Share |

‘ও জেরুজালেম!’

হাসনাত আবদুল হাই
‘সিটি অফ জয়’ এবং ‘ফ্রিডম অ্যাট মিড নাইটের’ লেখক ডমিনিক লেপিয়ার ও ল্যারি কলিন্সের লেখা ‘ও জেরুজালেম’ বইতে ইহুদিদের এই ঐতিহাসিক নগরীর জন্য আর্তধ্বনির কথা উল্লেখ করা হয়েছে নামকরণের মাধ্যমেই। ইহুদিপ্রীতি এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হবার কারণেই লেখক দু’জন ‘জেরুজালেমের জন্য ইহুদিদের আহাজারির কথা’ প্রচার করেছেন এমন নাটকীয়ভাবে। তিন ধর্মের কাছে পবিত্র এই প্রাচীন নগরী যে ইহুদিরা বেআইনিভাবে দখল করে আছে তার জন্য বিন্দুমাত্র সমালোচনা নেই বইটিতে। লেখক হিসেবে তারা যে পক্ষপাতিত্ব দেখিয়েছেন তার জন্য সমালোচনা করা যায়। কিন্তু সামান্য লেখক নয়, প্রধান পরাশক্তির দেশ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেমন অম্লানবদনে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী বলে ঘোষণা করলেন তার জন্য শুধু সমালোচনা করাই যথেষ্ট হবে না, অন্যায় এবং বেআইনি সিদ্ধান্ত ঘোষণার জন্য জানাতে হবে তীব্র নিন্দা ও জোরালো প্রতিবাদ। বাস্তবে তাই হয়েছে যা দেখে মনে সন্তুষ্টি জাগে যে বিশ্ব বিবেক মরে তো যায়নি, ঘুমিয়েও পড়েনি। দুটি কট্টরপন্থি দেশ ছাড়া সব দেশ ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা করেছে এবং তিনি বিশ্ব শান্তির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছেন একথা জানাতেও ইতস্তত করেনি। পাশ্চাত্যের দেশের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য এবং বিবৃতি দিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে জেরুজালেম বিষয়ে তাদের মতপার্থক্যের কথা জানিয়ে দিয়েছেন। এমন ঐক্যবদ্ধভাবে এতগুলো মিত্র দেশ আমেরিকার বৈদেশিক নীতির বিশেষ করে প্যালেস্টাইন নীতির এমন তীব্র সমালোচনা এর আগে করেনি। পরে এই প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে তাৎক্ষণিকভাবে। জাতিসংঘ থেকেও সমালোচনা করা হয়েছে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। ট্রান্সপ্যাসিফিক চুক্তি থেকে সরে এসে, অবাধ বাণিজ্যের প্রসারের জন্য চুক্তিতে শর্ত প্রদান এবং অভিবাসী-সংক্রান্ত নীতির জন্য ট্রাম্প ইতোমধ্যেই পাশ্চাত্যের দেশগুলোর সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন। জেরুজালেম ঘোষণা দিয়ে তিনি এখন নতুন করে সমালোচনার মুখোমুখি হলেন।
প্রায় সব মুসলিম দেশে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। এই সব দেশের নেতারাও তীব্র সমালোচনা করেছেন ট্রাম্পের। লেবাননে আমেরিকার দূতাবাস আক্রমণ করেছে বিক্ষোভকারীরা। গাজা এবং পশ্চিম তীরে প্যালেস্টাইনিদের সঙ্গে প্রায় হাতাহাতি সংঘর্ষ হচ্ছে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সদস্যদের। আরো একটি ‘ইনতিফাদা’র সূচনা হতে যাচ্ছে মনে হয় অধিকৃত প্যালেস্টাইনে। এই ইনতিফাদা আগের দুটির মতো হবে না, হবে আরো মারাত্মক। প্যালেস্টাইনিদের এখন অস্তিত্বের প্রশ্ন। তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছে। তাই তাদের হাতে যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে ইতস্তত করবে না তারা। তারা জানে বিশ্ব জনমত তাদের পক্ষে।
এমন একটা বেআইনি এবং পক্ষপাতপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণার পর পর আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স শান্তি প্রক্রিয়া চালু করার জন্য ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইন সফরে গিয়েছে। নির্লজ্জতারও একটা সীমা থাকা দরকার। ট্রাম্পের ধারণা, সামরিক শক্তিতে সবচেয়ে বলীয়ান হওয়ার কারণে পৃথিবীর সব দেশ তার নেতৃত্ব আগের মতোই মেনে নেবে। তার ধারণা যে ভ্রান্ত ইউরোপের দেশগুলো তা জানিয়ে দিয়েছে। প্যালেস্টাইন কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট আব্বাস সফররত আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকার করে জানিয়ে দিয়েছেন যে তারা তাকে এবং তার প্রশাসনকে শান্তির উদ্দেশ্যে মধ্যস্থতা করার জন্য উপযুক্ত মনে করে না এবং আমেরিকার কোনো হুমকির তোয়াক্কা করে না। যে আরব লীগ কোনো বিষয়ে একমত হতে পারে না, সেই সংস্থাও ঐকমত্যে পৌঁছে ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জরুরি অধিবেশন ডাকার পর। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিবদমান আরব দেশগুলোকে একতাবদ্ধ করেছেন এর জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানাতে হয়। এর পর-পরই বিশ্ব মুসলিম সংস্থা ওআইসি ইস্তাম্বুলে জরুরি সম্মেলনে ট্রাম্পের জেরুজালেম ঘোষণার তীব্র নিন্দা করার পাশাপাশি পূর্ব জেরুজালেমকে প্যালেস্টাইনের রাজধানী ঘোষণা করেছে। এইভাবে সংস্থাটি আমেরিকান প্রশাসনের জেরুজালেম নীতির পা?