Share |

‘এবার ঘরে নয়, একেবারে হেইল্ট’

হামিদ মোহাম্মদ 

‘এবার ঘরে নয়, একেবারে  হেইল্ট’। গত ১১ জানুয়ারি ফোনে কথা বলতে গেলে শুরুতেই  শাহাব উদ্দিন আহমদ বেলাল এ কথা বললেন। ফোন করার সময় একটু দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলাম- তিনি হাসপাতালে না ঘরে। আপনি কোথায় বলতেই অনেকটা রাগত স্বরে বললেন, তুমি জানো না আমি কোথায়। আমি দ্বিধান্বিত হয়ে কিছু বলতে চাইলে তিনি আগেই বলে ফেললেন, তিনি হাসপাতালে। ফোন করেছিলাম আমার মেয়ের একটা সুখবর দেয়ার জন্যে। সুখবরটি পরে বললাম। আগে খোঁজ খবর নিলাম তাঁর শারীরিক অবস্থার। বললেন, এবার একেবারে হেইন?ে যাবো, আর আশা নেই। আমি তাকে শান্তনা দিয়ে সুখবরটি বললাম। শুনে তিনি খুশি হলেন।
দৃঢ়কণ্ঠে তাঁর হেইন?ে শেষ যাত্রার কথা বলায় এদিন বুকটা কেঁপে উঠলো। অনেকদিন হয় খবর নিইনি। পত্রিকার সারওয়ার কবির দু’একদিন পর পর ফোন করে বা দেখা হলে বেলাল ভাইয়ের শারীরিক খবরাখবর জিজ্ঞেস করার আগেই বলতো তিনি কি অবস্থায় আছেন। হাসপাতালে বেলাল ভাইয়ের নিয়মিত খবর নিতো সারওয়ার কবির ও তবারক পারভেজ। আমরা ধরেই নিতাম, সারওয়ারের কাছ থেকে  সর্বশেষ তাঁর শারীরিক অবস্থার খবর জানতো পারবো। তিনি হাসপাতালকে নিজের বাড়ি বলতেন। ঘন ঘন শারিরীক সমস্যার কারণে মাসের বেশিরভাগ তাঁর হাসপাতালেই কাটতো। গত দু বছর ধরেই এমনি হাসপাতালে তাঁর দৌঁড়ঝাঁপ ছিল। যার জন্যে হাসপাতালকে তাঁর বাড়ি বলতেন। তবে হাসপাতাল থেকে ছাড় পেলেই সাপ্তাহিক পত্রিকা অফিসের পেছনে গাড়ি নিয়ে এসেই সারওয়ার বা তবারককে ফোন করে বলতেন একটা পত্রিকা নিয়ে দেয়ার জন্যে। কোনো কোনো দিন গাড়ি পার্ক করে চলে আসতেন লাঠি হাতে গুটি গুটি পদক্ষেপে অফিসে। ঝগড়াও জুড়ে দিতেন, তাঁর কেউ খোঁজ নিচ্ছে না বলে। এসব ছিল গত ক’মাসের চিত্র। কিন্তু এর আগে তিনি কাউকে কোনো তোয়াক্কাই করতেন না, সবাই যেন তাঁর পরিবারের লোক, সবাইকে ডেকে আনতেন। কে কোথায় আছো চলে আসো। বোঝা যেতো কতো জরুরি কাজ। আসলে কিছু না। আড্ডা। রাজনীতি সমাজনীতি, দেশে কী ঘটছে বা এদেশে এখন আলোচ্য বিষয় কোনটি এসব নিয়ে খুনসুটি আর টেবিল চাপড়ানো। সব কিছুতেই তাঁর জিত। বড়দের সাথে যেভাবে বন্ধুত্ব ছিল ছোটদের সাথেও একইভাবে বন্ধুত্ব।  