Share |

বেলাল ভাই : যাকে চাইলেও ভোলা যাবে না

নজরুল ইসলাম বাসন
গত বৃহস্পতিবার রাতে রয়েল লন্ডন হাসপাতালের ১৩ তলার একটি কেবিনে শাহাব উদ্দিন বেলাল ভাইকে যখন দেখতে গেলাম তখন রাত প্রায় ১১টা। রুমে তার স্বজনরা এক বেদনাবিধুর পরিবেশ। বেলাল ভাইয়ের তখন অন্তিম সময় চলছে। পরিবারের সদস্য তার স্বজন-শুভাকাংখীরা যাওয়াআসা করছেন। সবাই ধারনা করে নিয়েছেন ভালবাসার মানুষটি তাদের ছেড়ে চলে যাচ্চেছন।
বেলাল ভাই গত তিরিশ বছর ধরে অনেকবার হাসপাতালে গেছেন, আবার ফিরে এসেছেন আমাদের মাঝে। কিন্তু এবার যে আর ফিরে আসবেন না এটা তার প্রিয়জনরা হয়তো বুঝে গিয়েছিলেন। প্রিয়জনকে বিদায় দেয়া যে কত কষ্টকর তা বেলাল ভাই বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন। শুক্রবারে জুম্মার পরে তিনি না ফেরার দেশে চলে গেলেন। শনিবারে তাকে গার্ডেন অব পীসে শুইয়ে রেখে যখন ফিরছিলাম তখন তাঁর স্মৃতিগুলো বার বার ভেসে ওঠছিলো।  মনে পড়ছিল, আমরা যখন সবেমাত্র কলেজে ঢুকেছি বেলাল ভাই তখন ছাত্রলীগের নেতা, মদন মোহন কলেজের ম্যাগাজিন সম্পাদক। আমরা তখন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র সমর্থক আর বেলাল ভাইরা মুজিববাদ করতেন। তখন এক অস্থির সময় পার করছে বাংলাদেশ। সে আরেক অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তনের প্টকরে নিয়েছেন। লেবার পার্টি, আওয়ামী লীগের সক্রিয় সংগঠক। শাপলা ইয়ুথ ফোর্সের নেতা বেলাল ভাই, বর্ণবাদ বিরোধী পোস্টার ফেস্টুন লেখার জন্যে বেলাল ভাইয়ের তখন অনেক কদর। ১৯৭৮ সালে আলতাব আলীর বর্ণবাদীদের হাতে নিহত হওয়ার পর বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন টাওয়ার হ্যামলেটসে চাঙ্গা হয়ে উঠে। বেলাল ভাই সেই আন্দোলনে যোগ দিয়ে তার সহকর্মীদের নিয়ে তখন মাঠ গরম রাখতেন। তিন দশক আগের পরিস্থিতি আর আর এখনকার পরিস্থিতির রাতদিন তফাৎ। তখন বেলাল ভাই বা তার সহকর্মীরা কমিউনিটি এ্যাকটিভিস্ট ছিলেন।  কমিউনিটি একটিভিস্ট হিসাবে তারা ক্যাম্পেইন করতেন, হাউজিং, এডুকেশন, হেলথ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বঞ্চিত বাংলাদেশিদের অধিকার আদায়ে তারা ছিলেন সোচ্চার। তাদেরকে তখন নিরলস কাজ করতে হত। তখনও এমপি বা কাউন্সিলর হবার দৌড় শুরু হয়নি। সিলেটী বাঙালি মানুষের তখন থাকার জায়গা নেই। স্কুলে গিয়ে মার খেয়ে ছেলেমেয়েরা বাড়ী ফিরে। ভাষা না জানার কারণে সার্জারীতে গিয়ে চিকিৎসা নেয়া সম্ভব হয়না। এখন কমফর্ট জোনে থেকে এমপি বা কাউন্সিলর হয়েছেন তারা জানেন না তখন একটিভিস্ট আর ক্যাম্পেইনাররা কত কষ্ট করেছেন। আমরা যারা লেবার পার্টি সমর্থন করি আমরা জানি বাঙালিরা লেবার পার্টির কত বড় সম্পদ। কিন্তু লেবার পার্টি বাঙালিদের সেই মূল্যায়ন আজও দেয়নি। বেথনাল গ্রীনের ক্যাম্বব্রিজ হীথ রোডে অবস্থিত লেবার পার্টির অফিসের সাইনবোর্ডের বাংলা লেখাটি নাকি বেলাল ভাই লিখে দিয়েছিলেন। 
