Share |

এনআরবি ডে : সিলেট সিটি ও টাওয়ার হ্যামলেটস টুইনিং লিংক এবং এনআরবি ডেস্ক

গত তিন দশক ধরে দেখছি বাংলাদেশ থেকে মন্ত্রী, এমপি বা কোনো নেতা এলে এনআরবিরা সংবর্ধনা দেন এবং তাদের কাছে দাবী-দাওয়া তুলে ধরেন আর নেতারাও এসব দাবী দাওয়া পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে যান। এনআরবিদের দাবী দাওয়া বলতে এখন আর তেমন কিছু নেই। এয়ারপোর্টে হয়রানি, কাস্টমসের ঘুষ খাওয়া, বিমানের হয়রানি, মামলা মোকদ্দমার জ্বালাতন এখন গা সওয়া হয়ে গেছে। এখন আর তারা কারো কাছে দাবী দাওয়া পেশ করেন না। কারণ তারা বুঝে গেছেন এসব অরন্য রোদন ছাড়া আর কিছু নয়। বিগত কয়েক দশকে এনআরবিরা যে হারে বাংলাদেশে জমি জমা, বাসা বাড়ী ও দোকানপাট কিনে বিনিয়োগ করেছিলেন এখন তারা আর সেদিক থেকেও নজর ফেরাচ্ছেন। এখন পারলে জমি জমা বিক্রি করে এদেশে টাকা পয়সা নিয়ে আসতে চাচ্ছেন। কারণ দেশে সম্পত্তি রেখে অহেতুক ঝামেলায় কেউ ঝড়াতে চাচ্ছেন না। তাদের ছেলেমেয়েরাও দেশে যাবে না। কাজেই দেশে সম্পত্তি রেখে কি লাভ। কে এগুলো দেখাশোনা করবে বা কে এগুলোর দায়িত্ব নেবে? কাজেই এখন দেশে সম্পত্তি বিক্রি করার হিড়িক চলছে, এই ধারা চলতে থাকলে আগামী দশকের মধ্যে এনআরবিরা দেশের সহায় সম্পদ বিক্রি করে চলে আসবেন। বাংলাদেশের এক শ্রেণীর অফিসার এবং স্বার্থান্বেষী মহল চাচ্ছে এনআরবিরা তাদের সম্পত্তি পানির দামে বিক্রি করে চলে আসুক। তারা জোর জবরদস্তি করে অথবা ছলচাতুরির মাধ্যমে প্রবাসিদের সম্পত্তি দখল করেও নিচ্ছে এর মধ্যে প্রবাসীদের পরিবারের লোকজন বা নিকটাত“ীয়রা মদদ দিচ্ছেন। নিকটাত“ীয়রাও সম্পত্তি দখলে এগিয়ে রয়েছেন এমন নজিরও রয়েছে ভুরি ভুরি। এতো গেল সমস্যার কথা, এই সমস্যার মধ্যে সম্ভাবনার আলো কোথায়?

ব্রিকলেন ও এনআরবি চত্বর এবং ব্রান্ডিং সিলেট
ব্রেক্সিটের পরে সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে, ইতোমধ্যে বৃটেন চীন, ভারত ও উপমহাদেশে তাদের বাণিজ্যের দ্বার খুলছে। বাংলাদেশও এর বাইরে থাকার কথা নয়। বাংলাদেশ থেকে গার্মেন্টস, সাইকেল, ঔষধ সহ পণ্য রফতানি হচ্ছে। বৃটেন থেকেও মেশিনারিজ ও পণ্য রফতানি হচ্ছে। অতি সম্প্রতি বৃটেন থেকে দক্ষ জনশক্তি বাংলাদেশে যাচ্চেছ। তারা বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করছেন। এদিকে লক্ষ্য রেখে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরি বলেছেন আমি আধুনিক নগরায়নের জন্যে আর্কিটেক্ট, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, চিকিৎসকদের সহযোগিতা চাই। তিনি লন্ডনে বেশ কয়েকটি সমাবেশে বলেন আমি সিলেট নগরি ব্রিকলেন নামে একটি লেন করতে আগ্রহী, এনআরবিদের নামে একটি চত্বর করতে আগ্রহী। বিশ্বের কাছে সিলেটকে পর্যটন নগরী হিসাবে একটি ব্রান্ড হিশেবে তুলে ধরার জন্যে ব্রিকলেন কনসেপ্ট অত্যন্ত জোরালোভাবে কাজ করবে। এই কনসেপ্টে কাজ করার জন্যে ব্যবসায়ি ও পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। মনে করুন, সিলেট সিটির একটি এলাকাকে লিটল লন্ডন হিসাবে গড়ে তোলা হবে। বাড়ীঘর, দোকান পাট, রাস্তার সাইন, কালো ট্যাক্সি, লাল রঙের টাউন বাস ইত্যাদি চলবে ঐ এলাকার রাস্তায়। ঐ খাতে হলিডে ইন, টেসকো, কেএফসি. নেক্সেটের মত ব্রান্ডের শপ থাকবে।  এই লিটল লন্ডন গড়ে তুলতে বিদেশের অর্থায়ন বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও জাপানের আর্থিক অনুদান আকর্ষণ করা যেতে পারে। কারণ, কাছেই রয়েছে ভারতের সেভেন সিস্টার, শিলং, দার্জিলিং বা ভারতের বিভিন্ন এলাকার পর্যটকরা সহজে সিলেটে আসতে পারবেন। এ ব্যাপারে সিলেট চেমবার অব কমার্স এবং বৃটেনের চেম্বার অব কমার্সগুলোর মধ্যে মতবিনিময় করার দায়িত্বও নিতে পারে প্রস্তাবিত এনআরবি হেল্প ডেস্ক। এক্ষেত্রে বিবিএ ও এমবিএ পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের কাজে লাগানো যায়। 