তাঁর মৃত্যুর দুদিন আগেই সহযোগী একটি পত্রিকায় লিখেছি, একদিন দেখা না হলে ফোন করেই বলতেন, ‘হেই তুইন কইরে’। এটা ছিল তাঁর বরাবরের একটি ব্যবহৃত বাক্য। বেশি জ্বালাতন করতেন সারওয়ার কবির, সাঈম চৌধুরী, এমরান আহমেদ ও অপু রায়কে। তাঁর ‘প্রবাসে বাংলাদেশ’ অনলাইন পোটার্লে সর্বশেষ ঘটে যাওয়া সংবাদ আপলোড করতে এদের শরণাপন্ন  হতেন। এ নিউজ বা অই নিউজ কনভার্ট বা ইমেইলে পাঠানোর জন্যে তাদের অস্থির করে তুলতেন। একটু দেরি করলে উপায় নেই। রাগ না হয় অভিমান। দুদিন কথা বলা বন্ধ। সাপ্তাহিক জনমত-এ ‘রাতের পর দিন’ কলাম লিখতেন। এর বানান বা বাক্য ঠিক হলো কিনা তার জন্যে কখনো আমাকে কিংবা কাছে যদি সাঈম চৌধুরী থাকে, চেপে ধরতেন। হাতে শত কাজ থাকুক তাঁরটা আগে দেখে দিতে হবে। ‘রাতের পর দিন’ কলামটি লিখতেন সমাজের নানা অসংগতি নিয়ে। কাল্পনিক গল্প ফেঁদে কী সুন্দর বর্ণনা দিতেন, পড়ে মজাই পেতো পাঠকরা। সাপ্তাহিক পত্রিকা অফিসে এবং সাপ্তাহিক জনমত অফিসে কর্মরত সাংবাদিকদের ইফতার করানো গত ক‘বছর ছিল যেন তাঁর নিয়মিত দায়িত্ব। ইফতারের সময় দেখা যেতো মিডিয়াপাড়ার প্রায় বেশিরভাগ মিডিয়াকর্মীই তাঁর দাওয়াত পেয়ে উপস্থিত। দাওয়াত দিয়েছেন আর উপস্থিত হননি, তাকে এক প্রস্থ শাসাতেনও। দু’বছর আগে জনমত অফিসের আয়োজনে আমি উপস্থিত হতে পারিনি। এক সপ্তাহ পর পত্রিকা অফিসের আয়োজনে উপস্থিত হলে কেন জনমত-এ যাইনি তার কৈয়িফত চেয়ে মারমুখো হয়ে ওঠেন। 
টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলেও দীর্ঘদিন মিডিয়া সেকশনের দায়িত্বে ছিলেন। সেখানে বাঙালি কমিউনিটির নানা সমস্যা সমাধানে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছেন। এছাড়া  টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে একজন দায়িত্ববান নির্বাচিত কাউন্সিলরও ছিলেন তিনি। তাঁর মেয়াদকালে গৃহহীন অনেককে ঘর পাইয়ে দিতে যে সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন তা এখন কিংবদন্তি। তাঁর কাছে গিয়ে কেউ কোনভাবে উপকৃত হননি এমন নজির নেই। শাহাব উদ্দিন বেলাল কাউন্সিলের মিডিয়া সেকশনে শুধু কাজ বা কাউন্সিলর ছিলেন তার চেয়ে বড় পরিচয় তিনি ৭০ ও আশির দশকে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন। তরুণ রাজনীতিক রাজন জালাল উদ্দিন, শাহাব উদ্দিন আহমদ বেলাল, আনসার আহমদউল্লাহ, সাবেক মেয়র গোলাম মর্তুজা, ব্যারোনেস পলা উদ্দিন, সমাজকর্মী জামাল হাসান, রাজনীতিক ম.আ. মুক্তাদির, সাবেক কাউন্সিল নুর উদ্দিন আহমদসহ শতাধিক মেইনস্টিম বাঙালি রাজনৈতিক কর্মী তখন ছিলেন যেন এক গুচ্ছ শালবৃক্ষ। পূর্ব লন্ডনে যখন বর্ণবাদী আক্রমণে পোশাককর্মী আলতাব আলী নিহত হন, তখন বাঙালিরা জ্বলে উঠলেন। আর জ্বলে ওঠার তেজস্বী কর্মী ছিলেন এসব তরুণ রাজনীতিক নেতারাই। তাদের সঙ্গে কাণ্ডারী হিসেবে ছিলেন বিশিষ্টজনদের মধ্যে