তোমার দল আমার দল
শ্রমিক দল শ্রমিক দল
বেলাল ভাই লেবার পার্টি থেকে কাউন্সিলর হয়েছিলেন। নবধ্বই দশকের মাঝামাঝি টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল-ডেনমার্কের হর্সেন সিটি কাউন্সিল ও সিলেট পৌরসভার সাথে একটি টুইনিং চুক্তি স্বাক্ষর করা হল। শাহাব উদ্দিন বেলাল ভাই টুইনিং-এর গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন তাই তিনি অনেকবার সিলেট গিয়েছিলেন। তবে দুঃখের সাথে বলতে হয়, কেউ কেউ টুইনিংকে তাদের ফটো সেশনে আর মোটা বেতনের চাকুরি বলেই মনে করেছিলেন। তাই টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল আর টুইনিং চালু রাখেনি। আমাদের অনেক অর্জন মৗান হয়ে গেছে শুধু মাত্র ভুল নেতৃত্ব আমাদের কমিউনিটির নেতা হয়ে বসেছেন বলে।
এ প্রসঙ্গে বলা যায়, বর্তমানে যে এনআরবি-রা যে আন্দোলন শুরু করেছেন নলেজ রপ্তানি করার এই সময় টুইনিং প্রকল্প থাকাটা খুব প্রয়োজন ছিল। বর্তমানের বাঙালি কাউন্সিলদের এ ব্যাপারে উৎসাহিত হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে, ব্রেক্সিটের পরে ব্রিটিশরা তাদের একসময়ের কলোনীগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে যাচ্ছে এ সময় টাওয়ার হ্যামলেটসের টুইনিং প্রকল্প অনেক কাজে আসতো বলে আমার ধারনা। বেলাল ভাইদের যুগে ঐসব কাজ করানো সম্ভব হতো। তবে তাদের মাঝে যে ভুল বোঝাবুঝি বা মতের অমিল ছিল না এ কথা বলা যায় না। তবে তারা বাংলাদেশ থেকে শিক্ষক এনেছেন। তাদেরই একজন  শামীম আজাদ এখনও এদেশে সক্রিয়। তারা বাংলা টাউন করেছেন। অনেককে বাসস্থান দিয়েছেন। দেশে বন্যা হলে চাঁদা তুলে পাঠিয়েছেন। বৈশাখী মেলার মত একটি বার্র্ষিক মেলার জন্ম দিয়েছেন, শহীদ মিনার করতে পেরেছেন। এসব একটি জেনারেশনের কাজ। আর বেলাল ভাই ছিলেন সেই জেনারেশনের মাঠকর্মী। তাঁর মানুষের সাথে মেশার ছিল অদ্ভুত এক ক্ষমতা। পারভেজ, সরওয়ার, সায়েম, ইমরান, বাবু, অপু, মোসলেহ - এদের সাথে তার সখ্যতা ছিল। 
মানুষের মৃত্যুর পর একটি শূন্যতা সৃষ্টি হয়। বেলাল ভাইয়ের চলে যাওয়ার পর বহুদিন এ শূন্যতা বিরাজ করবে। বিশেষ করে রমজান মাসে জনমত অফিসে ইফতারি নিয়ে বেলাল ভাই যাবেন না, পত্রিকা অফিসেও আর বেলাল ভাইয়ের ইফতারি নিয়ে আসা হবে না। তাঁর তরুণ বন্ধুরা হারিয়েছে তাদের অগ্রজপ্রতীম এক বন্ধুকে যিনি তাদের স্নেহ দিয়ে গেছেন অকাতরে। আর আমরা যারা গত তিন দশক ধরে বেলাল ভাইয়ের সঙ্গ পেয়েছি তারা কি সহজে এই মানুষটিকে ভুলতে পারবো? চাইলেই ভোলা যাবে না। দোয়া করি শান্তির বাগানে শান্তিতে ঘুমাও বেলাল ভাই। 
 লণ্ডন, ২৭ জানুয়ারি 
লেখক : সাংবাদিক। সাপ্তাহিক সুরমার সাবেক সম্পাদক।