Share |

টাওয়ার হ্যামলেটস ‘ঘুষ কেলেঙ্কারি’র প্রতিক্রিয়া : জন বিগসের উচিত পদত্যাগ করা

 পত্রিকা রিপোর্ট
লন্ডন, ১৮ ডিসেম্বর: ঘুষ কেলেঙ্কারির দায় নিয়ে নির্বাহী মেয়রের পদ থেকে জন বিগসের পদত্যাগের দাবি উঠেছে। পিপলস অ্যালায়েন্স অব টাওয়ার হ্যামলেটস এবং টাওয়ার হ্যামলেটস ইন্ডিপেনডেন্ট গ্রুপ আলাদা আলাদা সংবাদ সম্মেলনে করে এ দাবি জানিয়েছে। ঘুষ কেলেঙ্কারির এ ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর থেকে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। সবাই বলছেন, প্ল্যানিং পারমিশনের বিনিময়ে দুই মিলিয়ন পাউন্ড ঘুষ দাবির ঘটনা নজিরবিহীন।
মেয়র জন বিগস এই ঘুষ কেলেঙ্কারিকে অতীতের অসৎ রাজনীতির ধারাবাহিকতা হিসেবে আখ্যায়িত করে এ ঘটনা থেকে পার পাবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু খোদ লেবার দলের কোনো কোনো কাউন্সিলার বলছেন, জন বিগস সৎ রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু যে ঘটনা ফাঁস হয়েছে, তা অতীতের সকল অসততাকে ছাড়িয়ে গেছে। এটিকে জন বিগসের চরম ব্যর্থতা বলে স্বীকার করেন তারা।
আর সাবেক মেয়র লুতফুর রহমানের সমর্থকরা বলছেন, লেবার প্রার্থী জন বিগস কনজারভেটিভ পার্টির সঙ্গে মিলে সাবেক মেয়র লুতফুর রহমানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন। কিন্তু শত চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁরা ঘুষ লেনদেনের মত কিছু তারা আবিষ্কার করতে পারেননি। এখন দেখা যাচ্ছে লুতফুর রহমান নয়; বরং জন বিগসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে অস্বচ্ছতার অভিযোগ বেশি।  আর এ ঘটনায় নাম আসা কাউন্সিলার এবং মেয়র জন বিগসের সাবেক ডেপুটি সিরিয়া খাতুন এ ঘটনার তদন্ত কেন বিলম্ব করা হলো- তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বলেছেন, এ বিষয়ে কিছু গুরুতর প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। 
টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকার ক্যানারি ওয়ার্ফের কাছে ৬৫ তলা একটি ভবন নির্মাণের প্ল্যানিং পারমিশন দেয়ার বিনিময়ে ২ মিলিয়ন পাউন্ড ঘুষ দাবি করা হয়। এ কেলেঙ্কারির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নির্বাহী মেয়র জন বিগসের ডেপুটি হিসেবে কাজ করা কাউন্সিলার সিরিয়া খাতুন এবং কমার্শিয়াল রোডে অবস্থিত আমানা বিজনেস সেন্টারের আবদুস শুকুর খালিসাদার।  ২০১৫ সালের মেয়র নির্বাচনে আবদুস শুকুর মেয়র জন বিগসের পক্ষে জনমত গঠনে জোরালো ভূমিকা রাখেন। টাওয়ার হ্যামলেটস লেবারের ঘণিষ্ঠজন বলেও পরিচিত এই ব্যবসায়ী। 
ডেভেলপার কোম্পানির সাথে ঘুষ লেনদেনের কাজটি করার দায়িত্ব ছিল আবদুস শুকুরের। আর কাউন্সিলার সিরিয়া খাতুন আবদুস শুকুরকে ডেভেলপার কোম্পানির লোকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।
ঘটনার প্রায় দীর্ঘ দুই বছর পর গত ১০ ডিসেম্বর রোববার এ কেলেঙ্কারির খবর সবিস্তারে ফাঁস করে সানডে টাইমস। টাওয়ার হ্যামলেটসে লেবার দলীয় মেয়র জন বিগসের প্রশাসনের এ ঘটনা রাজনৈতিক মহলে রীতিমত তোলপাড় তোলে।
 পিপলস অ্যালায়েন্স অব টাওয়ার হ্যামলেটসের সংবাদ সম্মেলন 
