Share |

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের জরিপে ভয়ানক চিত্র : তরুণদের চোখে ভবিষ্যতহীন স্বদেশ

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের জরিপে সম্প্রতি প্রকাশিত ফলাফলে এশিয়া মহাদেশের তরুণদের ভাবনা এক ভয়ঙ্কর ছবি তুলে ধরেছে আমাদের সামনে। নানা কারণেই নিজের দেশ ছেড়ে ভিনদেশে পাড়ি দেওয়ার ঘটনা নতুন নয় মোটেও। আরো ভালো জীবন আর ভবিষ্যতের আশায় যুগে যুগে স্বদেশত্যাগী মানুষের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু নিজের দেশে ভবিষ্যত নেই এই ধারণা যদি ৮২% তরুণ প্রজন্মের মনে জন্ম নেয় তাহলে তা সংশ্লিষ্ট দেশের পরিচালকদের আতঙ্কিত করে তোলার কথা। আমরা জানিনা দক্ষিণ এশিয়ার বিশেষ করে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালকদের এ ভয়ানক চিত্র আদৌ ভাবিত করেছে কিনা।  
ওয়ার্? ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) কর্তৃক তরুণদের মধ্যে পরিচালিত জরিপে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় যে ৮২% তরুণ স্বদেশত্যাগী হবার বাসনা প্রকাশ করেছে তারা বলছে- নিজ দেশে বৈষম্য, আতঙ্ক আর ন্যায্য বিষয়ে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের বিরুদ্ধে কথা বলা অসম্ভব হয়ে উঠার বিষয়টি তাদের ভিনদেশে চলে যাওয়ার ইচ্ছার পেছনে কাজ করছে।
বাংলাদেশসহ ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রায় ১ হাজার ৩০০ তরুণের মতামত নেওয়া হয় ‘গ্লোবাল শেইপার্স সার্ভে ২০১৭ম্ব শীর্ষক এ জরিপে। গত বছরের ৩১ মার্চ থেকে ৩০ জুনের মধ্যে জরিপের জন্য মতামত সংগ্রহ করা হয়। এতে অংশ নেওয়া তরুণদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের শীর্ষ দৈনিক প্রথম আলো পরিচালিত তারুণ্য জরিপ-২০১৭-এর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। কারণ, তাতেও প্রায় একই চিত্র উঠে এসেছিল। বাংলাদেশের ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী ১ হাজার ২০০ তরুণের মতামত নিয়ে গত বছরের জুলাইয়ে করা ওই জরিপে ৮২ শতাংশ তরুণ বলেছিলেন, ভবিষ্যৎ কর্মজীবন নিয়ে তাঁরা অনিশ্চয়তায় থাকেন। আর সবার জন্য সমান সুযোগের অভাবকেই কর্মজীবনের অনিশ্চয়তার বড় কারণ বলে উল্লেখ করেছিলেন তরুণেরা। এছাড়া দুর্নীতি ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন ৫০ শতাংশের বেশি তরুণ। তরুণ প্রজন্ম যেকোন রাষ্ট্র তথা সমাজের অগ্রগতি আর উন্নয়নের অপরিহার্য শক্তি। সেই প্রজন্মের একটি বড় অংশ যখন নিজের দেশে তাঁদের ভবিষ্যৎ নেই এমন হতাশায় ডুবে যায় তাহলে এর পরিণতি সমাজে ভয়ঙ্কর হিশেবেই দেখা দিতে বাধ্য। কারণ, তরুণ প্রজন্ম যখন স্বদেশত্যাগী হয় তখন সেই দেশের জনসংখ্যাই কমে না বরং এর সাথে সমাজের আকাঙক্ষা আর শক্তি আর স্বপ্নও বিদায় নেয়।  
এই জরিপের ফলাফল নিয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য শামসুল আলম তরুণদের সামনে রেখেই এখন দেশের সব উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে এমন দাবি করে বলেছেন, এসব উন্নয়নকাজে ভবিষ্যতে প্রচুর মেধাবী তরুণের দরকার পড়বে। তাই তরুণদের হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে মেধাবী তরুণদের একটি বড় অংশ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এখানে দেশাত্মবোধ তৈরির একটি বিষয় আছে। বাংলাদেশে সুযোগের সমতা নেই- এমন অভিযোগ তিনি সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন।  আমরা বলতে চাই, তাঁর দাবি সঠিক হলে দেশটির তরুণ প্রজন্মের সিংহভাগকে কেনো দেশত্যাগের ভাবনা পেয়ে বসেছে? কেনো তরুণদের ৫৬ শতাংশ অভিযোগ করছে, রাষ্ট্র তরুণদের কথা ভাবে না। অথচ সাড়ে ৭৫০ কোটি জনসংখ্যার এই বিশ্বে অর্ধেকের বয়স ৩০ বছরের নিচে। আর বাংলাদেশেও জনসংখ্যার অর্ধেকের কাছাকাছি তরুণ প্রজন্ম।  
আমরা মনে করি, নিজদেশে বঞ্চনার কারণে এরা হারিয়ে গেলে পুরো আসলে হারবে দেশ ও জাতি। সুতরাং, সময় থাকতেই দেশের হর্তাকর্তাদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।