Share |

বেনিফিট নিচ্ছেন না ৩ লাখের বেশি কর্মহীন মানুষ!

লন্ডন, ৮ জানুয়ারি : বিস্ময়করও হলেও সত্যি, যুক্তরাজ্যের ৩ লাখের বেশি কর্মহীন অথবা নিম্নআয়ের মানুষ বেনিফিট দাবি করছেন না। সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিবেদেনে  বেরিয়ে এসেছে এই তথ্য। রিজুল্যশন ফাউন্ডেশন নামের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তৈরি এই প্রতিবেদনে এই বিষয়ে  সরকারকে দ্রুত দৃষ্টি দেওয়ারও তাগাদা দেওয়া হয়েছে। খবর গার্ডিয়ানের।  
রিজুল্যশন ফাউন্ডেশনের এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,  বেনিফিট দাবি না করা এইসব ‘বিস্মৃত বেকার‘ মানুষদের একটি বড় অংশ বয়স্ক নারী অথবা তরুণ। তারা প্রতি সপ্তাহে অন্তত ৭৩ পাউন্ড বা খুব সম্ভবত তার চেয়েও বেশি বেনিফিট বা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ধারনা করা হচ্ছে, বেনিফিট সুবিধা না নেওয়া এই মানুষদের মধ্যে আছেন বহু বাংলাদেশিও।
বিকল্প ব্যবস্থা বা সাপোর্ট থাকাটা (যেমন: কর্মরত পার্টনার বা অভিভাবকের সঙ্গে থাকা) বিপুলসংখ্যাক মানুষের বেনিফিট দাবি না করার কারণ বলে মনে করা হয়। তবে এই বেনিফিট দাবি না করার আরও একটি বড় কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে বেনিফিট সিস্টেমের জটিলতা এবং ‘মাত্রাতিরিক্ত শাস্তিমূলক‘ ব্যবস্থাকে। ‘ফলিং থ্রো দ্য ক্র্যাকসজ‘ শিরোনামের এই প্রতিবেদনে ওয়ার্ক অ্যান্ড পেনশনস (ডিডব্লিউপি) ডিপার্টমেন্টকে এর কারণ বের করতে তাগাদা দেওয়া হয়েছে। ইউনিভার্সেল ক্রেডিট ব্যবস্থার মাধ্যমে বেনিফিট থেকে বাদ পড়া লোকদের তালিকাভুক্তি করার জন্যও পরামর্শ দিয়েছে তারা ডিডব্লিউপিকে।   
তারা এটাও বলেছে, ন্যাশনাল  স্ট্যাটিসটিকস অফিসেরও এই বিষয়ে কিছু করার আছে যাতে সাপোর্ট বঞ্চিতরা এই সেবা নিতে পারেন। রিজল্যুশন ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিগত কোন সরকারের আমলেই এই বিষয়টির দিকে নজর দেওয়া হয়নি। নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে কর্মহীন মানুষ আর বেনিফিট চাওয়া মানুষের সংখ্যার ব্যবধান বাড়তে থাকে।
ডেভিড ফিঞ্চ রিজুল্যশন ফাউন্ডেশনের একজন সিনিয়র অর্থনীতি বিশ্লেষক। তিনি বলছিলেন, ‘কর্মহীন মানুষ আর বেনিফিট সুবিধাভোগী মানুষদের সংখ্যার এই ব্যবধান নিয়ে কোন নীতি নির্ধারকরাই খুব বেশি চিন্তিত ছিলেন না। তারা ধরে নিয়েছেন এটি মূলত ঘটছে কারণ মানুষ দ্রুত নতুন কাজ নিচ্ছে অথবা তাদের পরিবার থেকে অন্য কোন আর্থিক সুবিধা তারা পেয়েছেন।  
এই বিষয়ে ওয়ার্ক অ্যান্ড পেনশনস (ডিডব্লিউপি)-এর একজন মুখপাত্র বলেছেন, যারা বিশ্বাস করেন তারা বেনিফিট পাওয়ার  দাবিদার  তাদের জব সেন্টার প্লাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। তারা অনলাইনে, ফোনে বা ডিডব্লিউপির নিকটস্থ অফিসে গিয়ে সহজে এই কাজটি করতে পারেন। সেখানে ডিডব্লিউপির অ্যাডভাইজর বা কোচরা তাদের সহায়তা ও পরামর্শ দিতে তৈরি আছেন। এমনকি বেনিফিটের বাইরে এইসব মানুষ অন্য কি সুবিধা  পেতে পারেন সেটিও তারা বাতলে দিতে পারেন।     
ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গনাইজেশনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, গত চার সপ্তাহ ধরে সক্রিয়ভাবে কাজ খুঁজছেন বা কোন কাজ মিলে গেলে সেটিতে দুই সপ্তাহের মধ্যে যোগ দিতে রাজি আছেন এমন ব্যক্তি বেকার বা কর্মহীন। ব্রিটেনে প্রাপ্তবয়স্ক বেকারের সংখ্যা ১৫ লাখ। আর বেনিফিট চেয়েছেন তাদের মধ্যে ৮ লাখ মানুষ। স্বাভাবিকভাবেই বেনিফিট সুবিধা না নেওয়া এই মানুষদের মধ্যে আছেন বহু বাংলাদেশি। কমিউনিটির অভিজ্ঞজনরা মনে করছেন, মূলত: আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ভয়েই আসলে কমিউনিটির কেউ কেউ বেনিফিট নিতে চান না।  
লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির স্যোশাল পলিসির শিক্ষক সামছুল আলম এ বিষয়ে পত্রিকাকে বলেন, রেজুলেশন ফাউন্ডেশনের দাবী অবাক করার মতো কিছু নয়। অধিকারী সুবিধা বা বেনিফিট দাবী করছেন না, এমন জনসমষ্টিতে অনেক বাংলাদেশীরা আছেন - সন্দেহ নেই। তবে এর কারণ আমি আকস্মিক বলে মনে করি না। নানাবিধ কারণে, বিশেষত তুচ্ছতা বা অবমাননা এড়াতে অনেকেই দাবী করছেন না তার অধিকারী বেনিফিট। কেবল বেনিফিট নয়, প্রেজুডিসের কারণে কিংবা অবমাননার ভয়ে অনেক বাংলাদেশীরা স্বাস্থ্যসেবা নিতেও অনীহা প্রকাশ করেন। বেনিফিট দাবীর প্রক্রিয়াটি কখনও অবমাননার বৈকি। আমার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি অনেক বাংলাদেশী শিক্ষার্থী শিক্ষাঋণ পান না বলে অনেক কষ্টে বিভিন্ন কোর্স করছেন। অথচ তারা বেনিফিট দাবী করছেন না কারন বেনিফিট পাবার শর্ত হিসেবে তাদেরকে বাধ্য করা হয় অপ্রয়োজনীয় কিংবা অনুপযোগী কোন কোর্সে ভর্তি হতে। বেনিফিটকে কুসংস্কারমুক্ত করতে না পারলে এর খাতায় একটি বড় জনসংখ্যা বিস্মৃতই থেকে যাবে। কমিউনিটি পর্যবেক্ষকদের মতে, ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতা একটি বড় কারণ। আবার অনেক সময় আমাদের পারিবারিক বন্ধনও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আমাদের বাঙালি কমিউনিটিতে বয়স্ক বাবা-মাকে ছেলেমেয়েরা দেখাশুনা করেন। সে কারণেও তাদের হয়তো বেনিফিট নির্ভরশীলতা কম।’