Share |

মিয়ানমার নিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট : অভিযুক্ত সেনাদের দ্রুত শাস্তি চাই

লন্ডন, ১৮ ডিসেম্বর : ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বৃহস্পতিবার (১৪ ডিসেম্বর) প্রস্তাবটি করে। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো চরম নৃশংসতার কারণে জরুরি ভিত্তিতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযুক্ত সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব করেছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা। একই সঙ্গে তাঁরা মিয়ানমারের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার পরিসর আরও বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন। বৃহস্পতিবার ৭৫১ সদস্যের ওই পার্লামেন্ট একই সঙ্গে অবিলম্বে রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। ফ্রান্সের স্ত্রাসবুর্গে বৃহস্পতিবার ভোটাভুটিতে রোহিঙ্গা জনগণের পরিস্থিতিবিষয়ক প্রস্তাবটি হাত তুলে সমর্থন জানান ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, গত আগস্টের পর থেকে ৬ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। বছর শেষে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মোট সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত তিন মাসে এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো মিয়ানমার নিয়ে প্রস্তাব পাস করল ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধসহ বেশ কিছু সুপারিশ জানিয়ে ১৪ সেপ্টেম্বর ইউরোপীয় পার্লামেন্ট একটি প্রস্তাব পাস করেছিল। এ ছাড়া ১৬ অক্টোবর ইউরোপীয় কাউন্সিল রোহিঙ্গাদের ওপর ‘মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের’ অভিযোগে মিয়ানমারের সেনাপ্রধানসহ জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাদের ভবিষ্যতে আমন্ত্রণ না জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। পাশাপাশি দেশটির সঙ্গে সব ধরনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টে রোহিঙ্গা নির্যাতনের অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাসের দিন বৃহস্পতিবার রাখাইনের সহিংসতাকবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করেন ইয়াঙ্গুনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান শুমুডট। তিনি সেখানকার পরিস্থিতির নানান ছবি দিয়ে টুইট করেছেন। টুইটে তিনি বলেছেন, সহিংসতার প্রায় চার মাস পরও রাখাইনের বিভিন্ন স্থান এখনো জনশূন্য।
মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘন তদন্তের জন্য গত মার্চে তথ্যানুসন্ধানী দল গঠন করেছিল জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা তাঁদের প্রস্তাবে নিরপেক্ষ ওই তদন্ত দলসহ এ ধরনের প্রতিনিধিদলকে কাজ করার জন্য মিয়ানমার সরকারকে অনুমতি দিতে বলেছেন। যৌন সহিংসতাসহ সব ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তে কমিশনকে সহায়তা করতে বলেছেন তাঁরা। মিয়ানমার অভিযুক্তদের বিচার করতে অনীহা প্রকাশ করলে সে ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে অবহিত করাসহ নিরাপত্তা পরিষদকে অব্যাহত চাপ দিতে বলা হয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় চুক্তিকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁরা জাতিসংঘকে নিয়ে ইইউকে একটি আন্তরাষ্ট্রীয় শীর্ষ সম্মেলন ডাকতে বলেছেন। ওই শীর্ষ সম্মেলন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন পর্যালোচনা, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পুনর্বহালের পাশাপাশি মানবতাবিরোধী অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করবে।
মিয়ানমারের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতার জন্য ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা নিরাপত্তা পরিষদের সমালোচনা করেন। এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণে বাধাদানকারী দেশ চীন ও রাশিয়ার ওপর চাপ দিতে ইইউ এবং সদস্যদেশগুলোকে আহ্বান জানানো হয়েছে। ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে মিয়ানমারের সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযুক্ত সদস্যদের বিরুদ্ধে ইইউ এবং এর সদস্যদেশগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বলেছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা। অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গে তাঁরা বলেছেন, ইইউ এবং এর সদস্যদেশগুলো এখন যে নিষেধাজ্ঞা আছে তার পরিধি আরও বাড়াতে পারে। পাশাপাশি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক সমন্বিত অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়ে দেশটিতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে অস্ত্র সরবরাহ, বিক্রি কিংবা বিনিময় স্থগিত করতে বলেছেন তাঁরা। মিয়ানমারের সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশিক্ষণ বন্ধের প্রস্তাবও এসেছে।
ইইউভুক্ত দেশগুলোতে অগ্রাধিকারমূলক বাজার-সুবিধা অস্ত্র ছাড়া সবকিছু (ইবিএ) পেয়ে থাকে মিয়ানমার। রোহিঙ্গা নির্যাতনের প্রেক্ষাপটে ইবিএর বিষয়টি পর্যালোচনা করতে কমিশনকে খতিয়ে দেখতে বলেছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চিসহ দেশটির সরকারকে জাতিগত কিংবা ধর্মীয় যেকোনো উসকানির নিন্দা জানানোর পাশাপাশি সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বঞ্চনা ও ঘৃণার প্রতিবাদ করার আহ্বান জানিয়েছেন। ইউরোপ মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য শাখারভ পুরস্কার দিয়েছে-এ কথাটা ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা মিয়ানমারের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চিকে আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা-এই শর্তগুলো লঙ্ঘনের জন্য তাঁর পুরস্কারটি ফিরিয়ে নেওয়া যায় কি না, সেই প্রশ্ন তাঁরা আবার তুলেছেন।
পার্লামেন্টের সদস্যরা রাখাইনসহ মিয়ানমারের সর্বত্র মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার জন্য আসিয়ানসহ আঞ্চলিক অন্য সরকারগুলোকে দেশটির সরকার ও সেনাবাহিনীর ওপর চাপ বাড়াতে বলেছেন। রাখাইনে নৃশংসতা বন্ধ করে সেখানকার সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সব পক্ষ বিশেষত চীনকে যুক্ত করে দ্বিপক্ষীয়, বহুপক্ষীয় ও আঞ্চলিক উপায়কে কাজে লাগাতে বলেছেন।  
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা আর বৈষম্য বন্ধের জন্য ইইউর জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিকে মিয়ানমারের সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর চাপ বাড়াতে বলেছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা। সেই সঙ্গে মিয়ানমারের সামাজিক প্রক্রিয়া থেকে রোহিঙ্গাদের বিচ্ছিন্ন রাখার প্রয়াস বন্ধে জাতিসংঘ, আসিয়ান এবং আঞ্চলিক সরকারগুলোর সঙ্গে তাঁকে যুক্ত হতে বলেছেন।