Share |

শান্তিরক্ষী ছাত্রলীগ!

কামাল আহমেদ
গৌরবের সত্তর বছর ঘটা করে উদ্যাপনের মাত্র তিন সপ্তাহ পার না হতেই ছাত্রলীগের ‘শান্তিরক্ষীর ভূমিকা’ নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক এখন তুঙ্গে। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ঘেরাওয়ে অবরুদ্ধ থাকা উপাচার্যকে রক্ষা করতে গেছে এবং অবরোধকারীদের মারধর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে চলছে তোলপাড় এবং মূলধারার গণমাধ্যমেও ঘটনাটি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। এসব সংবাদের শিরোনাম এবং ভাষ্য ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরতে পেরেছে কি না, সেটা অবশ্য প্রশ্নসাপেক্ষ। কেউ কেউ লিখেছে, অবরুদ্ধ উপাচার্যকে মুক্ত করল ছাত্রলীগ। কেউ বলেছে, উদ্ধার করেছে। আবার কারও কারও ভাষায়, উপাচার্যের ত্রাতার ভূমিকায় ছাত্রলীগ।
যাদের নিয়ে এত কথা, তাদের ভাষ্যটি কী? ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান বলেছেন, অছাত্রদের হামলা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে ‘উদ্ধার’ করতে ও উপাচার্যের সম্মান রক্ষায় ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে সেখানে গিয়েছিল। তিনি আরও বলেছেন, ছাত্রলীগ সেখানে মারামারি করতে যায়নি। ছাত্রদল, জামায়াত-শিবির এবং কিছু বাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে অবরুদ্ধ ও তাঁর ওপর হামলা করেছে শুনে সেখানে গিয়েছিল। এ ছাড়া অবরোধকারী ছাত্রছাত্রীদের বাম-সন্ত্রাসী অভিহিত করে তাদের বহিষ্কার ও বিচার দাবি করে ছাত্রলীগ যে বিবৃতি দিয়েছে, তাতে ঘটনার বিবরণে তারা উপাচার্যকে ‘উদ্ধার’-এর কথা বলেছে। ছাত্রলীগের অভিভাবক সংগঠন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ছাত্রলীগ উপাচার্যকে রক্ষা করতে এগিয়ে না গেলে তাঁর প্রাণনাশের আশঙ্কা ছিল।
‘বাংলাদেশের ইতিহাস, ছাত্রলীগের ইতিহাস’-এ রকম একটি ভাষ্য বহুদিন ধরেই চালু আছে। বিশেষ করে, যাঁরা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ছাত্রলীগ করেছেন এবং পরবর্তীকালে জাতীয় পর্যায়ে রাজনীতি, প্রশাসন, বুদ্ধিবৃত্তিক বিভিন্ন পেশা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে সাফল্য লাভ করেছেন, তাঁরা গর্বের সঙ্গেই এ কথাগুলো বলে থাকেন। বাষট্টি, ছেষট্টি কিংবা উনসত্তরের ছাত্র-গণ-আন্দোলনে যাঁরা অংশ নিয়েছেন, তাঁদের কাছে ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি নতুন কিছু নয়। অবশ্য ইতিহাস তো অতীতের কথা। সময় যে বদলে গেছে, সে কথাও তো আমাদের মানতে হবে। এখন উন্নয়নের রাজনীতির যুগ। তাই ছাত্রছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের প্রধান ফটকের তালা ভাঙবে কিংবা কলাপসিবল গেট ভাঙবে, সেটা এখনকার ছাত্রলীগ এবং কিংবা তাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকেরা মেনে নেবেন-এমন ধারণা ‘উন্নয়নের গণতন্ত্রে’ অচল।
উন্নয়নের রাজনীতিতে বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তচিন্তা এবং বিতর্কের জন্য উন্মুক্ত থাকবে-এমনটি যাঁরা ভাবছেন, তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন যে ছাত্রলীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনটি বহুদিন ধরেই ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ। বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর সাংগঠনিক শক্তি যেহেতু ক্ষমতাসীনদের জন্য তেমন কোনো মাথাব্যথার বিষয় নয়, সেহেতু তারা কিছুটা সীমিত অধিকার ভোগ করে থাকে। কিন্তু তারাও যখন মাথাব্যথার কারণ হয়েছে, তখন তাদের কী পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, সে কথা নিশ্চয়ই কাউকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। ছাত্র সংসদ-ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে তাদের আন্দোলন দমনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং ছাত্রলীগ উভয়ের মারমুখী আচরণের ঘটনা বেশি দিনের পুরোনো নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রক্টরকে তখন তাঁর দায়িত্ব পালনে শারীরিক শক্তি প্রয়োগেও সক্রিয় দেখা গেছে। এগুলো সবই হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে। শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে উন্নয়নের রাজনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেই উপলব্ধি থেকেই সম্ভবত সংসদের বিরোধী দল মন্ত্রিসভারও অংশীদার! উপাচার্য তাই তাঁর ‘প্রিয় শান্তিরক্ষীদের’ দ্বারা ছাত্রী নিগ্রহে বিব্রত না হয়ে বরং আরও উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেন যে কোনো ধরনের অশুভ তৎপরতা বরদাশত করা হবে না। ‘শান্তিরক্ষীদের’ পক্ষে সাফাই দিয়ে তিনি বরং বলেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীদের সামাজিক শক্তি দিয়ে তিনি অশুভ শক্তি প্রতিহত করবেন (শুক্রবার ২৬ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযানের বক্তৃতা)। উপাচার্য অবশ্য সামাজিক শক্তির কথা বলতেই পারেন, কেননা ছাত্রলীগ ছাড়াও তাঁর রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। শিক্ষক সমিতি যে বিবৃতিটি দিয়েছে, তাতে তাদের পক্ষপাতদুষ্ট দলীয় অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।
২. অনেকেই প্রশ্ন করেছেন, উপাচার্যকে রক্ষার দায়িত্ব ছাত্রলীগকে নিতে হবে কেন? দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজটি তো পুলিশের করার কথা? তাঁরা আসলে উন্নয়নের রাজনীতি দেখেও দেখেন না! সাতটি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার পর পরীক্ষার ফল প্রকাশের দাবিতেআন্দোলন মোকাবিলায় পুলিশ আসারপর তা নিয়ে কর্তৃপক্ষকে কি কম সমালোচনা শুনতে হয়েছে? সিদ্দিকুর নামের তিতুমীর কলেজের সেই ছাত্রটির চোখ হারানোর ঘটনায়ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেই গালমন্দ শুনতে হয়েছে। সুতরাং পুলিশের বদলে শৃঙ্খলা ফেরানোর কাজটি ছাত্রলীগ নিজেদের কাঁধে তুলে নেবে, তাতে অবাক হওয়ার কী আছে?
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, ‘ছাত্রলীগ ভিসির আমন্ত্রণে এসেছে’ (প্রথম আলো, ২৫ জানুয়ারি, ২০১৮)। প্রশ্ন উঠেছে, উপাচার্য কেন ছাত্রলীগকে লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করলেন? এক যুগের বেশি আগে ২০০৫ সালে তৎকালীন উপাচার্য এস এম এ ফায়েজকে উদ্ধারের জন্য ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরাও একই কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। সে সময়ে অবশ্য উপাচার্যকে ঘেরাওয়ের পেছনে ছাত্রলীগের সমর্থন ছিল, এখন যেমন ছাত্রদলের ভূমিকার কথা উঠেছে। যাঁরা এভাবে ছাত্রলীগ আর ছাত্রদলের তুলনা করেন, তাঁরা সম্ভবত ভুলে যাচ্ছেন, উন্নয়নের রাজনীতির সঙ্গে বিএনপির শাসনামলের তুলনা চলে না। উন্নয়নের রাজনীতিতে উপাচার্যের ওপর হামলার অধিকার ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য কারও থাকার কথা নয়। যে কারণে ২০১৬ সালের ১ জুলাই সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের গাড়ির ওপর হামলা এবং তাঁর বাসভবনে তালা দিয়ে তাঁকে ছাত্রলীগের কর্মীরা অবরুদ্ধ করে রাখলেও তখন উপাচার্যের জীবনরক্ষার প্রশ্ন ওঠেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর স্মরণিকায় জিয়াউর রহমানকে দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করে ভুল তথ্য ছাপা হওয়ায় ক্ষুব্ধ ছাত্রলীগের কর্মীরা তখন উপাচার্যের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছিলেন। উপাচার্যের ঘরবাড়ি তছনছ করার অধিকার ছাত্রলীগ যে শুধু ঢাকাতেই চর্চা করেছে, এমন নয়। গত বছরের ৮ নভেম্বরের সংবাদপত্রগুলো খুললে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭ নভেম্বর রাতে তারা কী ধরনের তাণ্ডব চালিয়েছিল, তার একটা চিত্র পাওয়া যাবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই বা বাদ যায় কী করে? সেখানেও তো বিক্ষোভ-ভাঙচুরের একচেটিয়া অধিকার ছাত্রলীগের। এ ছাড়া ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রাণহানিগুলোর দিকে আওয়ামী লীগের নেতাদের তাকানোর ফুরসত কই? চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ নেতার হত্যাকারীর বিচারের দাবিতে এই সরকারের আমলেই একজন মা আমরণ অনশনে বসতে বাধ্য হয়েছিলেন। সিলেটে অভ্যন্তরীণ খুনোখুনির হিসাবটিও তারা আর কত দিন উপেক্ষা করে চলবে?