 উত্থাপিত ঘুষ কেলেঙ্কারির ঘটনায় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন পিপল্স অ্যালায়েন্স অব টাওয়ার হ্যামলেটসের নেতা কাউন্সিলর রাবিনা খান। রাবিনা খান গত মেয়র নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জন বিগসের বিগসের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি সাবেক মেয়র লুতফুর রহমানের কেবিনেটে হাউজিং বিষয়ক দায়িত্ব পালন করেন।  গত ১৩ ডিসেম্বর বুধবার পূর্ব লন্ডনে এক সংবাদ সম্মেলনে রাবিনা খান এই ঘুষ কেলেঙ্কারির দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করেন। এ ঘটনার দায় নিয়ে জন বিগসের পদত্যাগ করা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।   সংবাদ সম্মেলনে কাউন্সিলর রাবিনা খান বলেন, ঘুষ কেলেঙ্কারির এ ঘটনার পর টাওয়ার হ্যামলেটসে হাউজিং প্রকল্প সম্পর্কে সেক্রেটারি অব স্টেটের নির্দেশনা চেয়ে বিভিন্ন দলের আহবানের সাথে তিনি একমত। এ বিষয়ে তিনি সেক্রেটারি অব স্টেটের দৃষ্টি আকর্ষণ করে চিঠি দিয়েছেন বলেও জানান।  সংবাদ সম্মেলনে কাউন্সিলর রাবিনা খান ছাড়াও পিপল্স এলায়েন্স অব টাওয়ার হ্যামলেট্স চেয়ার কাউন্সিলর আবদুল আসাদ বক্তব্য রাখেন।  রাবিনা খান বলেন, সেক্রেটারি অব স্টেইট বরাবরে পাঠানো চিঠিতে তিনি বলেছেন, পুলিশী তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত টাওয়ার হ্যামলেটসের হাউজিং সংক্রান্ত বিষয়াদি কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখা প্রয়োজন। অফস্টেড সেইফগার্ডিং কেলেঙ্কারির মত এই কেলেঙ্কারির ক্ষেত্রেও কাউন্সিলের উপর আস্থা রাখতে পারছেন না বলে মন্তব্য তাঁর।  তিনি বলেন, মেয়র জন বিগস দায়িত্ব নেয়ার পর আকস্মিকভাবে কাউন্সিলের চিলড্রেন সার্ভিসের মান তলানিতে নেমে এসেছে বলে অফস্টেড-এর প্রতিবেদনে উঠে আসে। ইয়ুথ সার্ভিস, হাউজিংসহ প্রতিটি খাতে সেবার মান নিচের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এখন ঘুষ কেলেঙ্কারির এই মহা-অপকাণ্ড ফাঁস হল। ফলে কাউন্সিলের দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জনগণের আস্থা রাখা কঠিন। প্ল্যানিং প্রক্রিয়াতেও দুর্নীতির কোন চেষ্টা যে হচ্ছে না তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে।  
টাওয়ার হামলেটস ইন্ডিপেন্ডেন্ট গ্রুপের সংবাদ সম্মেলন 
টাওয়ার হ্যামলেটস শাখার লেবার পার্টির বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের প্রেক্ষিতে মেয়র জনবিগসকে অবিলম্বে পদত্যাগের দাবি তুলেছে টাওয়ার হ্যামলেটস ইন্ডিপেন্ডেন্ট গ্রুপ। গত ১৪ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার পূর্ব লন্ডনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি তোলা হয়। 
২০১৮ সালের নির্বাচনের জন্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট গ্রুপ মনোনীত প্রার্থী কাউন্সিলার অহিদ আহমদ মেয়র পদ থেকে জন বিগসকে পদত্যাগের আহবান জানিয়ে বলেন, ক্যানারী ওয়ার্ফের নিকটবর্তী স্থানে বহুতল ভবনের প্ল্যানিং পারমিশন পাইয়ে দিতে স্থানীয় লেবার কাউন্সিলারদের জন্য ২ মিলিয়ন পাউন্ড ঘুষ দাবীর যে খবর সানডে টাইমস এ প্রকাশিত হয়েছে তা দেখে আমরা হতবাক হয়েছি।  