Share |

শাহাব উদ্দিন আহমদ বেলাল : এক প্রিয়জনের প্রয়াণে শ্রদ্ধাঞ্জলি

ফারুক আহমদ
১৯৮৯ সালে এদেশে এসেছিলাম একটি সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হিসেবে। আমাদের প্রথম অনুষ্ঠান হয় হ্যাকনি টাউন হলে। আগে থেকেই অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ নির্ধারিত ছিল। আসার পরের দিনই অনুষ্ঠানে কে কী দায়িত্ব পালন করবেন এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছিল। তখন অনুষ্ঠান উপস্থানপনা কে করবেন প্রশ্ন উঠলে আয়োজক জানালেন বেলাল করবে, - শাহাব উদ্দিন বেলাল। কে এই শাহাব উদ্দিন বেলাল? আমাদের এ প্রশ্নের জবাবে জানালেন তিনি অত্যন্ত ভালো ও ভদ্র মানুষ। নতুন প্রজন্মের মধ্যেও জনপ্রিয় এবং বর্তমানে কাউন্সিলার। আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন তিনিতো পূবালী। আয়োজকের প্রতিত্তোর - ভালো মানুষ পূবালী নাকি পশ্চিমালী তাতে কী। আমরা এমন উপস্থাপক চাই যিনি দর্শক ধরে রাখতে পারবেন, সামাল দিতে পারবেন। উল্লেখ্য, যে সে সময়ে সিলেটের পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে পূর্বাঞ্চলের মানুষ ‘পূবালী’, এবং পূর্বাঞ্চলের মানুষের কাছে পশ্চিমাংশের মানুষ ‘পইছমালী’ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। এছাড়া পূর্ব লন্ডনে তখন ‘ল’-এর দারুণ প্রভাব। যেমন শাহাব উদ্দিন বেলাল, রাজন উদ্দিন জালাল, আব্বাস উদ্দিন হেলাল (পরবর্তীকালে হেলাল উদ্দিন আব্বাস), সৈয়দ বেলাল আরও আছেন। আসার পরের দিন বেড়াতে গেছি ক্যানন স্ট্রিটে বসির রেজা ভাইয়ের কফি শপে। সেখানে গিয়েই শাহাব উদ্দিন বেলালের সঙ্গে পরিচয়। জানালেন ব্যস্ততার জন্য আমাদের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। তিনিই সেদিন আমাদেরকে চা-পানে আপ্যায়িত করালেন। আলাপ-আলোচনায় মনে হল একেবারে সহজ-সরল একজন মানুষ। তখন থেকেই তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক। এর কয়েক দিন পরেই শুনলাম তার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে! এটা ছিল সম্ভব তার দ্বিতীয় হার্ট অ্যাটাক। তার পর অর্থাৎ ১৯৮৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত প্রতি বছরই হ্যাট অ্যাটাকের কারণে তাকে হাসপাতালে যেতে হয়েছে। আমি একবার জানতে চেয়েছিলাম কত বার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে? জানালের বিশ বার পর্যন্ত মনে রেখেছিলেন! এর পরে আর হিসেব রাখার প্রয়োজন মনে করেননি। আমার ধারণা সবচে বেশি হার্ট অ্যাটাকধারণকারী রোগি হিসেবে গিনিজ বুক অব ওয়ার্? রেকর্ডে তার নাম যোগ হবার দাবি রাখে। হাসপাতালের অনেক প্রবীন ডাক্তার তাকে দেখে বিষ্ময় প্রকাশ করতেন যে, কীভাবে তিনি এখনোর বেঁেচ আছেন? অনেক নবীন ডাক্তারকে তিনিই বলে দিতেন কী কী ঔষধ তাকে দিতে হবে। আমাদের সমাজে প্রচলিত ধারণা যে, একজন মানুষ সর্বোচ্চ তিন বার হার্ট অ্যাটাকের পরে আর বাঁচেন না। তা হলে বেলাল ভাই এতোদিন বাঁচলেন কীভাবে? আমার ধারণা, তার হার্টের ধারণক্ষমতা হয়ত ছিল আমাদের চাইতে অনেক অনেকগুণ বেশি। আসলেই তিনি ছিলেন একজন মহৎ এবং বড় হৃদয়ের মানুষ। আরও মজার বিষয় হল- হার্ট অ্যাটাক তার কাছে কোনো রোগই ছিল না। হাসপাতালে গেলেও রোগের চাইতে তিনি বেশি মনোযোগী থাকতেন তার অনলাইন পত্রিকা ‘...’ খবরগুলো আপডেইট করা নিয়ে। সেজন্য সাপ্তাহিক পত্রিকার রিপোর্টার সরোয়ার কবির এবং বাংলাদেশের দৈনিক প্রথম আলোর লন্ডন প্রতিনিধি তবারকুল ইসলাম তার অনেকটা একান্ত সহকর্মী। আমার কাছে মনে হত ঘরসংসার, ভাবী-বাচ্চা, খাওয়া-দাওয়া এগুলো ছাড়া তার চললেও, সরোয়ার এবং তবারক ছাড়া তার চলতো না; তেমনি এ দুজনেরও শাহাবউদ্দিন বেলাল ভাইয়ের বকাঝকা না শুনলে যেন তাদের পেটের ভাতই হজম হতো না। উল্লেখ্য যে, গত প্রায় সাতাশ বছরে মাত্র দুইবার আমি তাকে হাসপাতালে দেখতে গেছি। প্রথমবার শুনলাম পড়ার মতো বই আর তার হাতে নেই। তাই আমার একটি বই নিয়ে গিয়েছিলাম। দ্বিতীয়বার তার মারা যাবার আগের সপ্তাহে। তাও সরোয়ার কবিরের চোখেমুখে হতাশার চি? দেখে। কারণ, যতবারই যাবার প্রস্তুতি নিয়ে পূর্ব লন্ডনে গেছি, গিয়ে জেনেছি তিনি ঘরে চলে গেছেন। আসলে তিনি ঘরে যাননি হাসপাতাল থেকে হয় সাপ্তাহিক পত্রিকা অফিসে অথবা সাপ্তাহিক জনমত অফিসে গিয়ে সোজা হাজির হতেন। কখনো বা মুসলেহ উদ্দিন আহমদের ফেইথ প্রিন্টার্সে। এগুলো ছিল অনেকটা তার রোগ নিরাময় কেন্দ্রের মতো। সেজন্য কেন জানি মনে হত বেলাল ভাই সুস্থ্য হয়ে ফিরে আসবেন। সেদিন আমার সঙ্গে ছিলেন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ বেলাল আহমদ। আমাদেরকে দেখে ভাবী ও ছেলেমেয়েরা অন্য কামরায় চলে যান। তিনি তখন ঘুমাচ্ছেন। পাশে কেউ না থাকায় বেলাল আহমদ তাকে ডেকে জাগালেন। জেগেই প্রশ্ন করলেন ‘তোমরা কুবাই আইছ’ অর্থাৎ তোমরা কোথায় এসেছো? আমরা উত্তর দিলাম। বেলাল আহমদ আবার প্রশ্ন করলেন আপনার কি কোনো কিছু খেতে ইচ্ছে করে? উত্তর দিলেন, ‘ই-দুনিয়াত খাওয়ার কোনতা আছেনি?’ অর্থাৎ এই দুনিয়াতে খাওয়ার কি কোনো কিছু আছে? তখনই মনে হয়েছিল হয়ত তিনি এ যাত্রায় টিকবেন না।  আমরা ছিলাম একই পাড়ার বাসিন্দা। অর্থাৎ স্টেপনি গ্রিন মাঠের এপারে আমি এবং ওপারে আমি। তারপর ২০০৫ সালে পূর্ব লন্ডন ছেড়ে অ্যানফি?ে বসবাস। তখন আমি কৃষিকাজে মোটামুটি সুনাম অর্জন করেছি। প্রতি বছর কমপক্ষে দেড় থেকে দুইশত লাউ, কুমড়ো ঘরে তুলি। এছাড়া অন্যান্য তরি-তরকারিতো আছেই। আছে চেরি, প্লাম ইত্যাদি ইত্যাদি। বেলাল ভাইয়ের পছন্দের তালিকায় ছিল আধাপাকা প্লাম, কচি এবং পাকা কুমড়ো। ভাবী, আধাপাকা প্লাম দিয়ে খুব ভালো চাটনী প্রস্তুত করতে পরেন। এছাড়া, কচি কুমড়োর সঙ্গে ইছা মাচ দিয়ে তরকারি ছির তার পছন্দের। আর পাকা কুমড়ো দিয়ে মুরব্বা তৈরিতেও ভাবীর জুড়ি মেলা ভার। তবে মুরব্বা তৈরি করলে তার অর্ধেক চলে আসতো সাপ্তাহিক পত্রিকা অফিসে। ওদিকে, আমার কাজ ছিল অযাচিতভাবে বন্ধু-বান্ধবকে এগুলো বিতরণ। তাই প্রতি বছর মৌসুম আসলেই বেলাল ভাই জানতে চাইতেন তার পাওনাগুলো তিনি কবে পাবেন। গত কয়েক বছর ধরে তার দু’জন অনুজপ্রতীম বন্ধু জোটে। এরা হল সরোয়ার কবির এবং তবারক। এরা প্রতি দিন কতবার যে তাকে ফোন করতো তার কোনো হিসেব ছিল না। আমি পত্রিকা অফিসে গেলেই সরোয়ার কবির মোবইল সংযোগ দিয়েই ফোনটি আমার হাতে তুলে দিয়ে বলতো, বেলাল ভাইয়ের সাথে কথা বলুন।
বন্ধু ইসহাক কাজলের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল ২৯ জানুয়ারি প্রথমে গাফফার ভাইকে (আব্দুল গাফফার চৌধুরী) দেখে সন্ধ্যায় বেলাল ভাইকে দেখতে যাবো। কিন্তু তার আগেই, শুক্রবার সরোয়ার কবিরের কান্নাজড়িত কণ্ঠের অনাকাঙিক্ষত সংবাদ - ‘ফারুক ভাই, বেলাল ভাই মারা গেছেন!’ এর বেশি সরোয়ারের কণ্ঠ থেকে বের হচ্ছিল না, আমারও না। মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের প্রিয় শাহাবুদ্দিন বেলাল ভাইকে যেন বেহেস্ত নসিব করেন এই প্রার্থনাই করি। আমিন।
লেখক : গবেষক।