Share |

চিরভাস্বর সুপ্রিয় বেলাল ভাই

দিলু নাসের

গত শনিবার জোহরের নামাজের পর লন্ডন মুসলিম সেন্টারের বিশাল হল রুম যখন কমিউনিটির প্রিয়মুখ শাহাবুদ্দিন আহমদ বেলালকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য লোকে লোকারণ্য, আমি তখন এক পাশে দাড়িয়ে জীবিত বেলাল ভাইয়ের স্মৃতি নাড়াচাড়া করছিলাম আর সেখানে আসা দীর্ঘদিন না দেখা অসংখ্য পরিচিত মানুষের মুখ চেনার চেষ্টা করছিলাম ঠিক তখন অতি পরিচিত একজন কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, লাশ দেখেছেন? শুনেই আমার বুক আৎকে উঠলো। আহা-রে মানুষ, নিঃশ্বাস চলে যাবার পরই তার পরিচয় বদলে যায়। চিরচেনা মানুষের নাম হয়ে যায় লাশ। আর তা মৃত্তিকার গভীরে পুঁতে রাখতে শুরু হয় তাড়াহুড়ো! আসলে এটাই অমোঘ নিয়ম।
আমি ওনার প্রশ্নের জবাবে বল্লাম, জ্বিনা দেখিনি। দেখতেও চাই না। কারণ প্রিয়জনদের মৃত মুখ দেখতে আমার ভালো লাগেনা। আমি তাদের জীবন্ত মুখটাকে মনের গভীরে লালন করতে চাই। এ কারণে আজো দেখবোনা। নিচ্চেজ মুখ দেখলে হয়তো তাঁর সতেজ মুখাবয়ব মন থেকে হারিয়ে যেতে পারে। 
এর পর সারাদিন গত তিরিশ বছরের অসংখ্য স্মৃতি আমি উ?েপা?ে দেখেছি। কিছু কিছু ভাঙাছেড়া,/ কোনটা ধুসর কোন কোন স্মৃতি আছে চিরভাস্বর। তাঁর মৃত্যুসংবাদ শোনার পর থেকে একটি অপরাধবোধ আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। এই কষ্ট ভুলতে হয়তো আমার হয়তো অনেক দিন লাগবে। বেলাল ভাই হাসপাতালে আছেন খবরটি কয়েকদিন আগে শুনলেও তেমন চিন্তিত ছিলাম না। কারণ গত কয়েক বছর ধরে তিনি শারিরিক অসুস্থতার জন্য নিয়মিতই হাসপাতালে যাওয়া-আসা করছেন। এর আগে যখনই শুনেছি তিনি অসুস্থ, কয়েকদিন যেতেনা যেতেই দেখেছি তিনি আবার যথারীতি পত্রিকা অফিসে উপস্থিত। তাই এবারও এতোটা দুর্ভাবনায় ছিলাম না। ভেবেছি হয়তো চলে আসবেন অচিরেই। গত সপ্তহে পত্রিকা অফিসে গিয়ে শুনলাম এবার তাঁর অবস্থা ভালো না। প্রিয়জন সারওয়ার বললেন দিলু ভাই বেলাল ভাই আপনার কথা জিঞ্জেস করেছেন। দেখে আসুন একবার। ভাবলাম পরের দিনই যাবো কিন্ত যাওয়া হয়নি। যখন যাওয়ার সুযোগ পেলাম তখন তিনি হিমস্রোতে পাড়ি দিয়েছেন। আমার জন্য আর অপেক্ষা করেননি। কিন্ত আমি তাকে শেষ দেখা দেখতে পারিনি বলে কেবলই অশ্রুসিক্ত হচ্ছি।
আর মনে মনে বলছি ক্ষমা করবেন বেলাল ভাই। আমি আপনার শেষ কথা শুনতে পারিনি। আমি জনমতের জন্য আপনাকে নিয়ে একটা ছড়া লিখেছিলাম। লেখার সময় ভেবেছি পড়ে হয়তো আপনি খুশী হবেন কিন্তু এই লেখা আপনার আর দেখা হয়নি। আপনি এখন অনেক দূরে, মৃত্তিকার ফুল হয়ে ফুটে থাকবেন পিস গার্ডেনে।
প্রতি সোমবারে পত্রিকা অফিসে গেলে আর বলবেন না, “আইজ কিতা লেখরে বে..” । কোন কথা নিয়ে দ্বিমত হলে আর বলবেন না “তোমরা বেশী বুঝো...।”
আজ থেকে তিরিশ বছর আগে যখন পূর্ব লন্ডনের অলিগলি চিনতে শিখেছিলাম তখনই এই প্রাণময় মানুষটিার সাথে চেনা জানা। প্রথম পরিচয় স্টেপনি গ্রীনের তৎকালীন সিলেট সেন্টারে ১৯৮৭ সালের সামারে এক পড়ন্ত বিকেলে। কবি দিলওয়ারের সম্বর্ধনা সভায়। এর পর হৃদ্যতা বাড়ে দ্রুত গতিতে। সেসময় দেশে প্রবল গতিতে চলছে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন। এর ঢেউ এসে লেগেছে লন্ডনে। এখানে প্রতিদিন মিছিল মিটিং জনসভা। আমি তখন সাপ্তাহিক কাগজ গুলোতে গণআন্দোলন নিয়ে ছড়া লিখছি প্রতি সপ্তাহে। আর জনসভায় পাঠ করছি উচ্চস্বরে। বেলাল ভাই আমার ছড়া পড়ে মুগ্ধ তখন। কোন সভা হলেই ডাক দিতেন ছড়া পড়তে। অপরিচিত লোকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেন। সে সময় সাপ্তাহিক নতুনদিন পত্রিকা প্রকাশিত হয়। আমি সেখানে যাই প্রতি সপ্তাহে। বেলাল ভাইও আসেন। কথা হয় আডডা হয়। বাড়তে থাকে প্রাণের লেনাদেনা। যতোদুর মনে পরে তখন তিনি ঢাকার খবর গ্রুপের সাথে যুক্ত। এখানে কোন অনুষ্ঠান হলে ছবিসহ সংবাদ পাঠাতেন নিয়মিত। সেসময় তাঁর নিত্য সাথী ছিলো প্রয়াত বন্ধু ছানু মিয়া। তারা দুজনে তখন কমিউনিটির সব খবরাখবর ছবি সহ সকল কাগজে দিতেন। পরবর্তীতে আমি নতুনদেশ এবং পূর্বদেশ কাগজের সাথে যুক্ত থাকাকালে বেলাল ভাইকে আরো কাছ থেকে দেখার ও জানার সুযোগ হয়।