একটি বহুতল ভবন নির্মাণের প্রস্তাব করে। ৫শ মিলিয়ন পাউন্ডের ওই প্রজেক্টে ৬শ ফ্ল্যাট, স্কুল, হোটেল এবং মেডিকেল সার্জারি নির্মাণের কথা। ভবনটি মোট ৬৫ তলা হওয়ার কথা।
 ২০১৫ সালে জুন মাসে ডেভেলপার কোম্পানি তাদের প্রথম আবেদনটি প্রত্যাহার করে নেয়। কারণ ওই আবেদনে স্থানীয় এলাকার উন্নয়ন সংক্রান্ত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ঠিকমত মানা হয়নি। এরপর বিষয়গুলো সংশোধন করে দ্বিতীয় আবেদনটি করা হয়। ততদিনে লুতফুর রহমান মেয়র পদ থেকে অপসারিত হয়ে জন বিগস ক্ষমতায়। আর কাউন্সিলার সিরিয়া খাতুন হয়েছেন ডেপুটি মেয়র।
২০১৫ সালের ৩ আগস্ট ডেভেলপার কোম্পানি ফার ইস্ট কনসোর্টিয়ামের ইউকে প্রধান জন কোনোলি ডেপুটি মেয়র সিরিয়া খাতুনের সাথে ব্যক্তিগতভাবে বৈঠক করেন। সেখানে কাউন্সিলর হেনরি জোন্সও উপস্থিত ছিলেন। হেনরি জোন্সের সুপারিশে সিরিয়া খাতুন ফ্রিডম অব দ্য সিটি অব লন্ডন অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। ফাঁস হওয়া দলিল অনুযায়ী কাউন্সিলার সিরিয়া খাতুন এই প্রজেক্টের পক্ষে মত দিচ্ছিলেন না। জন কনোলি মেয়র জন বিগসের সাথে দেখা করে তাঁর সংশোধিত প্রস্তাবটি দাখিল করেন।
এরপর সিরিয়া খাতুন জন কোনোলিকে দ্বিতীয় দফা সাক্ষাতের জন্য খবর পাঠান। ২৬ অক্টোবর তাদের দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে সিরিয়া খাতুন বেশ খুশি মনে আমানা সেন্টারের মালিক আবদুস শুকুরের সাথে কোনোলিকে পরিচয় করিয়ে দেন। বলেন, প্ল্যানিংয়ে যেসব সমস্যা রয়েছে সেগুলোর সমাধানে আবদুস শুকুর সাহায্য করতে পারবেন। আবদুস শুকুর প্ল্যানিং পারমিশন নিয়ে দিতে পারবেন বলেও ইঙ্গিত করেন তৎকালীন ডেপুটি মেয়র সিরিয়া। এই বৈঠকেও কাউন্সিলর হেনরি জোন্স উপস্থিত ছিলেন।  
বৈঠকের এক ফাঁকে আবদুস শুকুর জন কোলোনিকে এক পাশে ডেকে নিয়ে যান। কফি খেতে খেতে তিনি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই প্রস্তাব করেন যে, দুই মিলিয়ন পাউন্ড প্রিমিয়াম দিলে এই প্রজেক্ট পাশ হয়ে যাবে। চারজন রাজনীতিক সমান ভাগে এই অর্থ পাবেন। জন কোনোলি বলেন, তাঁর একজন কনসালটেন্ট বিষয়টি দেখভাল করবে।
এর ১০ দিন পর ৪ নভেম্বর ওই কনসালটেন্ট আবদুস শুকুরকে ফোন করেন। রেকর্ডার চালু করে দিয়ে আবদুস শুকুরের সাথে কথা বলেন তিনি। এ সময় শুকুর আবারও বলেন যে, দুই মিলিয়ন পাউন্ড দিলে প্রজেক্ট পাশ হয়ে যাবে। চারজন রাজনীতিক ওই অর্থ পাবেন। আর মাসে ১৫ হাজার পাউন্ড করে তাঁকে কনসালটেন্সি ফি দিতে হবে। তিনি দাবি করেন আরও প্রজেক্টের ক্ষেত্রে এমন লেনদেন হয়েছে। আর এসব কাজে তাঁকে দুতিয়ালির জন্য ব্যবহার করা হয়। শুকুর দাবি করেন, লেবার দলের এনইসি এবং শীর্ষ রাজনীতিকদের সাথেও তাঁর ভাল উঠাবসা আছে।  
ওই কনসালটেন্ট শুকুরকে তাঁর প্রস্তাব লিখিত আকারে পাঠানোর অনুরোধ করেন। প্রায় ৫৮ মিনিটের ওই কথোপকথনের পুরোটাই রেকর্ড করে নেন ডেভেলাপার কোম্পানির কনসালটেন্ট।
শুকুর পরবর্তীতে ক্রিসেন্ট ইউকে ডেভেলাপমেন্ট নামের একটি কোম্পানির পক্ষে প্রস্তাব পাঠান। যাতে বলা হয়, প্ল্যানিং পারমিশনের বিনিময়ে ২ মিলিয়ন পাউন্ড ক্রিসেন্ট ইউকে ডেভেলাপমেন্ট কোম্পানিকে দিতে হবে। সানডে টাইমের রিপোর্ট মতে, শেষ পর্যন্ত কোনো ঘুষের লেনদেন অবশ্য হয়নি।  
জন কোনোলি ২৬ নভেম্বর টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র জন বিগসের সাথে লিভারপুল স্টেশনের কাছে সাক্ষাত করেন এবং তাঁকে বিষয়টি অবহিত করেন।  
ওই বছরের ডিসেম্বরে টাওয়ার হ্যামলেটসের প্ল্যানিং কর্মকর্তারা ফার ইস্ট কনসোর্টিয়ামের আলফা স্কয়ার নির্মাণের আবেদন প্রত্যাখান করার পরামর্শ দেন। প্ল্যানিং কর্মকর্তাদের এমন পরামর্শ লন্ডন মেয়র অফিসকে অবাক করে। গ্রেটার লন্ডন অথোরিটির এসিসটেন্ট ডাইরেক্টর স্টুয়ার্ট মারি জন কোলোনির কাছে লেখা এক চিঠিতে আলফা স্কয়ারের পক্ষে সমর্থন তুলে ধরেন এবং টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল এর চাইতে বিতর্কিত প্রজেক্টে সমর্থন দিচ্ছে বলেও তিনি সমালোচনা করেন।  