পর্যটন : সিলেটে অপার সম্ভাবনা
ইতোমধ্যে ফ্লাই দুবাই সিলেটে ডাইরেক্ট ফ্লাইট শুরু করে দিয়েছে। বিমানের ও ডাইরেক্ট ফ্লাইট আছে মধ্যপ্রাচ্যে থেকে। কক্সবাজারেও সিলেট থেকে ডাইরেক্ট ফ্লাইট যাওয়া আসা করতে যাচ্ছে। কাজেই রাতারগুল, বিছনাকান্দি, মাধবকুন্ড এলাকায় পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্যে পথ খূলে যাচ্ছে। ফরেন পর্যটক ছাড়াও অভ্যন্তরীণ পর্যটকদের ভিড়ে এখন সিলেট মুখরিত হয়ে উঠছে কাজেই এখন সেবার মান বাড়াতে হবে, সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করতে হবে। বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগে সিলেটকে আন্তর্জাতিকভাবে বিপনন করতে গেলে, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাথে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল, বার্মিংহাম সিটি কাউন্সিল, গ্রেটার লন্ডন কাউন্সিলের সাথে যৌথ কর্মসুচি বা টুইনিং লিংক গড়ে তুলতে হবে। মেয়র আরিফুল হক চৌধুরি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তার নগর ভবনে একটি এনআরবি ডেস্ক প্রতিষ্ঠা করবেন। এই ডেস্কের মাধ্যমে শুধু প্রবাসিদের হেল্প করলেই হবে না, ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের এনে তাদের সাথে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিতে হবে। 

টুইনিং প্রকল্পের সুযোগ সুবিধা
টুইনিং প্রকল্পের মাধ্যমে যেসব সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায় তাহলো- কমিউনিটি সেফটি, কাউন্টার টেরোরিজম, হেলথ, এডুকেশন সেক্টরে পেশাগত দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে যৌথ কর্মসূচি। উল্লেখ্য, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল ও ডেনমার্কের হর্সেন এবং সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে একটি টুইনিং চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। দুই বছর চলার পর এটি বন্ধ হয়ে যায়। কারণ এ ধরনের কর্মসুচি চালাতে অফিসার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের যে সদিচ্ছা প্রয়োজন রেজিম পরিবর্তন হওয়ার সাথে সাথে সদিচ্ছাও মৗান হয়ে যায়। টুইনিং কর্মসুচিও হিমঘরে চলে যায়। মেয়র আরিফুল হক চৌধুরি গত ৩০ শে জানুয়ারি টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র জন বিগসের সাথে এক বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে টুইনিং লিংক পুনরুজ্জীবিত করার আহবান জানান। মেয়র জন বিগস ও তার কেবিনেট মেম্বার কাউন্সিলররাও বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন। এই টুইনিং লিংক পুনরুজ্জীবিত করতে পারলে হেলথ এবং এডুকেশন সেক্টরে কিঝু কিছু কাজ করার সুযোগ সম্প্রসারিত হবে। সিলেটের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা যদি যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার সুযোগ পায় তাহলে তাদের মাধ্যমে অনেক প্রকল্প গ্রহণ করা সম্ভব হতে পারে। বৃটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে ইতোমধ্যে কানেক্টিং ক্লাশরুম চালু করা হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দুই দেশের ছাত্র ছাত্রী স্টাডি সাপোর্ট পাচ্চেছ। লন্ডনের পেশাদার সংগঠন আপাসেন সিলেটে অটিস্টিক বাচ্চাদের লেখাপড়া যারা করাচ্ছে সেইসব শিক্ষকদের ট্রেনিং প্রদান করছেন। আপাসেন অচিরেই সিলেটে একটি বিশেষায়িত স্কুলও খুলতে যাচ্ছে। সিলেট সিটি কর্পোরেশন যদি এনআরবি হেল্প ডেস্ক প্রতিষ্ঠা করে তাহলে দুই দেশের তরুণ প্রজন্মের সাথে একটি যোগসূত্র স্থাপিত হবে। বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগে এই সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্যে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করলে যেসব এনআরবি রা সিলেটে সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে চলে আসতে চাইছেন তাদের ছেলেমেয়েরা যখন দেশমুখি হবে তখন তারা হয়ত মত পরিবর্তন করতেও পারেন। ব্যবসায়ি ও পেশাজীবীরা যদি সমন্বিতভাবে কাজ করেন তাহলে সিলেট নগরী সিঙ্গাপুর বা ব্যাংককের মত একটি শহর হিসাবে গড়ে উঠতে পারে।
লণ্ডন, ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
লেখক : সাংবাদিক, সাপ্তাহিক সুরমার সাবেক সম্পাদক।