Share |

তরুণরা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে কেন?

জয়া চৌধুরী। একজন ব্রিটিশ বাংলাদেশি। এক সময় জড়িয়ে পড়েছিলেন জঙ্গি জীবনে। জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) অধ্যুষিত সিরিয়ায়ও পাড়ি জমিয়েছিলেন। বিয়েও করেন এক আইএস যোদ্ধাকে। তাদের ঘরে জন্ম হয় চার সন্তানের। জঙ্গি জীবন থেকে বেরিয়ে আসা জয়া এখন বাস করছেন আমেরিকার টেক্সাসে। 
আমেরিকান সংবাদমাধ্যম দ্য আটলান্টিকে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে জয়ার জঙ্গি জীবনে জড়িয়ে পড়ার গল্প। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় লন্ডনে খুব কষ্টে বেড়ে উঠছিলেন জয়া। দ্বিতীয় প্রজন্মের এ অভিবাসী পরিবারটি শুরু থেকেই শিকার হয়েছিলো বর্ণবাদের। তাদের প্রতিবেশীরা তাদের ভালোভাবে মেনে নেয়নি। স্থানীয়রা ঢিল ছুঁড়ে জয়াদের ঘরের জানালার কাচ ভেঙে দিত। তখন তার মনে হত, তারা আসলে এখানকার কেউ নয়। এখানে তাদের কেউ নেই। নিজেদের এ একাকিত্বের বোধটি আরো প্রবল হয় আমেরিকায় টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পর। নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারে যখন হামলা হয় জয়া তখন স্কুলের ছাত্রী। ঘটনার ভয়াবহতা আঘাত করে তার হৃদয়কেও। পরদিন স্কুলে গিয়ে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন তার এক বন্ধুর সাথে। ভয়ঙ্কর ঘটনায় তার হৃদয়ে লাগা চোটের কথা জানান বন্ধুটিকে। তার বন্ধুটি বাঁকা সুরে জানতে চায়, সত্যিই কি দুঃখ হচ্ছে জয়ার। একজন মুসলিম হওয়ায় জয়াই যেনো তখন তার বন্ধুর চোখে অপরাধী। তখনই তিনি উপলব্ধি করেন সবার মাঝখানে থেকেও আসলে তারা সবার মতো নন। জয়ার জঙ্গি জীবনে জড়িয়ে পড়ার বীজ বুনে দেয় এ ঘটনাটিই। 
জঙ্গি জীবন থেকে ফিরে আসা পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান মুবিন শেখকে উগ্র জঙ্গিবাদের দিকে ঠেলে দিতেও ভূমিকা রেখেছিলো নাইন ইলেভেনের টুইন টাওয়ার হামলা। পাকিস্তান ভ্রমণ শেষে ফিরে আসা মুবিন ভেবেছিলেন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে হলে লড়তেই হবে। যুক্ত হন সক্রিয় জঙ্গিবাদে।
বিভিন্ন দেশে অভিবাসীদের মধ্যে জঙ্গিবাদের প্রতি ঝুঁকে পড়ার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এর একটা কারণ হতে পারে বিরুদ্ধ পরিবেশে তার লড়াই করার দুঃখজনক অভিজ্ঞতা। চারপাশের অসহযোগিতায় সে হয়তো ঠিকভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না তার নতুন ঠিকানায়। আত্মপরিচয় নিয়ে এক ধরনের সংকটে ভুগতে থাকে সে। মনের কোণে এক ধরনের হীনম্মন্যতা তৈরি হয়। মনে হয় তারা যেখানে বাস করছেন সেখানে কেউ তাদের আপন নন। অথচ তার এখানেই নিজেদের স্বপ্ন সাজাতে চেয়েছিলেন। আপন করে নিতে চেয়েছিলেন এ মাটিকে। সবার সাথে নিজেকে মিলিয়ে নিতে না পারার এ চাপটা অনেকেই সামাল দিতে পারে না। মুক্তির উপায় খুঁজে। নিজের পরিচয় নিয়ে সংকটে ভুগতে থাকা একজন তরুণের সামনে কৌশলে হাজির হয় জঙ্গি সংগঠনগুলো। মনের দুর্বল জায়গাটিকে খুঁচিয়ে সবল করে তোলে জঙ্গি সংগঠনগুলো। এরা তাদের মনের মধ্যে এই বিশ্বাস তৈরির চেষ্টা করে চারপাশের সকলে তাদের শত্রু। মুক্তির জন্য লড়তে হবে। প্রতিবাদী হতে হবে। সহিংসতার পথ মেলে ধরে তারা ওই তরুণের সামনে। 
যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট অব পিসের ২০১০ সালের এক পর্যবেক্ষণেও এমনটাই দেখা গেছে। গবেষণাটি বলছে নিজের একটি পরিচয় খুঁজে নিতে জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা রয়েছে তরুণদের মাঝে। আল কায়দার সাথে যুক্ত ২ হাজার ৩২ বিদেশি যোদ্ধার উপর পরিচালিত ওই গবেষণায় দেখা গেছে ওই যোদ্ধাদের বেশিরভাগই নিজের একটি পরিচয় খুঁজে নিতে যুক্ত হয়েছেন জঙ্গিবাদের সাথে। এর একটা সমাধান হতে পারত তরণদের মধ্যে তৈরি এ সংকটটিকে দূর করার মাধ্যমে। তাদেরকে এই বিশ্বাস দেওয়া যে তারা একা নয়। যেখানে তারা বাস করছে সেটা তাদেরও ভূমি, যারা তাদের আশপাশে আছে তারা তাদেরই স্বজন-সুহৃদ। এমনটি হলে হয়তো জঙ্গিবাদের চোরাগলিগুলো এভাবে তরুণদের টানতে পারত না। কিন্তু তা না করে তারা অভিবাসীদের ব্যাপারে, মুসলিমদের ব্যাপারে অনেক দেশই আরো কঠোর হচ্ছে। এ বিষয়টি কিন্তু আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে জঙ্গিবাদের ক্ষেত্রে। এটা সকলকে উপলব্ধি করতে হবে, জঙ্গিদের কোনো দেশ নেই, কোনো ধর্ম নেই। 
কোনো কিছুর সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার আকর্ষণও তরুণদের জঙ্গিবাদের দিকে টেনে আনছে। কোনো কিছু করে দেখানো বা পা?ে দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের ভূমিকা রাখতে তরুণদের কাছে জঙ্গিবাদ কখনো কখনো আকর্ষণীয় হয়ে উঠে। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার অধ্যাপক র‌্যান্ডি বরাম তার ২০০৪ সালের এক গবেষণায় এ বিষটির প্রতি আলোকপাত করেছেন। গবেষণা বলা হয়েছে, জীবনে প্রথমবারের মতো ‘বড়’ কোনো ঘটনার সাথে যুক্ত হওয়ার আকর্ষণে তরুণরা জঙ্গি সংগঠনে যোগ দিচ্ছে।
পৃথিবীতে উগ্রতার ইতিহাস কিন্তু নতুন নয়। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় কিছু মানুষ সবসময়ই উগ্রবাদের সাথে জড়িত ছিল। এই উগ্রবাদের সাথে ধর্ম, বর্ণ, জাতি বা আঞ্চলিকতার কোনো সংস্পর্শ না থাকলেও সুবিধাবাদীরা যুগে যুগে ধর্ম, বর্ণ, জাতি বা আঞ্চলিকতাকে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ব্যবহার করেছে। জঙ্গি সংগঠনগুলোও একইভাবে নিজেদের স্বার্থে ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। আর না বুঝে তাদের এই ফাঁদে ধরা দিচ্ছে সরলপ্রাণ তরুণরা।
তরুণ বয়সে সবার মাঝেই পা?ে দেওয়ার প্রবণতা, সমাজের জন্য কিছু করার তাগিদ, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মানসিক কাজ করে। কোথাও অন্যায় দেখলে তরুণ মন বিদ্রোহ করে উঠে। জঙ্গি সংগঠনগুলো তরুণ হৃদয়ের অনুভূতির এ অংশটুকুকে কৌশলে কাজে লাগায়। তারা তরুণদের মনে এই ধারণা তৈরির চেষ্টা করে পৃথিবীতে মুসলিমরা নির্যাতিত হচ্ছে। অবিচার-নির্যাতন চলছে মুসলিমদের উপর। তারা তরুণদের প্রতিবাদী হতে উৎসাহী করে। ইসলামের শান্তির বাণী গোপন করে জঙ্গি সংগঠনগুলো তরুণদের উগ্রতার দিকে আকৃষ্ট করে। 
জঙ্গিবাদ বিশ্লেষক অধ্যাপক ব্রুস হফম্যান বলছেন, জঙ্গি সংগঠনগুলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কথা বলে তরুণদের দলে টানছে। বিশেষ প্রচারের মাধ্যমে তারা মুসলিম তরুণদের মনে এই বিশ্বাসের জন্ম দিচ্ছে যে পশ্চিমারা ইসলামের শত্রু। তাই তরুণরা পশ্চিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে ‘ন্যায় প্রতিষ্ঠা’র জন্য। তরুণরা নিজেদের এই যুদ্ধকে তাই কখনোই ভুল মনে করে না। তাদের মতে অবিচার নির্মূলে এটাই সঠিক পন্থা। জঙ্গিবাদ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মার্থা ক্রেনশো বলছেন, ‘অন্যায়ের শাস্তি’ দিতেই তরুণর বেছে নিচ্ছে সহিংসতার পথ।