টাওয়ার হ্যামলেটস ইন্ডিপেনডেন্ট গ্রুপ সাবেক নির্বাহী মেয়র লুতফুর রহমান সমর্থিত দল।  উল্লেখ্য, অহিদ আহমদ আগামী মেয়র নির্বাচনে লুতফুর রহমানের সমর্থিত প্রার্থী।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে অবৈধ পন্থায় প্ল্যানিং পারমিশন পাইয়ে দেয়ার যে খবর ফাঁস হয়েছে তা নজিরবিহীন। এতে  প্রমাণিত হয়েছে জন বিগস টাওয়ার হ্যামলেটসে সঠিক নেতৃত্ব দিতে চরমভাবে ব্যর্থ। তাই তাঁর মেয়রের মত গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার কোন অধিকার নেই। আমরা অবিলম্বে তাঁর পদত্যাগ দাবি করছি।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, টাওয়ার হামলেটসের বর্তমান লেবার পার্টির কাউন্সিলাদের দেওয়ার জন্য স্থানীয় ব্যবসায়ীর মাধ্যমে ঘুষ দাবি করা হয়েছিলো। মেয়র বিগসের নাকের ডগায় ২ মিলিয়ন পাউন্ড ঘুষ দাবির এ কেলেঙ্কারি ঘটলেও বিগস এমন ভান করছেন যেন তিনি কিছুই জানেন না। অথচ সংশ্লিষ্ট প্রপার্টি ডেভেলপার কোম্পানি মেয়র বিগসকেই ঘটনাটি সাথে সাথে জানিয়েছিল। কিন্তু তিনি দীর্ঘ ছয়মাস এ নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেননি। তাই স্বাভাবিক কারণে মেয়র জন বিগসের ব্যর্থতার নেপথ্য কারণ নিয়ে?জনগণের সন্দেহ রয়েছে। কারণ টাইমসের রিপোর্টে বেরিয়ে এসেছে যে, স্থানীয় ঐ লেবার ব্যবসায়ী মেয়র জন বিগসের পক্ষে নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে মেয়র বিগসসহ সকল লেবার কাউন্সিলারের অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করে ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সিসহ সিরিয়াস ফ্রড অফিস কর্তৃক গৃহীত ইনভেস্টিগেশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কাউন্সিলারশিপ বাতিল রাখার আহবান জানানো হয়। একজন কিউসির পরামর্শ অনুয়ায়ী সিরিয়াস ফ্রড অফিস কর্তৃক যে তদন্ত শুরু হয়েছে, সেই তদন্তে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে টাওয়ার হ্যামলেটস ইন্ডিপেন্ডেন্ট গ্রুপ লিডার কাউন্সিলার অলিউর রহমান বলেন, ডঙ্কাষ্টার ও এবং ল্যাঙ্কাশায়ার কাউন্সিলে দুর্নীতির অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, টাওয়ার হ্যামলেটস লেবার পার্টির সহযোগিতার মিথ্যা আশ্বাস জনগণ আর বিশ্বাস করে না। এই কারণে নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যাপারে জন বিগসের দেয়া আশ¡াসের ওপর টাওয়ার হ্যামলেটস ইন্ডিপেন্ডেন্ট গ্রুপের কোন আস্থা নেই। আমরা তাই জন বিগসের আশু পদত্যাগ দাবি করছি।
 মেয়র জন বিগসের বক্তব্য
এদিকে অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় জন বিগস এক বিবৃতিতে বলেন, নির্বাচিত হবার পর থেকেই তিনি দূর্নীতি এবং খারাপ তৎপরতার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। কাউন্সিলের সকল সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় কাজ করছেন। আলোচিত ঘটনাটি অতীতের খারাপ আচরণগুলোরই ধারাবাহিকতা বলে তিনি দাবি করেন।  