৩. আপাতদৃশ্যে মনে হয় অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধার কিংবা মুক্ত করার এ ভাষ্যটিই সংবাদমাধ্যম গ্রহণ করেছে। ব্যতিক্রমী দু-একটি কাগজ ছাড়া কেউ উদ্ধার বা মুক্ত কথাগুলো উদ্ধৃতিচি?ের মধ্যে রাখেনি। উদ্ধার বা মুক্ত করার প্রশ্ন তখনই আসে, যখন কোনো বেআইনি উপায়ে কাউকে আটকে রাখা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে কি কেউ বেআইনিভাবে আটকে রেখেছিল? বিক্ষোভ, ঘেরাও এবং অবরোধের মতো কর্মসূচি বাংলাদেশের রাজনীতিতে তো কোনো নতুন সংযোজন নয়। উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ছিল পূর্বঘোষিত। সুতরাং সেটা বেআইনি হলে কর্তৃপক্ষ তা আগেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারত। সে রকম কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি। ছাত্রলীগের নিগ্রহের বিচার দাবিতে ঘেরাওয়ের কর্মসূচির দিনে উপাচার্যের কার্যালয়ের ফটকগুলোতে তালা লাগানো আর ছাত্রলীগের মিছিলের দিনে সেগুলো খুলে রাখার মধ্য দিয়ে আসলে উপাচার্যের নৈতিক অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়।
স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাশিত ছিল, উপাচার্য বিক্ষোভকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলবেন এবং আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার একটি গ্রহণযোগ্য এবং শান্তিপূর্ণ সমাধান করবেন। দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটিতে সেভাবেই আন্দোলন-সংগ্রামের নি?ত্তি হওয়ার কথা। কিন্তু তার উ?োটা কেন ঘটল? ছাত্রলীগ দাবি করেছে, তাদের ১০ জন কর্মী আহত হয়েছেন। ছাত্রলীগ তাদের অন্যায় দাপট দেখানোকে বৈধতা দিতে ‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানার ব্যবহারের পর শনিবার ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নামটিকেও কাজে লাগানোর এক অদ্ভুত নজির তৈরি করেছে। ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিকদের (জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, ন্যাপ ইত্যাদি) ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে তাঁরা ছাত্রলীগের ভাষ্যেরই পুনরুচ্চারণ করেছেন। তবে, লক্ষণীয়ভাবে তাঁরা উপাচার্যকে ঘেরাওকারীদের আর ‘বাম সন্ত্রাসী ‘বলেননি।
কিছু কিছু সংবাদপত্রে ছাত্রলীগের ১০ কর্মী আহত হওয়ার দাবি এমনভাবে ছাপা হয়েছে, যাতে সেটি সত্য বলেই মনে হয়। কিন্তু ভিডিও ফুটেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রের ছবিগুলোতে তার উ?ো চিত্রই পাওয়া যাচ্ছে। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, সত্যাসত্য যাচাইয়ের কাজটি গণমাধ্যম যথার্থভাবে করতে পেরেছে কি না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষমতার কাছে মূলধারার পত্রিকাগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষাটি কিন্তু এখন আর কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সময় নয়।
লেখক : সাংবাদিক।