আল কায়দার সাথে যুক্ত ২ হাজার ৩২ বিদেশি যোদ্ধার উপর পরিচালিত গবেষণার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট অব পিস বলছে তরুণদের একটি অংশ অ্যাডভেঞ্চার বা থ্রিলের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে জঙ্গিবাদের সাথে। এদের মধ্যে ৫ ভাগ তরুণ সহিংস ভিডিও গেম খেলে, ‘জিহাদে’র রোমাঞ্চকর গল্প পড়ে বা শুনে জঙ্গিবাদের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। এদের বেশিরভাই সমাজের উপরের শ্রেণি থেকেই আসছে। অধ্যাপক র‌্যান্ডি বরাম বলছেন জীবনের একঘেয়েমি কাটানোর জন্যও এরা জঙ্গিবাদের পথে চলে আসছে।
 একাকিত্বের বোধও তরুণদের উগ্রপন্থার দিকে ঠেলে দেওয়ার পথে কাজ করছে। পশ্চিমা বা আধুনিক জীবনধারায় পারিবারিক বন্ধন ক্রমেই ঢিলে হয়ে পড়ছে। অভিভাবকরা নিজেদের কাজ, নিজেদের বলয় নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন যে সন্তানদের জন্য আলাদা করে একটুখানি সময় বের করে নিতে পারেন না। একটি শিশুর জন্য তার পরিবারই সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল, সবচেয়ে ভরসার জায়গা। কিন্তু মা-বাবার উদাসীনতায় অনেক ক্ষেত্রেই সত্যিকার ভরসার জায়গা হয়ে উঠতে পারছে না। শৈশব-কৈশোরে নিজের গল্পগুলো বাবা-মার সাথে ভাগাভাগি করার সুযোগ হয়ে উঠে না অনেক সন্তানেরই। নিজেদের মধ্যে তাদের তখন এক ধরনের শূন্যতার সৃষ্টি হয়। সেই শূন্যতা থেকে, সেই হতাশঅ থেকে অনেকেই আকৃষ্ট হচ্ছে জঙ্গিবাদের দিকে। 
শিশু-কিশোরদের জন্য খেলাধুলার বা সুস্থ বিনোদনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে না পারাটাও জঙ্গিবাদ বিস্তারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। খেলাধুলা বা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ না পেয়ে তারা ঝুঁকে পড়ছে কম্পিউটার-ইন্টারনেটের প্রতি। ইন্টারনেটের বিশাল ভুবনে ঘুরতে ঘুরতে হয়তো কোনো এক সময় হারিয়ে যাচ্ছে কোনো অন্ধকারের বাঁকে। তরুণদের উগ্রপন্থার দিকে টেনে আনতে বড় একটি ভূমিকা রাখছে প্রযুক্তি। যোগাযোগের দুয়ার এখন সহজ হওয়ায় ভালোর সাথে মন্দও ঢুকে পড়ছে এ পথ দিয়ে। জঙ্গি সংগঠনগুলো প্রথমে বিভিন্ন কৌশলে তরুণদের মধ্যে তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহ তৈরি করে। ইন্টারনেটে ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে প্রথমে তারা নাড়িয়ে দিতে চায় তরুণ হৃদয়ের সহানুভূতিশীল অংশটিকে। আর এটি সম্ভব হলে তাদের কাজটা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। একসময় ইন্টারনেটই ওই তরুণদের কাছে হয়ে উঠে জঙ্গিবাদের ‘ভার্চুয়াল ট্রেনিং ক্যাম্প। ধর্ম সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞানের অভাবও জঙ্গিবাদের বিস্তারের ক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী। ধর্মের প্রকৃত জ্ঞান না থাকায় অনেকেই ভালো-মন্দ বিচার করতে পারছে না। সাময়িক মোহে পড়ে বা কোনো অশুভ শক্তির ইশারায় পড়ে নিজে যেটাকে ভালো মনে করছে সেটাই করে চলেছে। তাতে ধর্মের মূলমন্ত্র লঙ্ঘিত হচ্ছে কি না, মানবতার অকল্যাণ হচ্ছে কি না সে বিষয়ের তারা মোটেই তোয়াক্কা করছে না। কোনো ধর্মই সহিংসতার শিক্ষা দেয় না। ধর্মের মূল শিক্ষা হচ্ছে ভালোবাসা দিয়ে চারপাশকে জয় করা, হৃদয়ের পবিত্রতা দিয়ে চারপাশকে ভরিয়ে তোলা। জঙ্গি সংগঠনগুলো নিজেদের স্বার্থে ধর্মের এ মূলমন্ত্রকে আড়াল করে চলেছে। আর তাদের মোহমায়ায় আচ্ছন্ন তরুণ সমাজ চোখ বন্ধ করে ছুটে চলেছে সেই ভুলের পথে।
২৮ ডিসেম্বর ২০১৭