মেয়র বলেন, অভিযোগ জানার পর তিনি কাউন্সিলের সংশ্লিষ্ট কর্মতাদের বিষয়টি অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অনুরোধ করেন। তারা সেই নির্দেশনা মোতাবেক পযাঁয়ক্রমে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করে। কিন্তু দীর্ঘ ১৮ মাসেও পুলিশ তদন্ত সম্পন্ন করতে না পারায় তিনি হতাশ। কিন্তু সানডে টাইমসের প্রতিবেদন বলছে, মেয়র জন বিগসকে এই ঘুষ দাবির বিষয়টি অবহিত করার পরও দীর্ঘ প্রায় চারমাস তিনি এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেননি। এছাড়া টাওয়ার হ্যামলেটসে প্ল্যানিং পারমিশনের বিনিময়ে এভাবে ঘুষ দাবির অভিযোগ কখনো উত্থাপিত হয়েছে বলে জানা যায়নি।  বিবৃতিতে জন বিগস আরো জানান, লিডার অব দ্য লেবার গ্রুপ হিসাবে প্ল্যানিং কমিটিতে বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং বলেন প্ল্যানিং প্রসেসে অতিরিক্ত মনোযোগ দিয়েছি। মেয়র বলেন, ঘটনাটি আমাদের আরেকবার মনে করিয়ে দিলো এখনো অনেক কাজ বাকী। তাই আগামী নির্বাচনটি হবে অতীতের বিশৃৃখলায় ফিরে যাবার বিপরীতে লেবার পার্টির ভ্যালু এবং ডিসিপ্লিনের লড়াই। উল্লেখ্য, গত ১০ ডিসেম্বর রোববার টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের দুর্নীতির এই মহাপরিকল্পনার চিত্র সবিস্তারে তুলে প্রতিবেদন প্রকাশ করে সানডে টাইমস। গুরুতর এই দুর্নীতির পরিকল্পনা ফাঁস হওয়ার ঘটনায় লেবার পার্টিতে রীতিমত তোলপাড় তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে নির্বাহী মেয়র জন বিগসের ভূমিকা নিয়ে। ঘুষ দাবির বিষয়টি ডেভেলপার কোম্পানির পক্ষ থেকে মেয়র জন বিগসকে জানানো হলেও মেয়র এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেননি। বরং সংশ্লিষ্ট ডেভেলপার কোম্পানির প্ল্যানিং আবেদনকে রিজেক্ট করে দেয়া হয়। যে কারণে লন্ডন মেয়র অফিস এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়।  এসব ঘটনার কয়েক মাস পর মেয়র জন বিগস বিষয়টি তদন্তে একটি অ্যাকাউন্টিং ফার্মকে (ইওয়াই) নিয়োগ দেন। দুর্নীতির বিষয়ে পুলিশে না গিয়ে মেয়র অ্যাকাউন্টিং ফার্মের কাছে কেন গেলেন সেটিও একটি বিরাট রহস্য। ঘুষ নিয়ে আলাপের সময় মোট চারজন রাজনীতিক এ অর্থ পাবেন বলে উল্লেখ করা হয়। এ চারজন কারা, তা নিয়েও আছে বড় প্রশ্ন। এ কেলেঙ্কারির ঘটনায় কোনো অর্থের লেনদেন হয়নি। কারণ ডেভেলপার কোম্পানি গোপনে সব কথা রেকর্ড করে এবং বিষয়টি মেয়র জন বিগসকে জানায়। পরবর্তীতে ওই গোপন রেকর্ডিং সানডে টাইমের কাছে ফাঁস করে দেয়া হয়। যার ভিত্তিতে ঘটনার প্রায় দুই বছর পর গত রোববার বিরাট প্রতিবেদন প্রকাশ করে পত্রিকাটি।
টাওয়ার হ্যামলেটসের সাবেক ইন্ডিপেনডেন্ট মেয়র লুতফুর রহমানের বিরুদ্ধে লেবার পার্টি দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিল। ভোট জালিয়াতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে আদালতের মাধ্যমে লুতফুর রহমানকে অপসারণে বাধ্য করা হয়। কিন্তু লুতফুর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের কোনো অভিযোগ কখনো পাওয়া যায়নি। লুতফুর রহমানকে অপসারণের সুযোগ নিয়ে লেবার দলের প্রার্থী জন বিগস ২০১৫ সালের জুনে মেয়র নির্বাচিত হন। নির্বাচনী প্রচারে তিনি টাওয়ার হ্যামলেটসকে দুর্নীতিমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি বারবার উচ্চারণ করেন। অথচ নির্বাচিত হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই জন বিগসের প্রশাসন এই ঘুষ লেনদেনের দফারফা শুরু করে বলে উঠে এসেছে টাইমসের প্রতিবেদনে। যার নেতৃত্বে ছিলেন জন বিগসের ডেপুটি কাউন্সিলার সিরিয়া খাতুন।  টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, হংকংভিত্তিক প্রপার্টি ডেভেলপার কোম্পানি ফার ইস্ট কনসোরটিয়াম কেনারি ওয়ার্ফের লাগোয়া এলাকায় আলফা স্কয়ার নামে একটি বহুতল ভবন নির্মাণের প্রস্তাব করে। ৫শ মিলিয়ন পাউন্ডের ওই প্রজেক্টে ৬শ ফ্ল্যাট, স্কুল, হোটেল এবং মেডিকেল সার্জারি নির্মাণের কথা। ভবনটি মোট ৬৫ তলা হওয়ার কথা। 
২০১৫ সালের ৩ আগস্ট ডেভেলপার কোম্পানি ফার ইস্ট কনসোরটিয়ামের ইউকে প্রধান জন কোনোলি ডেপুটি মেয়র সিরিয়া খাতুনের সাথে ব্যক্তিগতভাবে বৈঠক করেন। সেখানে কাউন্সিলর হেনরি জোন্সও উপস্থিত ছিলেন। হেনরি জোন্সের সুপারিশে সিরিয়া খাতুন ফ্রিডম অব দ্য সিটি অব লন্ডন অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। ফাঁস হওয়া দলিল অনুযায়ী কাউন্সিলার সিরিয়া খাতুন এই প্রজেক্টের পক্ষে মত দিচ্ছিলেন না। জন কনোলি মেয়র জন বিগসের সাথে দেখা করে তাঁর সংশোধীত প্রস্তাবটি দাখিল করেন। এরপর সিরিয়া খাতুন জন কোনোলিকে দ্বিতীয় দফা সাক্ষাতের জন্য খবর পাঠান। ২৬ অক্টোবর তাদের দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে সিরিয়া খাতুন বেশ খুশি মনে আমানা সেন্টারের মালিক আবদুস শুকুরের সাথে কোনোলিকে পরিচয় করিয়ে দেন। বলেন, প্ল্যানিংয়ে যেসব সমস্যা রয়েছে সেগুলোর সমাধানে আবদুস শুকুর সাহায্য করতে পারবেন। আবদুস শুকুর প্ল্যানিং পারমিশন নিয়ে দিতে পারবেন বলেও ইঙ্গিত করেন ততকালীন ডেপুটি মেয়র সিরিয়া। এই বৈঠকেও কাউন্সিলর হেনরি জোন্স উপস্থিত ছিলেন।  বৈঠকের এক ফাঁকে আবদুস শুকুর জন কোলোনিকে এক পাশে ডেকে নিয়ে যান। কফি খেতে খেতে তিনি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই প্রস্তাব করেন যে, দুই মিলিয়ন পাউন্ড প্রিমিয়াম দিলে এই প্রজেক্ট পাশ হয়ে যাবে। চারজন রাজনীতিক সমান ভাগে এই অর্থ পাবেন। জন কোনোলি বলেন, তাঁর একজন কনসালটেন্ট বিষয়টি দেখভাল করবে।
এর ১০ দিন পর ৪ নভেম্বর ওই কনসালটেন্ট আবদুস শুকুরকে ফোন করেন। রেকর্ডার চালু করে দিয়ে আবদুস শুকুরের সাথে কথা বলেন তিনি। এ সময় শুকুর আবারও বলেন যে, দুই মিলিয়ন পাউন্ড দিলে প্রজেক্ট পাশ হয়ে যাবে। চারজন রাজনীতিক ওই অর্থ পাবেন। আর বছরে ১৫ হাজার পাউন্ড করে তাঁকে কনসালটেন্সি ফি দিতে হবে। তিনি দাবি করেন আরও প্রজেক্টের ক্ষেত্রে এমন লেনদেন হয়েছে। প্রায় ৫৮ মিনিটের ওই কথোপকথনের পুরোটাই রেকর্ড করে নেন ডেভেলোপনার কোম্পানির কনসালটেন্ট। কাউন্সিলার সিরিয়া খাতুন এক বিবৃতিতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, ওই সময়ে ওই ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে তখন তিনি স্ট্র্যাটেজিক ডেভেলাপম্যান্ট কমিটির সদস্য ছিলেন না।  সিরিয়া খাতুন বলেন, এই ঘুষ দাবির ঘটনায় গুরুতর কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যে গলদ রয়েছে এবং তদন্তের কাজটি কেন বিলম্ব করা হলো- সে বিষয়ে উত্তর খুঁজতে হবে। তিনি বলেন, মেয়র, স্ট্র্যাটেজিক ডেভেলপম্যান্ট কমিটির চেয়ার এবং স্ট্র্যাটেজিক ডেভেলপম্যান্ট কমিটি অ্যান্ড প্ল্যানিং বিষয়ক কেবিনেট মেম্বার-গুরুত্বপূর্ণ এই তিন পদের সবাই শ্বেতাঙ্গ। অথচ দুই বাঙালিকে জড়িয়ে ঘুষ কেলেঙ্কারির অভিযোগ তোলা হয়েছে।  