তাসাদ্দুক আহমেদ, আবদুল গাফফার চৌধুরী, আমিনুল হক বাদশাসহ অগ্রজরা। তাদের বর্ণবাদবিরোধী সম্মিলিত আন্দোলনের তোড়ে বর্ণবাদীরা ইস্ট লন্ডন ছেড়ে পালিয়ে যায়। বর্তমান বাঙালি অধ্যুষিত পূর্ব লন্ডন ইতিবাচক পরিবেশ তাদেরই তৈরি, তাদের হাতেই মূলত বর্ণবাদীদের পরাজয়। সেদিনগুলোতে বর্ণবাদীদের  রুখে দেয়ার কারণেই পূর্ব লন্ডনে বাঙালি শুধু নয়, অভিবাসীদের নিরাপদ বসবাস নিশ্চিত হয়েছিল। হয়েছে বাংলা টাউন, ওসমানি সেন্টার, কবি নজরুল সেন্টার, ওসমানি স্কুল, বঙ্গবন্ধু স্কুল, শাপলা স্কুল এবং ইংরেজির পাশাপাশি স্ট্রীট, বিভিন্ন স্থাপনা এবং অফিসে বাংলা লেখা।
বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা যখন জার্মানী থেকে লন্ডনে আসেন, পিতৃমাতৃ স্বজনহারা হয়ে অনেকটা নিরাশ্রয় ছিলেন তখন যারা ছায়ার মত নিরাপদ বেষ্টনি তৈরি করে এগিয়ে এসেছিলেন শাহাব উদ্দিন বেলাল ছিলেন তাদের অন্যতম। এসময় তারা তরুণ রাজনৈতিক কর্মীদের নিয়ে আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। ডা. হারিছ আলীকে সভাপতি ও শাহাব উদ্দিন আহমদ বেলালকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে যুক্তরাজ্য যুবলীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের দাবীটিও যুবলীগ প্রতিষ্ঠার পর আর্ন্তজাতিক জনমত গঠনে বলিষ্ঠ হয়ে ওঠে, গতি পায়। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অবিচল ও একনিষ্ঠ সৈনিক। এই আদর্শবাদী মানুষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে সোচ্চার ও আপসহীন ভূমিকা পালন করেন।
যতটুকু জানি, শাহাব উদ্দিন বেলাল ভাইয়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এসব সামান্য কাজ। এর বাইরেও তিনি ছিেেলন এক অসামান্য ব্যক্তি। তাকে  ঘিরে নানা গল্পই চালু থাকবে বহুদিন। তাঁর রাজনৈতিক সতীর্থ ডা. হারিছ আলী মারা গেলে লন্ডনে নাগরিক শোকসভা আয়োজনে তিনি স্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন।
তাঁর সাথে আমার পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা কম দিনের। মাত্র সাত বছরের পরিচয়ে যে মমত্ববোধ গড়ে ওঠেছিল, তার হিসেব অনেক, ওজন তুলনাহীন। স্বজনদের দুর্দিনে তাকে কাতর হতে দেখেছি যেভাবে অন্য কারোর দুর্দিনেও সমান সহযোগিতার হাত বাড়াতে দেখেছি। এমন খোলা মন আর দরদী মানুষ সমাজে বিরল। তাঁর তিরোধান বড়ই বেদনার, বড়ই কষ্টের। ২৬ জানুয়ারি,শুক্রবার ২০১৮ বিকেল ৩টায় তিনি চলে যান অন্য ভুবনে, যে ভুবন থেকে কেউ ফেরে না।
 লণ্ডন, ২৭ জানুয়ারি 
লেখক : কবি, সাংবাদিক।