া জবাব দিয়েছে। যে জর্ডান ইসরায়েলের সঙ্গে ১৯৯৫ সালে শান্তিচুক্তি করেছিল সেই দেশের পার্লামেন্ট শান্তিচুক্তি পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর চেয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া আর কিছু হতে পারে না। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছিল অনেক আগেই। এবার সেখানে তার ভরাডুবি হলো বলা যায়। ঐ অঞ্চলে তার কোনো গুরুত্ব আর অবশিষ্ট থাকল না। ইরানের বিরুদ্ধে জোট বাঁধার যে পদক্ষেপ তিনি নিয়েছিলেন সৌদি আরব সফর করে তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেল। মনে হচ্ছে আরো মূল্য দিতে হবে আমেরিকাকে ট্রাম্পের এই অবিমৃষ্যকারিতার জন্য। ইতোমধ্যেই তিনি জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন ইউরোপে তার শিষ্টাচারবহির্ভূত বিভিন্ন বক্তব্য রেখে। এখন সেইসব দেশ তার সঙ্গে কোনো চুক্তিতেই আগ্রহী হবে না। ট্রাম্পের অধীনে আমেরিকা শুধু অনির্ভরশীল দেশে পরিণত হয়নি, সে দেশের পররাষ্ট্র নীতি যে বিশ্ব শান্তির জন্য বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে সে বিষয়েও সবাই এখন একমত। যে দেশের প্রেসিডেন্ট কথায় কথায় যুদ্ধের হুমকি দেন এবং আণবিক বোমা বর্ষণ করে নিশ্চি? করে দেবেন বলে শাসানি দেন তিনি যে অস্থিরমতি এবং বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে অপারগ এই বিশ্বাস এখন দৃঢ় হয়েছে। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী বলার কোনো প্রয়োজন ছিল না ট্রাম্পের। তিনিও প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন, প্রেসিডেন্ট বুশ এবং প্রেসিডেন্ট ওবামার মতো স্থগিত রাখতে পারতেন দূতাবাস স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত। নিদেনপক্ষে বলতে পারতেন যে, তার দেশের দূতাবাস পশ্চিম জেরুজালেমে স্থাপিত হবে। পূর্ব জেরুজালেমসহ সমস্ত জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী বলার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। ইসরায়েলকে খুশি করার জন্য দূতাবাস স্থানান্তরের কথা বললেই যথেষ্ট হতো। তাহলে তিনি এমন সিদ্ধান্ত ঘোষণা কেন দিলেন? এর একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে, তিনি চান না প্যালেস্টাইন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হোক। এ প্রসঙ্গে পরোক্ষভাবে তিনি তার মত ইতোমধ্যেই দিয়েছেন। এবার নতুন এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই নীতি আরো স্পষ্ট করে তুললেন। এতে করে যে ইসরায়েলের ক্ষতিই করা হলো এ বিষয়টি তিনি এখনো উপলব্ধি করতে পারছেন না। ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আমেরিকার সমর্থন পাওয়ার পরই সগর্বে ইউরোপে গিয়ে সেখানকার দেশগুলোকেও আমেরিকার মতো জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি জানানোর জন্য অনুরোধ করেছেন। প্রায় প্রতিটি দেশ তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জানিয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করে জেরুজালেমের মর্যাদা রক্ষায় তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অপমানিত হয়ে ফিরে এসে নেতানিয়াহু বিবৃতি দিয়ে বলেছেন- ইউরোপের দেশগুলো সব হিপোক্রেট। কূটনৈতিক ক্ষেত্রে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে এমন বলা ছাড়া তার আর উপায় কী! ট্রাম্পের সঙ্গে সঙ্গে তিনিও যে সমালোচিত হয়ে গেলেন এটা বুঝতে পেরে থাকলে তার আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। যুদ্ধংদেহী ভাব আর মারকুটে স্বভাব নিয়ে এত দেশের বিরাগভাজন হয়ে শত্রু পরিবেষ্টিত ইসরায়েলকে ট্রাম্প একা রক্ষা করতে পারবেন না। তার ইহুদিদের ইতিহাস মনে রাখা দরকার। অমানবিক এবং দর্পিত আচরণের জন্যই তাদেরকে বিতাড়িত করেছিলেন রোমক সম্রাটের প্রতিনিধি। দীর্ঘদিন তাদেরকে ছত্রভঙ্গ হয়ে বাস করতে হয়েছে পৃথিবীর নানা দেশে। একই আচরণের জন্য আবার যে তেমন পরিণতি হতে পারে একথা ইসরায়েলি নেতাদের মনে রাখা উচিত। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি কেবল কথার কথা নয়। কখনো কখনো এটা রূঢ় বাস্তবও হয়ে যায়। ইসরায়েল কি তারই প্রতীক্ষায় আছে? নাকি ভাবছে আমেরিকার মতো মিত্র থাকতে আমার কীসের ভয়?  
লেখক : কথাশিল্পী ও সাবেক সচিব