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ফার ইস্ট কনসোরটিয়ামের আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল। প্রত্যাখ্যানের পক্ষে যুক্তি দেখায় মূল ভবনটি মাত্রাতিরিক্ত উচ্চতাসম্পন্ন এবং এটি এলাকায় কনজেশনের সৃষ্টি করবে।
এরপর তৎকালীন মেয়র বরিস জনসন বিশেষ ক্ষমতাবলে ওই প্রজেক্ট নির্মাণের অনুমতি দেন। প্রজেক্টটির কাজ আগামী বছর থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।  
ফার ইস্ট কনসোর্টিয়াম এই ঘুষ দাবির বিষয়ে মেয়র জন বিগসের কাছে অভিযোগ করার প্রায় দুই বছর হয়ে গেছে। কিন্তু প্ল্যানিং পারমিশন প্রত্যাখ্যান করার পর ২০১৬ সালের এপ্রিলে বিষয়টি তদন্তের জন্য অ্যাকাউন্টিং ফার্ম ইওয়াইকে দায়িত্ব দেয় টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল। তদন্তকারীরা তাদের রিপোর্টে বিষয়টি গুরুতর আখ্যায়িত করে ঘটনাটি পুলিশকে জানানোর পরামর্শ দেয়। প্রাথমিকভাবে কাউন্সিল একটি ফাইল সিরিয়াস ফ্রড অফিসে পাঠায়। ওই অফিস ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে সেটিকে ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির কাছে হস্তান্তর করে। এখনো পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি কিংবা যাদের নাম এসেছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়নি।  
সানডে টাইমসের প্রশ্নের জবাবে আবদুস শুকুর দুই মিলিয়ন পাউন্ড দাবি করার কথা স্বীকার করেন। কিন্তু তিনি দাবি করেন, এটা কোনো অন্যায় প্রস্তাব ছিল না। তাঁর আইনজীবী বলছেন, শুকুর কোনো অন্যায় করেননি। কারণ কোনো চুক্তি ছাড়াই আলোচনা সমাপ্ত হয়েছে।  
শুকুর স্বীকার করেন কাউন্সিলার সিরিয়া খাতুন তাঁকে জন কোনোলির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর দাবি, এ ঘটনার সাথে কাউন্সিলার সিরিয়ার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।  
এক বিবৃতিতে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল বলেছে, ইওয়াই (অ্যাকাউন্ডিং ফার্ম) এর তদন্তের ফলাফল একজন কিউসি মূল্যায়ন করেছেন এবং ফাইলটি সিরিয়াস ফ্রড অফিসে প্রেরণের পরামর্শ দিয়েছেন। সিরিয়াস ফ্রড অফিস সেটিকে তদন্তের জন্য ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির কাছে হস্তান্তর করেছে। কাউন্সিল তদন্তের ফলাফল জানার অপেক্ষায় আছে।  
এ ব্যাপারে পত্রিকার পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানতে এবং?কিছু প্রশ্নের জবাব চেয়ে সোমবার মেয়রকে ইমেইলে অনুরোধ পাঠালেও রাতে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাঁর কাছ থেকে কোন জবাব আসেনি।
ঘুষ কেলেঙ্কারির এই ঘটনা লেবার দলের সাম্প্রতিক অস্থিরতাকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল। সিরিয়া খাতুন হঠাৎ করেই কয়েক মাস আগে জন বিগসের কেবিনেট থেকে পদত্যাগ করেন। এর কিছুদিন পর র‌্যাচেল সন্ডার্সও ডেপুটি মেয়রের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। সর্বশেষ সিরিয়া, সন্ডার্স এবং জশোয়া প্যাকসহ কয়েকজন কাউন্সিল নির্বাচনে প্রার্থী না হওয়ার ঘোষণা দেন। টাওয়ার হ্যামলেটস লেবারের এসব প্রভাবশালী নেতার সিদ্ধান্তের পেছনে আসল কারণ কি, তা নিয়ে পরিষ্কার কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। এখন ঘুষ কেলেঙ্কারির ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে- এ ঘটনার জন্যই কি টাওয়ার হ্যামলেটস লেবারে এত অস্থিরতা?