তিনি এতো বড় অথবা নামীদামী সাংবাদিক- লেখক ছিলেন না ঠিকই, কিন্তু তাঁর হৃদয় ছিলো অনেক বড়। ছোটবড় সকলকে তিনি সম্মান দিতেন। আমার জানা মতে তিনি অনেক অখ্যাত ব্যক্তিকে বিখ্যাত বানিয়ে দিয়েছেন। সে সময় দেশ থেকে আসা অনেক রাজনৈতিক নেতা - বুদ্ধিজীবিকে তিনি প্রাণপণে সহযোগিতা করতেন। সারাদিন তাদেকে নিয়ে ঘুরতেন। অনেককে এদেশে স্থায়ী ভাবে বসবাসের জন্য সাহায্য করেছেন। সে সময় থেকেই দেশের বড় বড় নেতাদের সাথে ওনার ছিলো গভীর সম্পর্ক।
তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে এদেশে ঘাতক দালাল নিমূর্ল কমিটির কার্যক্রমে গতি এসেছে। দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য তাঁর ভালোবাসা ছিলো অপরিসীম। তাই দেশের প্রতিটি দুর্দিনে- আন্দোলনে এই ভিন্ন দেশে ভিন্ন পরিবেশে তিনি ছিলেন সদাজাগ্রত।
সাহিত্য- সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং সমাজ সেবা সবখানেই ছিলো তাঁর উজ্জর উপস্থিতি। সেসময় আমাদের সকল উদ্যোগে কাছে থেকে তিনি প্রেরণা যুগিয়েছেন সাধ্যমতো ।
বাংলাদেশ আওয়ামিলীগ আর এখানের লেবার পার্টি ছিলো তাঁর প্রাণ। তাঁর জীবনের বেশীর ভাগ সময় কেটেছে এই দুই দলের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌছে দিতে। 
প্রবাসে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে তিনি আজিবন এখানে কাজ করে গেছেন। চলনে বলনে আচার আচরণে আমৃত্যু তিনি ছিলেন আপাদমস্তক বাঙালী। লালসবুজ পতাকার অতন্দ্র প্রহরী। এদেশে বাংলা ভাষার চর্চা বিকাশের পিছনেও তাঁর ভূমিকা ছিলো। পূর্ব লন্ডনে বাঙালীর উত্থানের পিছনে যেসব মানুষের অবদান রয়েছে তিনিও তাদের একজন।
সত্তর দশকের শেষের দিকে সাড়ে বাহান্ন হ্যানবারী স্ট্রীটে কাঠের বানানো শহীদ মিনার দিয়ে মহান একুশে উদযাপনের যে প্রচলন শুরু হয়েছিলো এটির প্রধান কারিগর ছিলেন প্রিয় বেলাল ভাই। এর ধারাবাহিকতায়ই আলতাব আলী পার্কসহ বিলেতের বিভিন্ন জায়গায় শহীদ মিনারের স্থাপিত হয়েছে। 
বর্ণবাদী আন্দোলন সহ এখানে আমাদের অধিকার আদায়ের সকল আন্দোলনে তিনি আজীবন ছিলেন সক্রিয়। লেবার পার্টির সাথে আশির দশকের শুরু থেকে তিনি যুক্ত। সে সময় থেকেই স্থানীয় মানুষের সুখ দুঃখ হাসি-আনন্দের সাথে তাঁর সম্পৃক্ততা।
জনপ্রতিনিধি হিসাবেও যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। শাহাবুদ্দিন বেলাল মানুষকে ভালোবাসতেন। আর মানুষের ভালোবাসাই ছিলো তাঁর পরম সম্পদ। বর্ণবাদের হিংস্র ধাওয়া খেয়ে যেখান থেকে তাঁর প্রবাস জীবন শুরু হয়েছিলো সেই জনপদকে আমাদের জন্য নিরাপদ করে হাজারো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে এই পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিলেন তিনি।
ইস্টএন্ডের অলিতে গলিতে আমরা আর তাকে দেখবোনা ঠিকই। কিন্তু স্টেপনি গ্রীনের সুউচ্চ ম্যাপল আর ফুলে শোভিত চেরী বৃক্ষের নিচে তাঁর পদছাপ রয়ে যাবে আজীবন এবং প্রিয়জনদের প্রাণেপ্রাণে থাকবেন অম্লান- চিরভাস্বর, সুপ্রিয় বেলাল ভাই।
মানুষের শান্তির জন্য যিনি কাজ করেছেন আজীবন তাঁর পরকাল হোক শান্তিময়। আল্লার কাছে এই কামনা করি।
লেখক : কবি ও ছড়াকার। সংস্কৃতিকর্মী।