সিরিয়া খাতুন বলেন, ফার ইস্ট কনসোরটিয়াম তাঁকে অবহিত করেছিল যে, তাদের আবেদন যখন প্রক্রিয়াধীন তখন তাদের লোক কেবিনেট মেম্বারের সাথে সাক্ষাত করেছিল। অথচ মেয়র অফিসের লোক সানডে টাইমসের সাথে ষড়যন্ত্র করে ঘুষ দুর্নীতির অভিযোগ দিয়ে বর্ণবাদী খেলা খেলছে। এটা ডগ হুইসল পলিটিকস বলে আখ্যায়িত করেন তিনি। কাউন্সিলের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ ঘটনাকে বাংলাদেশি বিষাক্ত রাজনীতি হিসেবে মন্তব্য করেছেন উল্লেখ করে সিরিয়া খাতুন বলেন, এই কর্মকর্তার মন্তব্য টাওয়ার হ্যামলেটসের নোংরা রাজনীতির প্রতিচ্ছবি।  ঘটনা ধামাচাপা না দিয়ে এ বিষয়ে গুরুতর প্রশ্নের জবাব নিশ্চিতের আহবান জানান তিনি।  ব্যবসায়ী আবদুস শুকুর এক বিবৃতিতে বলেন, তিনি কোনো ধরণের অন্যায় করেননি। ফার ইস্ট কনসোর্টিয়ামের সাথে কোনো চুক্তি সম্পাদিত হয়নি। তাঁকে কোনো ঘুষ অফার করা করা হয়নি এবং কোনো অর্থের লেনদেনও হয়নি। 
  টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের বক্তব্য 
২০১৫ সালে লিডারশীপ পরিবর্তনের পর থেকেই টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল স্বচ্ছতা এবং সুশাসনকে প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে। এই লক্ষ্য অর্জনে কাউন্সিল যে ৩টি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে আসছে এগুলো হচ্ছে হুইসালব্লোইং পলিসি (চাকুরী হারানোর ভয় ছাড়াই কাউন্সিল অফিসাররা যে কোন বেআইনী ততপরতা প্রকাশ করতে পারবেন), সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা এবং যে কোন ধরনের অভিযোগের বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত। আলফা স্কয়ারের প্ল্যানিং অ্যাপ্লিকেশন বিবেচনার সময় কাউন্সিল বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেয় নাই। ২০১৬ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে তাদের আবেদন স্ট্র্যাট্রেজিক ডেভেলাপমেন্ট কমিটিতে প্রত্যাখাত হয়। ভোটাভুটিকালে কমিটির সদস্য মোট ৮ জন কাউন্সিলারের মধ্যে ৬ জন কাউন্সিলারই তাদের আবেদনের বিপক্ষে ভোট দেন এবং ২ জন অনুপস্থিত ছিলেন।
এর আগে কাউন্সিল অফিসাররাও তাদের আবেদন প্রত্যাখানের জন্য সুপারিশ করেছিলেন। পরবর্তীতে এব্যাপারে অভিযোগ কাউন্সিলের নজরে আসার পর কাউন্সিলের সাথে সম্পর্কিত নয় এমন একটি স্বাধীন তদন্ত সংস্থাকে এব্যাপারে প্রমাণ সংগ্রহের দায়িত্ব দেই। পরবর্তীতে একজন খ্যাতিমান কিউসিম্বর পরামর্শে তাদের প্রাপ্ত তথ্য সিরিয়াস ফ্রড অফিসে পাঠানো হয়। সিরিয়াস ফ্রড অফিস আরো তদন্তের জন্য তা ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির কাছে পাঠানো হয়। কাউন্সিল এখন এই তদন্তের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছে। এছাড়া পুলিশের তদন্তকে ব্যাহত করতে পারে- বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর এই পরিষ্কার পরামর্শের কারণে কাউন্সিল এই মুহূর্তে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত রয়েছে।